This is default featured slide 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

ইসলামিক প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইসলামিক প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

আকিমুস সালাহ বলতে আসলে কী বুঝায়?


‘কায়েম করা’ কথাটির অর্থ হচ্ছে, প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বারংবার নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। কুরআনে নানানভাবে নামাজের কথা এসেছে প্রায় ১০৪ বার এবং প্রায় ১৮ বার আল্লাহ তায়ালা আদেশ সূচকভাবে নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। নামাজ কায়েম বলতে আমরা সাধারণত নামাজের অনুষ্ঠান বাস্তবায়নকে বুঝি। অর্থাৎ আমরা সাধারণত যা বুঝি নিজে নামাজ পড়া অন্যদেরকে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করাই হচ্ছে আকিমুস সালাহ বা নামাজ কায়েম। আসলে আকিমুস সালাহ বলতে কী বুঝায় তা আমরা আজ আলোচনা করার চেষ্টা করবো। 

নামায প্রতিষ্ঠা দুই ধরণের হতে পারে 
১- ব্যক্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠা 
২- সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা 

ব্যক্তির মধ্যে নামায প্রতিষ্ঠা আবার দুই ধরণের হতে পারে 
ক- নামাজকে ব্যক্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা
আমরা অনেকেই স্মার্ট ফোন ইউজ করি। আপনারা জানেন এসব স্মার্ট ফোনে কিছু এপস বা কিছু প্রোগ্রাম প্রথম থেকেই ইন্সটল করা থাকে আবার কিছু প্রোগ্রাম পরবর্তীতে আমাদের প্রয়োজন অনুসারে ইন্সটল করি। ঠিক তেমনি আল্লাহ তায়ালা আমাদের দেহে কিছু প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার বা এপস শুরু থেকেই ইন্সটল করে দিয়েছেন। যেমন আমরা নিঃশ্বাস নেই, ক্ষুদা লাগলে খাই, ক্লান্তি লাগলে ঘুমাই ইত্যাদি। এরপর আমরা যখন আস্তে আস্তে বড় হই তখন কিছু কিছু ব্যাপার আমরা নিজেরা নিজেদের খুশিমত ইন্সটল করে নিই যেমন কেউ গান শোনা ছাড়া থাকতে পারি না, কেউ গল্পের বই পড়তে পড়তে প্রচুর সময় ব্যয় করি, কেউ প্রচুর খেলাধুলা করি, কেউ প্রচুর টিভি দেখি ইত্যাদি। আমরা যারা যেগুলো ইন্সটল করে নিয়েছি সেগুলো ছাড়া আমরা অস্থির হয়ে পড়ি। কোন কারণে টিভি না দেখলে বা না গান শুনলে বা না বই পড়লে আমাদের কাছে সব এলোমেলো লাগে। এটাই হচ্ছে আপনি বা আমি এই বিষয়গুলোকে নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছি। ঠিক তেমনি নামাজও এইভাবে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয় আছে। কেউ যদি নামাযকে তার নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে নেয় তখন নামাজের সময় হওয়া মাত্রই সে অস্থির হয়ে পড়বে। নামায পড়ার জন্য তার মন আনচান করবে। তাদের অন্তর থাকবে মসজিদের সাথে লাগোয়া। 

আল্লাহর রাসূল সঃ বলেছেন, আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেছেন যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। এর মধ্যে এক ধরণের ব্যক্তি যার ক্বলব মসজিদের সাথে লেগে রয়েছে। 
সহীহ বুখারীঃ ৬২৭ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) 

নামাজকে নিজের মধ্যে ইন্সটল বা প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতি হচ্ছে বার বার নামাজ পড়া। নামাজের প্রতি সচেতন থাকা। নামাজ না পড়ার শাস্তি এবং আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার শাস্তি স্মরণ করা। এভাবে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নামাজ আমাদের শরীরে এবং ক্বলবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইনশাআল্লাহ্‌। 

খ- নামাজের শিক্ষাকে ব্যক্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা 
শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক নামাজ আদায় করলেই নামাজ কায়েমের হক আদায় হয় না। বরং নামাজ থেকে শিক্ষাগ্রহন করে সেই শিক্ষা নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করাও নামাজ কায়েম তথা নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই ব্যাপারে রাসূল সঃ এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে, আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অমুক মহিলা নামাজ ও যাকাতে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তবে সে নিজের মুখ দ্বারা তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, সে জাহান্নামী। লোকটি আবার বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অমুক মহিলা সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, সে কম (নফল) রোজা রাখে, কম (নফল) সদকা করে এবং নামাজও (নফল) কম পড়ে। তার দানের পরিমাণ হলো পনিরের টুকরাবিশেষ। কিন্তু সে নিজের মুখ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। রাসূল সা. বললেন, সে জান্নাতী।
(আহমাদ ও বায়হাকী, শো’আবুল ঈমান)

এই হাদীস থেকে যে বিষয়টা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো নামাজ নিয়মিত পড়েও যদি কোন ব্যক্তি নামাজের শিক্ষাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে না পারেন, নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন তাহলে তিনি নামাজ কায়েম করতে পারেন নি। তার নামাজ পড়া কোন কাজে আসবে না। তাই আমাদের নামাজ আদায়ের সাথে সাথে নিজের জীবনে নামাজের শিক্ষা কায়েম করা একান্ত কর্তব্য। এটি আকিমুস সালাহর অংশ। 

আসুন আমরা নামাজ থেকে যে শিক্ষাগুলো পাই সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি। 
১. সকল কাজে আল্লাহকে স্মরণ করা। 
সূরা ত্বোয়াহ’র ১৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমিই আল্লাহ আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর। আমরা যে কাজই করি না কেন আমরা অবশ্যই সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করবো। প্রতিটা কাজ করার পূর্বে চিন্তা করবো আল্লাহ আমাকে দেখছেন, এই কাজের জন্য আমাকে জবাবাদিহি করতে হবে। এভাবে আল্লাহকে স্মরণ করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে আমাদের দ্বারা পাপ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এটাই নামাজের শিক্ষা। 

২. আল্লাহর আদেশ মানার মানসিকতা সৃষ্টি করা
সূরা বাকারার ১৭৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা মুখ পূর্ব দিক করলে না পশ্চিম দিক করলে, এটি কোন সওয়াব বা কল্যাণের কাজ নয়। বরং সওয়াব বা কল্যাণের কাজ সে-ই করে, যে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীদের বিশ্বাস করে বা মান্য করে। আর শুধু আল্লাহর ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর ধনসম্পদকে আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন, পথিক, সাহায্যপ্রার্থী ও ক্রীতদাস মুক্তির জন্যে ব্যয় করে এবং নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে, ওয়াদা করলে তা পূরণ করে, দারিদ্র্য, বিপদ-আপদ ও হক বাতিলের দ্বন্দ্বের সময় ধৈর্য ধারণ করে। এরাই (ঈমানের ব্যাপারে) সত্যবাদী এবং এরাই মুত্তাকী।
এখানে আল্লাহ তায়ালা নামাজে আমরা কোনদিক ফিরে দাঁড়াবো সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন, মূল কথা হলো আল্লাহ যা বলেছেন তা করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। একজন মু’মিনের কাজের মানদণ্ড হবে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সঃ। তাদের কথার বা আদেশের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। 

৩. আল্লাহর আদেশ-নিষেধ আল-কুরআন থেকে জানার মানসিকতা তৈরি করা: নামাজে কুরআন পড়তে হয় যা থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো আমাদের আদেশ নিষেধ জানা তথা জ্ঞানের উৎস হলো আল কুরআন। 

৪. সতর ঢাকা বা পর্দার শিক্ষা 
নামাজে সতর ঢাকা পূর্বশর্ত। এর মাধ্যমে আমাদের পর্দা শেখানো হয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের বিধান অত্যন্ত যৌক্তিক ও উপকারী। শরীয়ত বিশেষ কোনো পোশাক সুনির্দিষ্ট করে দেয়নি এবং কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইন বা আকৃতিও বলে দেয়নি যে, এ ধরনের পোশাকই তোমাদের পরতে হবে; বরং বিভিন্ন দেশ, অঞ্চল, আবহাওয়া ও মৌসুম ভেদে পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে কিছু মৌলিক নীতি ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, এ ধরনের পোশাক গ্রহণীয় ও এ ধরনের পোশাক বর্জনীয়।

এক. পোশাক এমন আঁটসাঁট ও ছোট মাপের হতে পারবে না, যা পরলে শরীরের সাথে লেপ্টে থাকে এবং দৈহিক গঠন ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুটে ওঠে।

আবু ইয়াযীদ মুযানী রাহ. বলেন, হযরত ওমর রা. মহিলাদেরকে কাবাতী (মিসরে প্রস্ত্ততকৃত এক ধরনের সাদা কাপড়) পরতে নিষেধ করতেন। লোকেরা বলল, এই কাপড়ে তো ত্বক দেখা যায় না। তিনি বললেন, ত্বক দেখা না গেলেও দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুটে ওঠে।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ২৫২৮৮

দুই. পোশাক এমন পাতলা ও মিহি হতে পারবে না যাতে শরীর দেখা যায় এবং সতর প্রকাশ পেয়ে যায়। যেমন পাতলা সুতির কাপড়, নেটের কাপড় ইত্যাদি। অবশ্য পাতলা কাপড়ের নিচে সেমিজ জাতীয় কিছু ব্যবহার করলে তা জায়েয হবে। হযরত আলকামা ইবনে আবু আলকামা তার মা থেকে বর্ণনা করেন যে, একবার হাফসা বিনতে আবদুর রহমান তার ফুফু উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকটে এল। তখন তার পরনে ছিল একটি পাতলা ওড়না। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং একটি মোটা ওড়না পরিয়ে দিলেন।-মুয়াত্তা মালেক ২/৯১৩, হাদীস : ৬

তিন. পোশাকের ক্ষেত্রে কাফের-মুশরিক ও ফাসেক লোকদের অনুসরণ-অনুকরণ ও সাদৃশ্য অবলম্বন করা যাবে না। বিশেষত সেইসব পোশাকের ক্ষেত্রে যা অমুসলিমদের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে‘উসফুর’ (ছোট ধরনের লাল বর্ণের ফুল গাছ) দ্বারা রাঙানো দুটি কাপড় পরতে দেখে বললেন,‘এগুলো হচ্ছে কাফিরদের পোশাক। অতএব তুমি তা পরিধান করো না।’-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২০৭৭; নাসায়ী, হাদীস : ৫৩১৬

তাছাড়া অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই দলভুক্ত। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০২৭

চার. পোশাকের মাধ্যমে অহংকার ও লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ উদ্দেশ্য হওয়া যাবে না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-যে ব্যক্তি দুনিয়াতে সুখ্যাতি ও প্রদর্শনীর পোশাক পরবে আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৬২৪৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০২৫

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি অহংকারবশত মাটিতে কাপড় টেনে টেনে চলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫৭৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২০৮৭

পাঁচ. পুরুষদের জন্য মেয়েলী পোশাক এবং নারীদের জন্য পুরুষদের পোশাক পরা এবং একে অন্যের সাদৃশ্য গ্রহণ করা নিষেধ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সব পুরুষের উপর লানত করেছেন, যারা নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে (তাদের মতো আকৃতি, তাদের পোশাক ও তাদের চাল-চলন গ্রহণ করে)। আর সেই সব নারীর উপরও লানত করেছেন, যারা পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৩৮৮৫

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নারীর পোশাক পরিধানকারী পুরুষকে এবং পুরুষের পোশাক পরিধানকারিনী নারীকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০৯২

ছয়. পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে অপচয় ও অপব্যয় করা, বিলাসিতা করার জন্য বা শখের বশে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাক ক্রয় করা অথবা মাত্রাতিরিক্ত উচ্চমূল্যের পোশাক ক্রয় করা নিষেধ।

হযরত আমর ইবনে শুআইব তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা খাও, পান কর, অন্যদের দান কর এবং কাপড় পরিধান কর যে পর্যন্ত অপচয় ও অহংকার করা না হয়।-সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ২৫৫৯; ইবনে মাজাহ,হাদীস : ৩১০৫

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, যা মনে চায় খাও, যা মনে চায় পরিধান কর যে পর্যন্ত দুটি বিষয় না থাকে : অপচয় ও অহংকার।-সহীহ বুখারী ১০/১৫২

সাত. গায়রে মাহরাম ও পর পুরুষের সামনে অলংকার ও পোশাকের সৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে না, যাতে তারা সেদিকে আকৃষ্ট হয়।

ولا يبدين زينتهن الا ما ظهر منها

তারা যেন নিজেদের ভূষণ প্রকাশ না করে।

উক্ত আয়াতে নারীদেরকে হুকুম করা হয়েছে তারা যেন গায়রে মাহরাম বা পর পুরুষের সামনে নিজেদের পুরো শরীর বড় চাদর বা বোরকা দ্বারা আবৃত করে রাখে। যাতে তারা সাজ-সজ্জার অঙ্গসমূহ দেখতে না পায়।

ইমাম যাহাবী রাহ. বলেন, যে সব কর্ম নারীর উপর লানত করে তা হল অলংকার ও আকর্ষণীয় পোশাকের সৌন্দর্য প্রকাশ করা। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার ...। আলকাবায়ের পৃ. ১০২

وقرن فى بيوتكن ولا تبرجن تبرج الجاهلية الاولى

নিজ গৃহে অবস্থান কর সাজ-সজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না। যেমন প্রাচীন জাহেলী যুগে প্রদর্শন করা হত।

প্রাচীন জাহেলী যুগে নারীরা নির্লজ্জ সাজ-সজ্জার সাথে নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াত। আজকের নব্য জাহেলিয়াতের অশ্লীলতা এতটাই উগ্র যে, তার সামনে প্রাচীন জাহেলিয়াত ম্লান হয়ে গেছে।

আট. পুরুষের জন্য টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে কাপড় নিষেধ এবং তা কবীর গুনাহ।

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কাপড়ের যে অংশ টাখনুর নীচে যাবে তা (টাখনুর নীচের অংশ) জাহান্নামে জ্বলবে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫৭৮৭

হযরত আবু হুবাইব ইবনে মুগাফফাল গিফারী রা. মুহাম্মাদ কুরাশীকে লুঙ্গি টেনে চলতে দেখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন-আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘যে অহংকারবশত পায়ের নীচে কাপড় ফেলে চলবে সে জাহান্নামে গিয়ে এভাবে চলবে।’-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৫৫৪২

৫. সময়ানুবর্তিতা শিক্ষা 
নামায সময়মত পড়তে হয়। সময়মত না পড়লে নামাজ হয় না। এই ব্যাপারে সূরা মাউনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ঐসব মুসল্লিদের জন্য ধ্বংস যারা তাদের নামাজের (সময়ের) ব্যাপারে গাফেল। এই সময়ানুবর্তিতার ব্যাপারে শুধু নামাজে নয় নামাজের বাহিরেও সকল কাজে সচেতন থাকা নামাজের শিক্ষা। 

৬. শরীর সুস্থ ও সবল রাখার শিক্ষা
আল্লাহ তায়ালা সূরা মায়েদায় বলেন, হে মুমিনগণ, যখন তোমরা সালাতে দণ্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাসেহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা (ধৌত কর)। আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে ভালোভাবে পবিত্র হও। আর যদি অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাক অথবা যদি তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে অথবা তোমরা যদি স্ত্রী সহবাস কর অতঃপর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর। সুতরাং তোমাদের মুখ ও হাত তা দ্বারা মাসেহ কর। (নামাজের আগে ওজু গোসল করার শর্ত আরোপের দ্বারা) তোমাদের অহেতুক অসুবিধায় ফেলা (কষ্ট দেয়া) আল্লাহর ইচ্ছা নয়, বরং এর মাধ্যমে তিনি তোমাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন (পবিত্র) করতে চান (বা করার শিক্ষা দিতে চান) এবং তোমাদের জন্যে তাঁর নেয়ামত (কল্যাণ কামনা) পরিপূর্ণ করে দিতে চান, যাতে তোমরা (কল্যাণপ্রাপ্ত ও খুশি হয়ে) তাঁর গুণগান করতে পার। (মায়েদাহ : ০৬)

ক. নামাজের আগে শরীর, কাপড় ও জায়গা পাক তথা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার শর্তের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মানুষকে তাদের শরীর, পোশাক-পরিচ্ছদ ও পরিবেশকে ঘন ঘন ধোয়া-মোছার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার শিক্ষা দিয়েছেন। আর এভাবে তিনি তাদের নানা ধরনের রোগের হাত থেকে মুক্ত থাকার এক সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন।

খ. ব্যায়াম করা ও ব্যায়ামে কী কী অঙ্গভঙ্গি করতে হবে তা শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে রোগমুক্ত রাখার ব্যবস্থা

গ. মেসওয়াক করার মাধ্যমে শরীর সুস্থ রাখার শিক্ষা। পাঁচবার ওজুর সময় কেউ যদি নিয়মিত মেসওয়াক করে তার দাঁত ও মুখের রোগ অনেক কম হবে।

নামাজকে সমাজে প্রতিষ্ঠা: সমাজে নামাজকে প্রতিষ্ঠা দুইভাবে হতে পারে 

ক- ফরজ নামাজ জামায়াতের সাথে পড়ে নামাজের অনুষ্ঠানকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। 
নামাজের অনুষ্ঠানটির আরকান-আহকামসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানুষকে শিক্ষা দিয়ে, মসজিদ নির্মান করে সেখানে নামাজ পড়তে পারার ব্যবস্থা করা। যখনই নামাজের আহ্বান হবে তখন সকল কাজ বাদ দিয়ে নামাজে অংশগ্রহন করার ব্যবস্থা করা। ইসলামিক সমাজে সকল মুসলিমের জন্য নামাজের জামায়াতে শরিক হওয়া বাধ্যতামূলক করা। এই প্রসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামীন বলেন, হে ব্যক্তিগণ, যারা ঈমান এনেছ, জুমআর দিন যখন নামাজের জন্যে (আজানের মাধ্যমে) ডাকা হয়, তখন বেচা-কেনা রেখে আল্লাহর স্মরণের দিকে (নামাজের দিকে) দ্রুত চলে যাও। এটি তোমাদের জন্যে উত্তম যদি জানতে।
(জুমআ : ৯)
সূরা বাকারার ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। 
এই ধরনের অনুষ্ঠান নিয়মিত পালন এবং এর ব্যবস্থা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রপ্রধানেরও। সূরা হজ্জের ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘তারাই ঐসব লোক, যাদেরকে যদি আমি দুনিয়াতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করি, তারা নামায কায়েম করে, যাকাত চালু করে, ভালো কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। আর সকল বিষয়ের শেষ ফল আল্লাহরই হাতে”। ইসলামী সরকার কর্তৃক যে কাজগুলো করা জরুরী-

ক. সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত জামাআতে নামাযের ব্যবস্থা করতে হবে। সকল মুসলমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জামাআতে শরীক হওয়ার ব্যবস্থা করা। 

খ. সরকারি হুকুমের ফলে দেশে সকল প্রতিষ্ঠানে জামাআতে নামাযের সুব্যবস্থা থাকবে।

গ. জামাআতে নামায আদায় করার জন্য সব স্থানে মসজিদ তৈরী হবে।

ঘ. ছোট বয়স থেকে সকল মুসলিম ছেলেমেয়েকে শুদ্ধভাবে নামায শেখানোর সুব্যবস্থা করতে হবে।

ঙ. নামায যে শুধু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয় এবং নামাযের উদ্দেশ্য যে উন্নত চরিত্র গঠন করা, সে বিষয়ে সবাই সচেতন হবে।

চ. এমন পরিবেশ গড়ে তোলা, যাতে সবাই নিয়মিত জামাআতে হাজির হওয়ার জন্য তৎপর হবে।

এই জামায়াতে নামাজের অনুষ্ঠানটি কতটা জরুরী এই প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল সঃ এর হাদীস থেকে পাই, আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, আল্লাহর কসম, আমার ঐ সব মুসলমানের ঘরে আগুন ধরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে যারা (বিশেষ ওজর ছাড়া) আযানের পর জামায়াতে নামাজ পড়তে না এসে, ঘরে একা নামাজ পড়ে।

উপরে বর্ণিত কুরআন ও হাদীসের বক্তব্য থেকে অতি সহজে বুঝা যায় যে, ইসলাম জামায়াতে নামাজ পড়াকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি কাজ বন্ধ রেখে জামায়াতে নামাজ পড়তে আসা অনেক উত্তম। 

খ- জামায়াতে নামাজের সামাজিক শিক্ষা:
১. সমাজের সদস্যদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, ভালবাসা ইত্যাদি সামাজিক গুণ সৃষ্টি করা
পবিত্র কুরআনের সূরা হুজুরাতের ১০ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, মুমিনরা পরস্পরের ভাই। আল্লাহ এখানে বলছেন, এক ভাইয়ের অন্তরে অন্য ভাইয়ের জন্যে যেমন সহানুভূতি, সহমর্মিতা, স্নেহ-শ্রদ্ধা, ভালবাসা ইত্যাদি থাকে, একজন মুমিনের অন্তরেও ঠিক অন্য মুমিনের জন্যে অনুরূপ অনুভূতি থাকবে।
রাসূল সা. বলেছেন, মুসলমানদের সমাজ একটি দেহের মত। দেহের কোথাও কোন ব্যথা বা কষ্ট হলে সমস্ত দেহে তা অনুভূত হয়। আবার দেহের কোথাও সুখ অনুভূত হলে তাও সমস্ত শরীরে অনুভূত হয়। মুসলমানদের সমাজও হতে হবে অনুরূপ। অর্থাৎ তাদের সমাজের কোন ব্যক্তির উপর কোন দুঃখ-কষ্ট আসলে সমাজের সকলের উপরও তার ছাপ পড়তে হবে এবং সবাইকে সেটি দূর করারও চেষ্টা করতে হবে। আবার সমাজের কারো কোন সুখের কারণ ঘটলেও সমাজের সকলের উপর তার ছাপ পড়তে হবে।

‘মুমিনরা পরস্পরের ভাই’ কথাটি বলেই আল্লাহ ছেড়ে দেন নাই। ভাইয়ের অন্তরে ভাইয়ের জন্যে যেমন স্নেহ-শ্রদ্ধা, মমতা, ভালবাসা, সহমর্মিতা ইত্যাদি থাকে তেমন মুসলমানদের সমাজের সদস্যদের পরস্পরের অন্তরেও অনুরূপ গুণাবলী সৃষ্টি করার জন্যে, তিনি ব্যবস্থা দিয়েছেন জামায়াতে নামাজের। আর এটি জামায়াতে নামাজ পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে, পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ, ওঠা-বসা যত বেশি হয়, ততই একজনের প্রতি আর একজনের মায়া-মহব্বত, স্নেহ-মমতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদি বেশি হয়। আর তা না হলে ঐ সবগুলো বিষয়ই ধীরে ধীরে কমে যায়। জামায়াতে নামাজ মুসলমানদের সমাজের একজনের সঙ্গে আর একজনের সেই দেখা-সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। 

২. শৃঙ্খলার শিক্ষা
সামাজিক শৃঙ্খলা ব্যতীত কোন জাতি উন্নতি করতে পারে না। জামায়াতে নামাজের মাধ্যমে মুসলমানদের সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অপূর্ব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার মুসলমানও যদি জামায়াতে দাঁড়ায়, তবুও দেখবেন, সোজা লাইনে দাঁড়িয়ে, কী সুন্দর শৃঙ্খলার সঙ্গে তারা একটি কাজ করছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের শিক্ষা দিতে চাচ্ছেন, তারা যেন ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি কাজ সুশৃঙ্খলভাবে করে। এত সুন্দর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সামাজিক শৃঙ্খলার অবস্থা দেখলে সত্যিই দুঃখ হয়।
৩. সাম্যের শিক্ষা
পবিত্র কুরআনের সূরা হুজরাতের ১৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, হে মানুষ, আমি তোমাদের একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সেই সব থেকে বেশি সম্ভ্রান্ত, যার অন্তরে আল্লাহভীতি সব থেকে বেশি।

আল্লাহ এখানে বলছেন, তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন একজন পুরুষ ও একজন মহিলা থেকে। এরপর তিনি তাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন। তবে এই বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করার পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য পরস্পর সম্মান ও মর্যাদা নির্ণয় করা নয় বরং পরস্পরকে সহজে চেনার ব্যবস্থা করা। এরপর আল্লাহ বলেছেন, তাঁর নিকট মানুষের সম্মান-মর্যাদার মাপকাঠি হচ্ছে আল্লাহভীতি। অর্থাৎ আল্লাহর ভয় যার অন্তরে যত বেশি, আল্লাহর নিকট সে তত বেশি মর্যাদাশীল। আল্লাহর ভয়ই মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে দূরে রাখে এবং ন্যায় কাজ করতে বাধ্য করে। তাহলে আল্লাহ বলছেন, ন্যায় কাজ করা বা বাস্তবায়ন করা এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকা বা তা প্রতিরোধ করাই হচ্ছে মানুষের মর্যাদাশীল হওয়ার মাপকাঠি। বংশ, জাতি, ধনী-গরীব, কালো-সাদা, মনিব-চাকর ইত্যাদি নিয়ে যেন অহংকার সৃষ্টি না হতে পারে, সে জন্যে তিনি কর্মপদ্ধতিও তৈরি করে দিয়েছেন। সেই কর্মপদ্ধতি হচ্ছে ‘জামায়াতে নামাজ’। একজন মুসলমান দিনে পাঁচবার জামায়াতে নামাজের সময় তার বংশ, ভাষা, গায়ের রং, অর্থনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি পরিচয় ভুলে গিয়ে অন্য মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে এক লাইনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় মনিবের পাশেই তাঁর ভৃত্য দাঁড়াতে পারে বা মনিবের মাথা যেয়ে লাগতে পারে সামনের কাতারে দাঁড়ানো তাঁর ভৃত্যের পায়ের গোড়ালিতে। এভাবে দিনে পাঁচবার বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মুসলমানদের অন্তর থেকে বংশ, বর্ণ, ভাষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ভিত্তিক অহংকার সমূলে দূর করার অপূর্ব ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৪. সমাজ পরিচালনা পদ্ধতির বাস্তব শিক্ষা
মানবসমাজের সুখ, শান্তি, উন্নতি, প্রগতি ইত্যাদি নির্ভর করে সুষ্ঠুভাবে সমাজ পরিচালনার ওপর। সুষ্ঠুভাবে সমাজ পরিচালনা করতে হলে কী কী বিষয় দরকার, জামায়াতে নামাজ পড়ার মাধ্যমে আল্লাহ প্রতিদিন পাঁচ বার তা মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সেই বিষয়গুলো হচ্ছে-

ক. নেতা নির্বাচন করা
জামায়াতে নামাজের সময়, একের অধিক লোক হলেই একজন ইমাম বা নেতা বানাতে হয়। এখান থেকে আল্লাহ শিক্ষা দিচ্ছেন, কোন সামাজিক কর্মকাণ্ড, যেখানে একের অধিক লোক জড়িত, তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে হলে একজন নেতা অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে।

খ. পুরুষ না মহিলা নেতা
জামায়াত যদি শুধু পুরুষের হয় বা পুরুষ ও মহিলা মিশ্রিত হয়, তাহলে পুরুষ ইমাম হবে। কিন্তু জামায়াত যদি শুধু মহিলাদের হয়, তবে সেখানে মহিলা ইমাম হতে পারবে। এ থেকে আল্লাহ শিক্ষা দিতে চাচ্ছেন, যে সকল সামাজিক কর্মকাণ্ড পুরুষ ও মহিলা অধ্যুষিত বা শুধু পুরুষ অধ্যুষিত, সেখানে পুরুষই নেতা হবে। আর যে সকল সামাজিক কর্মকাণ্ড শুধু মহিলা অধ্যুষিত, সেখানে মহিলা নেতা হতে পারবে।

এর কারণ হল, পুরুষ ও মহিলা মিশ্রিত সামাজিক কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে চালাতে হলে, একটি বিশেষ দৈহিক, বুদ্ধি-বৃত্তিক ও মানসিক গঠন দরকার। যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সব থেকে ভাল জানেন, ঐ ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে ঐ তিনটি গুণের প্রয়োজনীয় সমন্বয় কার মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভাল আছে। এ বিষয়টি বিবেচনা করে তিনি পুরুষকেই সে দায়িত্ব দিয়েছেন। আর এটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে আল্লাহ বলেছেন, সূরা নিসার ৩৪ নং আয়াতে। পুরুষেরা হচ্ছে নারীর পরিচালক। কারণ, আল্লাহ তাদের একজনকে অপরের উপর বিশিষ্টতা দান করেছেন।

গ. নেতা হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাগুণ
যে গুণাবলী থাকলে কোন ব্যক্তি নেতা হতে পারবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গুণগুলো রাসূল সা. সুন্দরভাবে মুসলমানদের জানিয়ে দিয়েছেন, নামাজের ইমাম হওয়ার গুণাবলী বর্ণনাকারী নিম্নের হাদীসগুলোর মাধ্যমে-
হযরত আবু মাসউদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : মানুষের ইমামতি করবে সে-ই, যে কুরআন ভাল পড়ে। যদি কুরআন পড়ায় সকলে সমান হয়, তবে যে সুন্নাহ বেশি জানে। যদি সুন্নাহেও সকলে সমান হয়, তবে যে হিজরত করেছে সে। যদি হিজরতেও সকলে সমান হয়, তবে যে বয়সে বেশি। কেউ যেন অপর ব্যক্তির অধিকার ও সেইস্থলে ইমামতি না করে এবং তার বাড়িতে তার সম্মানের স্থলে অনুমতি ব্যতীত না বসে। (মুসলিম)

এ হাদীসটিতে রাসূল সা. ইমাম হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাগুণ বা যোগ্যতাগুলো যে ক্রম অনুযায়ী উল্লেখ করেছেন, তা হচ্ছে-
ক. শুদ্ধ করে পড়াসহ কুরআনের জ্ঞান থাকা,
খ. সুন্নাহ তথা হাদীসের জ্ঞান থাকা,
গ. হিজরত করা এবং
ঘ. বেশি বয়স।
হযরত আবু সায়ীদ খুদরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : যখন তিন ব্যক্তি হবে, তখন যেন তাদের মধ্য হতে একজন ইমামতি করে এবং ইমামতির অধিকার তার, যে কুরআন অধিক ভাল পড়ে। (মুসলিম)

আমর ইবনে সালেমা রা. বলেন, আমরা লোক চলাচলের পথে একটি কূপের নিকট বাস করতাম, যেখান দিয়ে আরোহীগণ চলাচল করত। আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করতাম, মানুষের কী হল? তারা যে লোকটি সম্বন্ধে বলে তিনি কে? তারা উত্তর করত, লোকটি মনে করে তাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন এবং তার প্রতি এইরূপ ওহী নাযিল করেছেন। তখন আমি ওহীর বাণীটি এমনভাবে মুখস্থ করে নিতাম যে তা আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যেত। আরবগণ যখন ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে মক্কা বিজয়ের অপেক্ষা করছিল, তখন তারা বলত তাকে (মুহাম্মাদকে) তার গোত্রের সাথে বুঝতে দাও। যদি সে তাদের উপর জয়লাভ করে তখন বুঝা যাবে, সে সত্য নবী। যখন মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটল, তখন সকল গোত্রই ইসলাম গ্রহণে তাড়াহুড়ো করল এবং আমার পিতা গোত্রের অন্য সকলের আগে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তিনি গোত্রে ফিরে এসে বললেন, আল্লাহর কসম আমি তোমাদের নিকট এক সত্য নবীর নিকট থেকে ফিরে এসেছি। তিনি বলে থাকেন, এই নামাজ এই সময় পড়বে এবং ঐ নামাজ ঐ সময় পড়বে। যখন নামাজের সময় উপস্থিত হবে, তখন তোমাদের মধ্য হতে কেউ যেন আযান দেয় এবং তোমাদের মধ্যে ইমামতি যেন সেই ব্যক্তি করে যে অধিক কুরআন জানে। তখন লোকেরা দেখল, আমার অপেক্ষা অধিক কুরআন জানে এমন কেউ নেই। কেননা আমি পথিকদের নিকট হতে পূর্বেই তা মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। তখন তারা আমাকেই তাদের আগে বাড়িয়ে দিল অথচ তখন আমি ছয় কি সাত বছরের বালকমাত্র।  (বুখারী)

এ হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, নামাজের ইমাম হওয়ার জন্যে কুরআনের জ্ঞান থাকা বয়সের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূল সা. এর হিজরতের পূর্বে যখন প্রথম মুহাজির দল মদীনা পৌঁছলেন, তখন আবু হুযায়ফার গোলাম সালেম রা. তাদের ইমামতি করতেন। অথচ তাদের মধ্যে তখন ওমর এবং আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদের ন্যায় লোকও বিদ্যমান ছিলেন। (বুখারী)

হযরত সালেহ একদিকে যেমন কুরআনের বড় জ্ঞানী ছিলেন, অপরদিকে তিনি বড় কারীও ছিলেন। রাসূল সা. যে চার ব্যক্তির নিকট থেকে কুরআন শিখতে বলেছিলেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। এ হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, ইমাম হওয়ার যোগ্যতার মধ্যে শুদ্ধ করে পড়াসহ কুরআনের জ্ঞান থাকার গুরুত্ব বংশ, গোত্র, দেশ অথবা মনিব, গোলাম ইত্যাদির চেয়ে ওপরে।
উল্লিখিত হাদীসগুলো থেকে নিশ্চয়তা দিয়েই বলা যায়, নামাজের ইমাম হওয়ার যোগ্যতা বা গুণাগুণগুলোর প্রথম চারটিকে গুরুত্বের ক্রম অনুযায়ী রাসূল সা. যেভাবে সাজিয়ে দিয়েছেন বা উল্লেখ করেছেন, তা হচ্ছে-
১. শুদ্ধ করে কুরআন পড়াসহ কুরআনের জ্ঞান থাকা,
২. হাদীসের জ্ঞান থাকা,
৩. হিজরত করা এবং
৪. বয়স। 

কুরআনের জ্ঞান ও হাদীসের জ্ঞান থাকা খুব সহজে বুঝা গেলেও হিজরত আমাদের সাধারণত বুঝাটা একটু কষ্টকর। মদীনার প্রাথমিক সময়ে হিজরত ছিল সবচেয়ে বড় আমল যা করতে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। হিজরত করেছেন তারা যারা দ্বীন কায়েমের জন্য তাদের সকল সহায় সম্পত্তি আত্মীয় স্বজন বিসর্জন দিয়েছেন। এখনো আমাদের দেশে যারা দ্বীন কায়েমের পথে নিয়োজিত আছেন। শ্রম দিচ্ছেন ত্যাগ স্বীকার করছেন তারা নেতা হওয়ার জন্য অধিকতর যোগ্য। 

ঘ. নেতা নির্বাচন পদ্ধতির শিক্ষা
মুসলিম সমাজ বা দেশের নেতা তথা কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার পরিষদের নেতা কী পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচন করতে হবে সেটি মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন নামাজের ইমাম নির্বাচনের পদ্ধতির মাধ্যমে, যা প্রত্যেক নামাজীকে প্রতিদিন পাঁচবার অনুশীলন করতে হয়। নামাজের ইমাম নির্বাচনের ঐ পদ্ধতি রাসূল সা. জানিয়ে দিয়েছেন নিম্নের হাদীসগুলোর মাধ্যমে,
ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ কবুল হবে না।  যে কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয়েছে অথচ তারা তাকে পছন্দ করে না, যে নামাজ পড়তে আসে দিবারে। আর দিবার হল- নামাজের উত্তম সময়ের পরের সময়কে এবং যে কোন স্বাধীন নারীকে দাসীতে পরিণত করে। (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।

আবু উমামা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের কানের সীমা অতিক্রম করে না (অর্থাৎ কবুল হয় না) পলাতক দাস যতক্ষণ না সে ফিরে আসে, যে নারী রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট এবং গোত্র বা জাতির ইমাম কিন্তু মানুষ তাকে পছন্দ করে না। (তিরমিযী, তবে হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী গরীব বলেছেন)

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের মাথার উপর এক বিঘতও ওঠে না অর্থাৎ কখনই কবুল হয় না। ক. যে ব্যক্তি কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয় কিন্তু তারা তাকে পছন্দ করে না, খ. সেই নারী যে রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী সঙ্গত কারণে তার ওপর নাখোশ এবং গ. সেই দুই ভাই যারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন। (ইবনে মাজাহ)

উপরিউক্ত হাদীসগুলো থেকে একথা স্পষ্ট কোন ব্যক্তির ইমামতির যোগ্যতা থাকার পরও মুক্তাদী বা অনুসারী বা জনগনের ভোট বা সমর্থন জরুরী। অধিকাংশ জনগনের সমর্থন না থাকলে তিনি ইমামতি তথা নেতা হওয়ার যোগ্যতা হারান। 

এই সকল হাদীসের আলোকে স্পষ্টভাবে নামাজের ইমাম নির্বাচনের ব্যাপারে যে বিধি-বিধান বের হয়ে আসে এবং যা প্রতিটি মুসলমান বাস্তব আমলের ভিত্তিতে দিনে পাঁচবার অনুসরণ করছে, তা হচ্ছে-

ক. ভোট বা সমর্থনের মাধ্যমে সকল বা অধিকাংশ মুক্তাদি যাকে পূর্বোল্লিখিত গুণাগুণসমূহের ভিত্তিতে অধিকতর যোগ্য মনে করবেন তিনি নামাজের ইমাম হবেন। আর এই সমর্থন দিতে হবে সকল রকম অন্যায় প্রভাব মুক্ত হয়ে।

খ. ঐ পদ্ধতি অনুসরণ করে ইমাম নির্বাচন করা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান। কারণ, রাসূল সা. বলেছেন, ঐ পদ্ধতি অনুসরণ না করে যে ইমাম হবে, তার নামাজ কবুল হবে না। সুতরাং তাকে জাহান্নামে যেতে হবে অর্থাৎ তার সকল কর্মকাণ্ড ব্যর্থ হবে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, নামাজের অনুষ্ঠান থেকে আল্লাহ মুসলমানদের বিভিন্ন শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। আর নামাজের ইমাম নির্বাচনের বিধি-বিধানের মাধ্যমে মহান আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, সমাজের নেতা নির্বাচন করার বিধি-বিধান। তাহলে সমাজের নেতা নির্বাচনের সেই বিধি-বিধানগুলো হবে

১. নেতা নির্বাচিত করতে হবে সকল বা অধিকাংশ ঈমানদার মুসলমানের সমর্থন তথা ভোটের মাধ্যমে।
২. সকল বা অধিকাংশ ঈমানদার মুসলমান ঐ ভোটের মাধ্যমে জানাবেন কোন ব্যক্তি তাদের মতে নেতা হওয়ার জন্যে পূর্বোল্লিখিত গুণাগুণের ভিত্তিতে অধিকতর যোগ্য।
৩. ঐ ভোটগ্রহন হতে হবে সকল প্রকার অন্যায় প্রভাবমুক্তভাবে।

আমরা যাতে নামাজকে ব্যক্তিগতভাবে এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি সেজন্য জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। শুধু নিয়মিত নামাজ আদায় নয় এর শিক্ষাও বাস্তবায়ন করতে হবে নতুবা আমাদের নামাজ কায়েমের হক আদায় হবে না। আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবো। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রকৃতভাবে নামাজ কায়েমের তাওফীক দান করুন। 

মঙ্গলবার, ৩১ মে, ২০১৬

অপদার্থ প্রজন্ম, ফেরাউন এবং আমাদের করণীয়


ভবিষ্যত প্রজন্মকে মূর্খ ও অপদার্থ হিসেবে তৈরী করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা নতুন কোন পদ্ধতি নয়। ফেরাউনও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। এদেশে ইংরেজরাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বামপন্থি নাহিদও সে পথই অনুসরণ করেছে। আপনারা একটা ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখেছেন যেখানে ছাত্ররা খুব কমন কিছু প্রশ্নের উত্তর জানেনা। অথচ তারা সর্বোচ্চ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এটা দুঃখজনক। শিক্ষার মান ক্রমেই কমছে। এটা বড় একটা ষড়যন্ত্রের অংশ। 

অনেক আগে ফেরাউন যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো, তখন সে তার মন্ত্রী হামানকে তার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছিল। হামান তাকে ধৈর্য্য ধরতে বলেছিল এবং পরামর্শ দিয়ে বলেছিল আপনি এখনি যদি নিজেকে সর্বশক্তিমান দাবী করেন তাহলে জনগণ তা মেনে নিবে না। কারণ তারা অনেক কিছু জানে। আপনি প্রথমে সকল বিদ্যালয় বন্ধ করে দিন। তাহলে এখনকার কিশোরেরা সব মূর্খ হয়ে বড় হবে। কিছু বছর পর তারা যুবক হবে। তখন তারা আপনি যা বলবেন তাই শুনবে।

ফেরাউন তাই করলো। মন্ত্রী হামানের পরামর্শ মতো ফেরাউন সমগ্র রাজ্যের মাতব্বর প্রজাদের ডেকে একটা বড় সভা করলেন। সেই সভাতে তিনি তাদের বুঝিয়ে দিলেন যে, লেখাপড়া শিখে মিছামিছি সময় নষ্ট করবার আর প্রয়োজন নেই। কারণ, লোকের পরমায়ু অতি অল্পকাল। এই সংকীর্ণ সময়ের মধ্যে জীবনের বেশির ভাগ দিনই যদি মক্তবে এবং পাঠশালায় গমনাগমন করে এবং পড়ার ভাবনা ভেবে ভেবে কাটিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আমোদ আহলাদ এবং স্ফুর্তি করবার অবসর পাওয়া যাবে না। সুতরাং সারাজীবন ভরে আমোদ করো, মজা করো। তাহলে মরবার সময়ে মনে বিন্দুমাত্র অনুতাপ আসবে না।

প্রজারা ফেরাউনের ও হামানের এই উপদেশ সানন্দে গ্রহণ করলো এবং বংশধরদের কাউকে আর বিদ্যালয়ে প্রেরণ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলো।অতঃপর হামান পাঠশালা ও মক্তব রাজ্য থেকে উঠিয়ে ঢাক পিটিয়ে দেশময় প্রচার করে দিলো যে, কেউ আর লেখাপড়া শিখতে পারবে না। রাজার আদেশ অমান্য করলে সবংশে তার গর্দান যাবে।

প্রজারা ফেরাউনের আদেশ মতো চলতে লাগলো। লেখাপড়া আর কেউ শিখতে চেষ্টা করলো না। সারাদেশে কিছুকালের মধ্যে একেবারে গণ্ডমুর্খতে পূর্ণ হয়ে গেল। মূর্খের অশেষ দোষ। কোন ধর্মাধর্ম, হিতাহিত জ্ঞান তার থাকে না। তারা হয় কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। দুনিয়ার এমন কোন অসৎ কাজ নেই যা মূর্খরা না করতে পারে! যখন তার রাজ্যের প্রজাদের এই অবস্থা ফেরাউন মনে মনে হাসতে লাগলো। তার উদ্দেশ্য এতদিনে সিদ্ধ হয়েছে। তিনি প্রত্যেককে একটা করে নিজের প্রতিমূর্তি দিয়ে তাকে সৃষ্টিকর্তা এবং উপাস্য বলে পূজা করতে হুকুম দিলেন। মূর্খ ও অপদার্থ প্রজন্ম ফেরাউনের আনুগত্য করতে লাগলো।

বাম আদর্শে বড় হওয়া নাহিদরা ভালো করেই জানে এদেশবাসী যখন ভালো শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠবে তখন তাদের বস্তাপঁচা আদর্শ তারা গ্রহন করার প্রশ্নই আসে না। বরং তাই হচ্ছে। এদেশে যখন বাম আদর্শ বিস্তার শুরু করছিলো তখন তাদের চটকদার কথা শুনে অনেক জ্ঞানী মানুষ তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেছিলো। কিন্তু কালক্রমে তাদের আদর্শের অসারতা বড় হয়ে ধরা পড়ে সকলের সামনে। বড় দলগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসতে শুরু করে।

নতুন করে তারা আবার দলভারী করতে চায়। বস্তাপঁচা আদর্শ গিলাতে চায় এই জাতির ভবিষ্যত প্রজন্মের মগজে। তাই তাদের দরকার একটা অপদার্থ প্রজন্ম। সেটাই নাহদ তৈরী করতে সক্ষম হচ্ছে। এজন্য তারা পলিসি গ্রহন করেছে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন না দেয়া। ভালো ও খারাপের ক্যাটাগরি সমান করে দিয়েছে। ছেলেরা আরো ভালো কিছু করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ আরো এমনসব পলিসি গ্রহন করেছে যাতে একটা নির্বোধ জাতির সৃষ্টি হয়। 

এর বিপরীতে আমাদের করণীয় কি হওয়া উচিত এই বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। ইসলামের প্রথম নির্দেশ পড়। ইসলামিক সমাজে একজন মূর্খ ব্যক্তি অবশ্যই অপরাধী। মূর্খ ব্যক্তি নিজেকে চিনতে পারে না এমনকি স্রষ্টাকেও চিনতে পারেনা। তাই জ্ঞানঅর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। নিজের শিশুসন্তানকে সুশিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। 

পিতা-মাতা তাঁদের সন্তানের সাথে জীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে জীবনের দর্শন কী তা সন্তানকে বুঝিয়ে থাকেন। জীবন কেন? জীবনের উদ্দেশ্য কি? দুনিয়ার জীবনে আমাদের করণীয় কি? আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কি হওয়া উচিত এসব বিষয়ে যথাযথ শিক্ষা দিবেন। এক্ষেত্রে সাধারণ বাঙ্গালী সমাজে যা শিক্ষা দেয়া হয় তা হলো এই সমাজে পয়সা উপার্জন করে সুখে শান্তিতে থাকাই জীবনের সঠিক পথ। কিন্তু পিতা মাতাদের উচিত এই ধারণা থেকে বের হয়ে আল্লাহর দেয়া বিধি-নিষেধ এবং আল্লাহ কর্তৃক পরীক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া।   

পরিবার যথাযথ ভূমিকার মাধ্যমে সন্তানকে একজন সামাজিক ব্যক্তিত্বরূপে গড়ে উঠতে এবং বিভিন্ন নৈতিক গুণ অর্জন করতে সহায়তা করবে। সন্তানকে একজন ভালো নাগরিক তৈরীর উদ্দেশ্যে পরোপকারের শিক্ষা দিতে হবে। এই সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা। প্রতিবেশীদের অধিকার, অন্যান্য মুসলিমদের অধিকার শিক্ষা দিতে হবে। ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের আলোর পথে আসার জন্য যোগ্য দায়ী হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।  

পরিবার থেকেই সন্তান সম্পদ উৎপাদন, জীবিকা বণ্টন এবং সম্পদের ব্যবহার বিষয়ে জ্ঞানলাভ করবে এবং দারিদ্র্য ও সচ্ছলতার অর্থ অনুধাবন করতে পারবে। ভাই বোন পিতা মাতাসহ সকল আত্মীয়ের প্রতি আর্থিকভাবে যত্নবান হতে শিখবে।  

শিশুরা প্রকৃতিগতভাবে অজ্ঞতা নিয়েই জন্মলাভ করে। সকল শিশুই প্রথমে দুনিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। মানুষের মাঝে যে সকল সমস্যা রয়েছে এবং পৃথিবীতে যে সকল কর্মকান্ড সংঘটিত হয় সে সম্পর্কে শিশুরা অনেক কিছুই জানে না। শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে এ সকল বিষয়ে জানতে শুরু করে। তার মাঝে জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। জীবন ও জগৎ সম্পর্ক যতই সে প্রশ্নের সম্মুখীন হয় ততই তার মাঝে জানার আগ্রহ বাড়তে থাকে; ভালো-মন্দ সম্পর্কে সে বিচার করতে শুরু করে। এই সময়ে শিশুর পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন। পিতামাতাই কেবল এই পর্যায়ে শিশুকে যথোপযুক্ত জ্ঞানদানের জন্য এগিয়ে আসতে পারেন। বরং বলা উচিত এ সময়ে শিশুর জ্ঞান বিকাশে সহায়তা করা মাতাপিতার অবশ্যকর্তব্য। শিশুর প্রতিটি প্রশ্নের পেছনে একটি প্রবল শক্তি কাজ করে যা তার জ্ঞানার্জনের পথকে উন্মোচিত করে দেয়। শিশুর অন্তর্নিহিত কৌতুহলই তাকে জীবন পথে চলার প্রাণশক্তি যোগায়।

পৃথিবীর জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য শিশুর প্রয়োজন পৃথিবীকে ভালোভাবে জানা। এই পৃথিবীর সভ্যতার সত্যিকারের ইতিহাস শিশুর জানা উচিত যাতে ঘটে যাওয়া পুরনো ঘটনা থেকে সে শিক্ষা নিতে পারে। জীবন পথে চলার জন্য তার কোন দর্শন অবলম্বন করা উচিত, কোন লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়া উচিত। এছাড়া কিভাবে তার পথ চলা উচিত তাও শিশুর জানা দরকার। এই বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন পরিবারের গুরুজনেরা। 

নিজে নিজে প্রতিভার বিকাশ ঘটানো শিশুর পক্ষে সম্ভব নয়। পৃথিবীর লোভ-লালসা থেকে বেঁচে থাকাও তার জন্য খুব কঠিন। তাই পিতা-মাতাই কেবল পারেন তার শিশুকে সঠিক পথে নিয়ে গিয়ে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে, পিতামাতারা তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তম বিষয়গুলো সন্তানদের শিখিয়ে দিতে পারেন।

শিশুর জীবনের প্রথম বছরগুলোতে পিতামাতাই হবেন একজন জ্ঞানী অভিভাবক। শিশুর নানা প্রশ্নের জবাব দিতে হয় এসময়। পিতাকে অকপটে এবং অবলীলাক্রমে শিশুর এ সকল কৌতুলহল মেটাতে হবে। কারণ, শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করার দায়িত্ব তো পিতামাতার। তার ক্রমাগত প্রশ্নকে উপেক্ষা না করে বিরক্ত না হয়ে যথাযথ উত্তর করার চেষ্টা করা উচিত। মা-বাবা যদি শিশুদেরকে এসকল বিষয় জানা থেকে বঞ্চিত করেন তাহলে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়; শিশু অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এ জন্য বাবা-মার উচিত তার সন্তানের সাথে যতটা সম্ভব আন্তরিক এবং খোলামেলা হওয়া। পিতার আচার-ব্যবহার এমন হবে যাতে শিশু বুঝতে পারে যে, পিতা-মাতাই হলো তার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। একটি পরিবারে অভিভাবকরা যতটা উপকারী ভূমিকা পালন করতে পারে অন্যরা তা পারে না। 

আমাদের অনেকেরই একটি ভুল ধারণা যে, সাংস্কৃতিক ভূমিকা শুধু স্কুলই পালন করে। আমাদের এটা জানা উচিত শিশুর জ্ঞানার্জনের ভিত্তি স্থাপিত হয় পরিবারের দ্বারা। পরিবারেই একটি শিশু প্রথম বিশ্বজগতের বিশাল পরিমন্ডলে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। পরিবারেই শিশু তার ভবিষ্যত জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পৌঁছার ব্যাপারে দিকনির্দেশনা পেয়ে থাকে। 

শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য পিতামাতার পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা দরকার। সেই সাথে পিতামাতার দৃষ্টিভঙ্গিও প্রসারিত হওয়া উচিত। পিতামাতা যদি শুধু সন্তানের দৈহিক চাহিদা মেটানোর প্রতিই মশগুল থাকেন তাহলে তাঁদের দায়িত্ব সম্পূর্ণ হয় না। শিশুসন্তানদের প্রতি মাতাপিতার অন্যতম দায়িত্ব হলো শিশুকে জ্ঞান শিক্ষা দেয়া। অর্থাৎ জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া। পিতা-মাতা সাধারণত জীবন ও জগত সম্পর্কে যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন শিশুরা তারই অনুসরণ করার চেষ্টা করে। তাই শিশুদের সামনে সঠিক এবং যথাযথ জীবন দর্শন উপস্থাপন করতে হবে।

শিশুর প্রশিক্ষণে সাহিত্যের গুরুত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, প্রবাদবাক্য প্রভৃতির মাধ্যমে সাহিত্য নৈতিকতা ও সভ্যতার জ্ঞান শিক্ষা দেয়, মানুষকে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে। এ কারণে প্রত্যেক পিতারই উচিত তার সন্তানের পড়ালেখার জন্য এবং তার জ্ঞান বিকাশের জন্য উপযুক্ত বই-পুস্তক নির্বাচন করা। এমন অনেক বই-পুস্তক রয়েছে যা ধ্বংসাত্মক জ্ঞানের উৎস। যে সকল বইয়ে নৈতিক গুণাবলি শিক্ষার কিছু থাকে না সে সকল বই-পুস্তক শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। এ নীতিজ্ঞান বিবর্জিত এবং সুশিক্ষার অভাব সম্বলিত বই শিশুকে কোন জ্ঞানই দেয় না; বরং তার ভবিষ্যত জীবনকে মূর্খতা ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। তাই শিশু কী পাঠ করছে এবং তাকে কী পড়তে দেয়া উচিত সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। খেয়াল রাখতে হবে শিশু যেন আজেবাজে বই-পুস্তকের দিকে আকৃষ্ট হয়ে না পড়ে।

সাহিত্যের মতো শিল্পকলাও শিশুর জ্ঞান বিকাশে বিরাট ভূমিকা পালন করে। শিল্পচর্চার প্রতি শিশুদের উতসাহিত করা উচিত। কারণ, শিল্পকলা মানুষের মেধাশক্তিকে প্রখর করে মানসিকতাকে উন্নত করে। শিশুর মাঝে একাগ্রতা, সুনির্বাচন এবং ভালো কিছু করার আকাক্সক্ষা বৃদ্ধিতে শিল্পচর্চার বিকল্প নেই। তাই স্বল্প বয়স থেকেই সন্তানদেরকে শিল্পকলার সাথে পরিচিত করে তোলা উচিত। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই অংকন, হস্তলিপি প্রভৃতির চর্চা করতে পারে। এভাবে শিশু তার অবসর সময়টাকে গঠনমূলক কোন কিছুতে ব্যয় করতে পারে। পরিবার অবশ্যই শিশুদের সুকুমার বৃত্তি উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

আমাদের সবার সন্তান, ছোট ভাই-বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নী, ভাস্তে-ভাস্তি রয়েছে। তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিরোধে আমরা যদি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারি তাহলে আমাদের ভবিষ্যতে অবশ্যই উজ্জল। এজন্যে প্রতিটা পরিবারেই আন্দোলন প্রয়োজন। আমাদের প্রতিটা পরিবারকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি তাহলে শয়তানের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য। আল্লাহ তায়ালা ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবেলায় আমাদের দৃঢ় করুন। আমিন।

শুক্রবার, ১৩ মে, ২০১৬

শরীয়তের মানদন্ডে গায়েবানা জানাযা



-প্রফেসর ড. বি. এম. মফিজুর রহমান আল-আযহারী

মৃতদেহ সামনে না রেখে জানাযা পড়াই হচ্ছে গায়েবানা জানাযা। বিভিন্ন রেওয়ায়েতে দেখা যায়, রাসূল (স.) একাধিকবার গায়েবানা জানাযা পড়েছেন। তবে একটি রেওয়ায়েত ছাড়া বাকীগুলো বিশুদ্ধ সনদে পাওয়া যায় না। সেটি হচ্ছে, আবেসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাযা। ইমাম বুখারী ও মুসলিম এ মর্মে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, 
أن رسول الله ـ صلى الله عليه وسلم ـ نعى النجاشي في اليوم الذي مات فيه، وخرج بهم إلى المصلى ، فصف بهم، وكبر عليه أربع تكبيرات. (متفق عليه). 
“যে দিন নাজ্জাশী মারা গেলেন, সে দিনই রাসূল (স.) তাঁর মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করলেন। অতঃপর তাদেরকে নিয়ে জানাযার মাঠে হাজির হলেন এবং তাদেরকে কাতারবন্দী করলেন। তারপর চার তাকবীর দিলেন”। 
এই ঘটনা সকলের কাছেই একটি সুবিদীত ও স্বীকৃত বিষয়। তা সত্বেও ইসলামী শরীয়াহ বিশেষজ্ঞগণ গায়েবানা জানাযার ব্যাপারে একাধিক মত পোষণ করেছেন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সকলের মূল 
প্রমাণই কিন্তু রাসূল (স.) কর্তৃক নাজ্জাশীর জানাযা পড়ানোর ঘটনা সম্বলিত এই হাদীসটি। তারতম্য শুধু হাদীসটি বিশ্লেষণে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা। তাদের অভিমতগুলোকে মোটামুটি চারটি ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথম অভিমত: গায়েবান জানাযা সর্বাবস্থাতেই বৈধ। পূর্বে তার জানাযা হোক বা না হোক। মুসলিম জনপদে মারা যাক বা কাফির জনপদে মারা যাক।

যুক্তি-প্রমাণ:
ক. বুখারী-মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত উপরিল্লিখিত হযরত আবু হুরায়ার হাদীস। যাতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রাসূল (স.) নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাযা পড়েছেন। অতএব, গায়েবানা জানাযা অবৈধ হওয়ার কোন কারণ নেই। 
এ ছাড়া অন্যান্য সাহাবী থেকেও হাদীসটি বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে সমর্থ শব্দে বর্ণিত হয়েছে।

ইমাম ইবনু হাযম (রা.) বলেন: 
ويصلى على الميت الغائب، وقد صلى رسول الله ـ صلى الله عليه وسلم ـ على النجاشي وصلى معه أصحابه صفوفا، وهذا إجماع منهم لايجوو تعديه.

“অনুপস্থিত মৃতের জানাযা পড়া যাবে। রাসূল (স.) নাজ্জাশীর জানাযা পড়েছিলেন। তাঁর সাথে কাতারবন্দী হয়ে সাহাবীরাও পড়েছিলেন। এটা হচ্ছে তাদের এমন ইজমা (ঐকমত্য) যা এড়িয়ে যাওয়া বৈধ নয়।”
রাসূূল নিজে পড়েছেন। সাহাবীদের পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। এ কথা উল্লেখ করে ইবনু হাযম আরো বলেন: “ 
فهذا أمر رسول الله وعمله وعمل جميع أصحابه ، فلا إجماع أصح من هذا.

“এটি হচ্ছে রাসূলের নির্দেশ, তার আমল এবং সমস্ত সাহাবীর আমল। এর চেয়ে বিশুদ্ধ কোন ইজমা হতে পারে না”।

খ. গায়েবানা জানাযার উদ্দেশ্য হলো, মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ ও ইস্তেগফার করা। যেমনটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে হযরত আবু হুরায়রা থেকে নাজ্জাশীর জানাযা সংক্রান্ত ঘটনায় বর্ণনা করেন। 
نعى رسول الله ـ صلى الله عليه وسلم ـ النجاشي لأصحابه، ثم قال: استغفروا له
“রাসূল (স.) নাজ্জাশীর মৃত সংবাদ দিয়ে সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা তাঁর জন্য ইস্তেগফার কর”। 
এ কথা সুবিদিত, দু‘আ ও ইস্তেগফার লাশ সামনে থাকলে যেমন করা যায়; লাশ না থাকলেও করা যায়।

দ্বিতীয় অভিমত: গায়েবানা জানাযা কোন অবস্থাতেই বৈধ নয়। 

যুক্তি-প্রমাণ: 
রাসূল (স.) কর্তৃক নাজ্জাশীর জানাযা, এটি শুধু তাঁর জন্যই বৈধ ছিলো। যা রাসূল (স.) এর একক বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ইহা রাসূলের সাথেই খাস। তিনি জীবনে শুধু একবারই তা করেছেন। এই খুসুসিয়্যাতের দলীল হলো:

ক. রাসূলের জীবদ্দশায় অনেক সাহাবী বিভিন্ন স্থানে মারা গেছেন। কিন্তু রাসূল আর কখনোই কারো গায়েবানা জানাযা পড়েন নি। 

খ. রাসূল (স.) এর ইনতেকালের সময় সাহাবীরা বিভিন্ন স্থানে ছিলেন। রাসূল (স.) তাদের কাছে সর্বাধিক প্রিয় হওয়া সত্বেও কোন সাহাবী রাসূলের (স.) গায়েবানা জানাযা পড়েন নি। যদি পড়তেন, তাহলে তা বর্ণিত হতো । 

গ. খুলাফায়ে রাশেদীনের মৃত্যুর পরও তাদের গায়েবানা জানাযা হয়েছে বলে কোন প্রমাণ নেই। 
আর মূলনীতি হলো: 
كل ما تركه الرسول وأصحابه من البعادات مع وجود المقتضي للفعل وزوال المانع فإنه واجب الترك وفعله بدعة
“রাসূল (স.) ও তাঁর সাহাবারা যে সমস্ত ইবাদাত ছেড়ে দিয়েছেন কাজটি করার যুক্তি ও সুযোগ থাকা সত্বেও, তা বর্জন করা ওয়াজিব এবং তা করা বিদআত”। 

ঘ. তদুপরি হতে পারে এটা রাসূলের জন্য গায়েবানা জানাযা ছিলো না। বরং নাজ্জাশীর মৃতদেহ তার সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। যেমনটি তুলে ধরা হয়েছিল বায়তুল মুকাদ্দাস ইসরা ও মিরাজের ঘটনায়। এটি রাসূলের একটি মুজেযা। যা অন্য কারো জন্য হবে না। যেমনটি বলছেন ইবনু আবেদীন (র.) 
قال ابن عابدين: [لأنه رفع سريره - أي النجاشي- حتى رآه عليه الصلاة والسلام بحضرته فتكون صلاة من خلفه على ميت يراه الإمام وبحضرته دون المأمومين وغير مانع من الإقتداء] حاشية ابن عابدين ২/
“কারণ, নাজ্জাশীর কফিন রাসূলের (স.) উত্তোলন করা হয়েছিল এমনভাবে যে , তিনি তাকে তাঁর সামনেই দেখতে পেয়েছিলেন। সুতরাং যারা তাঁর পেছনে ছিলেন তাদের নামায এমন মৃত ব্যক্তির জন্য ছিলো যাকে ইমাম তাঁর সামনে দেখতে পাচ্ছে। মুক্তাদীরা দেখতে পাচ্ছে না। এটা ইমামের অনুসরণের পথে কোন বাধা নয়”। 

প্রমাণস্বরূপ যে বর্ণনাগুলো এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়, সেগুলো হচ্ছে: 
ক. ইবনু হিব্বান কর্তৃক সহীহ সনদে বর্নিত এ হাদীসটি: 
وأيدوا قولهم بما ورد من حديث عمران بن حصين رضي الله عنه أن النبي - صلى الله عليه وسلم - قال: (إن أخاكم النجاشي توفي فقوموا فصلوا عليه فقام رسول الله - صلى الله عليه وسلم - وصفوا خلفه فكبر أربعاً وهم لا يظنون إلا أن جنازته بين يديه) رواه ابن حبان وإسناده صحيح كما قال الشيخ الأرناؤوط، صحيح ابن حبان ৭/ ৩৬৯.
“হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স.) বলেন, “তোমাদের ভাই নাজ্জাশী মারা গেছেন। দাঁড়াও এবং তার জন্য নামায পড়। অতঃপর রাসূল (স.) দাঁড়ালেন এবং তারা তাঁর পেছনে কাতারবন্দী হয়ে গেলেন। তিনি চার তাকবীর দিলেন। তারা শুধু এমনটি ধারণা করছিলেন যে, তার মৃতলাশ রাসূলের সামনেই রয়েছে”।

খ. কোন কোন হাদীসে পাওয়া যায়, أنه قد سويت له أعلام الأرض حتى كان يبصر مكانه 
“রাসূলের (স.) জন্য ভূ-পৃষ্ঠের উপরিস্থিত সবকিছু সমতল করে দেয়া হলো এবং তিনি তার (নাজ্জাশীর) অবস্থান দেখতে পেয়েছিলেন”।

তৃতীয়ত অভিমত: গায়েবানা জানাযা শুধু একটি অবস্থায় বৈধ। তা হচ্ছে: যদি কেউ এমন জায়গায় মারা যায় যেখানে তার জানাযা পড়ার কেউ নেই। যেমন, অমুসলিম জনপদ। 
ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ ও ইবনুল কায়্যিম এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। 

যুক্তি-প্রমাণ: 

ক. রাসূল (স.) নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাযা পড়েছিলেন। এর কারণ ছিলো, নাজ্জাশী তার ঈমান গোপন রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন কাফেরদের দ্বারা বেষ্টিত। সেখানে তার জানাযা পড়ার কেউ ছিল না। অথচ কোন মুসলমান মারা গেলে তার জানাযা পড়া অন্য মুসলিমদের উপর ফরযে কিফায়াহ হয়ে যায়। এজন্যই রাসূল (স.) তার জানাযা পড়েছিলেন। এরই ভিত্তিতে, কোন মুসলিম যদি এমন কোন স্থানে মারা যায় যেথায় জানাযা হয়নি, তাহলে অন্য মুসলিমদের উপর তার জানাযা পড়া অবধারিত হয়ে যায়।

খ. রাসূলের (স.) যুগে ও তাঁর পরবর্তী যুগে কত সাহাবা কত দূরে দূরে মৃত বরণ করেছন। কিন্তু তাদের গায়েবানা জানাযা পড়া হয়নি। কারণ ঐ সব জায়গায় তাদের জানাযা পড়া হয়েছিলো। 
ইবনুল কায়্যীম এ মর্মে বলেন: 
ولم يكن من هديه وسنته الصلاة على كل ميت غائب، فقد مات خلق كثير من المسلمين من الصحابة وغيرهم، وهم غيب، فلم يصل عليهم. 
“প্রত্যেক মৃত্যুর গায়েবানা জানাযা পড়াটা রাসূলের কর্মপন্থা ও নীতি ছিল না। সাহাবীসহ কত মুসলমান মৃত বরণ করেছেন দূরে বসে। কিন্তু তিনি তাদের কারো গায়েবানা জানাযা পড়েন নি”। 
ইবনু তাইমিয়াহ থেকে ইবনুল কায়্যীম বর্ণনা করেন যে, 
الصواب أن الغائب إذا مات ببلد لم يصل عليه فيه، صلي عليه صلاة الغائب، كما صلى النبي على النجاشي؛ لأنه مات بين الكفار ولم يصل عليه، وإن صلى عليه حيث مات، لم يصل عليه صلاة الغائب؛ لأن الفرض قد سقط بصلاة المسليمن عليه.

সঠিক কথা হলো অনুপস্থিত ব্যক্তি যদি এমন জায়গায় মারা যায় যেখানে তার জানাযা হয় নি, তার উপর গায়েবানা জানাযা পড়া হবে। যেমন, রাসূল (স.) নাজ্জাশীর জানাযা পড়েছিলেন। কারণ তিনি কাফেরদের মাঝে থাকার কারণে তার জানাযা পড়া হয়নি। আর যদি কেউ এমন জায়গায় মারা যায়, যেখানে তার জানাযা হয়েছে, তার গায়েবানা জানাযা পড়া হবে না। কারণ ঐ জানাযার মাধ্যমে ফরজ আদায় হয়ে গেছে।

চতুর্থ অভিমত: বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির গাযেবানা জানাযা পড়া যাবে। সমাজ ও মানবতার জন্য যাদের অবদান আছে। যেমন, কোন নেককার ব্যক্তি, ভালো ব্যবসায়ী, আলেম, ধর্মীয় নেতা। 

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল থেকে এমন একটি অভিমত উল্লেখ করেছেন ইবনু তাইমিয়াহ তাঁর আল-ফাতওয়া আল-কুবরাতে। যেখানে ইমাম বলছেন: إذا مات رجل صالح صلي عليه“কোন নেককার ব্যক্তি মারা গেলে তার গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে”। সমকালীন সময়ের অন্যতম ফিকহবিদ শায়খ আব্দুল্লাহ বিন বায ও শায়ক সা‘আদী এই মতটি গ্রহণ করেছেন।

যুক্তি ও প্রমাণ:
রাসূল (স.) নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাযা এ জন্য পড়েন নি যে, সেখানে কেউ তার জানাযা পড়ার ছিলো না। কারণ, রাজা-বাদশাহ ও উচ্চ নেতৃত্ব পর্যায়ের কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে অনুসারীদের কেউ না কেউ ইসলাম গ্রহণ করে থাকে। তাই নাজ্জাশীর জানাযা পড়ার মত সেখানে একজন মানুষও ছিল না; বা কেউই তার জানাযা পড়ে নি, এটা অসম্ভব ব্যাপার। হতেই পারে না। তাই এ দাবী গ্রহণযোগ্য নয়। বরং মূলকথা হলো, নাজ্জাশী ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। মুসলিম মুহাজিরদের প্রতি তার রয়েছে বিরাট অবদান। তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতি, কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ও অন্যদেরকে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে রাসূল (স.) তার গায়েবানা জানাযা পড়েছিলেন। অতএব, যে কোন মুসলিম এ ধরনের অবদান রাখবেন ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য তার জন্যই গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে।

কোন মতটিকে প্রনিধানযোগ্য মনে হয়?
উপরিউক্ত আলোচনার পরে আমার কাছে গায়েবানা জানাযা বৈধ; বিশেষ করে যদি মৃত ব্যক্তি এমন হয় যে, মুসলিম উম্মাহর জন্য যার রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান , এ মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কারণ: 

১. গায়েবানা জানাযা রাসূল (স.) এর সাথেই খাস, এ দাবীটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, لأن الأصل عدم الخصوصية রাসূলের সাথে একান্তভাবে সম্পৃক্ত না হওয়াটাই হচ্ছে মৌলিক অবস্থা। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন: لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة“তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে সর্বোত্তম আদর্শ”। রাসূল (স.) বলেন: صلوا كما رأيتموني أصلي“আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখ, তোমরা ঠিক সেভাবেই নামায পড়”। আমরা দেখেছি, তিনি সাহাবীদেরকে নিয়ে নাজ্জাশীর গায়েবানা জানাযা পড়েছেন। অতএব, গায়েবানা জানাযা বৈধ।

এ মর্মে ইমাম খাত্তাবী বলেন: 
قال الإمام الخطابي: [وزعموا أن النبي - صلى الله عليه وسلم - كان مخصوصاً بهذا الفعل إذ كان في حكم المشاهدين للنجاشي لما روي في بعض الأخبار أنه قد سويت له أعلام الأرض حتى كان يبصر مكانه. وهذا تأويل فاسد لأن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - إذا فعل شيئاً من افعاله الشريفة كان علينا متابعته والإيتساء به والتخصيص لا يعلم إلا بدليل. ومما يبين ذلك أنه - صلى الله عليه وسلم - خرج بالناس إلى المصلى فصف بهم فصلوا معه فعلمت ان هذا التأويل فاسد] معالم السنن ১/ ২৭০ - ২৭১.   

“তারা ধারণা করছে যে, রাসূল (স.) এই কাজটির সাথে বিশেষভাবে জড়িত। অন্যরা নয়; কারণ, তিনি নাজ্জাশীকে প্রত্যÿকারীদের মধ্যে গণ্য। যেমনটি কোন কোন হাদীসে রয়েছে, “ভূ-পৃষ্ঠের উপরিস্থিত সবকিছু তাঁর জন্য সমতল করে দেয়া হলো এবং তিনি নাজ্জাশীর অবস্থান দেখতে পেয়েছিলেন”। এটি একটি অশুদ্ধ ব্যাখ্যা। কারণ, রাসূল (স.) যখন কোন একটি কাজ করেন তখন তাকে সে ক্ষেত্রে অনুসরণ করা ও সে কাজটি করা আমাদের জন্য অনিবার্য হয়ে যায়। আর তার সাথে কোন কাজকে একান্তুভাবে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি দলীল ছাড়া জানা যায় না। এখানেতো এমন কোন দলীল নেই। এটি যে একটি অশুদ্ধ ব্যাখ্যা তার বিবরণ হলো, রাসূল (স.) লোকদেরকে নিয়ে জানাযার মাঠে গেলেন এবং তাদেরকে কাতারবন্দী করলেন। অতঃপর তাদেরকে নিয়ে নামায পড়লেন। সুতরাং বোঝা গেল এটি শুধু তার সাথেই খাস/বিশেষভাবে সম্পৃক্ত নয়। (অন্যথায়, সাহাবীদেরকে পড়তে বলতেন না)। 

ইমমা বগভী (র.) এ মর্মে বলেন: 
وقال الإمام البغوي: [وزعموا أن النبي - صلى الله عليه وسلم - كان مخصوصاً به، وهذا ضعيف لأن الإقتداء به في أفعاله واجب على الكافة ما لم يقم دليل التخصيص ولا تجوز دعوى التخصيص هاهنا لأن النبي - صلى الله عليه وسلم - لم يصل عليه وحده إنما صلى مع الناس] شرح السنة ৫/ ৩৪১ - ৩৪২.
“যারা ধারণা করছে যে, বিষয়টি শুধু রাসূলের জন্যই খাস, তাদের এই অবস্থানটি দুর্বল। কারণ, রাসূল (স.) এর সমস্ত কর্মকান্ডে তাঁর ইকতেদা/অনুসরণ করা সকলের উপর ওয়াজিব যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর সাথে খাস হওয়ার দলীল না পাওয়া যায়। এখানে খাস হওয়ার দাবীটা ঠিক নয়; কারণ তিনিতো শুধু একাই গায়েবানা জানাযা পড়েন নি; বরং তার সাথে লোকেরাও পড়েছে।”।

আওনুল মাবুদ গ্রন্থকার বলেন: 
وقال صاحب عون المعبود: [قلت دعوى الخصوصية ليس عليها دليل ولا برهان بل قوله - صلى الله عليه وسلم -: (فهلموا فصلوا عليه) وقوله: (فقوموا فصلوا عليه) وقول جابر: (فصففنا خلفه فصلى عليه ونحن صفوف) وقول أبي هريرة: (ثم قال: استغفروا له ثم خرج بأصحابه فصلى بهم كما يصلى على الجنازة) وقول عمران: (فقمنا فصففنا عليه كما يصف على الميت وصلينا عليه كما يصلى على الميت) وتقدم هذه الروايات يبطل دعوى الخصوصية لأن صلاة الغائب إن كان خاصة بالنبي - صلى الله عليه وسلم - فلا معنى لأمره - صلى الله عليه وسلم - بتلك الصلاة بل نهى عنها لأن ما كان خاصاً به - صلى الله عليه وسلم - لا يجوز فعله لأمته. ألا ترى صوم الوصال لم يرخص لهم به مع شدة حرصهم لأدائه والأصل في كل أمر من الأمور الشرعية عدم الخصوصية حتى يقوم الدليل عليها وليس هنا دليل على الخصوصية بل قام الدليل على عدمها] عون المعبود ৯/ ৯.

“রাসূল (স.) এর বিশেষত্বের অন্তর্ভুক্ত করার দাবীটির স্বপক্ষে এখানে কোন দলীল-প্রমাণ নেই। কারণ, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় রাসূল (স.) থেকে বর্ণিত বিভিন্ন রেওয়ায়েত এর বিপরীত। সেগুলো হচ্ছে : রাসূলের বাণী: “চলো তার জানাযা পড়তে”, “তোমরা দাঁড়াও এবং নামায পড়”। জাবিরের কথা: “আমরা রাসূলের পেছনে কাতারবন্দী হলাম। অতঃপর তিনি নামায পড়লেন আর আমরা কাতারে ছিলাম”। হযরত আবু হুরাইরার কথা “অতঃপর রাসূল (স.) বললেন: “তোমরা তার জন্য ইস্তেগফার করো। তারপর তিনি সাহাবীদের নিয়ে বের হলেন এবং যেভাবে জানাযার নামায পড়েন সেভাবে নামায পড়লেন”। হযর ইমরান বিন হুসাইন এর কথা: “অতঃপর আমরা দাঁড়ালাম এবং কাতারবন্দী হলাম যেমন জানাযার কাতারবন্দী হয় এবং নামায পড়লাম ঠিক যেভাবে জানাযার নামায পড়া হয়”। এ সব রেওয়ায়েত দ্বারা বিশেষত্বের দাবী বাতিল হয়ে যায়। কারণ, তা যদি রাসূলের বিশেষত্ব হতো, তাহলে সাহাবীদেরকে তা করার আদেশ কোন অর্থই হয় না। বরং তাদেরকে তা থেকে নিষেধ করাই ছিল বাঞ্জনীয়। কারণ, যা কিছু নবীর বিশেষত্ব তউম্মতের জন্য তা বৈধ নয়: যেমন: একাধারে রোজা (সওমে ভেসালের) বিষয়টি। সাহাবীদের প্রবল আগ্রহ সত্বেও রাসূল (স.) তাদেরকে এ মর্মে অনুমতি দেন নি। শরীয়তের সমস্ত বিষয়ে মূলনীতি হলো, দলীল ব্যতীত কোন কিছুকেই বিশেষত্বের অন্তর্ভুক্ত না করা। এখানে এর কোন দলীলতো নাইই; বরং এর বিপরীতে দলীল রয়েছে।”

২. রাসূল (স.) এর সামনে নাজ্জাশীর লাশ তুলে ধরা হয়েছিল, এ কথাটিও গ্রহণযোগ্য নয়। এ মর্মে শামসুল হক আযীম আবাদী বলেন, 
أن الله تبارك وتعالى لقادر عليه وأن محمداً - صلى الله عليه وسلم - لأهل لذلك لكن لم يثبت ذلك في حديث النجاشي بسند صحيح أو حسن وإنما ذكره الواحدي عن إبن عباس بلا سند فلا يحتج به. ولهذا قال ابن العربي: ولا تحدثوا إلا بالثابتات ودعوا الضعاف.
“আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা‘আলা এমনটি করার ক্ষমতা রাখেন এবং মুহাম্মাদ (স.) এর যোগ্য। তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে নাজ্জাশীর হাদীসে এ রকম কিছু ছহীহ বা হাসান সনদ দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি। বরং ইবুন আব্বাস (রা.) এর সূত্রে ওয়াহেদী সনদ ব্যতীত এ রকম কিছু উল্লেখ করেছেন, যা প্রমাণ হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। এজন্যই ইবনুল আরাবী বলেছেন, যা প্রতিষ্ঠিত হয়নি তা বলো না। দুর্বল রেওয়াযেতগুলো ছেড়ে দাও”।
ইবনু হিব্বান কর্তৃক ইমরান বিন হুসাইনের হাদীসের জবাবে আওনুল মাবুদ গ্রন্থকার বলেন: 
ومعنى هذا القول أنا صلينا عليه خلف النبي - صلى الله عليه وسلم - كما يصلي على الميت والحال أنا لم نر الميت لكن صففنا عليه كما يصف على الميت كأن الميت قدَّامنا ونظن أن جنازته بين يدي - صلى الله عليه وسلم - لصلاته - صلى الله عليه وسلم - كعلى الحاضر المشاهد ..ويؤيد هذا المعنى حديث مجمع عند الطبراني " فصففنا خلفه صفين وما نرى شيئا "] عون المعبود ৯/ ৯ - ১০.
এ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত হয় না যে, নাজ্জাশীর মৃতদেহ তাঁদের সামনে ছিলো। বরং এর অর্থ হলো, আমরা রাসূলের পেছনে ঐ ভাবে নামায পড়েছি যেভাবে মুতব্যক্তির উপর নামায পড়া হয়। অর্থাৎ জানাযার মত করেই। আর আমাাদের অবস্থাটা এমন ছিল যে, আমরা মৃতকে দেখছি না। তবুও এমনভাবে কাতারবন্দী হলাম ঠিক যেভাবে উপস্থিত লাশের সামনে কাতারবন্দী হতে হয়। যেমন মৃতব্যক্তি আমাদের সামনেই রয়েছে। রাসূল (স.) যেন উপস্থিত দৃশ্যমান ব্যক্তির জানাযাই পড়ছেন। ইমাম তবারানী কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বিষয়টি সুস্পষ্ট করেই বলা হয়েছে: “আমরা রাসূলের পিছনে দুই কাতারে দাঁড়ালাম। আমরা কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না”। (আওনুল মাবুদ ৯/৯-১০)।

৩. রাসূল (স. ) কিংবা সাহাবায়ে কেরাম নাজ্জাশী ছাড়া অন্য কারো গায়েবানা জানাযা পড়েন নি। এ কথা দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে, গায়েবানা জানাযা অবৈধ। কারণ, রাসূলের একবার করাই এর বৈধতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। গায়েবানা জানাযা পড়া ওয়াজিব,না পড়লে গুনাহ হবে। বিষয়টিতো এমন নয়। যেহেতু, এতে কোন বাধ্য বাধকতা নেই, তাই কেউ তা না করলেও তাকে সেজন্য ভর্ৎসনা করা যায় না। অবশ্য তৃতীয় অভিমতঅনুযায়ী, তা ওয়াজিবের পর্যায়ে পরে। যদি ইতোপূর্বে তার জানাযা না হয়ে থাকে। 
মোটামুটি কথা হলো, যে মতটিকে আমরা প্রণিধানযোগ্য মনে করছি, তাই যে শেষ কথা তা নয়। বরং যদি কেউ মনে করে অন্য কোন মত তার কাছে অধিক যুক্তিসঙ্গত, তা হলে সে তাই মানতে পারে। কারণ, এ সব ইজতিহাদী বিষয়ে মনে রাখতে হবে, “ইজতিহাদকে অনুরূপ ইজতিহাদ দিয়ে খন্ডন করা যায় না”। আমরা আলেমদের গবেষণা ও যুক্তিভিত্তিক সকল মতকেই শ্রদ্ধা করি। তবে বাড়াবাড়ি পছন্দ করি না। অন্ধভাবে কাউকে মেনে নিতেই হবে। যদিও অন্য কারো যুক্তি অধিক প্রবল। এমন সাম্প্রদায়িক চিন্তা আমরা সমর্থন করি না। আল্লাহ আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন।

বৃহস্পতিবার, ১২ মে, ২০১৬

সেদিন কেবল গাড়ি-ঘোড়া নয়, মহানন্দার বুকে কোন নৌকাও চলেনি


আল কুরআনকে ভালোবেসে
প্রাণ দিয়েছিল যারা
আজকে দেখো সামনে এসে
রক্ত মাখা শহীদ বেশে
ফের দাঁড়িয়েছে তারা…….

১৯৮৫ সালের সেই শহীদেরা বারবারই প্রতিভাত হন আমাদের সামনে আর আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে যান আমাদের দায়িত্বের কথা। এদেশে কুরআনের রাজ প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্বের কথা। ভারতে যখন কুরআন বাজেয়াপ্ত করার ঘোষনা দেয়া হয় তখন ঈমানের বলে বলিয়ান হয়ে এদেশের মানুষের ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফুঁসে উঠে পুরো মুসলিম বিশ্ব। বাংলাদেশের স্বৈরশাসক ও তার দোসররা এই বিক্ষোভ ঠেকানোর জন্য উঠে পড়ে লাগে। মুসলিম নামধারী কিছু নরপশু বিক্ষোভ করতে দেবে না বলে চাপাইনবাবগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করে। কুরআন প্রেমিক মানুষ প্রশাসনের এমন অযৌক্তিক আচরণকে মেনে নিতে পারেনি। ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে তারা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে সমাবেশ স্থলের উদ্দেশ্যে। নরঘাতক, কুরআন বিদ্বেষী এবং ইসলাম বিদ্বেষী তৎকালীন মেজিষ্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে পুলিশ গুলি চালায় সাধারন মানুষের উপর। সেই থেকে ১১ মে কুরআন দিবস হিসেবে পালন করে আসছে এদেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ। 

ঘটনার সূত্রপাত ভারতে ১৯৮৫ সালের ১০ই এপ্রিল। পৃথিবীর ইতিহাসে সেটি ছিল এক জঘন্যতম ঘটনা। ভারতীয় দু’জন উগ্রবাদী হিন্দু নাগরিক পদ্মমল চেপারা ও শীতল শিং আদালতে কোরআন বাজেয়াপ্ত করার মামলা দায়ের করে। তারা কোরআনের উল্লেখিত সূরা বাকারার ১৯১নং আয়াত ও সূরা তওবার ৩১ নং আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে মামলা দায়ের করেছিল। কোরআন যেহেতু কাফের মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা, তাদের হত্যা করার কথা বলেছে সেহেতু কোরআন একটি সাম্প্রদায়িক উস্কানী দাতা গ্রন্থ।(নাউযুবিল্লাহ) তাই একে বাজেয়াপ্ত করার দাবি তুলে মামলা দায়ের করে। ভারতীয় সংবিধানের ২২৩ নং ধারা সি আর পিসি ১১৫(ক) ও ২৯৯ (ক) উদ্ধৃতি দিয়ে তারা আল কোরআনকে ভারতীয় সংবিধান বিরোধী বলে উল্লেখ করে।

বিচারপতি পদ্মা খাস্তগীর ভারতীয় সংবিধানে ঐশীগ্রন্থ সম্পর্কে যে বক্তব্য রযেছে তা হজম করে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মামলা গ্রহণ করেন। তিনি ১২ই এপ্রিল এ বিষয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যে এফিডেভিট প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় গোটা ভারতে মুসলমানদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশ এর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। যার উত্তাল তরঙ্গের জলরাশি আছড়ে পড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায়। বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে পুলিশ ইসলামপ্রিয় তৌহিদি জনতার মিছিলে অত্যাচার নিপীড়নও চালায়।

১০ মে ১৯৮৫ সালে এদেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে উক্ত ঘটনার প্রতিবাদে মিছিল ও সমাবেশ করে। সেই সতঃস্ফুর্ত সমাবেশে লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে স্বৈরশাসক এরশাদের পুলিশ। কী ভয়াবহ দুঃসাহস! সরাসরি কুরআনের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান! তারই সূত্র ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জনাব হোসাইন আহমদ একটি সভার আহবান করেন। সেই সভা থেকে ১১ই মে ঈদগাহ ময়দানে বিকেল ৩টায় প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয়া হয়। সভার প্রস্তুতির জন্য পুরো জেলাতে লিফলেট ও মাইকিং করা হয়। এর পূর্বের দিন শুক্রবার মসজিদে জুমআর খুৎবায় এবং নামাজ শেষে ইমাম সাহেবেরা পরের দিন সামবেশে অংশ গ্রহণের জন্য আহবান জানান। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আবেগ ও উত্তেজনা বইতে থাকে। আবাল-বৃদ্ধ সবাই সেই সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। কিন্তু ১১ই মে হঠাৎ করে তৎকালীন পুলিশ সুপার আওলাদ হোসেন এবং মেজিষ্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে সভাস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করে ব্যপক পুলিশ মোতায়েন করে। পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। ওয়াহিদুজ্জামান দম্ভ করে চেঁচিয়ে ওঠে বলে “এই মহুর্তে স্থান ত্যাগ করতে হবে নইলে গুলির আদেশ দিব, শালা মৌলবাদীদের সাফ করে দিবো”। কুরআন প্রেমিক জনতা চলে গেল না। তারা জানিয়ে দিলেন, গুলির ভয়ে এ স্থান ত্যাগ করা মানেই আল কোরআনের অপমান, আমরা এস্থান ত্যাগ করবো না।

জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিলের মাধ্যমে কুরআনপ্রেমী মানুষ ঈদগাহ ময়দানে জমায়েত হয়। এক পর্যায়ে মেজিষ্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান বিনা উস্কানিতে গুলির নির্দেশ দেয়। পুলিশ একনাগাড়ে প্রায় পনের মিনিট পর্যন্ত গুলি রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢলে পড়লো পনের বছরের কিশোর স্কুলছাত্র আবদুল মতিন। পুলিশের গুলিতে একে একে শাহাদাৎ বরণ করলেন কৃষক আলতাফুর রহমান, রিক্সা চালক মোক্তার হোসেন, দশম শ্রেণীর ছাত্র রশিদুল হক, অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র শীষ মোহাম্মদ ও সেলিম এবং ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র শাহাবুদ্দৌলা। আহত হয় শামীম, গোলাম আযম বুলু, শরীফুল ইসলাম, আলাউদ্দিন, রায়হান, এনামুল হক, মাহবুব, রেজাউল, শাহজাহান, রাজুসহ নাম না জানা আরো অনেকেই। লাশ আর আহতদের স্তুপে ভরে গেল ঈদগাহ ময়দান। সেদিন টুপি, পাঞ্জাবি, দাঁড়ি দেখলেই নির্মমভাবে তাদের উপর আক্রমন চালায় নরপশু ওয়াহিদুজ্জামানের সাঙ্গপাঙ্গরা।

আহতদের রাজশাহীতে নিয়ে যাওয়া হলো দুটো মিনিবাসে করে। দেড়ঘন্টা পর যখন মিনিবাস থানা পার হচ্ছিল কুখ্যাত মেজিষ্ট্রেট আবারো গাড়ি থামিয়ে গুলির নির্দেশ দেয়। এতে আহত হয় গাড়ীর হেলপার, মারা যায় কাপড় ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম। আহতদের নামিয়ে দৈহিক নির্যাতন চালানো হয় এবং নিখোঁজ হয় কয়েকজন আহত ব্যক্তি। কেবল হত্যা ও জখম করেই ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ হতাহতদের গুম করে ফেলেছিল সেই দিন। জানাজার মুহুর্তে লাশ কেড়ে নিয়ে আসা হয়েছে তাদের আত্নীয়-স্বজনদের কাছ থেকে। এটি ছিল চাঁপাইবাসীদের জন্য এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার দিন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে সেদিন বর্বর পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন ২০ এর অধিক। নিখোঁজ সংখ্যা ৮ জন।

এতো রক্ত, এতো গুলি, এতো আহত এতো তান্ডব- তারপরও পরবর্তী দিনগলোতে সাহসের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছে চাঁপাই নবাবগঞ্জবাসী। পুলিশের গুলির মুখে নারায়ে তাকবীর ধ্বনি তুলে ছুটে আসেন তারা ঈদগাহ ময়দানে, কারফিউ উপেক্ষা মিছিল আর শ্লোগানে কাঁপিয়ে তোলে ছোট্ট শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ১২ই মে পরদিন হরতাল আহবান করা হয়। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে বাজারে ও মসজিদে লিফলেট দেয়া হয়। গভীর রাতে কারফিউ ভঙ্গ করে সাইকলে চড়ে মোল্লার ফাঁসির দাবিতে পোস্টারিং করা হয়। পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী যে অভূতপূর্ব হরতাল পালন করেছে তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। সেদিন কেবল গাড়ি-ঘোড়া বা রিক্সাই নয়, মহানন্দার বুকে কোন নৌকাও চলেনি। এভাবেই মানুষ প্রকাশ করেছে কুরআনের প্রতি ভালোবাসা এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

ছবিঃ ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা

বাংলাদেশের এ ঘটনার ফলে সারা বিশ্বে একটি জনমত সৃষ্টি হয় এবং এর ফলশ্রুতিতে ১৩ ই মে মামলাটি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি বি. সি বাসক বামনের আদালতে স্থানান্তরিত হয় এবং তিনি উক্ত মামলাটি খারিজ করে দেয়। সেই থেকেই বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ ১১ মে'র সেই দিনকে স্মরণ করে “কোরআন দিবস” হিসেবে পালন করে আসছে।

১৯৮৫ সালের চাঁপাইনবাবগঞ্জের সেই নরঘাতক, ইসলাম বিদ্বেষী ম্যাজিস্ট্রেট মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানের বিচার তো এদেশে হয়ই নি বরং সে দিনকে দিন তার অন্যায় দূর্ণিতি চালিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে সে সচিব পর্যন্ত হয়ে গেছে। সেই মর্মান্তিক ঘটনার দীর্ঘ ৩০ বছর পর ফের খবরের শিরোনামে এসেছে সে। তবে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। যুদ্ধ না করেই মুক্তিযুদ্ধের জাল সনদ গ্রহণ করে। সে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে চাকুরি নিয়ে এই ধরণের অন্যায় দূর্ণিতিতে অংশ নেই। দুদকের অফিসে তার বিরুদ্ধে রয়েছে অনেকগুলো দূর্ণিতির ফিরিস্তি।

১৯৮৫ সালের ১১ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের বিচার এখনো হয়নি। এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের অভিযোগের তীর মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে হলেও বিগত ৩০ বছর বিভিন্ন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো তাকে তিরস্কার না করে বিভিন্ন মেয়াদে পুরস্কৃত করেছে। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের গত আমলে দীর্ঘ সময় ধরেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব ছিলেন মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান। এরপর ২০১৪ সালের মধ্য জানুয়ারি থেকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাকে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য এখনো আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষায় আছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। ৩০ বছর পার হয়ে গেলেও বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের মূল নায়কদের শাস্তির দাবি থেকে সরে আসেনি নিহতদের স্বজনরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঈদাগাহ মাঠে যেন আজো শোনা যাচ্ছে কিশোর শীষ মোহাম্মদের আর্তনাদ, শহীদ রফিকুলের করুন আহাজারী। আব্দুল মতিন ও সেলিমের আর্তচিৎকারে শহীদ সবুর ও নজরুলের বুক ফাটা কান্না। আজো বিচারের বানী নিভৃতে কাঁদে। ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লাদের বিচার দুনিয়ার জমিনে না হলেও আখিরাতে অবশ্যই আল্লাহর দরবারে এই বিচার আমরা পাবো এবং এই বাংলায় কুরআনের শাসন কায়েমের মধ্য দিয়েই আমরা উত্তম প্রতিশোধ গ্রহন করবো সেদিনের নির্মমতার। ইনশাআল্লাহ। 

শনিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৬

ইসলামে শ্রম ও শ্রমিকের অবস্থান


ইসলাম মানবজীবনের জন্য আশির্বাদ। যখন আরবে দাসদের সাথে এবং গরীব শ্রমিকদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হতো তখন আল্লাহর রাসূল সঃ নিয়ে এসেছেন মানবতার বার্তা। যাতে সমাজের প্রত্যেক মানুষের অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সকল প্রকার জুলুমবাজি বন্ধ করা হয়েছে। ইসলাম মানবতাকে সামনে এনে মানুষকে করেছে সম্মানিত। আল্লাহ্‌ সুবহানাল্লাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
“আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিজিক। আর আমি যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের উপর আমি তাদেরকে অনেক মর্যাদা দিয়েছি”।
-(সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত : ৭০)

শ্রমনীতি প্রণয়নের কাজটা সর্বপ্রথম ইসলামই করেছে। ইসলামই প্রথম শ্রমিকের প্রতি যথার্থ দৃষ্টি দিয়েছে। তাকে দিয়েছে সম্মান ও মর্যাদা আর শ্রমের স্বীকৃতি। আল্লাহর রাসূল সঃ যখন এই নীতি চালু করেন তখন সমাজে শ্রমিকদের মানুষই মনে করা হতো না, অধিকারতো অনেক পরের ব্যাপার। ইসলাম সমাজের আর দশজন সদস্যের মতো নাগরিক হিসেবে তাদের প্রাকৃতিক অধিকারগুলোর স্বীকৃতি দিয়েছে। শ্রমিক হিসেবে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে অনেক মূলনীতি ও বিধিও প্রবর্তন করেছে। যাতে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা হয়। 

মানুষের প্রয়োজনীয় কোনো কাজই তুচ্ছ নয়। মুচি জুতা সেলাই করেন, নাপিত চুল কাটেন, দর্জি কাপড় সেলাই করেন, ধোপা কাপড় পরিষ্কার করেন, জেলে মাছ ধরেন, ফেরিওয়ালা জিনিসপত্র বিক্রি করেন, তাঁতী কাপড় বুনেন, কুমার পাতিল বানান, নৌকার মাঝি মানুষ পারাপার করেন। এসব কাজ এতই জরুরি যে, কাউকে না কাউকে অবশ্যই কাজগুলো করতে হবে। কেউ যদি এসব কাজ করতে এগিয়ে না আসতেন, তা হলে মানবজীবন অচল হয়ে পড়ত। কোনো কাজই নগণ্য নয় এবং যারা এসব কাজ করেন, তারাও হীন বা ঘৃণ্য নন।

ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যধিক। শ্রম দ্বারা অর্জিত খাদ্যকে ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং জীবিকা অন্বেষণকে উত্তম ইবাদত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, "ফরজ ইবাদতের পর হালাল রুজি অর্জন করা একটি ফরজ ইবাদত।" (বায়হাকী) এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এরশাদ করেছেন, "তিনি তোমাদের জন্য ভূমি সুগম করে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তার দেয়া রিযিক থেকে আহার কর।" (সূরা: মুলক, আয়াত-১৫)

আমাদের প্রিয় নবী (সা.) শ্রমকে ভালোবাসতেন। তিনি নিজ হাতে জুতা মেরামত করেছেন, কাপড়ে তালি লাগিয়েছেন, মাঠে মেষ চরায়েছেন। নবীজী ব্যবসা পরিচালনাও করেছেন। খন্দকের যুদ্ধে নিজ হাতে পরিখা খনন করেছেন। বাড়িতে আগত মুসাফির কর্তৃক বিছানায় পায়খানা করে রেখে যাওয়া কাপড় ধৌত করে মানবতা ও শ্রমের মর্যাদা সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শ্রমিকের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, "শ্রমজীবী আল্লাহর বন্ধু।" (বায়হাকী) মহানবী এ ব্যাপারে আরো বলেন, "নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য আর নেই। আল্লাহর নবী দাউদ (আঃ) নিজের হাতে কাজ করে খেতেন।" (বুখারী)

কুরআন-হাদিস, ইসলামের ইতিহাস পড়লে জানা যায়, নবী-রাসূলগণ শ্রমিকদের কত মর্যাদা দিয়েছেন। ইসলামের প্রায় সব নবী ছাগল চরিয়ে নিজে শ্রমিক হয়ে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এছাড়া হযরত আদম আ. কৃষক ছিলেন। হযরত নুহ আ. কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। হযরত দাউদ আ. কর্মকার ছিলেন। হযরত ইদ্রিস আ. দর্জি ছিলেন। মালিক হযরত শোয়াইব (আঃ) তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়ে শ্রমিক নবী মূসাকে (আঃ) জামাই বানিয়েছেন। হযরত মুহাম্মদ (সা.) শ্রমিক যায়েদ (রাঃ)-এর কাছে আপন ফুফাতো বোন জয়নবের বিয়ে দিয়েছিলেন। বিশ্বনবী (সা.) যায়েদকে (রাঃ) মুতারের যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ইসলামের প্রথম মোয়াজ্জিন বানানো হয়েছিল শ্রমিক হযরত বিলালকে (রাঃ)। মক্কা বিজয় করে কাবা ঘরে প্রথম প্রবেশের সময় মহানবী (সা.) শ্রমিক বেলাল (রাঃ) ও শ্রমিক খাব্বাবকে (রাঃ ) সাথে রেখে ছিলেন। নবীজী কখনো নিজ খাদেম আনাসকে (রাঃ) ধমক দেননি এবং কখনো কোনো প্রকার কটুবাক্য ও কৈফিয়ত তলব করেননি। নবী (সা.)-এর কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ) নিজ হাতে যাঁতা ঘুরাতেন। আর এজন্য তার হাতে জাঁতা ঘোরানোর দাগ পড়েছিল। তিনি নিজেই পানির মশক বয়ে আনতেন, এতে তাঁর বুকে দড়ির দাগ পড়েছিল।

কোদাল চালাতে চালাতে একজন সাহাবীর হাতে কালো দাগ পড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাত দেখে বললেন, "তোমার হাতের মধ্যে কি কিছু লিখে রেখেছ ? সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) এগুলো কালো দাগ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি আমার পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য পাথুরে জমিতে কোদাল চালাতে গিয়ে হাতে এ কালো দাগগুলো পড়েছে। নবীজী (সা.) এ কথা শুনে ওই সাহাবীর হাতের মধ্যে আলতো করে গভীর মমতা ও মর্যাদার সাথে চুমু খেলেন। এভাবে অসংখ্য কর্ম ও ঘটনার মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

একইভাবে ইসলাম শ্রমগ্রহীতার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে শ্রমিকের সঙ্গে মানবিক ও সম্মানজনক আচরণ করতে। তার প্রতি মমতা দেখাতে। তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে। তাকে বারণ করেছে তার সাধ্যাতীত কাজের নির্দেশ প্রদান থেকে। এমনবিধ নানা অধিকার সুযোগ নিশ্চিত করেছে ইসলাম শ্রমিকের জন্য। 

রাসূল সঃ শ্রমিকদের অধিকার সম্বন্ধে বলেন- তারা তোমাদের ভাই আল্লাহ্‌ তাদের দায়িত্ব তোমাদের উপর অর্পণ করেছেন। কাজেই আল্লাহ যাদের উপর এরূপ দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছেন তাদের কর্তব্য হলো তারা যে রকম খাবার খাবে তাদেরকেও সেরকম খাবার দেবে, তারা যা পরিধান করবে তাদেরকে তা পরাবার ব্যবস্থা করবে। যে কাজ করা তাদের পক্ষে কষ্টকর ও সাধ্যতীত তা করার জন্যে তাদেরকে কখনও বাধ্য করবে না। যদি সে কাজ তাদের দিয়েই করাতে হয় তা হলে সে জন্যে তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য অবশ্যই করতে হবে। (বুখারী)

ন্যায্য মজুরি প্রাপ্তির অধিকার : 
একজন শ্রমিকের প্রথম অধিকার তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির অধিকার। তাই ইসলাম এর প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন “মহান আল্লাহ বলেন, তিনজন আমি তাদের বিপক্ষে থাকব কিয়ামতের দিন, তন্মধ্যে একজন হচ্ছেন, যাকে আমার জন্য প্রদান করার পর সে তার সাথে গাদ্দারী করেছে, আর একজন হচ্ছেন, যে কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার অর্থ খেয়েছে। আর একজন হচ্ছে সে ব্যক্তি যে কাউকে কর্মচারী নিয়োগ করার পর তার থেকে তার কাজ বুঝে নিয়েছে অথচ সে তাকে তার প্রাপ্য দেয় নি।”- সহীহ বুখারী 

শ্রমগ্রহীতার জন্য জরুরী হলো শ্রমিককে সেই অধিকারগুলো প্রদান করা যার ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। তাতে হ্রাস বা বিয়োগের চেষ্টা না করা। কারণ, তা ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনার মতো জুলুম। সেহেতু শ্রমগ্রহীতার জন্য আরও জরুরী শ্রমিকের কাজের তীব্র প্রয়োজনের সুযোগের অসৎ ব্যবহার করত তাকে তার অধিকারে না ঠকানো এবং একই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে প্রাপ্য মজুরির তুলনায় তাকে ধোঁকা দিয়ে কম নির্ধারণ না করা। কেননা ইসলাম সর্বপ্রকার ধোঁকা ও প্রতারণাকে হারাম ঘোষণা করেছে। বাস্তবায়ন করেছে ‘লা দ্বারারা ওয়ালা দ্বিরারা’ তথা ‘ক্ষতি করব না আবার ক্ষতির শিকারও হব না’ নীতি। 

একইভাবে তার জন্য আরও জরুরী, শ্রমিকের পাওনা হেফাযত করা যখন সে অনুপস্থিত থাকে কিংবা এর কথা ভুলে যায়। এবং কাজ শেষ কিংবা নির্ধারিত মেয়াদ পূরণ হবার পর মজুরি দিতে টালবাহানা বা বিলম্ব না করা। তেমনি চুক্তির পরিমাণের চেয়ে বেশি কাজ করলে তার (অতিরিক্ত) বিনিময় প্রদানে ব্যয়কুণ্ঠ বা কৃপণ না হওয়া। কেননা আল্লাহ আমাদেরকে প্রত্যেক শ্রমের মর্যাদা দিতে বলেছেন। সব কাজের প্রতিদান দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা তোমাদের চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর”। (সূরা আল-মায়িদাহ: ১)

হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 
“ধনী ব্যক্তির (পক্ষ থেকে কারও পাওনা প্রদানে) টাল-বাহানা করা জুলুম; আর যখন তোমাদেরকে কোনো আদায় করতে সক্ষম ব্যক্তির প্রতি ন্যস্ত করা হয়, তখন সে যেন তার অনুসরণ করে”। 

অপর হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 
“শ্রমিককে তার শ্রমের প্রাপ্য তার ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই প্রদান কর”। 

স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য না করার অধিকার : 
শ্রমিকের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিংবা কাজে অক্ষম বানানোর মতো কাজে তাকে বাধ্য না করা শ্রমিকের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। সে যুগে দাসদের যাই আদেশ করা করা হতো তাই তারা পালন করতে বাধ্য থাকতো। আল্লাহর রাসূল সঃ তার শ্রমনীতিতে এই ধরণের প্রথা বন্ধ করে দেন। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার ক্ষেত্রে শ্রমিকের সম্মতি ছাড়া বাধ্য করা যাবে না। 

শ্রমগ্রহীতা যখন তার প্রতি এমন কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন যা তাকে বাধ্যতামূলকভাবে করতে হয় এবং যার ফলে পরবর্তীতে তার স্বাস্থ্য বা ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তবে তার অধিকার রয়েছে চুক্তি বাতিল কিংবা বিষয়টি বিচারকের কাছে উত্থাপন করার। যাতে করে তারা তার ওপর থেকে শ্রমগ্রহীতার অনিষ্ট রোধ করেন। 

রাসূলে করীম সাঃ শ্রমিকদের সম্পর্কে বলেছেন, শ্রমিককে এমন কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না, যা তাদেরকে অক্ষম ও অকর্মণ্য বানিয়ে দেবে। (তিরমিযি)

তাদের উপর ততখানি চাপ দেওয়া যেতে পারে, যতখানি তাদের সামর্থ্যে কুলায়। সাধ্যাতীত কোন কাজের নির্দেশ কিছুতেই দেওয়া যেতে পারে না। (মুয়াত্তা, মুসলিম)

শ্রমিকের আত্মসম্মান রক্ষার অধিকার : 
শ্রমগ্রহীতার আরেকটি কর্তব্য হলো, শ্রমিকের সম্মান রক্ষা করা। অতএব তাকে কোনো অবমাননা বা লাঞ্ছনাকর কিংবা দাসসুলভ কাজে খাটানো যাবে না। ইসলাম এবং ইসলামের মহান ব্যক্তিদের জীবনে এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যা এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও ব্যক্তিতে সমানাধিকারের মূলনীতিকে সমর্থন করে। 

যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্রমিক ও কাজের লোকের সঙ্গে আহার গ্রহণ করতেন। তার কাজের বোঝা লাঘবে সরাসরি সহযোগিতা করতেন। তেমনি শ্রমিককে প্রহার বা তার ওপর সীমালঙ্ঘনেরও অনুমতি নেই। যদি তাকে প্রহার করে তবে তাকে এ জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। 

শ্রমিকের ওপর আল্লাহ যা ফরয করেছেন তা আদায়ের অধিকার :
শ্রম গ্রহীতার আরেকটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হলো, শ্রমিককে তার ওপর আল্লাহর ফরযকৃত যাবতীয় ইবাদত যেমন সালাত ও সিয়াম ইত্যাদি সম্পাদনের সুযোগ প্রদান করা। মনে রাখবেন একজন দীনদার বা ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি কিন্তু অন্য যে কারও চেয়ে নিজ দায়িত্ব পালনে বেশি আন্তরিক। কারণ, সে সবার জন্য মঙ্গল সাধন করতে সচেষ্ট থাকে। তার নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারি এবং চুক্তি রক্ষার প্রচেষ্টা সঙ্গত কারণেই বেশি হয়। 

আপনার অবস্থান যেন আল্লাহর ইবাদত কিংবা ইসলামের প্রতীক রক্ষার কাজে বাধা প্রদানকারীরদের পক্ষে না হয়। যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, যারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাত থেকে অধিক পছন্দ করে, আর আল্লাহর পথে বাধা দেয় এবং তাতে বক্রতার সন্ধান করে; তারা ঘোরতর ভ্রষ্টতায় রয়েছে। (সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ৩) 

সৎ কাজে বাধা না দিয়ে বরং তাতে ব্রতী হতে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা আরও ইরশাদ করেন, তুমি কি দেখেছ, যদি সে হিদায়াতের উপর থাকে, অথবা তাকওয়ার নির্দেশ দেয়? যদি সে মিথ্যারোপ করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়? সে কি জানে না যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ দেখেন? (সূরা আল-আলাক, আয়াত : ১১-১৪)

তাছাড়া শ্রমগ্রহীতা শ্রমিকদের আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করবেন। সুন্দর উপায়ে তাদেরকে নিজ ধর্মীয় শিষ্টাচারাবলি আঁকড়ে ধরতে উদ্বুদ্ধ করবেন। কেননা, শ্রমিকরা হলেন শ্রমগ্রহীতার আহল। তাদেরকে আগুন থেকে বাঁচানো তার উপর দায়িত্ব। আল্লাহ্‌ তায়ালা সূরা আত তাহরীমের ৬ নং আয়াতে বলেন, “তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের আহলকে আগুন থেকে বাঁচাও।” এছাড়াও শ্রমিকদের দীনদারির অনুভূতির লালন-অনুশীলনের মাধ্যমে কাজে তাদের মনোযোগ বাড়বে। এটি তাদেরকে আপন কাজে আরও বেশি নিষ্ঠাবান এবং কাজের স্বার্থ রক্ষায় অধিক যত্নবান বানাবে। 

শ্রমিকের অভিযোগ করা এবং বিচার প্রার্থনার অধিকার : 
শ্রম বা কর্ম সম্পর্কিত ইসলামী বিধানগুলো কেবল শ্রমিকদের অধিকার সংশ্লিষ্ট নিয়মাবলি প্রবর্তনেই সীমিত থাকে নি; বরং এসব বিধান পদ্ধতিগত ও প্রায়োগিক বিধিগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে যা শ্রমিকের অভিযোগ ও বিচার চাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে। 

সেহেতু ইসলাম চুক্তির পক্ষগুলোকে একেবারে ছেড়ে দেয় নি। বরং তাদের জন্য নিজেদের অধিকারগুলো সহজে পাবার পথ প্রশস্ত করেছে। হোক তা স্বেচ্ছায় কিংবা আদালতের ফয়সালায়। পাশাপাশি তাদের অধিকারসমূহ সংরক্ষণে অত্যধিক আগ্রহ দেখিয়েছে এবং এসব অধিকার রক্ষায় সর্বপ্রকার উপায় ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। 

আর এই উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে মানুষের মাঝে অধিকার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। কেননা অধিকার ও ইনসাফ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল প্রশান্তি ছড়ায়। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা পায়। সমাজে একে অপরের মধ্যে বন্ধন সুদৃঢ় হয়। মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে আস্থা মজবুত হয়। সম্পদ উন্নত হয়। স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পায় এবং পরিস্থিতি শান্ত হয়। ফলে কেউ অস্থিরতার মধ্যে পতিত হয় না। সর্বোপরি শ্রম ও উৎপাদনে মালিক ও শ্রমিক প্রত্যেকেই নিজ নিজ লক্ষ্যে ধাবিত হয়। পথপরিক্রমায় এমন কিছুর সৃষ্টি হয় না যা শ্রমিকের কর্মস্পৃহাকে ভোঁতা কিংবা মালিকের উত্থানকে বাধাগ্রস্ত করে। 

বিভিন্ন আয়াত ও হাদীসে ইনসাফ ও ন্যায়ানুগতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। জুলুম ও বঞ্চিত করার মানসিকতা থেকে সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা কোনো মানুষের প্রতি জুলুম করেন না; বরং তিনি কোনো প্রকার জুলুম প্রত্যাশাও করেন না। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, আর আল্লাহ বান্দাদের উপর কোন যুলম করতে চান না। (সূরা আল-মু’মিন, আয়াত : ৩১) 

আবূ যর গিফারী রাদিআল্লাহ আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘হে আমার বান্দা, আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং একে তোমাদের মাঝেও হারাম করেছি। অতএব তোমরা পরস্পর জুলুম করো না’। আর পূর্ববর্তী জাতিগুলো কেবল তাদের জুলুম ও অত্যাচারী আচরণের কারণেই ধ্বংস হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, যখন তারা যুলুম করেছে।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত : ১৩)

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং ঐগুলো তাদের বাড়ীঘর, যা তাদের যুলমের কারণে বিরান হয়ে আছে’। (সূরা আন-নামল, আয়াত : ৫২)। আল্লাহ তা’আলা আরও ইরশাদ করেন, ‘আর তুমি তাদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। যখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ, কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। যালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে। (সূরা আল-মু’মিন, আয়াত : ১৮) 

আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা আল-হাজ, আয়াত : ৭১)। অন্য হাদীসে রয়েছে, জাবের ইবন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো, কারণ জুলুম কিয়ামতের দিন অনেক অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে।’ আবূ মূসা আশ’আরী রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ জালেমকে অবকাশ দেন। অবশেষে যখন তাকে পাকড়াও করেন তখন তার পলায়নের অবকাশ থাকে না”। 

ক্ষতিপূরণ লাভের অধিকার : 
কাজ করতে গিয়ে শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্থ হলে অবশ্যই তার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ক্ষতিপূরণের এই ধারণাটি পবিত্র কুরআন যা মূলত ইসলামী আইন-আদালতের প্রথম উৎস- সামাজিক দায়িত্বের ধারণাকে সমর্থন করে। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, 
‘আর কোন মুমিনের কাজ নয় অন্য মুমিনকে হত্যা করা, তবে ভুলবশত (হলে ভিন্ন কথা)। যে ব্যক্তি ভুলক্রমে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তাহলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করতে হবে এবং দিয়াত (রক্ত পণ দিতে হবে) যা হস্তান্তর করা হবে তার পরিজনদের কাছে। তবে তারা যদি সদাকা (ক্ষমা) করে দেয় (তাহলে দিতে হবে না)। (সূরা আন-নিসা, আয়াত : ৯২) 

তেমনি নানা উপলক্ষে পবিত্র সুন্নাহও একে সমর্থন করেছে, যা ইসলামী আইনের দ্বিতীয় উৎস। সরাসরি ক্ষতি পূরণে একে সমর্থন করেছে। যেমন আনাস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের কাছে তাঁর কোনো এক স্ত্রী একটি থালায় আহার হাদিয়া পাঠান। আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা তাতে আঘাত করেন। ফলে থালায় যা ছিল তা পড়ে যায়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আহারের বদলে আহার এবং একটি পাত্রের বদলে আরেকটি পাত্র। 

তাই শ্রমিকের জন্য শ্রমগ্রহীতার কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করার সুযোগ রয়েছে। তার জন্য আরও সুযোগ রয়েছে তার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণে বিচার বা আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার। এসব হলো শ্রমিকের অধিকারগুলোর সবচে গুরুত্বপূর্ণগুলো। এভাবেই ইসলাম শ্রমিকের অধিকার, সম্মান রক্ষা করেছে। তার সম্মানিত জীবন নিশ্চিত করেছে। সর্বোপরি সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছে। 

এই কথা অনস্বীকার্য আমাদের সভ্যতা নির্মিত হচ্ছে শ্রমিকের ঘামের উপর। মানুষের উন্নতির চাবিকাঠি হলো শ্রম। যে জাতি যত বেশি পরিশ্রমী, সে জাতি তত বেশি উন্নত। সব ধরনের শ্রমিককেই মর্যাদা দিতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে যেভাবে শ্রমের মর্যাদা দেয়া হয়, আমাদের দেশে সেভাবে শ্রমের মর্যাদা দেয়া হয় না। একজন দিনমজুরের শ্রম, কৃষকের শ্রম, শিক্ষকের শ্রম, অফিসারের শ্রম, ব্যবসায়ীর শ্রম সবই সমান মর্যাদার অধিকারী। শ্রমের মর্যাদা সমাজের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে। 

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৬

পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলাম


মানুষকে আল্লাহ্‌ তায়ালা খলিফা হিসেবে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। এই দুনিয়ায় আমরাই আল্লাহর প্রতিনিধি। তাই দুনিয়ার সিস্টেমকে নষ্ট হতে না দেয়া এবং এর সংরক্ষন আমাদের উপরেই বর্তায়। সুতরাং পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব মানষেরই। ইসলাম হচ্ছে ফিতরাত বা স্বভাবগত বা প্রকৃতির ধর্ম। মহান রাব্বুল আলামীনের সৃষ্টির অন্যতম সেরা মানুষ বেসিক্যালি সামাজিক জীব। মানুষকে ঘিরেই পরিবেশ-প্রকৃতি ও সমাজের সৃষ্টি। তাই পরিবেশ সংরক্ষন ইসলামে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বৃক্ষ বা গাছ, মানুষ ও পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি বিস্তৃত করেছি ভুমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং উৎপন্ন করেছি নয়নাভিরাম, বিবিধ উদ্ভিদরাজি। এটি আল্লাহর অনুরাগী বান্দাদের জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ।” (সূরা কা’ফ ৭-৮)। সবুজ গাছপালার উপরই নির্ভর করে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর টিকে থাকা। জীবের জন্য গাছপালা সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্য প্রস্তুত করে। শুধু খাদ্য তৈরী নয়, সালোক-সংশ্লেষণের সময় তারা কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে ও অক্সিজেন বের করে দেয়। ফলে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য রক্ষা হয়। হাদীসে রাসূল (সা) থেকে জানা যায়, একজন লোক যখন অকারণে একটি গাছের ডাল ভাঙ্গে তখন নবী করিম (সা) সে লোকটির চুল মৃদুভাবে টান দিয়ে বললেন, “তুমি যেমন শরীরে আঘাত বা কেটে গেলে ব্যথা পাও, গাছের ডাল বা পাতা ছিঁড়লে গাছও তেমন ব্যথা পায়।” পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য গাছ লাগাবার শিক্ষা আমরা মহানবী (সা) থেকে পাই। তিনি বলেছেন, “যদি তুমি মনে করো আগামীকাল কিয়ামত হবে, তবু আজ একটি গাছ লাগাও।” রাসূল (সা) বৃক্ষরোপনকে উৎসাহিত করে বলেছেন, “বৃক্ষরোপন সদকায়ে জারিয়া হিসাবে পরিগণিত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম) রাসূল আরো (সা) বলেছেন, “কোন মুসলমান যদি একটি বৃক্ষ বা গাছ রোপন করে অথবা ক্ষেত-খামার করে, অতঃপর তা হতে মানুষ, পাখি বা কোন প্রাণী ভক্ষণ করে, তা তার জন্য দান বা সদকার সওয়াব হবে।” পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলাম যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তা মহানবী (সা.)-এর উপরোক্ত হাদিসগুলো থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বলতে গেলে পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা সুস্পষ্ট।

কোরআন-হাদিসে পরিবেশ সংরক্ষণকে বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি (আল্লাহ) পানি থেকে সৃষ্টি করলাম’ (সূরা আল আম্বিয়া : ৩০)। দুনিয়ায় যা কিছু প্রাণ পেয়েছে তা কেবল পানি থেকেই পেয়েছে। পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে মাটি ও পানি। মূলত মাটি থেকেই বিভিন্ন খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হয় এবং উৎপাদিত শস্য পানি দ্বারা জীবিত থাকে। এ প্রসঙ্গে কোরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘তাদের জন্য নিদর্শন একটি মৃতভূমি। আমি একে সঞ্জীবিত করি এবং তা থেকে উৎপাদন করি শস্য, তারা তা ভক্ষণ করে। আমি তাতে উৎপাদন করি খেজুর এবং প্রবাহিত করি ঝর্ণাধারা, যাতে তারা ফল খায়।’ (সূরা ইয়াসিন : ৩৩)। আল্লাহ পৃথিবীতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জীবজগতের অস্তিত্ব রক্ষায় বৃক্ষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন: ‘আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং উৎপন্ন করেছি নয়নাভিরাম বিবিধ উদ্ভিদরাজি। এটি আল্লাহর অনুরাগী বান্দাদের জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ’ (সূরা কাফ:৭-৮)। সূরা আন’আমের ১৪১ নম্বর আয়াতের শেষাংশে তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না’। এই আয়াত আরও গুরুত্ব পেয়েছে, মহানবী তাঁর এক সাহাবীকে সতর্ক করেছিলেন কারণ, ওই সাহাবী গোসলের পর অবশিষ্ট পানি ফেলে দিয়েছিলেন। মহানবী তাকে বলেছিলেন, উদ্বৃত্ত পানি নদীতে ফিরিয়ে দেয়া উচিত, যাতে ভাটির অন্য মানুষের চাহিদা পূরণ হয়। ভাটির মানুষের অধিকার এখানে আল্লাহর রাসূল (সা.) সুস্পষ্ট করেছেন। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় উজানের মানুষেরা বাঁধ দিয়ে নদীর পানির স্বাভাবিক স্রোতকে বাধাগ্রস্থ করে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় ভাটির মানুষ। পরিবেশ ও ভাটির মানুষের অধিকার রক্ষায় মহানবী (সা.) সামান্য গোসলের পানির ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন। 

সুন্দর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ গঠনে খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার থাকা অপরিহার্য। আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের জন্য সমুদ্র ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সূরা রুম : ৪১) রাসূল(সা) বলেছেন, “ঈমানের ৭৩টি শাখার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রাস্তা থেকে ক্ষতিকারক বস্তু দুরীভূত করা। পরিবেশ দুষণ থেকে বাঁচতে হলে পরিচ্ছন্নতা অতি জরুরী।রাসূল (সা) বলেছেন, “পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।” হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা) পানিতে প্রস্রাব করতে নিষেধ করেছেন। রাসূল (সা) আরো বলেছেন, “তোমরা অভিশাপ পাওয়ার তিনটি কাজ অর্থাৎ পানির ঘাটে, রাস্তার মাঝে এবং বৃক্ষের ছায়া তলে মলত্যাগ থেকে বিরত থাক।” হাদীসে রাসূল (সা) থেকে আরো জানা যায়, মৃত শরীরের কোন অংশ তিনি যত্রতত্র ফেলতেন না, কারণ তা একসময় শুকিয়ে বাতাসের সাথে মিশে যেতে পারে। যা পুঁতে না ফেললে তা কোন প্রাণী বা পাখির দ্বারা ছড়িয়ে পরিবেশ দুষিত করতে পারে। এজন্য রাসূল (সা) রক্ত বা গোশত মাটিতে পুঁতে ফেলতেন বা পুঁতে ফেলার নির্দেশ দিতেন। বায়ু দূষিত হলে নানান রোগজীবাণু সৃষ্টি হয় যা অনেক সময় মহামারীর আকার ধারণ করে। 

আল্লাহপাক পৃথিবীতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য পাহাড়কে সৃষ্টি করেছে। সমগ্র সৃষ্টি জগতের কল্যাণের জন্য আল্লাহপাক পাহাড়-পর্বত সৃষ্টি করেছেন। ভুমিকম্প, ভুমিধ্বস কিংবা অন্য কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যাতে মানুষকে নিয়ে এ পৃথিবীর নড়া-চড়া করতে না পারে অথবা। সেজন্য আল্লাহপাক্ পাহাড়সমূহকে পেরেকের মত গেড়ে দিয়েছেন বলে এরশাদ করেছেন। “এবং তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়।” (সূরা আন্ নহল-১৫) অন্যত্র বলা হয়েছে, “তিনিই স্থাপন করেছেন ভুপৃষ্ঠে অটল পর্বতমালা এবং তাতে রেখেছেন প্রভুত কল্যাণ।” (সূরা হা-মীম-আস্ সাজদা-১০) অন্য আয়াতে আছে, “আর পাহাড় গুলোকে পেরেকের মত গেড়ে দিয়েছি।” (সূরা নাবা-৭) আরো এরশাদ হয়েছে, “আর পাহাড়কে শক্ত করে দাঁড় করানো হয়েছে।” (সূরা গাশিয়া-১৯)। মহান সৃষ্টিকর্তা পাহাড় সম্পর্কে এসব বর্ণনার মাধ্যমে পাহাড়ের গুরুত্ব নিশ্চিত করেছেন। অথচ আমরা মানুষ আমাদের দায়িত্ব ভুলে সাময়িক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে পাহাড় কেটে পরিবেশের ক্ষতি সাধন করছি।

স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রকৃতি সংরক্ষণে মানুষ তার খিলাফতের দায়িত্ব এবং নিয়ম-কানুন অনেকাংশে এড়িয়ে যাচ্ছে। নদীকে দূষণ আর দখল করে তাকে বিপন্ন করে তুলছি, বন উজাড় করছি, বায়ু দূষণ করছি, শব্দ দূষণ করছি। ফলে আমাদের ওপর নেমে আসছে সর্বনাশা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কালো ছায়া। ইসলামে প্রসঙ্গক্রমে গাছপালা, প্রাণিজগৎ, পাহাড়-নদী সর্বোপরি প্রকৃতি সংরক্ষণের কথা উঠে এসেছে বারবার। ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব আর অসচেতনতার কারণে প্রকৃতি সংরক্ষণের চেয়ে আমরা প্রকৃতির ক্ষতি করছি বেশি। সেই সঙ্গে অনিশ্চিত করে তুলছি আমাদের ভবিষ্যৎ। দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা ও এর সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই রক্ষা করা সম্ভব আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ। গড়ে তোলা সম্ভব সুন্দর পরিবেশে সুস্থ জীবন। 

এই সুবিশাল মহাবিশ্বে পৃথিবী নামক ছোট্ট গ্রহে জীবের বেঁচে থাকার জন্য সকল উপাদান দিয়ে আল্লাহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। আমাদের কারণে পৃথিবীর পরিবেশ দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ফলে জীবের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ হারাচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ অধিকতর গলে যাওয়ার ফলে বিশ্বের কিছু কিছু নিম্নভুমি বিলীন হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাস আহরণে সুষ্ঠু নিয়ম মেনে চলা, মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হওয়া, বন-বনানী থেকে বৃক্ষ উজাড় না করা, পরিকল্পনা ছাড়া ঢালাওভাবে পাহাড় না কাটা, পশু-পাখি নির্বিচারে শিকার না করা, কল-কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশনে যথাযথ নিয়ম মেনে চলা, ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়ার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং জনসাধারণকে আরো অধিক সচেতন হওয়া অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় আইন রচনা করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়াটাও অত্যন্ত জরুরী। আসুন আমরা আমাদের খিলাফতের দায়িত্ব পালনে আরেকটু সচেতন হই। পরিবর্তন শুরু করি আমরা নিজেদের দিয়েই। আমাদের দ্বারা যেন পরিবেশের কোন ক্ষতি না হয়।