This is default featured slide 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

জান্নাতের যাত্রী


সালমান আজ না খেয়েই বেরিয়েছে। এটাতো আর বাড়ি নয় যে মাকে বলবে ‘মা, আজ আমার একটু আগে বের হতে হবে, খেতে দাও’। এটা মেস। এখানে কাকে বলবে? বুয়া প্রায়ই দেরী করে আসে, আড়মোড়া ভেঙ্গে তার রান্না করতে করতেই ক্লাসের সময় পার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যায়। যেদিন একটু আগে বের হতে হয় সেদিনের সকালের খাওয়া বাদ। এতে অবশ্য সালমানের খুব একটা কিছু হয় না। মাঝে মাঝে গ্যাস জমে পেট ব্যাথা করে এই যা। এটা মোটামুটি তার অভ্যাসের মধ্যেই চলে আসছে।

আজকে ক্লাসের আগে তার মিছিল আছে। অপশক্তি স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে মিছিল। ইসলাম ও ইসলামী নেতৃত্ব রক্ষা করার আন্দোলনের মিছিল। তাই যথারীতি সে না খেয়েই বেরিয়েছে। বন্ধুদের সাথে নিয়ে সে মিছিলে যোগ দেয়। মিছিল শুরু হওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই পুলিশ গুলি ছুঁড়ে। পুলিশ এখন খুব আক্রমানত্মক। লাঠিচার্জ কিংবা কাঁদানো গ্যাসের কোন বালাই নেই। সরাসরি গুলি। তাও কোন ফাঁকা গুলি নয়। বুক বরাবর। মিছিলের সামনে থাকা সালমান প্রথম শিকার পুলিশের। বুকে গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়ে সে। সে একা নয়, অনেকে। তার অন্যান্য সহকর্মীরা অনেককে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারলেও সালমান সহ সাত জনকে উদ্ধার করতে পারেনি।

কিছুক্ষন পর পুলিশ তাদের থানায় তুলে নিয়ে আসে। এসেই শুরু করে অত্যাচার। চিৎকার আর আর্তনাদে পুরো থানাটা যেন জাহান্নাম হয়ে উঠে। সাতটা গুলিবিদ্ধ মানুষের উপর ভাংতে থাকে এক একটা লাঠি। একজন পুলিশ মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে গেলে অপরজন শুরু করে। এভাবে পালাক্রমে চলছেই। রক্তের নহর বইতে থাকলো থানায়। একটা পুলিশতো দ্রুত হাঁটতে গিয়ে রক্তে পিছলিয়ে পড়ে গেলো। ঘন লাল রক্তে সেও রঞ্জিত হয়ে গেলো। হো হো করে হেসে উঠলো তার সহকর্মী অন্যান্য পুলিশেরা। রাগে লাল হয়ে গেলো সে। তার সব রাগ গিয়ে পড়লো উলট পালট কুন্ডলি পাকিয়ে থাকা সাতটি রক্তাক্ত দেহের উপর। কি যেন খুঁজতে লাগলো সে। কিছুক্ষন পর পাশের রুম থেকে নিয়ে এলো একটা লোহার পাইপ। এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করলো সে। সালমানরা শুধু আল্লাহকে ডেকেই চলছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিকট শব্দ করে কবির নামে এক সহকর্মীর হাত ভেঙ্গে যায়। কবজি আর কনুইয়ের মাঝখান থেকে ঝুলতে থাকে তার রক্তাক্ত হাত। এ এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।

বুকে, পেটে গুলি খাওয়া সালমানের শুধু নিঃশ্বাসটাই বাকী আছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে এখনই আল্লাহর কাছে চলে যাবে। মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি তার মনে ভর করে। কত কিছু যে কল্পনা করছে সে। সারা জীবনের কথা মনে করার চেষ্টা করে। কিছু কিছু অন্যায়ের কথা মনে হতেই সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। পুলিশের ক্রমাগত পিটুনি তাকে স্পর্শ করে না। সে আছে তার মত করে আনন্দে। মালিকের সাথে মিলিত হবার আনন্দ। বহু আকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে সে। এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না তার। এমন সময় সে বুঝতে পারলো তাকে গাড়িতে তুলছে পুলিশেরা।

কিছুক্ষনপর মৃতপ্রায় সাতটি মানুষকে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে আসে। ডাক্তাররা দ্রুত চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করেন। সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যান্ডেজ করে প্রথমে রক্ত বন্ধের ব্যবস্থা করলেন। তারপর একের পর এক পরীক্ষা করতে থাকলেন কার অবস্থা বেশী খারাপ। কাকে সবার আগে অপারেশন করতে হবে। পরিক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেলো সালমানের কন্ডিশন সবচেয়ে খারাপ। ডাক্তার তাকে বললেন, 
- তুমি দ্রুত তোমার আত্মীয়দের খবর দাও। তোমার আত্মীয় কেউ কি এসেছেন?
- আমার কোন আত্মীয় স্বজন এই শহরে থাকে না। আর থাকলেও আমি তাদের ডেকে কষ্ট দিবো না। আমি তো আমার কোন ক্ষতি করিনি। তাছাড়া আমার কোন এক্সিডেন্টও হয়নি। 
- তোমার অভিভাবকের সাইন ছাড়াতো আমরা তোমার অপারেশন করতে পারবো না। পরে কোন সমস্যা হলে আমাদের উপর দায় পড়বে। 
- (পুলিশদের দেখিয়ে) আপনাদের উপর দায় পড়বে কেন? তারা আমাকে গুলি করেছে। তারপর আমাকে আবার কোন কারণ ছাড়া এক ঘন্টা পিটিয়েছে। দায় হলে তাদের হবে। আর আমার এখানে কোন অভিভাবক নেই। আমার অভভাবক একমাত্র আল্লাহ্‌। 
- আল্লাহ্‌ তো আর সাইন দিবেন না। এখন আমরা কি করবো? 
- (পুলিশদের দেখিয়ে) ওদেরকে বলুন সাইন করতে।

পুলিশও সাইন করতে অস্বীকৃতি জানালো। এরপর সালমান বললো আমাকে দিন আমিই সাইন করি। কিন্তু ডাক্তাররা বললো প্রথম কথা তোমার সাইন করার শক্তি নেই। আর দ্বিতীয়ত তোমার সাইন কাজে আসবে না। এরপর ডাক্তার সার্জারির প্রধান ডাক্তার প্রবীর কুমারকে জানালো। তিনি সব শুনে বললেন, আচ্ছা তাকে নিয়ে এসো। অপারেশনতো করতে হবে। 

ডাঃ প্রবীর কুমার সালমানকে দেখেই চমকে উঠলেন। আরে এতো সেই ছেলে। তিনি তাকে চিনেন। মাস ছয়েক আগের কথা, একদিন রাত দুটোয় হঠাৎ তার বাসায় কলিংবেলের শব্দ। তিনি বের হয়ে দেখলেন একটা শীর্ণকায় ছেলে। দরোজা খুলে দিলেন। সে ঘরে ঢুকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লো। ডাঃ প্রবীর তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেন এবং বুঝতে পারলেন দীর্ঘক্ষন না খেয়ে থাকার কারণে ভীষন দূর্বল হয়ে পড়ছে। অল্পক্ষন পরই তার জ্ঞান ফিরলো। সে অপরাধী ও কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে ডাক্তার প্রবীরের দিকে তাকালো। ডাক্তার তাকে উঠালেন এবং বসালেন। তার কোন কথা শোনার আগেই তাকে খেতে দিতে বললেন তার স্ত্রীকে। সে খাওয়া দাওয়া শেষ করলে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন কী বৃত্তান্ত? তুমি কি কর? এত রাতেই বা কোথা থেকে? 
সব শুনে ডাঃ প্রবীর বললেন, আমি তোমাকে আগে থেকেই জানতাম। প্রসূনের মুখে তোমার এত গল্প শুনেছি যে তোমার সব বিষয় মোটামুটি জানি। সালমান অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে
- কোন প্রসূন?
- কেন তোমার ক্লাসমেট প্রসূন। সে আমার ছেলে। ঐ তো ঐদিকের রুমে ঘুমুচ্ছে।

সালমানের মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠছে। ডাক্তার প্রবীর সাহেব তাকে রাজনীতি করতে বারণ করছিলেন। কিন্তু এগুলো কিছুই তার কানে যাচ্ছিল না। সকাল দশটা থেকে পুলিশ তার পেছনে লাগছে। তার মেস ঘেরাও করেছে। কিন্তু কৌশলে বের হয়েছে। সারা শহর নিজেও ঘুরেছে পুলিশদেরও ঘুরিয়েছে। সে যে কোথাও গিয়ে বসবে তার ব্যবস্থা নেই। রাস্তার রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাহারা বসানো। খাবার দোকানগুলোতে গোয়েন্দারা বসে আছে। তাই সে অগত্যা টিকতে না পেরে এই ডাক্তারের বাসায় নক করেছে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি তারা হিন্দু। সে একটু আগে মজা করে মুরগী দিয়ে ভাত খেয়েছে। তার ক্লাসমেট প্রসূনের নাম বলাতে সে বুঝতে পারলো সে কতটা ভুল করেছে। ওনারা কষ্ট পেতে পারেন তাই সে আঙ্কেল বমি আসছে এই কথা বলেই সে ওয়াশরুমে চলে গেলো। গলায় হাত দিয়ে সব বমি করে দিলো। 

অন্য কেউ না বুঝলেও ডাক্তার বুঝলেন এটা সালমান ইচ্ছে করেই করেছে। অমুসলিমদের জবাই করা মুরগী মুসলিমদের খাওয়া বারণ এটাও জানা রয়েছে তার। তিনি কিছুই বললেন না কিন্তু শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিল ছোট্ট এই ছেলেটির প্রতি। কতটা একনিষ্ঠ তার আদর্শের প্রতি। তারপর সে ওয়াশ রুম থেকে বের হলে তাকে এক গ্লাস দুধ দিলেন। যে ছেলে সারাদিন না খাওয়ার পর যা খেয়েছে তাও বিসর্জন দিতে পারে শুধু আদর্শের জন্য সে সাধারণ কোন ছেলে নয়। তার ছেলে প্রসূনের মুখে তার শুধু প্রশংসাই শুনেন। সারাদিন পুলিশের সাথে দৌড়াদৌড়ি, তার সংগঠনের কাজ সব করেও সে ক্লাসের ফার্স্ট। প্রসূন ও সালমান দুজনই চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এবার HSC পরিক্ষার্থী।

এক মুহুর্তে সব মনে পড়ে গেলো ডাক্তারের। তিনি দ্রুত অপারেশনের ব্যবস্থা করলেন। পরিস্থিতি খুবই নাজুক। তারপরও বলা চলে অপারেশন সাকসেসফুল। তিনটি বুলেট এক্সরে রিপোর্টে ধরা পড়ছিলো। তিনটাই তিনি বের করতে পেরেছেন। অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়েই ছেলে প্রসূনকে ফোন করেছেন এবং বলেছেন সালমানের কথা। ততক্ষণে প্রসূন ও তার বন্ধুরা সবাই জেনেছে। সালমানের বাবা-মাও রওনা হয়েছেন গ্রাম থেকে। 

অপারেশনের আটচল্লিশ ঘণ্টা পার হওয়ার পরও সালমানের জ্ঞান ফিরছে না। সবাই খুব টেনশনে। সালমানের বাবা সিজদায় পড়ে আছেন আছেন। আর মা ছোটাছুটি করছেন অপারেশন থিয়েটারের সামনের বারান্দায়। কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছেন তারা। সালমানের আন্দোলনের সঙ্গীরাও আছে দূরে দূরে। পুলিশের কারণে তারা সামনে আসতে পারছে না। তবে সালমানের মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখছে। সবার খাবার দাবার ঔষধ তারাই সরবরাহ করছে। বায়ান্ন ঘন্টা পর তার জ্ঞান ফিরেছে। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছিল। খুবই দূর্বল হয়ে পড়েছে। হঠাৎ তলপেটে সে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করছে। ডাক্তাররা আসলেন এবং এক্সরে করালেন। আরো দুটো বুলেটের অস্তিত্ব দেখা গেল সেখানে। আবার অপারেশন করতে হবে।

এক অপারেশনের ধাক্কাই সে নিতে পারেনি। এখন অন্য অপারেশন একেবারেই সম্ভব না। আবার ওদিকে বুলেটদুটো থাকার কারণে ভেতরে ইনফেকশন হয়ে গিয়েছে। অপারেশন না করলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। ডাক্তাররা রিস্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন অপারেশনই করতে হবে। সালমানের বাবা-মা কে পুরো কন্ডিশন বুঝালেন ডাঃ প্রবীর। তারাও মত দিলো। সবাই বুঝতে পারলো হয়তো সালমানকে আর পাওয়া যাবে না।

একে একে সবাই অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করলো। সালমানের বাবা, মা, ডাক্তাররা, নার্স, সহকর্মীরা সবাই। সালমান তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। জান্নাতি সে হাসি। ডাঃ প্রবীর একজন জুনিয়র ডাক্তারকে কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বললেন। আর সালমানের দিকে তাকিয়ে কন্ঠকে খুব স্বাভাবিক রেখে বললেন, বাবা সালমান, তোমার শরীরে আরো দুটো বুলেট আছে সেগুলো বের করতে হবে। তোমার অবস্থা খুব নাজুক। আমরা জানিনা ভবিষ্যতে কি হবে। তবে তুমি আশঙ্কামুক্ত নও। এখানে সবাই আছেন। তুমি যদি কাউকে কিছু বলার থাকে তবে বলতে পারো। তোমার ক্ষতির জন্য কারা দায়ী তাদের কথা তুমি বলে যাও।

সালমান তার মাকে ইশারায় ডাকলো। মা কতদিন তুমি আমাকে আদর কর নাই, দোষ আমার আমি বাড়ি যেতে পারিনি। আমাকে একটু আদর করবে? মা জড়িয়ে ধরলো শুয়ে থাকা সালমানকে । মা-ছেলের সাথে কান্না করতে লাগলো সবাই। ডাক্তার তাদের ছাড়িয়ে নিলেন। এবার সে বাবাকে ডেকে বললো আমার কিছু ঋণ আছে, শোধ করে দিবে? বাবা বললো, কি ঋণ আমাকে বল। আমি অবশ্যই শোধ করে দিব। বাবা ঋণটা তোমার কাছেই। তুমি কষ্ট করে রোজগার করে আমার জন্য পাঠাতে। আমি তোমার কোন আশাই পূরণ করতে পারিনি। আমার ঋণটা মাফ করে দাও। 

তারপর তার এক সহকর্মীকে কাছে ডেকে বললো, আমার বিছানার নিচে ৫০০ টাকা আছে এগুলো সোহাগ ভাইকে দিবে। আর কিছু ভাউচার আর বিগত মাসগুলোর হিসাব আমার টেবিলের ড্রয়ারে আছে। দয়া করে সেগুলোও সোহাগ ভাইকে দিবে। আর আমাকে মাফ করে দিও ভাই। সবাইকে বলিও যেন আমাকে মাফ করে দেয়। এবার ডাক্তারকে ইশারা করে বলে লিখুন।

আমি সালমান বলছি আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। আল্লাহ্‌ তায়ালা যদি মনে করেন আমাকে তার সান্নিধ্যে নিয়ে যাবেন তাহলে এটা আমার জন্য পরম পাওয়া। যারা আমাকে গুলি করেছে আমাকে মেরেছে তারা না বুঝে এসব করেছে। তারা যদি আমাদের বুঝতো তাহলে তারা এই জঘন্য কাজ কখনোই করতো না। এই অপরাধ আমাদের, আমরা এদেশের মানুষকে ভালোভাবে বুঝাতে পারিনি। আমাদের সীমাবদ্ধতার জন্য আজ এই অবস্থা। আমার প্রতি যারা নির্যাতন করেছে আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন।

সবার চোখে অশ্রু। সবাই কাঁদছে। পুলিশগুলো সহ। হঠাৎ ডাঃ প্রবীর এক পুলিশের কলার চেপে ধরে বলতে লাগলেন, কেমনে পারলে? কেমনে পারলে এই ফেরেশতার মত ছেলেকে গুলি করতে? বলে কাঁদতে লাগলেন। পুলিশগুলোও চোখ মুছতে লাগলো।

একে একে সবাইকে ডাক্তার প্রবীর অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে দিলেন। আরেকজন ডাক্তার সংজ্ঞাহীন করার ইঞ্জেকশন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সালমানের দিকে।
২৫/২/২০১৬

সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

প্রমোশন


১.
খাবার টেবিলে আশরাফ সাহেব। সাথে মসজিদের হুজুর-খাদেম সহ তিনজন লোক। কোতোয়ালী থানার ওসি তিনি। হুজুরদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করার কারণে এটা মনে করার দরকার নেই তিনি ধার্মিক লোক। আপাদমস্তক অসৎ তিনি। মাসে একদিন ফকির-মিসকিন-হুজুরদের খাইয়ে তিনি তার পাপ কাটান। এই পাপ কাটানোর সিস্টেমটা তার আবিষ্কার নয়। তার দাদা ও বাবাকেও সে দেখেছে এভাবে পাপ কাটাতে।

ইদানিং তিনি তার দুই ছেলেকে নিয়ে ভীষন চিন্তিত। তারা না করে পড়াশোনা, না শুনে কারো কথা। তিনিও তার বাল্যকালে বাবা-মায়ের অবাধ্য ছিলেন ঠিক কিন্তু এতটা বেয়াড়া ছিলেন না। ইদানিং তাদের বিরুদ্ধে অহরহ ইভটিজিং এর অভিযোগ আসছে। আরো উদ্বেগজনক খবর হল নেশার সাথে জড়িত হয়ে পড়ছে। পাড়ালেখার তো হদিসই নেই। বাসায় তাদের প্রাইভেট টিউটর টিকে না। এক মাস পড়িয়েই তারা চলে যায়। আশরাফ সাহেব একের পর এক টিউটর ঠিক করেন আর তার ছেলেরা কিভাবে টিউটরকে তাড়ানো যায় সেই ব্যবস্থা করে।

খেতে খেতে ওসি সাহেব মসজিদের ঈমামকে বললেন, আমাকে একটা ভালো ছেলে দিন, যে আমার এই দুই ছেলেকে নিজের ভাইয়ের মত দেখাশোনা করবে। ঈমাম সাহেব বললেন শিক্ষক তো আর কম দিলাম না। কিন্তু তাদের অত্যাচারে কে এখানে পড়াবে বলুন! ছেলেদের কথা ভালোভাবেই জানেন ঈমাম সাহেব কারণ তিনি তাদের আরবী পড়ান। তিনিও অনেক চেষ্টা করেছেন তাদেরকে লাইনে আনার জন্য। কিন্তু বিধিবাম, কিছুতেই কিছু হয়নি। ঈমাম সাহেব কিছুক্ষন ভেবে বললেন একটা নতুন ছেলেকে দেখেছি। তাকে বলে দেখি সে হয়তো পারবে। তার মধ্যে প্রচুর ধৈর্য্য দেখেছি।

পরদিন ঈমাম সাহেব ফজরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হতেই দেখা হল সাকিবের সাথে। সাকিব এই এলাকায় এসেছে বেশীদিন হয় নি। এই দুই কি তিন মাস। গ্রামের ছেলে, ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে তাই শহরে আসা। ঈমাম সাহেব অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছেন এই কয় দিনে সে এলাকার ছেলেদের মধ্যে নিজেকে ভীষন জনপ্রিয় করে তুলেছে।সাকিবকে ঈমাম সাহেব ওসি সাহেবের ছেলেদের পড়ানোর কথা বললেন। সাকিব রাজী হল।

২.
ওসি সাহেবের দুই ছেলে। সাজিদ আর সাঈদ। সাকিব তাদের সম্পর্কে আগে জেনে নিয়েছিলো। তাই সে এক সপ্তাহ কোন পড়াশোনার কথাই বলেনি। কেবল গল্পগুজব করেছে। এদিক-সেদিক ঘুরতে যায়। জগতের যে আরেকটি পিঠ আছে তা দেখানোর চেষ্টা করে। তাদের নিয়ে বস্তিতে যায়। মানুষের দূর্দশা দেখায়। হাসপাতালে যায় মানুষের কষ্ট অনুধাবন করতে শেখায়। আস্তে আস্তে তাদের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে লাগলো। সাজিদ- সাঈদ দেখলো সাকিব কোন টিউটর নয়, যেন তাদের কোন বন্ধু।

আশরাফ সাহেব খুব অবাক হলেন তার দুই ছেলের পরিবর্তন দেখে। মাসখানেকের মধ্যেই কেমন যাদুর মতন দুই ছেলেকে কন্ট্রোল করে ফেললো সাকিব। ওরা যে শুধু পড়াশোনা করে তা নয়, তারা এখন নিয়মিত নামাজ পড়ে। সাকিবকে তিনি সম্মানের চোখে দেখতে লাগলেন। এরমধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে। আশরাফ সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন রাজাকারদের ফাঁসীর বিরুদ্ধে এই দেশের টগবগে তরুণরা প্রাণ পর্যন্ত দিচ্ছে। কঠিন নির্যাতনেও ওদের দমাতে পারছেন না তারা। তারা যেন মার খাওয়ার জন্য বারবার মিছিল করছে।

সাকিব ইতিমধ্যে ওসি সাহেবের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠলো। ওসি সাহেব হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি পুলিশের চাকুরীতে জয়েন করার পর অনেকেই বলেছে পুলিশের ছেলে মানুষ হয় না। সাকিবের প্রতি তিনি অনেক কৃতজ্ঞ। তিনি প্রায়ই রাতে সাকিবকে খেয়ে যেতে বলেন। 

একদিন খেতে খেতে সাকিবকে বললেন, আচ্ছা ছেলেরা এভাবে রাজাকারদের জন্য জীবন দিচ্ছে কেন? সাকিব কিছুক্ষন তার দিকে তাকিয়ে ছিল। এরপর নাতিদীর্ঘ একটা বক্তব্য দিয়ে দিল। ওসি সাহেব অবাক হয়ে শুনছিলেন। তিনি এতদিন ভাবতেই পারতেন না স্বাধীনতা বিরোধীদেরও যুক্তি থাকতে পারে। এত অকাট্য যুক্তি! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন তোমার যুক্তির বিরুদ্ধে আমার বলার যোগ্যতা নাই। তুমি আবার এগুলার সাথে জড়িত না তো? সাকিব সেদিন কোন উত্তর দেয়নি। 

৩.
সরকার ঘোষণা দিয়েছে, শিবির দেখামাত্রই গুলি করতে হবে। যারা করতে পারবে তাদেরই কেবল প্রমোশন। আশারাফ সাহেব যেন এমন একটি ঘোষনার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। খুশিতে তার মুখ চকচক করতে লাগলো। আশরাফ সাহেব বহুদিন বহু অফিসার কে ঘুষ দিয়ে আসছেন তারপরেও প্রমোশন হচ্ছে না। তিনি প্রমাদ গুনলেন। এবার তার প্রমোশন হবেই। তিনি গুলি চালাবেন। একেবারে বুক বরাবর। প্রমোশন তাকে পেতেই হবে!
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় বেশ খুশি ওসি সাহেব। কালই তিনি ঘটনাটা ঘটাবেন। কাল শিবিরের হরতাল। মিছিলে তিনি গুলি করবেন। সকালে কাকডাকা ভোরেই মিছিল শুরু হলো। তিনি এসআই দের বললেন গুলি চালাও। তারা গুলি চালালো ফাঁকা। তারপরও মিছিল থামছেনা।

তিনি তার পাশে থাকা এস আই থেকে রাইফেল কেড়ে নিলেন। তাক করলেন মিছিলের যুবকদের বুক বরাবর। ঠা ঠা ঠা টানা দশ রাঊন্ড। তিন জন যুবক লুটিয়ে পড়লো। হাসি ফুটে উঠলো ওসি সাহেবের মুখে। লাশের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না।
থানায় এসে নতুন অভিযানের পরিকল্পনা করছেন। এক এস আই জানালো, স্যার দুজন মারা গেছে একজন জীবিত আছে তাকে চিকিৎসা দেব? গালি দিয়ে উঠলেন তিনি ...... পুত শিবিরের জন্য কিসের চিকিৎসা? বাসা থেকে বারবার ফোন দিচ্ছে। নানান ঝামেলায়  ও ব্যাস্ততায় তা ধরতে পারছেন না।

বিকেলে বাসায় গেলেন। দেখলেন তার স্ত্রী কাঁদছেন। সব শুনে বুঝতে পারলেন তিনি আজ হত্যা করেছেন সাকিবকে। বিমূঢ় হয়ে গেলেন। দৌড়ে গেলেন হাসপাতালে। দেখলেন তার দুই ছেলে ধস্তাধস্তি করছে পুলিশের সাথে। তিনি পৌঁছতেই দেখেন নিচে পড়ে আছে সাকিব। এখনো বেঁচে আছে। তার দুই ছেলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে চাচ্ছে কিন্তু অন্যান্য পুলিশ তা দিচ্ছে না।
এরপর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। অনেক চেষ্টা করলেন, কিছুতেই কিছু হল না। আশরাফ বলতে লাগলেন আমি শুধু আমার ছেলেকে কে গুলি করে হত্যা করি নি, তিলে তিলে হত্যা করেছি।

কাঙ্খিত প্রমোশন হয়েছে আশারাফ সাহেবের। সাহসী পুলিশ অফিসারের পদক যখন গ্রহন করছিলেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন পেছন থেকে দৌড়ে আসছে রক্তমাখা সাকিব। হাতে দুইটা রেজাল্ট কার্ড। বলছে দেখুন আঙ্কেল আমার দুই ভাই কত ভালো। তারা দুজনই ফার্স্ট হয়েছে।

পুনশ্চঃ আশরাফ সাহেব এখন হেমায়েতপুর। চিকিৎসার উর্ধ্বে তিনি।

রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০১৬

হাজার বছরের আর্তনাদ


- ও বাবা বাইর হও না, আর কতক্ষন?
- মা'রে একটু শান্তিমত গোসল কইরতে দাও 
- এই এক্কান কতা দুই ঘন্টা ধরি কইতে আছস। 
- গত সাত মাসে এত হানি হাই ন গোসল কইরবার লাই। আইতেছি আর দুই মিনিট 
- কত আগে খানা বাড়ি রাখছি, অন বেক জুড়াই গেছে

মা জাহানারা বেগমের আনন্দের সীমা নাই। তার আদরের ছোট ছেলে রফিক গত পরশু জেলখানা থেকে বের হয়েছে। না, কোন দাগী আসামী নয় রফিক। ইন্টার ২য় বর্ষের ছাত্র। স্থানীয় সরকারি কলেজে পড়ে। অভাবের সংসারে সবকিছু ছাপিয়ে এসএসসি-তে সে A+ পেয়েছিল। তার অপরাধ সে ইসলামী আন্দোলন করে। স্বৈরাচারীর নাগপাশ ছিন্ন করতে চায়। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও জনগণের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক সমাজ চায়। কিন্তু তার চাওয়াতো স্বৈরাচারী সরকারের কাছে পছন্দ হবেনা, হয়ও নি। একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে একদল পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়।

তারপর সে কি কান্ড। তারা তো স্বীকারই করেনা। রফিকের বাবা নেই। বড় ভাই বিদেশ। জাহানারা বেগম অসহায় হয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। কেউ জানেনা তার ছেলে কোথায়। পরবর্তীতে স্থানীয় কিছু সাংবাদিকের সাহায্যে তিনি আবিষ্কার করেন তার ছেলে থানায়ই আছে। তবে পুলিশ স্বীকার করছেনা। সবার কথা শুনে বুঝতে পারলেন তার আদরের ছেলে রফিককে তারা আর বাঁচতে দিবেনা। খুন করবে ক্রসফায়ারের নামে।

সহসা জাহানারা বেগম চিৎকার করে উঠেন। ওসির পা ধরে ভিক্ষা চাইতে থাকেন তার ছেলেকে। তার করুণ আকুতিতে বরফ গলতে শুরু করলো বর্বর ওসির। জাহানারা বেগম বলতে থাকেন “আঁর হোলা যদি অপরাধ করি থায় তয় জেল দেন আজীবন জেল, তবুও হোলা আঁর চোখের সামনে থাক। হেতেরে মারিয়েন না”। পুলিশ মায়ের কথায় রাজী হয় তবে এজন্য বিসর্জন দিতে হয় বড় ছেলে শফিকের বিয়ের জন্য একটু একটু জমানো সব টাকা। ঘরের একমাত্র দুধেল গাই। বন্ধক দিতে হয় সব জমি। এরপরেও জাহানারা বেগমের ওই বর্বর ওসির প্রতি সে কি কৃতজ্ঞতা।

সাত মাস আগের কথাগুলো মনে হলো জাহানারা বেগমের। আজ তার খুশির সীমা নাই। অথচ এই খুশির মধ্যেও যেন মনে কিছু একটা খচ খচ করছে। রফিক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে পরশুদিন। বের হয়ে সে বাড়িতে আসেনি। বাড়িতে আসা নিরাপদ না। স্বৈরাচারী পুলিশেরা তাকে বাড়িতে থাকতে দিবেনা এই কথা সে জানতো। কিন্তু জাহানারা বেগম তাকে ডেকেছে শুধু একবেলা খাবার তাকে খাওয়াবে প্রাণভরে। এজন্য কতদিন থেকে কত আয়োজন করে রেখেছে।

রফিকের প্রিয় গরুর গোশত কিনেছে। মুরগীর বাচ্চা, কবুতরের বাচ্চা, বড় কাতল মাছ, সন্দেশ কত কিছুর যে আয়োজন হয়েছে। ঘাটের সামনের দোকান থেকে আধাসের সুগন্ধি চাল এনেছে। পাশের ঘর থেকে দু’সের দুধ এনেছে। এটা সেটা করে প্রায় বিশ পদ খাবার তৈরী করেছেন জাহানারা। এত খুশির দিন তার জীবনে খুব কমই এসেছে। রফিক তো আসতেই চায় নি, বলেছে আর ক’টা দিন সবুর কর। পরিস্থিতি ভালো হলে আসবো। কিন্তু মায়ের মন তর সয়নি। রফিককে আসতে বলে কেঁদেই দিয়েছে। অগত্যা রফিকও চলে এসেছে মায়ের কাছে একবেলা খাবার খেতে।

- হ্যাঁ রে তোদের ওখানে খুব মাইরতো না?
- না মা মারতো না, তবে অন্য বিষয়ে কষ্ট হতো, যেমন ধরো গোসলের পানি নেই, ওযুর পানি খুব কম, খাবারগুলো বিস্বাদ। ওখান মানুষগুলো সব ভালো না। মদ গাঁজা খায়, খারাপ কথা বলে। অপরিষ্কার।

ছেলে মন দিয়ে খাবার খাচ্ছে। এটা ওটা তুলে নিচ্ছে। যে কোন মায়ের কাছে এর চাইতে তৃপ্তিদায়ক দৃশ্য আর হতে পারেনা। জাহানারা বেগম সেই দৃশ্য থেকে একটুও বঞ্চিত হতে চাননা। পাশে বসে রফিকের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তিনি। এমন সময় ঘরের সামনে গাড়ির শব্দ। জাহানারা বেগম একটু উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। অতটুকুই।

ততক্ষণে সব পুলিশ গট গট করে নেমে ঘিরে ফেলেছে ওদের মা-ছেলেকে। জাহানারা বেগম কিছু একটা বলার চেষ্টা করছেন কিন্তু গুলির শব্দে তা গুলিয়ে গেলো। জাহানারা তাকিয়ে দেখেন গোশতের বাটির উপর লুটিয়ে পড়েছে রফিক। মুখে এক চিলতে হাসি।

ঘন লাল রক্তে উপচে উঠেছে গোশতের বাটি। কাতল মাছের বড় মাথাটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে খাবার প্লেটের উপর। ঘটনার আকস্মিকতায় সেও ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে।

আবারো গাড়ির শব্দ। হানাদাররা চলে যাচ্ছে। কয়েক মুহুর্ত কাঁদতে ভুলে গেছেন জাহানারা। গাড়ির শব্দে সম্বিৎ ফিরে পেলেন। আর্তনাদ করে উঠলেন। সহস্র বছরের আর্তনাদ। এই আর্তনাদ চলে আসছে রাসূল সঃ এর যুগ থেকে। বেলাল রাঃ, সুমাইয়া রাঃ, ইয়াসির রাঃ তারও আগে গর্তওয়ালাদের আর্তনাদ। হযরত যাকারিয়া আঃ সহ অনেকের আর্তনাদ।

বাংলাদেশেও এই আর্তনাদ নতুন নয়, মালেক, সাব্বির, হামিদ, আইয়ুব......

রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৫

একটি কঠিন প্রশ্ন


নুহার বয়স দু’ বছর। খুব পাকা পাকা কথা বলে। বাবার সাথে দুনিয়ার গল্প করে। প্রশ্ন করে জর্জরিত করে। বাবা আশিক সাহেব চা-পোষা মানুষ। অফিসের কেরানীর চাকুরি করে খুব দ্রুত ছুটে আসে মেয়ের কাছে। মেয়ের শত আবদার রক্ষা করাই যেন তার একমাত্র কাজ। ঐ কাজে এত শান্তি পান তিনি যা ভাষায় বর্ণনা করার মত না। মেয়েটিও বাবার জন্য পাগল। তিনি না খাওয়ালে সে খাবেই না। দাদী কিংবা ফুফি কারো হাতেই না। বাবা হাত না বুলালে সে খাবে না।

মেয়েটা পাশে না থাকলে মাঝে মাঝে আশিক সাহেবের মন আনচান করে উঠে। অফিসে প্রায়ই আশিক সাহেবের এমন হয়। তিনি আর টিকতে পারেন না, দৌড়ে বাসায় আসেন। এসে হয়তো দেখেন মেয়েটা দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমুচ্ছে অথবা আপন মনে খেলছে। বাবুটার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে, কপালে একটু করে চুমু দিয়ে তিনি আবার তার কাজে ফিরে যান। এই মেয়েটিই মাঝে মধ্যে আশিক সাহেবকে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন করে বসে। বাবা, আমার মা কে তুমি কি করেছ? সবার মা আছে, আমার মা নাই কেন? আশিক সাহেব কোন উত্তর দিতে পারেন না। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকেন। কখনো অন্য কিছু বলে প্রসঙ্গ এড়াতে চান। আবার মাঝে মধ্যে নিজেকেই সান্তনা দিতে পারেন না তিনি। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদেন। মেয়েটিও বাবার সাথে কিছুই না বুঝে কাঁদে।

এখন থেকে বছর নয় আগে আশিক সাহেবের বিয়ে হয় শিরিনের সাথে। শিরিনের মামার পরিচিত ছিল আশিক সাহেব। তিনিই প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন। সবকিছু দেখে শুনে শিরিনের বাবা বিয়েটা নাকচই করে দিলেন। কারণ আশিক সাহেব গরিব মানুষ। সে নিজেই খেতে পায়না শিরিনকে কি খাওয়াবে? শিরিনের মামার এক কথা, মানুষটা গরিব হলেও ভালো। চরিত্রবান। এমন ছেলে এখন পাওয়া সহজ নয়। আশিক সাহেব বলেন, আমি আর্থিক দিক দিয়ে গরীব হতে পারি কিন্তু মনের দিক দিয়ে কখনোই নই। আমি ডালভাত খাই, মাস শেষে জমানো টাকা খুব একটা থাকেনা। আমাকে আল্লাহ যা দিয়েছেন তাতে দু’জনের হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। এ সরল কথাগুলোই মনে ধরে শিরিনের। সে গোঁ ধরে বিয়ে যেন আশিক সাহেবের সাথেই হয়।

অবশেষে সবকিছু ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন হলো। সুন্দর সংসার আশিক-শিরিনের। এর মধ্যেও ছিল কিছুটা অপ্রাপ্তি। যা দুজনকেই প্রায় সময় বিষাদে আচ্ছন্ন করে রাখে। তাদের কোন সন্তান ছিল না। কত ডাক্তার-কবিরাজ দেখালেন। আল্লাহর কাছে চাইলেন। কিছুতেই কিছু যেন হবার নয়। অবশেষে তাদের বিয়ের সাত বছরের মাথায় আল্লাহ তাদের দিকে মুখ তুলে চাইলেন। শিরিন জানালো, তাদের সন্তান হচ্ছে। আশিক সাহেব অতি টানাটানির সংসারে দশ কেজি মিষ্টি কিনে বিতরণ করলেন, অভাবীদের খাওয়ালেন। শত শত টাকা ফকির-মিসকিনকে দান করলেন।

আস্তে আস্তে সন্তানের জন্মের সময় ঘনিয়ে আসলো। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিলো। হঠাৎ একদিন শিরিনের ভীষন পেইন শুরু হয়। শিরিনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। বাচ্চার হার্ট সাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে না। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত দিলেন, এখনি সিজার করতে হবে। দুই ব্যাগ রক্ত লাগবে। আশিক সাহেব ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রক্ত যোগাড় করার জন্য চারদিকে ফোন করেন। এদিকে শিরিনের অবস্থাও দ্রুত খারাপ হচ্ছে। শিরিনের রক্তের গ্রুপ বি নেগেটিভ পরিচিত কারো কাছেই রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে অপারেশন শুরু করা যাচ্ছে না। ডাক্তাররা একটি ব্লাড ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করে দিলেন। সেখানে বি নেগেটিভ রক্ত পাওয়া গেলো। আশিক সাহেব গেলেন রক্ত আনতে। ডাক্তাররাও অপারেশন শুরু করে দিলেন নিশ্চিন্তে।

আশিক সাহেব স্থানীয় জামায়াতের ইউনিট সেক্রেটারী। স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের পুলিশ সবসময় তাকে খুঁজে বেড়ায়। আশিক সাহেবের মনে খুব আস্থা, যেহেতু তিনি কখনো কারো ক্ষতি করেন নি তাই তার কিছু হবে না। এলাকাবাসী সবসময় তার পাশে থাকবে। আশিক সাহেব যেভাবে এলাকাবাসীদের যে কোন প্রয়োজনে পাশে থাকেন, এলাকাবাসীও তাকে সেভাবে ভালবাসে। তাই অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মত তিনি আত্মগোপনে থাকতেন না। তাকে কয়েকবার আটক করার জন্য পুলিশ এসেছিলো। কিন্তু এলাকার সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে তাকে আটক করা যায় নি।

পুলিশ আগে থেকে আশিক সাহেবকে ফলো করছিলো। তিনি যখন ব্লাড ব্যংক থেকে রক্ত নিয়ে বের হলেন তখনই তাকে আটক করে থানায় নিয়ে গেল। আশিক সাহেব অনেক অনুনয় করলেন। তার কোন কথা শোনা হয় নি। হাসপাতাল, তার স্ত্রী, রক্ত সব কথা বললেন কিন্তু নরপিচাশ কোন পুলিশ তার কথা শুনলো না। নীতিতে অটল আশিক সাহেব কখনোই কারো সামনে মাথা নত করেন না। সেই আশিক সাহেব হঠাৎ ওসির পা জড়িয়ে ধরলেন, বললেন স্যার প্লিজ আপনি আমাকে ছাড়ার দরকার নেই, দয়া করে এই রক্তের ব্যাগটি হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। আমি আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকবো। ওসি কষে লাথি মারে আশিক সাহেবকে। হতচকিত হয়ে ছিটকে পড়েন তিনি। পুলিশ এক ঝটকায় আশিক সাহেব থেকে কেড়ে নিল রক্তের ব্যাগ। ছুঁড়ে ফেলে দিল পাশের নর্দমায়। আশিক সাহেব স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কিছুই বলতে পারেন না। কেবল নোনা জল ছেড়ে প্রভুর দরবারে প্রার্থনা করতে থাকেন তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর আর সন্তানের জন্য।

এদিকে ডাক্তাররা অত্যন্ত অবাক হচ্ছেন। শিরিনের অবস্থা খুবই খারাপ। অথচ আশিক সাহেব রক্ত নিয়ে এখনো ফিরছেন না। আশিক সাহেবের মা ওটির সামনে দৌড়াদৌড়ি করছেন, কি করবেন বুঝতে পারছেন না। একদিকে ডাক্তার তাড়া দিচ্ছে। অন্যদিকে আশিকের ফোন নাম্বার বন্ধ। ইতিমধ্যে হাসপাতাল কাঁপিয়ে নবজাতক জানান দিল সে পৃথিবীতে এসেছে। জ্ঞানহারা শিরিন হঠাৎ জেগে উঠলো, ডাক্তার কে কাছে ডেকে ফিস ফিস করে বললো, বাবুটাকে আমার কাছে দিন। শিরিন নার্স থেকে বাবুটাকে নেয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। বাবুর দিকে তাকিয়ে অশ্রু ছেড়ে দিয়ে বললো, তোর বাবাকে পুলিশ নিয়ে গেছে। আমি চলে যাচ্ছি আল্লাহর কাছে। তুই ভালো থাকিস।

ব্যাস অতটুকুই। আবার জ্ঞান হারালো শিরিন। আশিক সাহেবের মা অনেক চেষ্টা করে রক্ত আবার যোগাড় করলেন। কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরী হয়ে গেলো। শিরিনের ঘুম আর কখনোই ভাংলো না। ডাক্তার অবাক হলেন শিরিনের কথাগুলো শুনে। আশিককে কখন পুলিশ নিয়ে গেল কেনইবা নিয়ে গেল? কিছুই বুঝতে পারেন না তিনি। শিরিন তার বাবুটাকে যে কথাগুলো বলেছিলো সেগুলো ডাক্তার আশিক সাহেবের মাকে জানালেন। তিনি অত্যন্ত অবাক হলেন, জরুরী খবর নিয়ে জানলেন সত্যিই আশিক থানায়।

রাত এগারোটার দিকে থানায় বাবুটাকে নেয়া হল, আশিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বাবুটা সেদিন যেন কেঁদে কেঁদে বহু প্রশ্ন করেছিলো। আশিক সাহেব সেদিন কোন উত্তর দিতে পারেন নি। আজও না। আজও তিনি পারেন না নুহার কঠিন প্রশ্নটার জবাব দিতে...

#দুঃসময়ের_গল্প 

রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১৫

অন্যরকম ভালোবাসা



 রাত পৌনে একটা। জীর্ণ একটি টিনশেড আধাপাকা ঘর। একটি গাড়ি এসে দাঁড়ালো। চালক কয়েকটি পানির বোতল নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। বাড়ির সামনে পাঁচটি ছোট কবর। সেই কবরগুলো ঘিরে রয়েছে অনেকগুলো ফুলগাছ। চালক হাতের পানির বোতলগুলো থেকে প্রত্যেকটি গাছের গোড়ায় পানি দিতে লাগলেন। পানি দেয়া শেষে কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে কাঁদতে থাকলেন। কখনো কখনো কবরগুলোতে হাত বুলাতে লাগলেন। এভাবে করতে করতে রাত শেষ হয়ে এলো। মুয়াজ্জিনের আযানে চালক সম্বিত ফিরে পেলেন। দ্রুত খালি বোতলগুলো নিয়ে আবার গাড়িতে উঠলেন। চলতে শুরু করলো গাড়ি।

সায়েমের বাগান করার খুব শখ। বাড়িতে তার বাগান ছিল। কিন্তু ভার্সিটির হলে সে বাগান কই পাবে? তার উপরে সে পড়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। যেখানে মানুষের জায়গা হওয়াই কঠিন, বাগান তো পরের কথা। তারপরও সায়েম বাগান করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। হোস্টেলের ছাদ তালা মারা। ছাদে যাওয়া ভীষন বারণ। কোনভাবেই সে ছাদে বাগান করার অনুমতি পেলনা। অবশেষে সে রুমের বারান্দায় কয়েকটি টব কিনে গাছ লাগায়। এতে তার বাকী রুমমেট দু’জন ভীষন বিরক্ত। তারা আগের মত বারান্দায় আরাম করে বসতে পারেনা। কাপড় শুকাতেও অসুবিধে হয়। মাঝে মাঝে সায়েম গাছগুলোতে পানি দিলে বারান্দা ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। এতসব অভিযোগের পরও নানানভাবে রুমমেটদের ম্যানেজ করে তার বাগান কার্যক্রম চালাতে থাকে। মাস দুয়েক পর যখন সবগুলো গাছে সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটতে থাকে তখন অবশ্য রুমমেটদের অবস্থান পরিবর্তন হয়। সায়েম যখন মাঝে-মধ্যে দেখে তার কোন রুমমেট গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে তখন সায়েমের মন আনন্দে নেচে উঠে।

ফুলগাছগুলো সায়েমের কাছে শুধুমাত্র গাছ ছিলনা। বরং বলা যেতে পারে সায়েমের বেস্টফ্রেন্ড। সায়েম তাদের সাথে বসে বসে গল্প করে। তাদের গান শোনায়, নিজেও তাদের কাছ থেকে গান শুনে। হুট করে কেউ দেখে ফেললে চমকে উঠে বলে কই আমি কারো সাথে কথা বলছিনা! আমি আপন মনে গান করছিলাম। অনেকে মনে করতো সায়েম বোধহয় মাথার তার দুটা ছিঁড়া। নইলে গাছের সাথে এত কিসের মাখামাখি। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যাপারটা ধোপে টিকতো না। কারণ বাস্তবে সায়েম ছিল অত্যন্ত মেধাবী, বুদ্ধিমান, মানুষের কাছে অতিপ্রিয় সদালাপী একজন মানুষ।

সায়েম শুধুমাত্র ফুলগাছ নিয়ে পড়ে থাকতো ব্যাপারটি সেরকম কিছু নয়। সে রাজনীতিও করে। দেশ গড়ার রাজনীতি, ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। জালিম সরকারের কাছে জনপ্রিয় এই ছেলেটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। একদিন রাতে পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। থানায় ভীষণ অত্যাচার চালাতে থাকে সায়েমের উপর। সায়েম অত্যন্ত দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন। সে চিন্তা করে রেখেছিলো জালিম পুলিশদের কাছে কিছু চাইবেনা। উহ আহ ও করবেনা। দাঁতে দাঁত চেপে একের পর এক নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছিল। ঘন্টা দুয়েক মার খাওয়ার পর সায়েমের মনে হচ্ছে তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাবে। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো পানি... পানি...

তাকে যে পুলিশটি বেশী মারছিলো তার নাম ঝন্টু। সায়েম অবাক হয়ে দেখলো ঝন্টুই পানি নিয়ে আসলো। ঝন্টু ধীরে ধীরে পানি গ্লাসে ঢাললো। তারপর তাকে পানি না দিয়ে সে নিজে একটু একটু করে চুমুক দিয়ে পানি খেতে লাগলো। এতে সায়েমের তৃষ্ণা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চোখ বন্ধ করে সে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। উপুড় করে সায়েমকে ফেলে অল্প কিছু পানি মেঝে ছড়িয়ে বলে চেটে চেটে খা। সায়েম শুধু আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কিছু বলেনা। এরপর সায়েম একটি চেয়ারে বসানো হলো। হাত-পা চেয়ারের হাতল ও পায়ার সাথে বেঁধে দুই কানে চিমটি দিয়ে বৈদ্যুতিক তার সংযোগ করে বলে। তোকে এখন কারেন্ট শক দিয়ে মেরে ফেলবো। যদি বাঁচতে চাস তবে তোর সঙ্গীদের ঠিকানা দে। সায়েম কিছু বলেনা। কেবল চোখ বন্ধ করে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। সুইচ অন করে ঝন্টু। ঝাড়া তিরিশ সেকেন্ড। সায়েম ফুসফুস যেন ফেটে যাওয়ার উপক্রম। পুরো মুখে সব রক্ত জমে গিয়েছে। সায়েম লক্ষ্য করে তার মুখ শুকনো খটখটে হয়ে গিয়েছে। আর টিকতে পারেনা। তৃষ্ণায় ছটফট করতে করতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

হঠাত সায়েম লক্ষ্য করে তার বারান্দার প্রিয় সব ফুলগাছ। তার একান্ত বন্ধু। সবাই দৌড়ে আসছে। আলমান্ডা আর হাসনাহেনা ভীষন জোরে নড়ে নড়ে বাতাস করতে থাকে। শিউলি বেলী আর টগর মিলে কুড়ানো পাতা সব উড়িয়ে সায়েমের মুখের সামনে ধরে আর সেখান থেকে নিঃসৃত হতে থাকে পাতার রস। আহা! কি মধু কি মিষ্টি। সায়েমের সব যন্ত্রনা মুহুর্তেই বিলীন হয়ে যায়। হুট করে আবার জ্ঞান ফেরে সায়েমের। অবাক হয়ে সায়েম লক্ষ্য করে সে ভীষন ঝরঝরে। যন্ত্রনা মোটেও নেই। মুখে এখনো সেই মিষ্টি পানির স্বাদ। কোন তৃষ্ণা নেই। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মহান রবের আর ভালোবাসার আবেগে বুকটা ভরে উঠে গাছগুলোর জন্য।

থানা হাজতে এভাবে নির্যাতন চলতে থাকে দুইদিন। আর সায়েমের সেবা করে যাচ্ছে গাছগুলো। অবশেষে পুলিশ নামের পাষন্ডরা তার থেকে কোন কথা বের করতে না পেরে তার দুই পায়ে গুলি করে। তাদের ইচ্ছে ছিল পঙ্গু করে দিবে সায়েমকে। গুলিবিদ্ধ সায়েমকে হাসপাতালে ভর্তি করায়। ডাক্তাররা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানান, ক্ষতস্থান কয়েকদিন আগের। ইনফেকশন হওয়ার যথেষ্ট আশংকা রয়েছে। যদি ইনফেকশন হয় তাহলে পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কাঁদতে থাকে সায়েমের বাবা মা ভাই বোন। ডাক্তার অনেকগুলো পরীক্ষা দেয়। রাতে সায়েম ঘুমিয়ে পড়লে আবার সেই গাছগুলোর সাথে দেখা হয়। তারা সবাই কাঁদতে থাকে আর সান্তনা দিয়ে সায়েমকে বলে আমরা আমাদের মত চেষ্টা করছি। তোমার কোন ক্ষতি হবেনা।

পরদিন সবগুলো টেস্ট রিপোর্ট দেখে ডাক্তার সিদ্ধান্ত দেন অপারেশন করে বাম পাটা কেটে ফেলতে হবে। ওটায় মারাত্মক ইনফেকশন হয়ে গিয়েছে। সায়েমের বাবা-মা রাজী না হয়ে উপায় থাকেনা। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য একটা পা কেটে ফেলতেই হবে। অপারেশন হবে আরো দুদিন পর। রাতে আবার ঘুমিয়ে পড়লে সায়েম দেখে তার প্রিয় গাছগুলো এসেছে। তারা অনেকগুলো গাছের পাতা একত্র করে লাগিয়ে দিচ্ছে। নানান ধরণের ঔষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে। আর সবাই সমানে কাঁদছে। সান্তনা দিচ্ছে। মিষ্টি রস খাওয়াচ্ছে। যাওয়ার সময় বলে গেল, ডাক্তারকে যেন রিকোয়েস্ট করে টেস্টগুলো আবার করাতে।

ঘুম থেকে উঠে সায়েম লক্ষ্য করে তার পায়ের যন্ত্রণা অনেক কমে গিয়েছে। সে তার বাবার কানে কানে বলে বাবা আমার মনে হয় পা না কাটলেও চলবে। আপনি ডাক্তারকে একটু বুঝিয়ে বলুন যেন টেস্টগুলো আবার একটু করতে বলে। বাবা বলেন, কেন তোর এমন মনে হচ্ছে? সে বিশদ না বলে বললো, এমনিই মনে হচ্ছে তাই বললাম। ডাক্তার আসলে সায়েমের বাবা আবার টেস্ট করানোর কথা বললে অবিশ্বাসের চোখে ক্ষতস্থান দেখতে দেখতে বললেন এক রাতের মধ্যে কি আর পরিবর্তন হবে? তবুও সায়েমের বাবার পীড়াপীড়িতে আবার টেস্ট করালেন। এবার সবগুলো টেস্টেই পজেটিভ রিপোর্ট আসলো। ডাক্তার কিছু না বুজতে পেরে বললেন আগের রিপোর্টটা মনে হয় ভুল ছিল। সায়েমের বাবাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন আপনি না বললে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারতো। সায়েমের বাবা-মা খুশিতে বার বার আল্লাহকে সিজদাহ দিতে লাগলেন। সায়েমও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় আর গাছগুলোর কথা কাউকে বলেনা। কারণ তার এই কথা কেউ বিশ্বাস করবেনা।

প্রতি রাতেই গাছগুলো আসে সেবা করতে। মিষ্টি রস খাওয়াতে। সায়েম ঘুমের মধ্যে তাদের সাথে গল্প করে। সায়েম হাসপাতালে গ্রেফতার অবস্থায় ছিল। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। একদিন পাহারাদার পুলিশগুলোর সাথে আরো অনেক পুলিশ আসলো। তারা সায়েমকে নিয়ে যাবে কারাগারে। সায়েমের বাবা-মা পুলিশগুলোর হাতে পায়ে ধরে বলতে থাকে ছেলেটা এখনো হাঁটতে পারেনা। এই অবস্থায় কারাগারে গেলে সে কিভাবে চিকিৎসা পাবে? কিন্তু কে শোনে কার কথা! জালিমরা হাসপাতাল থেকে সায়েমকে তুলে নিয়ে যায়। সায়েম হাত নেড়ে বিদায় জানায় সবাইকে। আবার কবে দেখা হবে কে জানে! মা সায়েমকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকেন। পুলিশ হ্যাঁচকা টান দিয়ে সায়েমকে গাড়িতে তুলে। ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠে সায়েম।

কারাগারের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও ভালো আছে সায়েম। কারণ সারা রাত যখন সে ঘুমে থাকে তখন তার সাথে আড্ডা দিতে আসে গাছগুলো। সায়েমের যেসব বন্ধু তার সাথে দেখা করতে আসে সে সবাইকে বলে যেন তার গাছগুলোতে পানি দেয়া হয়। এভাবে কিছুদিন যায়। ইতিমধ্যে পুলিশ আবার সায়েমদের হলে যায়। জঙ্গী আস্তানার ভুয়া কথা বলে হল বন্ধ করে দেয়। এই খবর সায়েমের কানে পৌঁছায়। সে তার দুইজন সহকর্মীকে খবর পাঠিয়ে বলে যেন গাছগুলোর খবর নেয়। কিন্তু সবার অবস্থায়ই বেগতিক। কে কার খোঁজ নেয়!

সায়েম এখন সুস্থ। আগের মতই হাঁটতে পারে। কিন্তু দুঃখের কথা গাছগুলো আর আগের মত স্বপ্নে দেখা দেয়না। গত এক সপ্তাহ একবারও আসেনি। সায়েম তার বন্ধু সহকর্মীদের খবর পাঠায়। তাদের মাধ্যমে জানতে পারে তার প্রিয় গাছবন্ধুগুলো আর নেই। পানির অভাবে সব মারা গিয়েছে। ভীষন শক খায়। এ যেন পুলিশের দেয়া বৈদ্যুতিক শকের চাইতেও বেশী। এখন পানিই খেতে পারেনা সায়েম। মনে হয় যেন গলায় কাঁটার মত বিঁধে পানিগুলো। 

দীর্ঘ সাত মাস পর কারাগার হতে মুক্তি পায় সায়েম। বের হয়েই প্রথমে হলে আসে। প্রহরীতো প্রথমে খুলতে চায়না, গাছের প্রতি সায়েমের ভালোবাসার কথা সে জানতো তাই আর বেশীক্ষন বাধা না দিয়ে দরজা খুলে দেয়। জনমানবহীন হলে সায়েম দৌড়ে দৌড়ে তার রুমে আসে। কঙ্কাল হয়ে আছে তার প্রিয় গাছগুলো। মানুষহীন হলের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান হয় সায়েমের আর্তনাদে। শুকিয়ে যাওয়া ফুলগাছগুলো জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে সে। প্রহরীরাও অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে।


সবগুলো গাছ টবসহ তুলে নিয়ে আসে হল থেকে। চলে আসে নিজেদের বাড়িতে। নিজের হাতে পাঁচটি কবর খুঁড়ে সমাহিত করে ফুলগাছগুলো। ছোট ছোট সাইনবোর্ড বানিয়ে কবরগুলোর সামনে লিখে দেয়। হাসনাহেনা, শিউলি, টগর, বেলী, আলমান্ডা। তারপর কিছুদিন পর সে বাড়িও ছাড়তে হয়। কারণ ফ্যাসিস্ট পুলিশ তার পিছু ছাড়েনা। এখন সে শহরে নাম গোপন করে বসবাস করে। এতদিনে সে সফল ব্যবসায়ীও হয়ে গিয়েছে। তবুও সে একমুহুর্ত ভুলে থাকতে পারেনা গাছগুলোকে। সেই গাছগুলো যে গাছগুলো নিজেদের রস নিংড়ে তাকে পানি খাইয়েছে। একদিন পানির অভাবেই তাদের মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তাই এখনো সুযোগ পেলেই সায়েম তার গাড়ি নিয়ে রাতের আঁধারে বের হয়ে পড়ে। যেভাবে একসময় অনেকগুলো রাতে তাকে সময় দিয়েছে গাছগুলো। 



               

রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৫

রুপকথা নয় সত্যকথাঃ ০১


দানশীলতার জন্য তাঁর ছিল বেশ সুনাম। একদিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন একস্থানে উটের দুধ আর অন্যস্থানে বিষ্ঠা। এর মাঝামাঝি স্থানে কে যেন কোদাল দিয়ে খনন করছে। তাতে একটা কূপ দেখা গেল। সেখানে কেবল পানি আর পানি। তিনি ঘুম থেকে উঠলেন কিন্তু স্বপ্নের আগাগোড়া কিছুই বুঝলেন না। একই ভাবে তিনদিন স্বপ্নে দেখলেন।
তারপর তিনি এক গণকের কাছে গেলেন। গণক বললেন তোমার জন্য সম্মান অপেক্ষা করছে। তুমি সম্মানিত হবে। এর কিছুদিন পর তিনি উটের পাল নিয়ে বরাবরের মত মাঠে গেলেন। হঠাৎ একটা তীর কোথা থেকে এসে একটা উটের ওলানে গিয়ে পড়লো। দুধে ভেসে গেলো ঐ স্থান। কে তীর মারলো তিনি আর সেই চিন্তা করতে গেলেন না। তার মনে পড়ে গেলো স্বপ্নের কথা।
তিনি খেয়াল করলেন কিছুদূরে বিষ্ঠা রয়েছে। যা ঐ উট একটু আগে ত্যাগ করেছে। তিনি বুঝলেন স্বপ্নই সত্য। এখানেই পানি পাওয়া যাবে। তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে স্থানটি চিহ্নিত করে তিনি ছুটলেন বাড়ির দিকে। কোদাল নিয়ে এসে খনন করতে লাগলেন। অল্প কিছু খনন করার পরই পাওয়া গেলো কূপটি। তিনি চিৎকার করে জানিয়ে দিলেন সবাইকে। তোমাদের আর চিন্তার কিছু নেই। আমাদের পানি সমস্যা দূর হয়ে গেলো।
এই সম্মানিত ব্যাক্তির নাম আব্দুল মুত্তালিব। আর কূপটি ইসমাইল আঃ এর জমজম কূপ। যা এতদিন পাথর দ্বারা ঢাকা পড়ে ছিল। আব্দুল মুত্তালিব কূপটিকে সুন্দর করে বাঁধিয়ে দিলেন। কূপটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন যাতে সবাই পানি নিতে পারে।
এদিকে কিছু স্বার্থবাদী কুরাইশ নেতা কূপের মালিকানা দাবী করে বসলো। এই নিয়ে অনেক ঝগড়া-বাকবিতন্ডা শুরু হলো। পরে সবাই সিদ্ধান্ত নিলো ইরাকের বনু সা’দ গোত্রের এক মহিলা জ্যোতিষীর কাছে যাবে। তিনি যা সিদ্ধান্ত দিবেন তাই সবাই মেনে নিবেন।
আব্দুল মুত্তালিব সহ মালিকানা দাবীদাররা রওনা হলো। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা মুরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেললো। তাদের কাছে ছয় দিনের খাবার ছিল। দশ দিনে সব খাবার শেষ হলো। এরপর একজন প্রস্তাব করলো আমাদের তো মৃত্যু ছাড়া অন্যকোন গতি নেই। আসো সবাই কবর খুঁড়ে শুয়ে পড়ি। সবাই কবর খুঁড়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো।
আব্দুল মুত্তালিব তাদের বোঝালো, এভাবে শেষ হওয়া যাবেনা। আমাদের যতক্ষন পর্যন্ত শক্তি থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত বাঁচার চেষ্টা করবো। তাছাড়া আমাদের কাছে তো উট রয়েছেই। আমরা তো সেগুলো খেয়েও বাঁচতে পারবো। তারপর তারা নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান করে প্রত্যেকে আলাদাভাবে পানি খুঁজতে লাগলো। এভাবে দুদিন যাওয়ার পর আব্দুল মুত্তালিব একটি পরিত্যাক্ত কূপের সন্ধান পায়।
তাদের প্রত্যেকটি উটই ছিল মৃতপ্রায়। উটগুলো ও তারা পানি পেয়ে আবার কর্মক্ষমতা ফিরে পায়। নতুন করে বাঁচার আশা দেখতে পায়। এই সময় সব কুরাইশ নেতা জমজম কূপের ব্যাপারে নিজেদের দাবী ছেড়ে দেয়। তারা বলে হে আবদুল মুত্তালিব, খোদাই আমাদের বিরুদ্ধে এবং তোমার স্বপক্ষে ফয়সালা দিয়েছেন। খোদার কসম এখন আর জমজম নিয়ে তোমার সাথে ঝগড়া করবোনা। যে খোদা এই মুরুভূমিতে তোমাকে পানি দিয়েছেন, সেই খোদাই তোমাকে জমজম দিয়ছেন।
এরপর তারা এক বানিজ্য কাফেলার সন্ধান পায় ও মক্কায় ফিরে আসে। এই ঘটনার পর আব্দুল মুত্তালিব আল্লাহকে খুশি করার জন্য নিজের এক ছেলেকে কোরবানী করার মানত করেন। তিনি তার দশ ছেলের সবাইকে কথাটা জানালেন। সবাই মেনে নিলো। এরপর তিনি দশ জনের নাম লিখে হোবাল মুর্তির তত্ত্বাবধায়কের কাছে দিলেন। তিনি লটারী করলেন দেখলেন ৪র্থ ছেলে আবদুল্লাহর নাম উঠেছে। 
আবদুল্লাহ ছিলেন আব্দুল মুত্তালিবের ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, সজ্জন, পরোপকারী। মক্কাবাসীরা সবাই তাকে ভালোবাসতো। তারা ওর কোরবানী মেনে নিতে পারে নি। সবাই আবারো লটারী করতে বললো, ২য় এবং ৩য় বারেও আবদুল্লাহর নাম উঠলো। সবাই আবারো বাধা দিল। সবচেয়ে বেশী বাধা দিল সহোদর আবু তালিব।

এরপর আব্দুল মুত্তালিব এক খ্রীস্টান মহিলা সাধকের কাছে গেলেন এবং সব খুলে বললেন। তিনি তাকে বললেন তুমি আবদুল্লাহর নাম ও দশটি উট লিখে লটারী কর। যদি আবদুল্লাহর নাম না উঠে তাহলে দশটি উট উঠে তবে দশটি উট আবদুল্লাহর বদলে কোরবানী করবে। আর যদি আবদুল্লার নাম উঠে তবে দশটি করে উট বাড়াতে থাকবে। যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহ তায়ালা খুশি হন।
দশটি উটে কাজ হলোনা। বিশটি কিংবা পঞ্চাশটিতেও না। যখন আবদুল্লাহর নামের সাথে একশো উট লিখে লটারী করা হলো তখনই কেবল লটারীতে একশ উট উঠলো। মক্কাবাসীরা খুশীতে উল্লাস করতে লাগলো। আবদুল্লাহ নিশ্চিত যবাইয়ের হাত হতে আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে গেলেন।
আব্দুল মুত্তালিব একশো উট জবাই করে সবার উদ্দেশ্যে রেখে দেন। সবাই যার যার ইচ্ছেমত নিয়ে যায়। তারপরও শেষ হয়নি। অন্যান্য মাংশাসী পশুরও ভুরিভোজের ব্যবস্থা হয়েছিল।
সেদিন হতে রক্তঋনের পরিমাণ হিসেবে একশো উট নির্ধারিত হলো। এর আগে ১০ টি উট ছিল। ইসলামেও এটি অব্যাহত আছে। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলতেন আমি দুই যবীহর (যবাইকৃত) সন্তান।
তথ্যসূত্রঃ 
১. ইবনে হিশাম
২. মুখতাছার সীরাতে রাসূল 
৩. আর রাহীকূল মাখতুম 
৪. সীরাতে সরওয়ারে আলম

রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৫

প্রতিশোধ




১.
পুলিশ অফিসার হিসেবে বেশ নাম-ডাক ওসি নিজাম উদ্দিনের। সরকারের নেক নজরে আছেন তিনি। কারণ সরকারের যে কোন নির্দেশ পালনে তিনি বেশ পটু। তার চাইতেও বেশী পটু তিনি শিবির পেটানোতে। তিনি সব সময় নিজেকে বলেন শিবিরের যম। মেজাজ সবসময় খিটখিটে থাকলেও আজ তিনি বেশ খুশি। কারন তার ছোট ছেলে SSC তে A+ পেয়েছে। সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন তিনি।

শামীম আহমেদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র। সরকারি কলেজের ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারী। পালিয়ে কলেজে ঢুকতে ও বের হতে হয়। কারন ওসি নিজাম। যে কোন মূল্যে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। শামীম রাতে নিজের মেসে তো থাকতেই পারে না, আত্মীয় স্বজন কারো বাড়িতেই থাকতে পারে না। আজ এই কর্মীর বাসায় তো কাল ঐ কর্মীর বাসায়।

কলেজের দুজন সাধারণ কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উদ্দেশ্য শামীমের অবস্থান জানা। প্রচন্ড নির্যাতন করে। প্রথমে লাঠিপেটা, তারপর বাঁশডলা। বাঁশডলা মানে হচ্ছে হাত দুটো উপরে তুলে হাতকড়া পরিয়ে চিৎ করে শোয়ানো হয়। তারপর ঘাড়ের নিচে হাতের উপরে একটা লাঠি রেখে চারজন পুলিশ এর উপর দাঁড়ায়। এতে কর্মী দুজনের হাতের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। প্রচন্ড নির্যাতনে তারা বারবার রক্তবমি করছে ও বেহুঁশ হয়ে পড়ছে।

এভাবে নিজাম আরো দশ বারোজন শিবির কর্মীকে আটক করে। হতাশ নিজাম উদ্দিন। সে কারো মুখ থেকে কোন তথ্য বের করতে পারলো না। ক্রোধান্বিত হয়ে সর্বশেষ সে আটককৃত দুজন কে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়।

২.
অঝোরে কাঁদতে থাকে শামীম। অপরাধ বোধ তাকে গ্রাস করে। তার জন্য তার একের পর এক সহকর্মীদের নির্যাতন সইতে হচ্ছে। পঙ্গু হয়ে যাওয়া দুই ভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে যায় সে মায়েদের সান্তনা দিতে। কিসের সান্তনা দিবে সে নিজেই কেঁদে কূল পাচ্ছে না। উল্টো তারাই শামীমকে সান্তনা দিচ্ছে। শামীম তার উর্ধ্বতনকে বারবার বলে থানায় সে আত্মসমর্পন করবে। কিন্তু উর্ধ্বতনের কড়া নির্দেশ, এমনটি করা যাবে না।

হতাশ নিজাম নতুন চাল চালে। সোজা সে শামীমের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার বিধবা মাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে। এবার শামীমকে থানায় যেতে বলে তার দায়িত্বশীলেরা। ওসি নিজামের মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠে। তুই আমারে অনেক কষ্ট দিয়েছিস। এর মূল্য তোরে দিতে হবে। এত সহজে তোর মাকে ছাড়ছি না। পঞ্চাশ হাজার লাগবে। টাকা নিয়ে আয়, তোরে রেখে তোর মাকে ছেড়ে দেব। সন্ধ্যার মধ্যে আসবি। কোন চালাকি করবি না। বলে পকেট থেকে একটা পুটলিমত কিছু একটা বের করে বলে এই দেখ হেরোইন। তোর মাকে মাদক মামলা দিয়ে দেব। বুঝিস।

পৃথিবীতে শামীমের আছে ঐ কেবল মা। কোন ভাই বোন নেই। পিতা গত হয়েছেন শামীমের ছোটবেলায়। বাবার কোন স্মৃতিই তার মনে নেই। এই মা আজ বন্দি। কিছুই মাথায় আসছে না তার। খুব দ্রুত টাকা যোগাড় করে থানায় আসে। থানার বাইরে তার সহকর্মীরা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রানপ্রিয় শামীম ভাই হয়তো আর কোনদিন তাদের সাথে মিলিত হতে পারবে না। অজানা ভবিষ্যত কারোই জানা নেই। কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

শামীমের মা বের হলেই অন্যান্য সহকর্মীরা তার মাকে নিয়ে পালিয়ে যায়। শামীম বলে গিয়েছে মা কে যেনো লুকিয়ে রাখা হয়। কারণ পাষন্ড নিজাম হয়তো তার থেকে কথা বলার অস্ত্র হিসেবে আবার মাকে ধরে নিয়ে আসতে পারে।

নির্যাতনের আর কোন পন্থা বাদ রাখেনি নিজাম। এক এক করে প্লাইয়ার্স দিয়ে সব নখ তুলে ফেলা, বাঁশডলা, পিঠে সিগারেটের আগুন, হাতুড়ি দিয়ে বাম হাত থেঁতলে দেয়া। দু কানে টানা কারেন্ট শক দেয়া চোখে লবণ মরিচ ইত্যাদি সব করে নিজামরা হাঁপিয়ে উঠেছে। তবুও বের করতে পারে নি অন্যান্য দায়িত্বশীলদের নাম বা ঠিকানা। বার বার হুমকি দিচ্ছে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলবে।

শামীমের মুখ থেকে আল্লাহ ছাড়া আর কোন শব্দই বের হয় নি। উহ কিংবা আহও না। টানা পাঁচদিনের এই নির্যাতনে কেঁদেছে অনেক পুলিশ সদস্যও। অনেকে নিজামকে বলেছে, স্যার ছেড়ে দেন, মনে হয় কিছু জানে না। জানলে সব বলে দিত। আপনি যেভাবে পিটিয়েছেন সেভাবে কোন জানোয়ারকে পিটালে সেও এতক্ষনে কথা বলা শুরু করে দিত।

হাল ছাড়লেন না নিজাম। বললেন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট দিতে হবে। না বলে কই যাবে। অসুস্থ শামীমকে চেয়ারে বসিয়ে চেয়ারের সাথে বাঁধা হলো। চেয়ার উল্টে ফেলে দেয়া হল। নাক মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে দেয়া হল। তারপর তার মুখের উপর পানি ঢালা হল। যতক্ষন পানি দেয়া হয় ততক্ষন শামীমের মনে হয় সে পানিতে ডুবে যাচ্ছে। ফুসফুস ফুলে ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। বেদনায় নীল হয়ে যাচ্ছে তার মুখ। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু সে বলতে থাকলো হাসবুন আল্লাহ ওয়া নে’মাল ওয়াকীল, নে’মাল মাওলা, ওয়া নে’মান নাসির।

ব্যর্থ হয়েছেন নিজাম সাহেব। শামীমের মুখ থেকে কোন কথা বের করতে পারেন নি। তাকে কয়েকটি বিস্ফোরক মামলা দিয়ে কোর্টে চালান করে দিচ্ছেন। এই সময় শামীম ইশারায় নিজামকে ডাকলো। কাছে আসলে বললো, জানিনা বাঁচবো কিনা। যদি বেঁচে থাকি আমি এর প্রতিশোধ নেব ইনশাল্লাহ। ক্রোধে আগুন হয়ে শামীমের বাম গালে কঠিন একটি চড় দিলেন।

৩.
নিজাম সাহেবের বড় দুই ছেলেই নেশাগ্রস্থ। পড়াশোনা ঠিকভাবে কোন সময়ই করে নি। অথচ তার ছোট ছেলে A+ পেয়ে বসলো। তাই তিনি অনেক খুশি। তার মনে খটকাও লাগে। কারন এই ছেলে হটাৎ পরীক্ষার ৬ মাস আগ থেকে ভালো হয়েছে। পড়াশোনা শুরু করেছে। তার আগে সে বইয়ের কাছেও ঘেঁষতো না। যাই হোক, স্বপ্ন দেখতে লাগলেন তিনি এই ছেলেকে ডাক্তার বানাবেন।

ছোট ছেলের কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ে। বাবা তুমি না বলেছিলে যিনি আমার ভালো রেজাল্টের জন্য সবচেয়ে বেশী কষ্ট করেছেন তাকে নিয়ে আসতে। তিনি এসেছেন। নিজাম সাহেব ব্যস্ত হয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ চল।

থমকে গেলেন নিজাম সাহেব। আরে! এ যে শামীম।
--শামীম তুমি?
-- জ্বি নিজাম সাহেব আমি। কথা দিয়েছিলাম প্রতিশোধ নেব। নিলাম। আপনার তিন ছেলেকে মানুষ করে দিলাম। তারা আর আপনার মত অমানুষ না।
অন্য দুই ছেলে একসাথে আসলো বললো, বাবা আমাদের ক্ষমা কর। আমরা এতদিন নানা অন্যায় করেছি। তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। আমরা ভুলের মধ্যে ছিলাম। শামীম ভাই আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন।

কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো হতবিহ্বল নিজাম সাহেবের চোখ থেকে।

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

ধান্ধা

১.
-- দোস্ত দেশের যা অবস্থা ধান্ধা- মান্ধা তো সব বন্ধ।
-- শালার খালেদা যা শুরু করছে। সরকার পইড়া গেলে তো পলান লাগবো।
-- হ দোস্ত যে ক’দিন আছি আরো কিছু কামানো লাগবো
-- বিদেশ যাইবার পয়সা তো অন্তত তুলতে হইবো
-- আমার মাথায় একখান জোশ বুদ্ধি আইছে।
-- কি বুদ্ধি দোস্ত?
-- শিবির ধরায়া দিমু। লাখ টাকা পামু।
-- আরে শিবির কই থাকে এডা তার বাপেরাই জানে না, তুই ক্যামনে বাহির করবি।
-- আরে বেটা ! তোর মাথায় একটু ঘিলু কম আছে। জীবনে কোন সলিড কাম করছি বলে তো আমার জানা নাই। এটা সলিড হওনের কি দরকার?
-- বুঝলাম না।
-- আরে রাস্তা থেকে সুন্দর, দাঁড়িওয়ালা হইলে আরো ভালা। এরকম কিছু পোলারে ধইরা সুমনের কক্টেল ধরায়া দিমু। ব্যাস! ভাই পুলিশ ডাইকা দিবে।
-- ওরে জোশ মাম্মা! এমন বুদ্ধি লই ঘুমাস ক্যামনে?
-- চল! ভাইর কাছে চল।
(কথোপকোথন গুলো দুই ছাত্রলীগ কর্মীর)
২.
তিন দিন ধরে কোচিং এ যায় নি মাসুদ। মা তাকে বের হতে দেয় না। রাস্তা-ঘাটে কখন কি ঘটে। দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ। মাসুদ তার বন্ধুদের ফোন করে পড়ার খোঁজখবর করে। পরদিন সে তার মাকে বলে, সবাই পড়ছে। আমি এভাবে কোচিং এ না গেলে পিছিয়ে পড়বো। আর তাছাড়া গাড়ি তো সব চলছে। যা দূর্ঘটনা ঘটছে সব ঢাকার বাইরে। অবশেষে তার মা তাকে যেতে দেয়।
কোচিং থেকে বের হলেই মসজিদ। মাসুদ বের হয়েই আসরের আযান শুনলো। চিন্তা করলো, নামাযটা পড়ে যাই। যেই মসজিদ থেকে বের হলো অমনি দুইজন লোক তাকে ডেকে রাস্তার পাশে নিয়ে গেলো। হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস এসে তাকে তুলে নিয়ে গেলো।
মাসুদের মা অপেক্ষা করছেন কখন তার ছেলে ফিরবে। সন্ধ্যা হয়ে গেলো অথচ সে ফিরলো না। মোবাইলটাও বন্ধ। একটি কল আসলো মাসুদের মায়ের নাম্বারে। থানা থেকে বলা হল আপনার ছেলে ককটেল সহ ধরা পড়েছে।
পরদিন মাসুদের বাবা পত্রিকা হাতে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। মাসুদের হাতবাঁধা ছবি আর ককটেল গুলোর দিকে তাকিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছেন। বুঝতে পারছেন না কি থেকে কি হয়ে গেলো। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মাসুদের মা।
৩.
ছাত্রলীগ থানা সেক্রেটারী মন্টুর আস্তানায় চলছে মদের ফোয়ারা উৎসবের আমেজ। মধ্যমণি রিংকু। কারণ তার এই অসাধারণ বুদ্ধিতে নতুন ধান্ধার খোঁজ পাওয়া গেছে। আজকের ইনকামের অর্ধেকই রিংকুকে দিয়ে হল। রিংকু কৃতজ্ঞতায় মন্টুর পা ধরে সালাম করলো। উৎসব নাচগানের পাশাপাশি চলছে ভবিষ্যত পরিকল্পনা।
সুমনকে বললো দুই’শ ককটেল বানাতে। সেতুকে বললো পঞ্চাশটা পেট্রোল বোমা বানাতে। রিংকু বললো, ওস্তাদ এতগুলান দিয়ে কাম কি? একটা দুইটা হলেও তো হয়। মন্টু বললো,
প্রথমে আমরা কোন এক এলাকায় প্রচুর ককটেল ফাটাবো। দুইটা বাস পোড়া দিব। তারপর পুলিশ ঐ এলাকার শিবির ধরার জন্য উইঠা পইড়া লাইগবো। তখনই আমরা গোবেচারা কাউকে আবার ধইরা পুলিশেরে দিমু। ব্যাস এলাকা ঠান্ডা হইয়া যাইবো। এই এলাকায় আমরা আর ককটেল ফাটামু না। মিডিয়া মনে কইরবো ঐ বেচারা পোলাই মূল হোতা। হেই এরেস্ট তো এলাকা ঠান্ডা।
আর প্রতিটা কাজে চেষ্টা করতে হবে, দুই একটা মানুষ যাতে মারা পড়ে। মানুষ না মরলে কাম হইবো না। মানুষ না মরলে মিডিয়া কাভারেজ পাওন যাইবো না।
শিবির-বিএনপিরাও তো ফুটায়। সেগুলাতে মানুষ মরে না। মিডিয়ায়ও আসে না।
সুমন বলে উঠলো, ভাই পুলিশ তো ঝামেলা কইরতে পারে। মন্টু অট্টহাসি দিয়ে বললো, আরে ব্যাটা পুলিশ ঝামেলা করলে আমি আছি ক্যান? পুলিশ আমার পকেটে থাকে। চিন্তা করিস না।
৪.
থানা সভাপতি মারুফের মুখ অন্ধকার। ঝাড়ছে তার সাঙ্গপাঙ্গদের। মন্টু সমানে ধান্ধা কইরা যাইতেছে। কি করস তোরা? কোন কামের না তোরা ...... পুতেরা!!
কবির হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে।
-- কি হইছেরে কবির? যে কামে পাঠাইছি, হইছে?
-- ওস্তাদ এক্কেরে পাকা খবর নিয়া আসছি।
কবির মন্টুদের সব পরিকল্পনা জানায় মারুফকে।
মারুফের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। পাইছি। ধান্ধা পাইছি। এবার শুধু ধান্ধা না। মন্টুরে ভ্যানিশ করার উপায় পাইছি। কবির তুই যা। কাল মন্টুরা কই কই ককটেল ফাটাইবো একটু খোঁজখবর কর।
৫.
পরদিন কিছু পত্রিকার নিউজ। ককটেল ফাটানো ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের সময় ছাত্রলীগ সেক্রেটারী মন্টুসহ ৫ জন হাতেনাতে ধৃত। মারুফ সব পত্রিকাকে ম্যানেজ করতে পারে নি। সরকারের এসব নিউজ চাপানোর ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে।

বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৫

শপথ (শহীদ নুরুল ইসলাম শাহিন ভাইয়ের স্মরনে)



১.


কবির ক্লাসের মধ্যম মানের ছাত্র। কয়েকদিন ক্লাসে আসছে না সে। এই বিষয়টা নজর এড়ায়নি অধ্যাপক নুরুল ইসলাম সাহেবের। অধ্যাপক সাহেবের ছেলেপুলে নেই। ইসলামীয়া কলেজের সব ছাত্রকেই উনি সন্তানের মত করে দেখেন। বাজারে মুরগী কিনতে গিয়েই দেখা কবিরের সাথে। হাতে দুটো মুরগী। বিক্রী করার জন্যই এনেছে বোধহয়। কিন্তু স্যারকে দেখে সহসা এমন ভাব করলো যেন সে মুরগী দুটো কিনেছে। অধ্যাপক সাহেব সব বুঝেও না বুঝার ভান করলেন।


তাকে ডেকে বললেন, তুমি কয়দিন কলেজে যাচ্ছ না। ঘটনা কি? কবির আমতা আমতা করে বললো স্যার,ফরম ফিলাপের টাকা যোগাড় হয় নি। পরীক্ষা আগামী বার দেব। অধ্যাপক সাহেব বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। মুরগী দুটোতো বেশ সুন্দর। শোন আমার জরুরী কাজ আছে এই বলে তাকে এক হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে বললো, তুমি আবার দুটো কিনে নিও। তোমারগুলো আমাকে দিয়ে দাও। এই বলে তিনি তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করলেন। বললেন কাল ক্লাসে এসে বাকী টাকা দিয়ে যাবে।


বাসায় থাকতে পারেন না অধ্যাপক সাহেব। তিনি জামায়াত করেন। তাই পুলিশ সর্বদা তাড়িয়ে বেড়ায়। একবার গ্রেপ্তারও করেছিলো। মাস চারেকের মত ছিলেন কারাগারে। আজ তিনি বাসায় যাচ্ছেন, তাই অনেক বাজার করলেন। বাসায় গিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকলেন। তাঁর স্ত্রী তাঁকে প্রায় ঠেলে ঘর থেকে বের করে দেন কারণ যে কোন সময় পুলিশ চলে আসবে। স্ত্রীকে সালাম জানিয়ে অধ্যাপক সাহেব একটি বাজারের একটি ভাঙ্গা দোকানের দিকে যাচ্ছেন। সেখানেই তিনি পালিয়ে থাকেন।


২.

কবিরের আর্থিক দৈন্যতার কথা তিনি আগে থেকেই জানতেন। তাকে কয়েকবার সহযোগিতা করতে চেয়েছেন। কিন্তু কবিরের প্রবল আত্মসম্মান বোধ থাকায় তিনি পারেন নি। তাই কবিরকে বাকী টাকা ফেরত দিতে বলে ক্লাসে ডেকে নিয়ে আসছেন। যথারীতি কবির ক্লাসে আসলো, কবিরকে বুঝিয়ে তিনি পরীক্ষা দিতে রাজী করালেন। টাকার ব্যবস্থা করলেন তিনি। আর খুব শক্ত করে বলে বিষয়টি যাতে কেউ না জানে।


প্রায় মাসখানেক অধ্যাপক সাহেব বাসায় যেতে পারেন নি, পুলিশের সমস্যা তো আছেই তাছাড়া এই মাসে ওনার কাজের চাপও ছিল বেশী। আগে কখনোই তিনি বাইরে খেতেন না। দুপুরের খাবারও বাসা থেকে নিয়ে যেতেন। অথচ সেই নুরুল ইসলাম সাহেব গত এক মাস বাসায় আসেন নি। মিসেস নুরুল ইসলাম এই নিয়ে খুব চিন্তায় থাকেন। ইচ্ছে করে অধ্যাপক সাহেবের খাবার রান্না করে পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু নিরাপত্তা জনিত কারণে পারা যায় না।


মিসেস নুরুল ইসলাম খুব চাপাচাপি করে একদিন বিকেলে ডেকে নিয়ে আসলেন তাকে। বললেন কি খাও না খাও। একটা দিন ভালো-মন্দ খাও। জমানো অনেক কথা বলতে বলতে রাত হয়ে গিয়েছে অনেক বেশী। তাই অধ্যাপক সাহেব আজ বাসায় থেকে গেলেন। মধ্যরাতে দরজায় লাথির শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো।


৩.

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত হয়। কথাটাই ঠিক। যেদিন তিনি বাসায় সে দিনই পুলিশ আসলো। হাতে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে গেলো। তখন রাত দুটো। মিসেস নুরুল ইসলাম পুলিশের গাড়ির সাথে সাথে চললেন CNG তে চড়ে। থানায় ওসির আর শুধু পা ধরা বাকী। অনুনয় করতে থাকলেন ছেড়ে দেয়ার জন্য। অবশেষে পুলিশ বলে আপনার কাছে কত আছে? হাতে খুব বেশী টাকা ছিল না তাই সব স্বর্ণালংকার নিয়ে আসলেন। অন্তত সাত ভরি তো হবেই।


ওসি সাহেব বললেন ঠিক আছে আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা আছে ওনার কাছে। জিজ্ঞাসা শেষ হলে ওনাকে ছেড়ে দেব। কাল সকাল সাতটায় দুই লাখ টাকা ক্যাশ নিয়ে আসবেন। স্বর্ণ গুলো রেখে যান। খুব খুশী হলেন মিসেস। এবার অন্তত কারাগারে যেতে হচ্ছে না।


ওসির রুম থেকে বের হয়ে কাস্টোডিতে অধায়পক সাহেব কে দেখতে এসে দেখলেন তিনি নোংরা মেঝেতে একটি পানির বোতলের উপর মাথা রেখে দিব্যি ঘুমাচ্ছেন। গায়ে অজস্র মশা মনের সুখে কামড়াচ্ছে। তিনি ডাক দিয়ে উঠালেন।

- আচ্ছা তোমার কখনোই কোন দুঃচিন্তা হয় না? এমন পরিবেশে কেউ ঘুমাতে পারে?

- (হেসে বললেন) শোন আমি আমার ভাগ্য রবের কাছে ছেড়ে দিয়েছি। তিনি থাকতে আমার চিন্তা কিসের?


এরপর মিসেস নুরুল ইসলাম ওসির সাথে হওয়া সব কথা বললেন তাকে। তিনি তার স্ত্রীকে বললেন কে বলেছে তোমাকে এসব করতে। পুলিশকে বিশ্বাস কুরতে নেই। তুমি সব অলংকার নিয়ে বাসায় যাও। আর তাছাড়া আমি একটু আগে খুব ভালো স্বপ্ন দেখেছি।


৪.

বাকী রাতের মধ্যেই মিসেস নুরুল ইসলাম প্রতিবেশীদের আত্মীয়দের মাধ্যমে টাকা যোগাড় করে ফেললেন। তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে অনেক কাঁদলেন আল্লাহর কাছে। সকালে নিজে নাস্তা তৈরী করলেন। যাতে থানা থেকে এসেই অধ্যাপক সাহেব কে নাস্তা দেয়া যায়। তারপর বের হওয়ার আগে TV টা একটু অন করলেন। স্ক্রলে বড় বড় করে লিখা “জামায়াত নেতা অধ্যাপক নুরুল ইসলাম পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত”


মিসেস ইসলাম দৌড়ে গেলেন থানায়, সেখানে মরদেহ নেই। চলে গেছে হাসপাতালে। মর্গের সামনে কিছুক্ষন একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর গগনবিদারী চিৎকার করে লাশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বললেন, আমি! আমি খুন করেছি তোমাকে। আমাকে তুমি ক্ষমা কর নি। সারা জীবনের শাস্তি তুমি দিয়ে গেলে। আমি তোমাকে বাসায় ডেকে এনেছি। বেঁহুশ হয়ে পড়লেন মিসেস।


জানাজা শেষে কবির ছুটে আসলো কফিনের কাছে। ঈমাম সাহেবের কাছ থেকে মাইক নিয়ে বললো, আমরা সবাই স্যার কে চিনি। তিনি যদি সন্ত্রাসী হন তবে পুরো দেশ সাক্ষী থাকো আমি কফিন ছুঁয়ে শপথ নিলাম আমিও স্যারের মত সন্ত্রাসী হলাম।


একে একে হাজার হাজার জনতা সবাই অশ্রুসিক্ত নয়নে শপথ নিল আমরাও স্যারের মত সন্ত্রাসী হয়ে গেলাম। হে পুলিশ, আমাদের গুলি কর। আমরা সবাই মরার জন্য প্রস্তুত।