This is default featured slide 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২০ জুলাই, ২০১৬

পাকিস্তান আমল এবং জামায়াত


দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের জন্ম হয়। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ মওদুদী রঃ এই বিষয়টার বিরোধীতা করেন। অনেকে মনে করেন তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেন। মূলত বিষয়টা তা নয়। জিন্নাহসহ মুসলিম লীগ প্রচার করে তারা মদীনা রাষ্ট্রের মত করে ইসলামিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করবেন। মদীনাতে যেভাবে মক্কা থেকে সবাই এসে রাষ্ট্র কায়েম করেছে ঠিক তেমনি সারা ভারতবর্ষ থেকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে একত্র হয়ে রাষ্ট্র কায়েম হবে। এখানে কুরআন হবে সংবিধান। বেসিক্যলি মওদুদী সাহেব এখানে বিরোধীতা করেন তিনি বলেন জাতীয়তাবাদী চেতনা দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। [১,২]
জিন্নাহ সাহেবেরা মুসলিম জাতীয়তাবাদ দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। এভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয় না। মূলত কিভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হয় তা নিয়ে তিনি একটি লেকচার দেন যা বই আকারে প্রকাশিত হয় “ইসলামী হুকুমাত কিস্তারা কায়েম হতি হায়” যা আমরা পড়ি ইসলামী বিপ্লবের পথ।

১৯৪৭ সালে ইংরেজরাও চেয়েছিলো ভারত ভেঙ্গে যাক। তাহলে তাদের ডিভাইড এন্ড রুল খেলতে ভালো হবে। ১৯০ বছরের দুঃশাসন ও শোষন ভুলাতে এটা ছাড়া তাদের বিকল্প ছিল না। তাই তারা মুসলিমদের দাবীকে গুরুত্ব দিয়ে ভারতকে দু’ভাগ করে এবং এতে পাকিস্তানের উদ্ভব হয়। আর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লেগে যায়। দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। কিছুদিন আগেই যাদের শত্রু ছিল ইংল্যান্ড এখন তাদের শত্রু পরিবর্তন হয়ে যায়। ভারতের শত্রু হয় পাকিস্তান আর পাকিস্তানের ভারত। আর ইংল্যান্ড উভয়ের মোড়ল বা অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়।

যাই হোক পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে। ভারত আয়তনে বড় হলেও পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান দ্বারা ভারতের মূল ভূখন্ড ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যায়। যুদ্ধাবস্থায় এই বিষয়টি পাকিস্তানের অনুকূলে আসে। এক বছরের অধিক সময় ধরে যুদ্ধ চলে। উভয় দেশের অনেক ক্ষতি সাধিত হয়। সাময়িক সমজোতার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান হয়। তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার পরিকল্পনা করে ভারত। তাহলে ভারতকে আর পাকিস্তান দ্বারা বেষ্টিত থাকতে হয় না।

পাকিস্তানের প্রথম গভর্ণর জেনারেল ছিলেন জিন্নাহ। তার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লিয়াকত আলী খান। ১৯৪৮ সাল থেকেই জামায়াত ইসলামী সরকার এবং ইসলামী সংবিধানের জন্য আন্দোলন করতে থাকে। জামায়াত ইসলামী সংবিধানের রূপরেখা তৈরী করে এবং এই রূপরেখা গ্রহনের আহ্বান জানায়। ১৯৪৮ সালে সাইয়্যেদ মওদুদী রঃ সহ অনেকে গ্রেপ্তার হন। এতে আন্দোলন দমে যায়নি। বরং দ্বিগুন তেজে জ্বলে উঠে।এর মধ্যে জিন্নাহ ইন্তেকাল করেন। লিয়াকত আলী খান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। তিনি ১৯৪৯ সালে জামায়াতের “ইসলামী সংবিধানের রূপরেখা” গ্রহন করেন। সে বছর পাকিস্তানে জেনারেল আকবর খানের নেতৃত্বে ১ম সেনাবাহিনীতে ক্যু হয়। সেনাপ্রধান আইয়ুব খানের কারণে সে ক্যু ব্যার্থ হয়। ১৯৫০ সালে সাইয়্যেদ মওদুদী রঃ মুক্তি পান। ১৯৫১ সালে লিয়াকত সাহেব আততায়ীর গুলিতে ইন্তেকাল করেন। [২]

ভাষা আন্দোলনঃ 
ভাষা আন্দোলনকে আমার মনে হয়েছে বাঙ্গালী জাতির সংকীর্ণতা। তাই আদতেই আমি এর বিপক্ষে। কোন ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা না হলে সেই ভাষা ধ্বংস হয়ে যায় না। এটি তৎকালীন পাকিস্তানের সংহতির বিরোধী। পাকিস্তানী নেতারা (ইনক্লুডেড বাঙ্গালী) এমন একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করেছে যা মাত্র ৩-৪ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ছিল। এটি সহজ এবং বোধগম্য ছিল। কোন নেতারই এটা মাতৃভাষা ছিল না। তাছাড়া উর্দু মুসলিমদের ভাষার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল মুসলিম লীগ গঠনের পর থেকেই।

হিন্দি নামটি ফার্সি থেকে এসেছে। পারস্যের অধিবাসীরা ভারতীয় লোক ও তাদের ভাষাকে হিন্দি নামে ডাকত। ইতিহাসবিদেরা তাই মনে করেন। ৮ম-১০ম শতকের দিকে ভারতে মুসলিম আক্রমণের সময় উত্তর ভারতের খারি বোলি কথ্য ভাষা থেকে হিন্দির উৎপত্তি ঘটে। খাড়ি বোলি ছিল দিল্লি এলাকার ভাষা, এবং বহিরাগত মুসলিম শাসকেরা সাধারণ জনগণের সাথে যোগাযোগের জন্য এই ভাষাই ব্যবহার করতেন। এই খাড়ি বোলি ভাষার একটি রূপ ধীরে ধীরে ফার্সি ও আরবি ভাষা থেকে প্রচুর শব্দ ধার করলে উর্দু নামের এক সাহিত্যিক ভাষার উদ্ভব ঘটে। উর্দু শব্দটি তুর্কি "ওর্দু" শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ "শিবির" বা "ক্যাম্প"। অন্যদিকে সাধারণ জনগণের মুখের ভাষায় আরবি-ফার্সির তেমন প্রভাব পড়েনি, বরং তারা সংস্কৃত ভাষা থেকে শব্দ ও সাহিত্যিক রীতি ধার করতে শুরু করে এবং এভাবে হিন্দি ভাষার জন্ম হয়। সেই হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশের মুসলিমরা উর্দু আর অন্যরা হিন্দি ভাষায় কথা বলতো। পাকিস্তানের সেসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মাতৃভাষাগুলো ছিল বাংলা, পাঞ্জাবী, বেলুচ, সিন্ধি, পশতু ইত্যাদি। এর মধ্যে উর্দুই ছিল বোধগম্যতার দিক দিয়ে কমন যা হিন্দীর অনুরূপ। তাই এই ভাষাই মুসলিমদের ভাষা হয়ে উঠে।[৩]

হিন্দি ভাষা দেবনাগরী লিপিতে লেখা হয় এবং এর শব্দভাণ্ডারের বেশির ভাগই সংস্কৃত থেকে এসেছে। অন্যদিকে উর্দু ভাষা ফার্সি লিপিতে লেখা এবং এর শব্দভাণ্ডার ফার্সি ও আরবি থেকে বহু ঋণ নিয়েছে। এছাড়া ভাষা দুইটির ধ্বনি ব্যবস্থা ও ব্যাকরণেও সামান্য পার্থক্য আছে। ১২শ শতক থেকে উর্দু ও হিন্দি উভয় ভাষাই সাহিত্যের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৮শ শতকে ইংরেজির প্রভাবে উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। [৩,৪]

মুসলিম লীগের তথা পাকিস্তানের তৎকালীন নেতারা তাদের প্রদেশগুলোর মধ্যে কমন ভাষা চালু করার জন্যই উর্দুকে সিলেক্ট করেছে। আর বিষয়টা এমন ছিল না যে উর্দু অপ্রত্যাশিতভাবেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হয়েছে। প্রত্যেক জাতি তাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা থেকে বঞ্চিত করেছে সংহতি রক্ষার জন্য। শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সভ্যতার সীমা ছাড়িয়েছে আমাদের কিছু বাঙ্গালী। বাংলার সব মানুষ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিল এটাও সঠিক নয়। ঢাকায় সেসময় প্রচুর ছাত্র উর্দুর পক্ষেও ভূমিকা রেখেছিলো। বাংলার কোন রাজনৈতিক নেতা বায়ান্নোর আগ পর্যন্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন না। ঢাকা ভার্সিটি ও জগন্নাথ কলেজের (তখন কলেজ ছিল) কিছু ছাত্র ছাড়া এই আন্দোলন কেউ করেনি।

আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ২১ ফেব্রুয়ারীর ঘটনায় আমরা অবাঙ্গালী পাকিস্তানীদের দোষারোপ করি। অথচ আমাদের মনে থাকে না আমরাই পাকিস্তানের শাসক ছিলাম। তৎকালীন পাকিস্তানে আমরা ৫৬ শতাংশ ছিলাম। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা আলোচনায় আসলেই আমরা ঐ সময়ের পশ্চিম পাকিস্তানীদের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে বিষোধগার করি এবং বলে থাকি ৫৬ শতাংশ মানুষের উপর উর্দু চাপিয়ে দিচ্ছে তারা। অথচ সেই তারা হলেন বাঙ্গালীরাই। ১৯৫২ তে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বাঙ্গালী খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি ঢাকার নবাব ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের যারা আন্দোলনকারী, যারা আন্দোলন দমনকারী, যারা জেলে গিয়েছে, যারা জেলে নিয়েছে, যারা গুলি করেছে, যারা গুলির নির্দেশ দিয়েছে, যারা গুলিতে মৃত্যুবরণ করেছে সবাই বাঙ্গালী। বামপন্থি কিছু নেতা ছাড়া এদেশের কোন বাঙ্গালী রাজনৈতিক নেতা এবং তাদের অনুসারীরা বাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ছিলেন না। বামদের গ্রহনযোগ্যতা তৎকালীন ৫২’র পাকিস্তানে ছিল না। 
সেসময়ের বাঙ্গালী শীর্ষ নেতা ছিলেন 
১- হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী 
২- নবাব খাজা নাজিমুদ্দিন 
৩- এ কে ফজলুল হক 
৪- মোহাম্মদ আলী বগুড়া 
৫- নুরুল আমীন 
৬- মাওলানা আতাহার আলী 
৭- হাজী মুহাম্মদ দানেশ

ওনারা কেউই রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ছিলেন না পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করার নিমিত্তে। ভাষা আন্দোলন প্রথমে কিছু সাধারণ ছাত্র এবং খেলাফতে রব্বানীর সাংস্কৃতিক উইং তমুদ্দিন মজলিশের মাধ্যমে শুরু হলেও পরে এটির লক্ষ্য অন্যদিকে পরিবর্তিত হয়। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে জিন্নাহর বৈঠকে জিন্নাহ তাদের বুঝাতে সক্ষম হন কেন উর্দু জরুরী। আন্দোলন থামিয়ে দিতে চায় তমুদ্দুন মজলিশ। কিন্তু কমরেড তোয়াহা তমুদ্দুন নেতা শামসুল হক থেকে বাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের দায়িত্ব ছিনিয়ে নিয়ে বামদের আন্দোলনে পরিণত করে। 
এখন স্বাভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে জনবিচ্ছিন্ন এই আন্দোলন কেন সফল হলো?

১- পাকিস্তান রাষ্ট্রে সেসময়ে তখনো কোন স্বৈরশাসক আসেনি। সাধারণ কোন বিষয়ে গুলি চালানোর মানুষের কল্পনার বাইরে ছিল। সাধারণ মানুষ গুলি চালানো মেনে নিতে পারেনি। আন্দোলন কারীদের প্রতি সবাই সিম্পেথাইজড হয়। দাবিটাও জোরালো হয়। আর এতেই পরিস্থিতি অন্যদিকে ঘুরে যায়। যদিও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে সেদিন সিদ্ধান্ত হয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে না। কিছু সিদ্ধান্ত অমান্যকারী মিছিল শুরু করলেই পুলিশ গুলি করে।

২- ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ঐ ঘটনার দায় মুসলিম লীগের উপর চাপিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে এবং ভাষা আন্দোলন তাদের অর্জন এটা প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করেন।

আমি শুরুতে বলেছিলাম ভারত চেয়েছিল পূর্ব-পাকিস্তান কে পশ্চিম-পাকিস্তান থেকে আলাদা করার জন্য। এই ভাষা আন্দোলনের পেছনে ভারতের যথেষ্ট অবদান আছে। ভাষা আন্দোলনের এই বিষয়টি সর্বপ্রথম জনসম্মুখে আনেন তৎকালে ভারতীয় চর হিসেবে পরিচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু গণপরিষদের অন্য কোন সদস্য তার এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেননি। বহুজাতি নিয়ে গঠিত পাকিস্তানে এই বক্তব্য সাম্প্রদায়িক বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তার প্রস্তাব নাকচ হয়।
বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় নিয়ে আসে তথাকথিত প্রগতিবাদী ইসলামী সংগঠন, সমাজতান্ত্রিক ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষ ইসলামের প্রবক্তা খেলাফতে রব্বানী। তাদেরই কালচারাল উইং তমুদ্দুনে মজলিশ।

কাদিয়ানী সমস্যাঃ 
পাঞ্জাবী লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী হন বাঙ্গালী খাজা নাজিম উদ্দিন। তিনি ১৯৫৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। সে সময় পাকিস্তানে আহমদিয়া বা কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ব্যপক বিস্তার হয়, পাকিস্তানের কয়েকজন উর্ধতন কর্মকর্তা এই মতবাদের অনুসারী ছিলেন। সাইয়্যেদ মওদুদী রঃ তখন 'কাদিয়ানী সমস্যা' নামে একটি বই লিখে কাদিয়ানী বা আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম প্রমাণ করেন এবং এদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষনার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলন বড় ধরণের নাড়া দেয় পাকিস্তানকে। অধিকাংশ মুসলিম এই আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন। এ সময় অনেকগুলো সংগঠন একযোগে কাদিয়ানীদেরকে সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষনার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তারা সর্বদলীয় কনভেনশনে ২৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে 'ডাইরেক্ট একশন কমিটি' গঠন করে। জামায়াত এই কমিটির বিরোধিতা করে অহিংস আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু তথাপি মার্চ মাসের শুরুতে আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে এবং পুলিশের গুলিতে কিছু লোক নিহত হয়।

ডাইরেক্ট একশন কমিটি কাদিয়ানীদের কিছু মানুষকে হত্যা করে, এর ফলশ্রুতিতে দাঙ্গা দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে খাজা নাজিমুদ্দিন পদত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী হন আরেক বাঙ্গালী মোহাম্মদ আলী বগুড়া। তারা সবাই মুসলিম লীগের নেতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নামে সেনাবাহিনী। গ্রেপ্তার হন সাইয়্যেদ মওদুদী রঃ। তার গ্রেপ্তারে আন্দোলন আরো ভয়ংকর হয়। সরকার কাদিয়ানীদের মৌখিকভাবে কাদিয়ানীদের নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। পরে একটি সামরিক আদালত সাইয়্যেদ মওদুদী রঃ কে এই গোলযোগের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেয়। তবে বহিঃবিশ্বের চাপে সেই দন্ড কার্যকর করতে পারেনি মোহাম্মদ আলী বগুড়ার সরকার। মুক্তি পান সাইয়্যেদ মওদুদী রঃ। [৪,৫]

যুক্তফ্রন্ট সরকারঃ 
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পরিষদের ১৯৫৪ খ্রীস্টাব্দের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে অন্যান্য দল মিলে যুক্তফ্রন্ট নামীয় একটি সমন্বিত বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয় এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর তারিখে কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। সাথে আরো ছিল মৌলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি। বামপন্থী গনতন্ত্রী দলের নেতা ছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ এবং মাহমুদ আলি সিলেটি।

১৯৫৪ সালের মার্চের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন অর্জ্জন করে। তন্মধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ, ৪৮টি পেয়েছিল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামী ইসলাম পার্টি লাভ করেছিল ২২, গণতন্ত্রী দল লাভ করেছির ১৩টি এবং খেলাফত-ই-রাব্বানী নামক দলটি ১টি আসন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে এ নির্বাচনে পরাভূত হয় ; তারা কেবল ৯টি আসন লাভ করতে সমর্থ হয়।

এ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য ৭২টি আসন সংরক্ষিত ছিল। এগুলোর মধ্যে কংগ্রেস লাভ করেছিল ২৪টি আসন, কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি, শিডিউল্ড কাস্ট ফাউন্ডেশন ২৭টি, গণতন্ত্রী দল ৩টি এবং ইউনাইটেড পগ্রেসিভ পার্টি ১৩টি আসন লাভ করেছিল। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী একটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন।

এখানে একটা বিষয় গোলমাল লেগে যায়। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের পাকিস্তান সভাপতি। আর ভাসানী ছিলে পূর্ব পাকিস্তান সভাপতি। সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৫৬ সালে। প্রায় বছরখানেক তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের সংবিধানের খসড়া পাস হয়। এবং এর মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী পাকিস্তান ইসলামিক রিপাবলিকে পরিণত হয়। এতটুকুই ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামীর সফলতা। এছাড়া জামায়াতের ইসলামী সংবিধানের রূপরেখার কিছুই গ্রহন করা হয়নি।

নতুন সংবিধানে গভর্ণর জেনারেল সিস্টেম বাদ পড়ে ইস্কান্দর মির্যা হন পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট। আগে মূলত রাষ্ট্র প্রধানমন্ত্রী দ্বারা পরিচালিত হতো। নতুন সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বেড়ে যায়। ইস্কান্দর মির্যার সাথে সোহরাওয়ার্দীর বিরোধ বাড়তে থাকে। ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে সোহরাওয়ার্দী পদত্যাগ করেন। এর প্রায় একবছর পর ১৯৫৮ সালে ক্যু করেন আইয়ুব খান। পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। [বাংলাপিডিয়া]

৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ এবং ছয় দফার সৃষ্টিঃ
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক ভারত যুদ্ধ হয়। যুদ্ধটি স্থায়ী ছিল ১৭ দিন। কাশ্মীর সহ নানা ইস্যুতে পাকিস্তানে অতর্কিত আক্রমন করে ভারত। পাকিস্তান যুদ্ধের জন্য অপ্রস্তুত থাকার থাকার কারণে প্রাথমিক ভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হয়। তবে ৫-৬ দিনের মধ্যেই আইয়ুব খানের রণনৈপুণ্যে ও বাঙ্গালী সৈনিকদের নজিরবিহীন আত্মত্যাগে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। ভারতের প্রায় ৬০ টি বিমান ৪৫০ ট্যাংক ধ্বংস হয়। এমতাবস্থায় ভারত যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগী হয়ে পড়ে। অপরদিকে পাকিস্তানের গোলাবারুদ সংকট ও যুদ্ধক্ষেত্র পাকিস্তান হওয়ায় পাকিস্তানের জনজীবন হুমকির সম্মুখিন। সব মিলিয়ে পাকিস্তানও যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে। [উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া]

ভারতের বন্ধু রাশিয়ার মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধ হয় এবং একটা চুক্তি হয়, যা তাসখন্দের চুক্তি বলে অভিহিত। পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো ও সাধারণ জনগণ এই চুক্তি মানে নি। এটা ছিল সূবর্ণ সুযোগ কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের। কিন্তু আইয়ুবের কূটনৈতিক ব্যর্থতায় তা হলো না। ক্ষেপে উঠে রাজনীতিবিদেরা ও পাকিস্তানী জেনারেলরা। আইয়ুবের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো জোট গঠনের চেষ্টা করে। এতে নেতৃত্ব দেয় মুসলিম লীগ। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী লাহোরে সেই মিটিঙে আরো অংশগ্রহন করে আওয়ামীলীগ, জামায়াত, নেজামে ইসলাম। আওয়ামীলীগের পূর্বপাকিস্তানের সেক্রেটারী মুজিব সেই প্রোগ্রামে আ. লীগের হয়ে অংশগ্রহন করেন। [৭]

সেই মিটিঙে মুজিব হঠাৎ করে ৬ দফা ঘোষনা করে বসেন। কিন্তু অন্যান্য বিরোধী দল তা মেনে নেন নি। তারা বলেন, আমরা আজ একত্রিত হয়েছি কাশ্মীর, তাসখন্দ ও আইয়ুব খান কে নিয়ে। ফলে মিটিঙের কার্যসূচী থেকে ছয় দফা বাদ পড়ে। মুজিব সভাস্থল ত্যাগ করে। মজার বিষয় হল নিখিল পাকিস্তানের আ. লীগ প্রেসিডেন্ট নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান এতে বিস্মিত হয়ে পড়েন। কারণ তিনি এই বিষয়ে কিছুই জানতেন না। এই ছয় দফা নিয়ে আ. লীগে ভাঙ্গন দেখা দেয়। শুধু তাই নয় যারা সেই মিটিঙে আ. লীগের অন্যান্য নেতা যারা মুজিবের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন তারাও আগে থেকে কিছুই জানতেন না ৬ দফার ব্যাপারে।

দুঃখজনক ও বিস্ময়কর হলেও সত্য মূলত এই ছয় দফার কারিগর ছিলেন আইয়ুব খান। কারণ তিনি চেয়েছিলেন সেনা অফিসার ও রাজনীতিবিদদের দৃষ্টি তাসখন্দ থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দিতে। এবং ৬ দফার বিরোধী হয়ে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ প্রভাব বজায় রাখতে সবাই যেন তার হাতকেই শক্তিশালী করে। পরিশেষে কিন্তু তাই হয়েছিলো। আইয়ুব ৬ দফাকে হাতিয়ার করে বাঁচতে চেয়েছিলেন। আইয়ুব তথ্য সচিব আলতাফ গওহরকে দিয়ে ৬ দফা প্রনয়ন করেন। আলতাফ সাহেব কর্মসূচীটি রুহুল কুদ্দুসকে দেন। রুহুল কুদ্দুস ছিলেন মুজিবের ইনার সার্কেল। তিনি সেটা কৃষি ব্যংকের এম ডি খায়রুল বাশারকে দিয়ে টাইপ করিয়ে বিমানে উঠার আগ মুহুর্তে মুজিবের হাতে গুঁজে দেন। [৮, ১০]

বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে এই কারণে যে, আলতাফ গওহর পাকিস্তানের সমস্ত পত্র-পত্রিকাকে নির্দেশ দেন এই মর্মে যেন তারা ৬ দফার বহুল প্রচার করে। এভাবেই ছয় দফা আলোচিত হয়। নতুবা বিরোধীদের মিটিঙে যেই ছয় দফা নিয়ে কোন আলোচনাই হয় নি সেই ছয় দফা নিয়ে মাতামাতি করার কোন কারণ নেই। লাহোরে ৫ তারিখ ৬ দফা উত্থাপন না করতে পেরে মুজিব ১০ ফেব্রুয়ারী সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে পত্রিকাগুলো আরো রসদ পায়। মানুষ ভুলে যায় তাসখন্দ কিংবা কাশ্মীর সমস্যা। রাজনীতিবিদ ও সামরিক অফিসারদের মাথা ব্যাথার কারণ হয় ৬ দফা। [৮,৯]

এদিকে মুজিবের অবস্থাও ভালো নয়। আওয়ামী লীগের অধিকাংশই ৬ দফা মানে নি। দফা গুলোর সাথে তাদের বিরোধ না হলেও তাদের মূল বিরোধ মুজিবকে নিয়ে। মুজিবের কারো সাথে পরামর্শ না করে এহেন ঘোষনা কেউ মেনে নিতে পারে নি। ১৯৬৬ সালের ১৮-১৯ মার্চ ঢাকায় পূর্ব-পাকিস্তানের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক শুরু হয়। এতে অন্যান্য মেম্বার সহ লীগ সভাপতি আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের প্রবল আপত্তির মুখে মুজিব ছয় দফা পাশ করাতে ব্যর্থ হয়। এর মাধ্যমে ছয় দফার সাথে আ. লীগের আর কোন সম্পর্ক থাকে না। হতাশ মুজিব তার শেষ অস্ত্র ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেন। [৭,৮,৯]

এই প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রী ও তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন। দুঃখভরা মন নিয়ে শেখ মুজিব আমাদের(ছাত্রলীগ) ডাকলেন। বললেন, আমি তো বিপদে পড়ে গেছি। আমারে তোরা কি সাহায্য করবি না? ছয় দফা বলার পর থেকেই বিভিন্ন দিক থেকে আমার অপর এটাক আসছে। আমার তো এখন ঘরে বাইরে শত্রু। আমরা তখন বললাম নিশ্চয়ই আপনার পাশে থাকবো। যাই হোক ফ্যসিবাদী মুজিব ছাত্রলীগের গুন্ডাদের সহযোগিতায় সভাপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। এবং নিজে পূর্ব পাকিস্তান আ. লীগের সভাপতি হন। ছয় দফার আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যান। [৮]

এভাবেই আইয়ুব-মুজিব ষড়যন্ত্রে নষ্ট হয়ে যায় কাশ্মীরের মুসলমানদের ভাগ্য। হয়তো তখন পাকিস্তানী জেনারেলরা তাসখন্দ চুক্তিকে বাতিল করে ভারতকে চাপ দিয়ে কাশ্মীর অধিকার করে নিতে পারতো।

ড: আনিসুজ্জামান এই প্রসঙ্গে বলেন,
"ছয় দফার প্রণেতা কে, এই নিয়ে অনেক জল্পনা হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন সিভিল সার্ভিসের কয়েকজন সদস্য এটা তৈরি করে শেখ মুজিবকে দিয়েছিলেন, কেউ কেউ সে কৃতিত্ব কিংবা দোষ দিয়েছিলেন কয়েকজন সাংবাদিককে। তাদের পেছনে কোন শক্তি কাজ করছিল, সে বিচারও হয়েছিল। প্রথমে উঠেছিল ভারতের নাম। কিন্তু পাকিস্তান হওয়া অবধি তো দেশের বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল ভারতের প্ররোচনা বলে। পরে বড়ো করে যে নাম উঠলো, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্ব এবং ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্টের বন্ধুত্বের কারণে পাকিস্তান ভাঙার উদযোগ নিচ্ছে মার্কিনরা, এমন একটা ধারণা খুব প্রচলিত হয়েছিল। আমরা যারা একটু বামঘেঁষা ছিলাম, তারা এই ব্যাখ্যা মেনে নিয়েছিলাম। ফলে, ফেডারেল পদ্ধতি ও স্বায়ত্ত্বশাসনের পক্ষপাতী হলেও ছয় দফাকে আমরা তখন গ্রহণ করিনি। আমরা আরো শুনেছিলাম যে, পাকিস্তান ভাঙতে পারলে পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি করতে দেওয়া হবে; সুতরাং এ কাজে মার্কিনদের উৎসাহ তো থাকবেই। যদি প্রশ্ন উঠতো যে, পাকিস্তান তো সেনটো-সিয়াটোর সদস্য, তাহলে জবাব পাওয়া যেতো যে, পাক-ভারত যুদ্ধের পরপ্রেক্ষিতে ওসব জোটের অসারতা প্রমাণ হয়ে গেছে এবং পাকিস্তান যে কোন সময় তার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। পাকিস্তান কখনোই এসব সামরিক জোট ছাড়েনি, তবে আইয়ুব খানের ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্সে’র প্রচারিত নীতি কিছুটা এ ধারণাকে পুষ্ট করেছিল।” [১১]

আতাউর রহমান খান (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী) বলেন,
"(তাসখন্দে) কয়দিন আলোচনার পর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ও লালবাহাদুর শাস্ত্রী একটি যুক্ত ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করলেন। সিদ্বান্ত হল, শান্তিপূর্ণভাবে উভয় পক্ষ নিজেদের ছোট বড় সমস্যার সমাধান করবে। আশ্চর্যের কথা, যা নিয়ে যুদ্ধ, অর্থাৎ কাশ্মীর, তার নামগন্ধও এই ঘোষণাপত্রে উল্লেখ রইল না। এত কান্ড করে, এত ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে, সারা পাকিস্তানকে প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি ঠেলে দেওয়ার পর সিদ্ধান্ত হল, ওম্ শান্তি।

পশ্চিম পাকিস্তানে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য শহর বাজার গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেরা সৈনিক নিহত হয়েছেন। পৃথিবীর কোন যুদ্ধে নাকি এত অল্প সময়ে এত অফিসার নিহত হয় নাই। তাদের স্থান পূরণ সম্ভব হবে না। তাই, পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিরুপ ছিল। এত ক্ষয়ক্ষতির পর আয়ুব খাঁ সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে অপমান-জনক একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করলেন। দেশবাসীর আশা-আকাঙ্খার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। এই চুক্তি অপরাধ স্বীকৃতির শামিল বলে তারা মনে করে।

যে সব সৈনিক কর্মচারী শহীদ হয়েছেন তাদের বিধবা স্ত্রী ও পরিবারবর্গ এক মিছিল বার করল লাহোর শহরে। ধ্বনি তুলল, আমাদের স্বামী পুত্র ফেরত দাও। তারা শাহাদাত বরণ করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেন নাই। অনর্থক আপনি তাদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছেন। অকারণে তাদের অমূল্য জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। যদি দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য হতো, তা হলে আপনি এমন চুক্তি কেন স্বাক্ষর করলেন? ইত্যাদি –

পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতি আলোচনা করার জন্য ফেব্রুয়ারী মাসের পাঁচ-ছয় তারিখে নিখিল পাকিস্তান জাতীয় কনফারেন্স আহ্বান করলেন। এই উপলক্ষে চৌধুরী মহম্মদ আলি ও নবাবজাদা নসরুল্লাহ খাঁ ঢাকা এসে সব দলের সাথে আলাপ আলোচনা করে কনফারেন্সে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ করলেন। বললেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্কটজনক এই মূহুর্তে আমাদের কর্তব্য নির্ধারণ করা উচিত।

জামাত, নিজামে ইসলামীও কাউন্সিল লীগ যোগদানে সম্মতি দিল। আওয়ামী লীগেরও দোমনাভাব। শেখ মুজিবের মতামতই দলের মত। প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন অভিমত নাই। শেখ মুজিব কনফারেন্সে যোগদানে অসম্মতি জ্ঞাপন করলেন। এন-ডি-এফ সভা করে মত প্রকাশ করল যে, কনফারেন্সের পক্ষে আমাদের নৈতিক সমর্থন রয়েছে, তবে বর্তমান অবস্থায় কোন সদস্য এতে যোগদান করতে পারছেনা। শেখ মুজিব আমাকে টেলিফোনে বললেন, আপনারা ঠিকই করেছেন। আমরাও যাবনা।

পরদিন সংবাদপত্রে দেখি, শেখ মুজিব সদলবলে লাহোর যাচ্ছেন। প্রায় চৌদ্দ পনেরো জন এক দলে। ব্যাপার কি? হঠাৎ মত পরিবর্তন। মতলবটা কি?

লাহোর কনফারেন্স শুরু হল গভীর উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে।

অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ একটি বোমা নিক্ষেপ করলেন – ‘ছয় দফা’। প্রস্তাব বা দাবীর আকারে একটা রচনা নকল করে সদস্যদের মধ্যে বিলি করা হল। কোন বক্তৃতা বা প্রস্তাব নাই, কোন উপলক্ষ নাই, শুধু কাগজ বিতরণ। পড়ে সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। জাতীয় কনফারেন্সে এই দাবী নিক্ষেপ করার কি অর্থ হতে পারে? কনফারেন্স ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে সম্মিলিত হয়েছে। এই দাবী যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, এই সম্মেলন ও এই সময় তার উপযোগী নয় – সম্পূর্ণ অবান্তর। [১২]

তারপর দলবলসহ শেখ মুজিব ঢাকা ফিরে এসে মহাসমারোহে ‘ছয় দফা’ প্রচার করলেন সংবাদপত্রে। শেখ মুজিবের দাবী ও নিজস্ব প্রণীত বলে ছয়-দফার অভিযান শুরু হয়ে গেল।

ছয় দফার জন্মবৃত্তান্ত নিম্নরুপ :
কিছুসংখ্যক চিন্তাশীল লোক দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দূরাবস্থার কথা আলাপ আলোচনা করেন। আমাদের ইঙ্গিত ও ইশারা পেয়ে তারা একটা খসড়া দাবী প্রস্তুত করলেন। তারা রাজনীতিক নয় এবং কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্টও নয়। তারা ‘সাত দফার’ একটা খসড়া আমাদের দিলেন। উদ্দেশ্য, এটা স্মারকলিপি হিসাবে আয়ুব খাঁর হাতে দেওয়া, কিংবা জাতীয় পরিষদে প্রস্তাবাকারে পেশ করার ব্যবস্থা করা।

এই খসড়ার নকল বিরোধীদলীয় প্রত্যেক নেতাকেই দেওয়া হয়। শেখ মুজিবকেও দেয়া হয়। খসড়া রচনার শেষ বা সপ্তম দফা আমরাও সমর্থন করি নাই। শেখ মুজিব সেই দফা কেটে দিয়ে ছয়দফা তারই প্রণীত বলে চালায়ে দিল। তারপর বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির দ্বারা ছয় দফার দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক মর্ম ও তাৎপর্য লেখায়ে প্রকাশ করা হয়। ইংরেজী ও বাংলায় মুদ্রিত হয়ে পুস্ত্কাকারে প্রচারিত হয় সারা দেশব্যাপী।

লাহোর কনফারেন্স বানচাল হয়ে গেল। নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবকেই এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী করেন। তারা অভিযোগ করেন, শেখ মুজিব সরকার পক্ষ থেকে প্ররোচিত হয়ে এই কর্ম করেছেন। লাহোরে পৌঁছার সাথে সাথে আয়ুব খাঁর একান্ত বশংবদ এক কর্মচারী শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করে কি মন্ত্র তার কানে ঢেলে দেয় যার ফলেই শেখ মুজিব সব উলটপালট করে দেয়। তারা এও বলে যে আওয়ামী লীগের বিরাট বাহিনীর লাহোর যাতায়াতের ব্যয় সরকারের নির্দেশে কোন একটি সংশ্লিষ্ট সংস্থা বহন করে। আল্লাহ আলীমূল গায়েব।” [১২]

বিঃ দ্রঃ অনেকে মনে করেন ছয় দফা বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিলো। তা মোটেই নয়। কারণ আইয়ুবের পতনের সাথে সাথেই মুজিব ভুলে যায় ছয় দফার কথা। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন। ইশতেহারে উল্লেখ করেন পাকিস্তানের সর্বোচ্চ অখন্ডতা রাখবেন, কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আইন করবেন না। ছয় দফা তার ৭০ এর নির্বাচনী মেনিফেস্টোতো ছিল না।

দু’দফা জামায়াত নিষিদ্ধঃ 
আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে এবং ১৯৬৪ সালে জামায়াত নিষিদ্ধ করে। ১৯৬৪ সালে গ্রেপ্তার হন এবং সে বছরই মুক্তি পান। সরকারের স্বৈরচারী আচরণের প্রতিবাদ এবং ইসলামী সংবিধানের জন্য চলমান আন্দোলনের জন্য জামায়াতের উপর এই নির্যাতন নেমে আসে। [৬]

আগরতলা ষড়যন্ত্রঃ 
আইয়ুব সরকারকে উৎখাত করার জন্য শেখ মুজিব ভারতের গোয়েন্দা বাহিনীর সাথে গোপন বৈঠক করে। এটা সরকারি গোয়েন্দারা আবিষ্কার করে এবং মুজিব সহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে। মুজিবের বিরুদ্ধে জনগণ ক্ষেপে উঠে। মুজিবসহ আওয়ামীলীগ এই বৈঠকের কথা অস্বীকার করে। জনগণ গোড়া থেকেই ভারতবিরোধী। মুজিব এই ধরণের কাজ করতে পারে তা তাদের ধারণার অতীত। বাঙ্গালীরা স্বৈরাচারী আইয়ুবের কথা বিশ্বাস করেনা বিশ্বাস করে আওয়ামী লীগের কথা। আওয়ামীলীগ এই মামলার নাম দেয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবীতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আন্দোলন শুরু করে। [১৩, ১৪]

অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানেও স্বৈরাচারী আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। সৃষ্টি হয় গণঅভ্যুত্থানের। আইয়ুব খান পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ায় সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ইয়াহিয়া খান এসেই প্রথমে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষনা দেয়। মামলা নিষ্পত্তির চার যুগ পর মামলার আসামী ক্যাপ্টেন এ. শওকত আলী ২০১১ সালে প্রকাশিত একটি স্বরচিত গ্রন্থে এ মামলাকে সত্য মামলা' বলে দাবী করেন। মজার বিষয় হলো এই দাবীটা তিনি যদি ১৯৬৯ এ করতেন তাহলে আর আওয়ামীলীগের এতদিন পর্যন্ত রাজনীতি করার সৌভাগ্য হতো না। ভারত সংশ্লিষ্টতা কিংবা পাকিস্তান বিরোধী কোন কর্মকান্ড সে সময় জনগণ সহ্য করতো না। এই সমস্যাটা হয়েছে ভাসানীর ক্ষেত্রে। ভাসানী ১৯৭০ এ বাঙ্গালীদের মধ্যে সবচাইতে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তিনি নির্বাচন না করে ঘোষনা দিলেন “ভোটের বাক্সে লাথি মার বাংলাদেশ স্বাধীন কর”। বাঙ্গালী জনগণ লাথি ঠিকই মেরেছে তবে ভোটের বাক্সে নয়, ভাসানী এবং তার দল ন্যশনাল আওয়ামী পার্টিকে। ভাসানী হিরো থেকে জিরোতে পরিণত হন। অপরদিকে পাকিস্তানের সংহতির প্রতি আনুগত্য পোষন করে ইশতেহারে কুরআন সুন্নাহ পরিপন্থী কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন করেন মুজিব। মুজিবের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে মুজিবকে বিপুল ভোট দেয় বাঙ্গালী জনগণ।

সত্তরের নির্বাচন ও ফলাফলঃ 
ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনামলে ১৯৭০ সনে পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭০ সনের অক্টোবরে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বন্যার কারণে ডিসেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ১৯৭১ এর জানুয়ারি পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। নির্বাচনে মোট ২৪ টি দল অংশ নেয়। ৩০০ টি আসনে মোট ১,৯৫৭ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেয়। এর পর কিছু প্রার্থী তাদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেয়। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে ১,৫৭৯ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীতা করে। আওয়ামী লীগ ১৭০ আসনে প্রার্থী দেয়। এর মধ্যে ১৬২টি আসন পূর্ব পাকিস্তানে এবং অবশিষ্টগুলি পশ্চিম পাকিস্তানে। জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থী দেয়। তাদের প্রার্থী সংখ্যা ১৫১। পাকিস্তান পিপলস পার্টি মাত্র ১২০ আসনে প্রার্থী দেয়। তার মধ্যে ১০৩ টি ছিল পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে। পূর্ব পাকিস্তানে তারা কোন প্রার্থী দেয়নি। পিএমএল (কনভেনশন) ১২৪ আসনে, পিএমএল (কাউন্সিল) ১১৯ আসনে এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাইয়ুম) ১৩৩ আসনে প্রতিদ্বন্দীতা করে।
নির্বাচনে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং প্রায় ৬৫% ভোট পড়েছে বলে সরকার দাবী করে। সর্বমোট ৫৬,৯৪১,৫০০ রেজিস্টার্ড ভোটারের মধ্যে ৩১,২১১,২২০ জন পূর্ব পাকিস্তানের এবং ২৩,৭৩০,২৮০ জন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ভোটার। [১৫]

ন্যশনাল এ্যাসেম্বলীতে আওয়ামী লীগ ১৬০ টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সাধারণ নির্বাচনের একই সাথে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান এ্যাসেম্বলীর ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের ৮১টিতে জয়লাভ করে। [১৫]

আওয়ামী লীগ ৩৮.৩% ভোট এবং আসন ১৬০
পাকিস্তান পিপলস পার্টি ১৯.৫% ভোট এবং আসন ৮১
পিএমএল (কাইয়ুম) ৪.৫% ভোট এবং আসন ৯
পিএমএল (কনভেনশন) ৩.৩% ভোট এবং আসন ৭
জমিয়ত উলেমা -ই- ইসলাম ৪.০% ভোট এবং আসন ৭
মারকাজি জমিয়তন-উলেমা-পাকিস্তান ৪.০% ভোট এবং আসন ৭
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালি) ২.৩% ভোট এবং আসন ৬
জামায়াত-ই-ইসলামী ৬.০% ভোট এবং আসন ৪
পিএমএল (কাউন্সিল) ৬.০% ভোট এবং আসন ২
পিডিপি ২.৯% ভোট এবং আসন ১
স্বতন্ত্র ৭.১% ভোট এবং আসন ১৬ 


১৯৭১ সাল হতে পারতো পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। কারণ এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যদিও এই নির্বাচন সামরিক শাসনের অধীনে হয়েছে তারপরও এই নির্বাচন নিয়ে কোন পক্ষেরই অভিযোগ ছিল না। সুষ্ঠু নির্বাচন সবাই মেনে নেন। সংবিধান অনুযায়ী বৈধ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন আওয়ামীলীগের শেখ মুজিব। ইয়াহিয়া খান সেভাবেই প্রস্তুত হচ্ছিলেন। কিন্তু বাধ সাধে ভুট্টো। সে প্রশ্ন তোলে নৈতিকতার। কারণ পাঁচটি প্রদেশের মধ্যে একটি প্রদেশ ছাড়া বাকী চারটিতে কোন সমর্থনই পায়নি আওয়ামীলীগ। শুধু একটি প্রদেশের ভোট দিয়ে পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সমীচীন নয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া উভয়পক্ষকে আলোচনার প্রস্তাব দেন। মুজিব আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন কারো যদি আলোচনা করতে হয় সে যেন ঢাকায় এসে আলোচনা করে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভুট্টোকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। পার্লামেন্ট অধিবেশন স্থগিত করেন এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করেন।

ষড়যন্ত্র শুরু হয় ১৯৬২ সাল থেকেঃ 
রুশপন্থী বামেরা একটা সফল বিপ্লবের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিল যেখানে তাদের আদর্শ তারা বাস্তবায়ন করবে। এদিকে র’ গঠিত হওয়ার পর তাদের ১ম প্রজেক্ট হলো পাকিস্তান আলাদা করা। ১৯৬২ সালে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের মধ্যে একটি গোপন সংগঠন সৃষ্টি হয় যার নাম নিউক্লিয়াস। র’ এর পক্ষ থেকে চিত্তরঞ্জন, ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সিরাজুল আলম খানের সমন্বয়ে এই আন্দোলন অত্যন্ত গোপনে চলতে থাকে। ছাত্রলীগের মধ্যে যারা সমাজতন্ত্রের পক্ষে তাদের আস্তে আস্তে গোপন সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরাই মূলত বাংলাদেশ নাম ঠিক করে, পতাকা ঠিক করে, সংগীত ঠিক করে ১৯৬৮ সালে। [১৬, ১৭]

অপরদিকে মাওবাদীরা মানে চীনপন্থী বামেরাও এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপন দেখতো তবে তাদের গুরুদের কাজ থেকে আশা না পাওয়ায় তারা একটু পিছিয়ে থাকে। ভাসানী নিউক্লিয়াস সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু চীন পাকিস্তানের কৌশলগত মিত্র হওয়ায় ভাসানীর বহিঃবিশ্বের সাপোর্ট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও সে তার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে দেয়। এই ঘোষনাই তার রাজনৈতিক ক্যরিয়ার শেষ করে দেয়। কারণ এদেশের পাঁচ শতাংশ মানুষও এমনকি ভাসানীর দল ন্যাপ যারা করে তারাও স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না। [১৭]

র’ আর নিউক্লিয়াসের লোকজন গোপনে স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজন ছিল কোন একটা গন্ডগোলের উসিলায় দেশে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া। বাকী কাজ ভারত করবে। এটা ছাড়া তাদের একজন নেতাও দরকার ছিল। তারা মুজিবকে নানানভাবে প্ররোচিত করেন। মুজিব তাদের প্ররোচনায় কান দেন নি। আসলে কান দেয়ার কোন প্রয়োজনই মুজিবের পড়েনি। মুজিব যেখানে পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা রাখে সেখানে কেন সে শুধু শুধু দেশ ভাগ করে একটা ছোট দেশের প্রধানমন্ত্রী হবে? আবার ভাগ হয়ে গেলে সেই দেশটা ভারতের পেটের ভেতর ঢুকে যাবে! আ স ম রব সহ ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াসপন্থী নেতারা ৭১ এর ২ মার্চ বাংলাদেশের পতাকা মুজিবের বাড়ির সামনে উত্তোলন করেন। মুজিব অত্যন্ত রাগান্বিত হন এবং নিজেই পতাকা ছিড়ে ফেলেন। তারপরও থেকে থাকে নি তারা, গনহত্যা চালাতে শুরু করে। [১৬]

৩ ও ৪ মার্চ চট্টগ্রামের ফিরোজ শাহ কলোনীতে ও ওয়্যারলেস কলোনীতে প্রায় ৭০০ অবাঙ্গালীদের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এখানে বসবাসকারী বহু শিশু, নারী, পুরুষ নিহত হয়। সে সময় সরকারি হিসেবে ৩০০ লাশ দাফন করা হয়। [১৮, ১৭, ১৯ ২০, ২১]

দ্যা টাইমস অফ লন্ডন ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল রিপোর্ট করেছিলো, হাজার হাজার সহায় সম্বলহীন মুসলিম উদ্বাস্তু যারা ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানে এসে আশ্রয় গ্রহন করে তারা গত সপ্তাহে বিক্ষুব্ধ বাঙ্গালীদের দ্বারা ধ্বংসাত্মক আক্রমনের শিকার হয়। বিহারী মুসলিম উদ্বাস্তু যারা সীমানা পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং ভারতে প্রবেশকারী একজন বৃটিশ টেকনিশিয়ান এই খবর নিশ্চিত করেন। উত্তর পূর্ব শহর দিনাজপুরে শত শত অবাঙ্গালী মুসলিম মারা গিয়েছে। [১৭, ২২]

খুলনায় টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৪ মার্চ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়, ৫ মার্চ খালিশপুর ও দৌলতপুরে ৫৭ জনকে অবাঙ্গালীকে ছোরা দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সামরিক বাহিনীর কঠোর সমালোচক সাংবাদিক মাসকারেনহাসও স্বীকার করেছেন অবাঙ্গালীদের এই অসহায়ত্বের কথা। অবাঙ্গালীদের জান মাল রক্ষায় শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে বাহ্যত নির্দেশ থাকলেও কোন কার্যকর উদ্যোগ ছিলনা। আওয়ামীলীগের কর্মীরা অদৃশ্য ইঙ্গিতে হত্যা খুন লুটতরাজ করে যাচ্ছিল অবারিতভাবে। সারাদেশেই চলছিল নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। সেই হিসেবে ঢাকা অনেক ভালো ছিল। [১৭, ২৩, ২২]

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসসহ অনেক দূতাবাসে হামলা চালায় বিদ্রোহীরা। ১২ মার্চ ও ১৫ মার্চ মার্কিন কনসুলেট লক্ষ্য করে বোমা হামলা ও গুলি করা হয়। ১৯ মার্চ হোটেল ইন্টারকন্টিনালে বোমা হামলা ও গুলি করে বিদ্রোহীরা। এগুলো ছিল শান্তি আলোচনার জন্য বড় অন্তরায়। তারপরও বলা চলে ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও মুজিব আলোচনা ফলপ্রসুই হতে যাচ্ছিল। পরিস্থিতির উপর মুজিবসহ কারোই নিয়ন্ত্রণে ছিলনা। সেনাবাহিনীও সরকারি আদেশের বাইরে কোন জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছিল না। [১৭, ২৩]

আর এদিকে RAW, এদেশীয় বাম ও আওয়ামীলীগে ঘাপটি মেরে থাকা সমাজতন্ত্রবাদীরা এদেশকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও মুজিবের আলোচনাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য একের পর এক অবাঙ্গালী গণহত্যা চালিয়েছে, সারা দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অনেক বিহারীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে বিশেষ করে জগন্নাথ হল এবং ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল) আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। [১৭, ২২]

সারাদেশে সেনাবাহিনীর উপর বিনা উস্কানীতে আক্রমন করেছিলো বাঙ্গালীদের একটা অংশ। সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে জয়দেবপুরে। গাজিপুরে সমরাস্ত্র কারখানার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে একদল সৈন্য সেখানে পৌঁছানোর আগে আওয়ামীলীগ কর্মীরা জয়দেবপুরে ব্যরিকেড সৃষ্টি করে। ব্যরিকেডের জন্য তারা একটি ট্রেনের বগি ব্যবহার করে। অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে জাহানজেবের নেতৃত্বে সৈন্যদল। তারা ব্যরিকেড সরিয়ে সেখানে পৌঁছায়। নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখে জাহানজেব আরবাব আবার যখন হেডকোয়ার্টারে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন বিশৃংখলাকারীরা সৈন্যদলকে আবারো ঘিরে ফেলে। বন্দুক, শর্টগান, লাঠি, বোমা ইত্যাদি নিয়ে হামলা চালায়। জাহানজেব বাঙ্গালী অফিসার লে. ক. মাসুদকে গুলি চালাতে নির্দেশ দিলেন। মাসুদ ইতস্তত করলে অপর বাঙ্গালী অফিসার মঈন তার সৈন্যদের নিয়ে পাল্টা আক্রমন চালালে কিছু মানুষ নিহত হয় বাকীরা পালিয়ে যায়। মাসুদকে পরে ঢাকায় এসে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় আরেক বাঙ্গালী অফিসার কে এম সফিউল্লাহকে। [১৭, ২৩] 

এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কে এম সফিউল্লাহ বলেন, ১৯ মার্চ সকাল দশটায় তার ইউনিটকে জানানো হয় ব্রিগেড কমান্ডার মধ্যহ্নভোজে আসছেন এবং নিকটবর্তী গাজিপুর সমরাস্ত্র কারখানা পরিদর্শন করবেন। কিন্তু জনতা প্রায় ৫০০ ব্যরিকেড বসিয়ে সৈন্যদের আটকে দেয়। এগুলো সরিয়ে তারা আসলেও ফিরে যাওয়ার সময় জয়দেবপুরে মজবুত ব্যরিকেড সৃষ্টি করলে লে. ক. মাসুদ তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। এমন সময় দুজন বাঙ্গালী সৈনিক জাহানজেবকে জানায় তাদেরকে বেধড়ক পিটিয়েছে, অস্ত্র গোলাবারুদ ছিনিয়ে নিয়েছে। এবার জাহানজেব গুলি করার নির্দেশ দিলে মঈন তার সৈন্যদের গুলি করতে বলে। তবে বাংলায় বলে দেয় ফাঁকা গুলি করার জন্য। এরপরও পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রনে না এলে এবার জাহানজেব কার্যকরভাবে গুলি করার নির্দেশ দেন। তারাও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। দু’জন নিহত হয়। সফিউল্লাহ আরো জানান, গাজিপুরের পরিস্থিতিও ছিল উত্তেজনাকর। রাস্তায় ব্যরিকেড দেয়া হয়েছিল। সমরাস্ত্র কারখানার আবাসিক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার করিমুল্লাকে আটকে ফেলে বাঙ্গালীরা। আবাসিক পরিচালককে উদ্ধার করতে আমরা সেনা প্রেরণ করেছিলাম। [২৩]

এভাবে সারাদেশে সেনাবাহিনীকে নানাভাবে উস্কে দিয়ে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করেছিলো বাঙ্গালীদের একটা অংশ। ইয়াহিয়া বিদ্রোহ দমন করার জন্য টিক্কা খানকে এদেশে আনলেও সেনাবাহিনীকে শুধুমাত্র আক্রান্ত হওয়া ছাড়া কোন ভূমিকা নিতে বারণ করেন। ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই ধৈর্য্যের প্রশংসা করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কট্টর সমালোচক সাংবাদিক মাসকারেনহাস। এসব ঘটনায় মুজিব বেশ চাপ পড়েছিলেন। সমঝোতাও পড়েছিলো হুমকির মুখে। তারপরও হয়তো সমঝোতা হত। কিন্তু একটা ছবি যা বিদেশী পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো এরপর আর কোন আলোচনাতে অংশ নিতে রাজি হয়নি ইয়াহিয়া এবং ভুট্টো। সেটি ছিল ঢাকা ভার্সিটি এলাকায় যুবক ছেলে মেয়েদের যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে মার্চপাস্টের ছবি। ইয়াহিয়া এবং ভুট্টো একথা মনে করেই নিয়েছেন আলোচনার নামে সময়ক্ষেপন করে মূলত মুজিব ভারতীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডের জন্য ও আটক বিহারীদের উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সমূহে অভিযান চালায়। এসময় তারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা খালি করে দেয়ার জন্য বলেন। সকল ছাত্র এবং শিক্ষক হল ছেড়ে দিলেও কয়েকজন শিক্ষক ও প্রায় পঞ্চাশজনের মত ছাত্র র’ ইঙ্গিতে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় না ছেড়ে সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। বিদ্রোহী ছাত্রদের চেষ্টা ছিল বালির বাঁধের মত। সেদিন হলে যারা সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চেয়েছিলো তাদের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে সেনাবাহিনী। এটাই অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচিত। এবং এটা খুবই যৌক্তিক অপারেশন ছিল। তবে সবাইকে হত্যা না করে গ্রেপ্তার করতে পারলে পাকিস্তান সরকার হয়তো সেসময় পরিস্থিতি ভালোভাবে সামাল দিতে পারতো। [১৭]

এতক্ষন পর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে তাতে কোনভাবেই দেশ ভাগ হওয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। এদেশের মানুষ পাকিস্তান সেনাশাসনের প্রতিবাদ করেছে। গণতন্ত্র চেয়েছে কিন্তু দেশভাগ কেউই চায়নি। এর পরদিনই জিয়াউর রহমান নিজ সিদ্ধান্তে ক্যু করেন। ওসমানী তার এই ক্যু কে ভালো চোখে দেখেননি। তিনি কিছু রাজনৈতিক লোকদের একত্র করে ১৭ এপ্রিল আবার ক্যু করেন এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষনাপত্র পাঠ করেন অতঃপর ভারত গমন করেন। জয় হয় ভারতীয় ষড়যন্ত্রের। জামায়াত সেসময় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আন্দোলন করে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেয়। জামায়াতের এই অবস্থান ছিল এদেশের অধিকাংশ মানুষের অবস্থান। আওয়ামীলীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেন। স্বাধীনতা এদেশের মানুষের দাবী ছিল না। [১৭]

কথিত স্বাধীনতার নামে ভারতের গোলামী চেয়েছিলেন এদেশের কিছু সমাজতন্ত্রী মানুষেরা আর কিছু উচ্চবিলাসী সেনা কর্মকর্তা। জামায়াত সেসময় একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে অবস্থান নিয়েছে কোন সশস্ত্র গ্রুপ হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেনি। জামায়াত যুদ্ধ বন্ধে কয়েকবার চেষ্টা করেছিল, শান্তি আনার চেষ্টা করেছিল, সরকার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে সমজোতার চেষ্টা করেছিল কিন্তু দু-পক্ষের বাড়াবাড়িতে সেটা সম্ভব হয়নি। হত্যা খুন ধর্ষন উভয় পক্ষ করেছে। জামায়াত উভয়পক্ষের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করেছে আর বিচ্ছন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে যারা ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। [২৪]

১- ইসলামী বিপ্লবের পথ/ সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী
২- মাওলানা মওদুদী/ একটি জীবন একটি ইতিহাস
৩- The History of Urdu Language
৪- ভাষা আন্দোলন, বাংলা পিডিয়া
৫- কাদিয়ানী সমস্যা/ সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী
৬- মাওঃ মওদুদী, একটি জীবন একটি ইতিহাস/ আব্বাস আলী খান
৭- ছয় দফা থেকে বাংলাদেশ/ রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী
৮-  বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ, প্রামান্য চিত্র।
৯- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে 'র' ও সিআইএর ভূমিকা/ মাসুদুল হক।
১০- আব্দুল মালেক উকিলের সাক্ষাতকার, সাপ্তাহিক মেঘনা, ১৯৮৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর
১১- কাল নিরবধি/ ড: আনিসুজ্জামান
১২- স্বৈরাচারের দশ বছর/ আতাউর রহমান খান
১৩- বাংলাদেশে র/ আবু রুশদ
১৪- সত্য মামলা আগরতলা/ কর্ণেল শওকত আলী (অবঃ)
১৫- The last days of United Pakistan/ G.W.Choudhury
১৬- দুঃসময়ের কথাচিত্র সরাসরি/ ড. মাহবুবুল্লাহ ও আফতাব আহমেদ
১৭- বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধঃ বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ, এম আই হোসেন।
১৮- দ্যা ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ, আর্চার ব্লাড
১৯- The 1971 Indo-Pak war, A soldier's Narrative, Hakim Arshad Koreshi
২০- The Crisis in East Pakistan, Govt of Pakistan, 5 August, 1971.
২১- Anatomy Of Violence, Sarmila Bose
২২-The event in East Pakistan, 1971- International Commission of Jurists, Geneva.
২৩- ডেড রেকনিং, শর্মিলা বসু
২৪- পলাশী থেকে বাংলাদেশ/ অধ্যাপক গোলাম আযম

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন, ২০১৬

জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং আমেরিকায় সমকামী হত্যা


জামায়াত একটা মুনাফিক টাইপ দল। কারণ জামায়াত একবার জোট বাঁধে আওয়ামীলীগের সাথে আন্দোলন করে বিএনপির বিরুদ্ধে। আবার কিছুদিন পর বিএনপির সাথে ঘর সংসার করে আন্দোলন করে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে। এদের চরিত্রের ঠিক নাই। এরা নিজেদের মত করে ইসলামকে ব্যবহার করে। এরা ধর্মব্যবসায়ী। এই ধরণের অভিযোগ আপনি করতেই পারেন। কারণ আপনার ইনফো সঠিক, তবে সকল ইনফো আপনার জানা নেই অথবা আপনি জানা থাকলেও গোপন করেছেন। তাই ইনফরমেশনের যে ব্যাখ্যা আপনি করেছেন তা সম্পূর্ণ ভুল। 

১৯৮৪ সালে জামায়াত প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলার প্রস্তাব দেয় রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে। কারন সে সময়ের ধূর্ত শাসক লে জে হু মু এরশাদের অধীনে নির্বাচন কারো পক্ষে মানা সম্ভব ছিল না। জামায়াতের এই ফর্মুলা সেসময় সরকারি দলতো গ্রহন করেইনি। বিরোধী দলের মধ্যেও কেউ গ্রহন করেনি। একই ফর্মূলা সকল বিরোধী দল গ্রহন করেছে ১৯৮৯ সালে। সকল বিরোধী দল তখন এই ফর্মূলা বাস্তবায়নের জন্য যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। তারই প্রেক্ষিতে গণঅভ্যুত্থান হয় এরশাদের পতন হয়। 

১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক ফর্মুলাতে নির্বাচন হয়। বিএনপি অল্পের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা মিস করে। জামায়াত ১৮টি সিট পায়। জামায়াত বিএনপিকে সমর্থন দেয়, বিএনপির সরকার গঠন করে। এর কিছুদিন পরই সংসদে দাবী উঠে এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার। আওয়ামীলীগ এই দাবী উত্থাপন করে। বিএনপি এই দাবী প্রত্যাখ্যান করে। এই নিয়ে জামায়াত বিএনপিকে রাজী করানোর চেষ্টা করে। সেই সময় সংসদে মাওলানা নিজামী খালেদাকে বলেন আমরা মোটেই আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে ইচ্ছুক নয়। আমরা দেশগঠনে আপনাকে সহায়তা করতে রাজী। কিন্তু আপনি জোর করে আমাদের আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে বাধ্য করবেন না। কিন্তু সেই সময়ের অহংকারী খালেদা জিয়া সেটা মেনে নিতে অসম্মত হয়। জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আওয়ামীলীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে। কারণ তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু যতটা না আওয়ামীলীগের তার চাইতে বেশী জামায়াতের। 

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা মানতে বাধ্য হয় বিএনপি। ১৯৯৬ তে দু'বার নির্বাচন হয়। ১ম বার সকল বিরোধী দল বয়কট করে। পরবর্তিতে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন হয়। আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামীলীগ তার পূর্বের আচরণ মতই ধর্মনিরপেক্ষ হতে গিয়ে ইসলাম বিরোধী হয়ে উঠে। ভারতকে খুশি রাখার জন্য একের একের পর এক কালো অসম চুক্তি করতে থাকে। কয়েকটি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়। দাড়িটুপি নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হকের মত মানুষও তাদের হাতে লাঞ্চিত হয়। 

এই পরিস্থিতিতে জামায়াত আওয়ামীলিগের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এর মধ্যে পার্বত্য শান্তিচুক্তির মত দেশকে ভাগ করে দেয়ার চুক্তি করে সরকার। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখে বিএনপি ও জামায়াত। এই আন্দোলনই দুই শক্তিকে আবার একই মঞ্চে আনে। সেখানে এরশাদও ছিল। পরবর্তিতে চার দলীয় জোট গঠন হয়। প্রথমে এরশাদ জোটে ছিল, পরবর্তিতে সে বের হয়ে যায়। জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের ভারতপন্থীদের অত্যাচার হতে রক্ষা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। সেই জোট এখনো বিদ্যমান। এখনো এই জোটের মূল দাবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ঘটনা কি দাঁড়ালো? জামায়াত তার প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবীতে সবসময় অটল ছিল। কোন কোন রাজনৈতিক দল তাদের ইচ্ছেমত জামায়াতের সাথে আন্দোলন করেছে বা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। এবার পরিস্থিতি বিবেচনায় আপনি নিশ্চয়ই জামায়াতকে এই ইস্যুতে মুনাফিক বলতে চাইলেও বলতে পারবেন না।

এবার আসুন সমকামী ইস্যুতে। জামায়াত আমেরিকায় সমকামী হত্যায় নিন্দা জানিয়েছে। এতে উৎপুল্ল হয়ে আপনি জামায়াতকে সমকামী আখ্যা দিতে আপনার বাধে না। আপনি জামায়াতকে গে জামায়াত বলে উল্লাস করছেন আর বলছেন দেখ দেখ আগেই বলেছিলাম জামায়াত ইহুদী-নাসারা কওমে লুতের অনুসারী। এখন তো প্রমাণ হলো। 

এখানেও আপনার সমস্যা ওটাই। আপনার যে তথ্যের উপর ভিত্তি করে জামায়াতকে দোষারোপ করছেন সেটা সত্য। তবে হয় সব তথ্য আপনার কাছে নেই অথবা আপনি কিছু তথ্য গোপন করেছেন। 

আমেরিকায় এই ধরণের সাইকো হামলা নতুন নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে জামায়াতের বিবৃতি প্রদানের প্রয়োজন পড়ে নি। কারণ আগের প্রত্যেকটি ঘটনায় খুনী ছিল অমুসলিম। আর বিষয়টা নিয়ে রাজনীতিও হয়নি। সবাই ঐসব খুনীকে অপ্রকৃতস্থ বলেছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে আলোচনা হয়েছে তা হয়েছে অস্ত্র আইন সংশোধন করা দরকার। যারা প্রায়ই মাতাল হয় তাদের অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের দাবী উঠেছিল। কোন পক্ষ থেকেই দাবী জানানো হয় নি এটি একটি সাম্প্রদায়িক হত্যা। 

কিন্তু সমকামীদের হত্যাকারী হিসেবে যখনই একজন মুসলিম নাম এসেছে তখনই সারা বিশ্বে হইচই শুরু হয়েছে। তখন আর কেউ উমর মতিন নামে লোকটিকে কেউ মাতাল বলতে রাজী না, সমকামী বলতে রাজী না এখন তার পরিচয় সে একজন মুসলিম। ব্যাস সকল সন্ত্রাসী ঘটনার দায় নিতে হচ্ছে ইসলামকে। পুরো বিশ্বের মিডিয়া ইসলামকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। আর এই ঘটনায় তাল দেয়ার জন্য আছে CIA এবং মোসাদের যৌথ প্রযোজনার আই এস। কোন কিছু বিবেচনা করার আগেই তারা এই ঘটনার দায় স্বীকার করে। শুধু এই ঘটনা নয় সারা পৃথিবীর আনাচে কানাচে যে কোন যায়গায় কোন মুসলিম নামধারী কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করলেই তারা সেই ঘটনার দায় স্বীকার করে ইসলামকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে। এটা তাদের এজেন্ডা। 

এই ধরণের প্রতিটি ঘটনায় বিপদে পড়েন মুসলিমরা। তারা অমুসলিম দেশে তাদের স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। অযথা হয়রানির শিকার হন। সবচেয়ে বড় কথা হলো ক্ষতিগ্রস্থ হয় ইসলাম। ইসলাম তখন বিবেচিত হয় সন্ত্রাসীদের ধর্ম হিসেবে। অনেক নালায়েক আছেন যারা ভুল প্রয়োগের মাধ্যমে কুরআন হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে জায়েজ করার চেষ্টা করেন। 

জামায়াত সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তারা নিয়োজিত। সাধারণত তারা যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার সেটা যদি তাদের শত্রুর সাথেও হয়ে থাকে। আর সেই অন্যায় যদি ইসলামের বিরুদ্ধে হয়ে থাকে তবে সেখানে জামায়াত সবসময় সোচ্চার। এটা জামায়াত ঈমানের দাবী মনে করে। জামায়াতের বিবৃতি যতটা না ছিল নিহতদের প্রতি সংহতি বরং তার চাইতেও বেশী হচ্ছে ইসলামকে সমুন্নত করা। ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা। জামায়াত তার বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়ে দিচ্ছে এমন কোন হত্যাকান্ডকে ইসলাম সমর্থন করে না, করতে পারে না। এই হত্যাকান্ডের সাথে ইসলামপন্থীদের সংযোগ নেই। 

অবশ্যই ইসলামে সমকাম একটি ফৌজদারি অপরাধ। তবে এটা অবশ্যই ইসলামিক রাষ্ট্রে, যেখানের অধিকাংশ মানুষ সতঃস্ফুর্তভাবে ইসলামকে গ্রহন করবে। ইসলামিক কানুন মেনে চলবে। তবে ইসলাম কখনোই কোন ব্যক্তিকে কোন শাস্তি বিধানের অনুমতি দেয় না। বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড মেনে নেয় না। কুরআনে মুশরিকদের হত্যা করার জন্যও বলা হয়েছে তাই বলে কি আপনার অনুমতি আছে পাশের বাড়িতে শিরক করা কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষকে হত্যা করা? অথচ শিরক করা আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অপরাধ। হাদীসে সমকামীদের হত্যা করার জন্য বলা হয়েছে এর মানে এই নয় যে আপনি কোন সমকামীকে হত্যা করতে পারবেন বরং এই হাদীসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো সমকাম ঘৃণিত জিনিস, প্রকৃতি বিরুদ্ধ এবং ফৌজদারী অপরাধ। রাষ্ট্র শাস্তির ব্যবস্থা করবে, সাধারণ নাগরিকদের সেই অধিকার ইসলাম দেয়নি। 

এজন্য কুরআন, হাদীস যাই ব্যখ্যা করবেন সাবধানে করবেন। কোন সময় কি পরিস্থিতিতে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা এবং মুহাম্মদ সঃ এই কথাগুলো বলেছেন সেটা বিবেচনা করবেন। আর জামায়াতের ব্যাপারে নতুন করে কিছু বললাম না। জামায়াত সবসময় প্রস্তুত আপনাদের সমালোচনা গ্রহন করার জন্য। এটলিস্ট জামায়াত এই কাজটা ভালো পারে :)

শুক্রবার, ২৫ মার্চ, ২০১৬

মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং এর পর্যালোচনা


মাওলানা নিজামী কেমন ছিলেন এই ব্যাপারে আমি আমার পূর্বের পোস্টে উল্লেখ করেছি। তাই এখানে কোন রকম ভূমিকা ছাড়াই মূল আলোচনায় চলে যাচ্ছি। ২০১২ সালের ২৮ মে মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই জামায়াত নেতার বিচার শুরু হয়। মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে মোট ১৬টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল ৪টি অভিযোগে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে। আপীলের রায়ে সেখান থেকে একটি অভিযোগে খালাস দিয়ে বাকী তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। আর্টিকেলের আকার বড় হয়ে যাওয়াতে এখানে আমরা শুধু তিনটি অভিযোগ, যে অভিযোগগুলোতে মাওলানাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে সে অভিযোগগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করবো। 

অভিযোগ-১: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার চালানোর কারণে একাত্তরের ৪ জুন পাকিস্তানি সেনারা পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিনকে অপহরণ করে নূরপুর পাওয়ার হাউস ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নিজামীর উপস্থিতিতে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ১০ জুন তাকে ইছামতী নদীর পাড়ে আরো কয়েকজনের সঙ্গে হত্যা করা হয়।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-২: একাত্তরের ১০ মে বেলা ১১টার দিকে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ি গ্রামের রূপসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি সভা হয়। স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের উপস্থিতিতে ওই সভায় নিজামী বলেন, শিগগিরই পাকিস্তানি সেনারা শান্তি রক্ষার জন্য আসবে। ওই সভার পরিকল্পনা অনুসারে পরে ১৪ মে ভোর সাড়ে ৬টার দিকে বাউশগাড়ি, ডেমরা ও রূপসী গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে। প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে সেদিন ধর্ষণ করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা।
রায়ঃ মৃত্যুদণ্ড

অভিযোগ-৩: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মে মাসের শুরু থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ব্যবহৃত হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প হিসাবে। রাজাকার ও আলবদর বাহিনীও সেখানে ক্যাম্প খুলে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। নিজামী ওই ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র করতেন বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-৪: নিজামীর নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় রাজাকার বাহিনী পাবনার করমজা গ্রামে হাবিবুর রহমান নামে একজনকে হত্যা করে। ১৯৭১ সালের ৮ মে নিজামীর রাজাকার ও আলবদর বাহিনী ওই গ্রাম ঘিরে ফেলে নয়জনকে হত্যা করে। রাজাকার বাহিনী একজনকে ধর্ষণসহ বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-৫: ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে নিজামীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার আড়পাড়া ও ভূতেরবাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে ২১ জন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। সেখানে বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগও করা হয়।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-৬: নিজামীর নির্দেশে ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর পাবনার ধুলাউড়ি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজতে যায় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসর রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। তারা গ্রামের ডা. আব্দুল আউয়াল ও তার আশেপাশের বাড়িতে হামলা চালিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৫২ জনকে হত্যা করে।
রায়ঃ মৃত্যুদণ্ড

অভিযোগ-৭: একাত্তর সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে নিজামীর দেওয়া তথ্যে রাজাকার বাহিনীকে নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী পাবনার বৃশালিখা গ্রাম ঘিরে ফেলে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ সেলিমের বাবা সোহরাব আলীকে আটক করে। তাকে রাস্তায় নিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর স্ত্রী ও সন্তানদের সামনেই হত্যা করা হয়। 
রায়ঃ যাবজ্জীবন 

অভিযোগ-৮: একাত্তরের ৩০ আগস্ট ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ও আলবদর বাহিনীর প্রধান নিজামী তার সংগঠনের তখনকার সেক্রেটারি আলী আহসান মুজাহিদকে সঙ্গে নিয়ে নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলে যান এবং সেখানে আটক মুক্তিযোদ্ধা জহির উদ্দিন বিচ্ছু জালাল, বদি, রুমি (শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে), জুয়েল ও আজাদকে দেখে তাদের গালিগালাজ করেন। পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে নিজামী বলেন, রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আদেশের আগেই তাদের হত্যা করতে হবে। নিজামীর পরামর্শ অনুযায়ী পরে জালাল ছাড়া বাকি সবাইকে হত্যা করা হয়। 
রায়ঃ যাবজ্জীবন 

অভিযোগ-৯: নিজামী ও রাজাকার বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তানি বাহিনী পাবনার বৃশালিখা গ্রাম ঘিরে ফেলে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রফুল্ল, ভাদু, মানু, স্বস্তি প্রামানিক, জ্ঞানেন্দ্রনাথ হাওলাদার ও পুতুলসহ ৭০ জনকে হত্যা ও ৭২টি ঘরে অগ্নিসংযোগ করে।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-১০: মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে পাবনার সোনাতলা গ্রামের অনিল চন্দ্র কুণ্ডু নিরাপত্তার জন্য ভাই-বোনদের নিয়ে ভারতে চলে যান। পরে অগাস্টে তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। নিজামীর নির্দেশে রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা তার এবং আশেপাশের বহু মানুষের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-১১: একাত্তরের ৩ অগাস্ট চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউটে ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় নিজামী বলেন, পাকিস্তান আল্লাহর ঘর। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তিনি প্রিয় ভূমির হেফাজত করছেন। দুনিয়ার কোনো শক্তি পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে পারবে না। সেদিন তার উপস্থিতিতেই নিরীহ বাঙালিদের ওপর হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের জন্য ইসলামী ছাত্র সংঘ, আলবদর, রাজাকারদের মতো সহযোগী বাহিনীগুলোকে উসকানি দেওয়া হয়।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-১২: একাত্তরের ২২ অগাস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক একাডেমি হলে আল মাদানীর স্মরণসভায় নিজামী বলেন, যারা পাকিস্তানকে ভাঙতে চায়, তারা ইসলামের শত্রু। পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে ইসলামের শত্রুরা অস্ত্র হাতে নিয়েছে মন্তব্য করে পাকিস্তানের শত্রুদের নির্মূল করার আহ্বান জানান তিনি।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-১৩: ওই বছর ৮ সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ইসলামী ছাত্রসংঘের সভায় নিজামী বলেন, পাকিস্তানের অখণ্ডটা রক্ষায় হিন্দুস্তানের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে রাজাকার, আলবদর সদস্যরা প্রস্তুত। উসকানিমূলক ওই বক্তব্যে মুক্তিকামী বাঙালিকে ভারতের সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-১৪: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১০ সেপ্টেম্বর যশোরে রাজাকারদের প্রধান কার্যালয়ে এক সুধী সমাবেশে নিজামী প্রত্যেক রাজাকারকে ইমানদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-১৫: একাত্তরের মে মাস থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে রাজাকার ক্যাম্প ছিল। নিজামী প্রায়ই ওই ক্যাম্পে গিয়ে রাজাকার সামাদ মিয়ার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করতেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়।
রায়ঃ খালাস

অভিযোগ-১৬: মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের ঊষালগ্নে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে আলবদর বাহিনী। দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার জন্য পরিকল্পিতভাবে আলবদর সদস্যরা ওই গণহত্যা ঘটায়। জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে ওই গণহত্যার দায় নিজামীর ওপর পড়ে। 
রায়ঃ মৃত্যুদণ্ড

২ নং অভিযোগের পর্যালোচনাঃ 
অভিযোগ-২: একাত্তরের ১০ মে বেলা ১১টার দিকে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ি গ্রামের রূপসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি সভা হয়। স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের উপস্থিতিতে ওই সভায় নিজামী বলেন, শিগগিরই পাকিস্তানি সেনারা শান্তি রক্ষার জন্য আসবে। ওই সভার পরিকল্পনা অনুসারে পরে ১৪ মে ভোর সাড়ে ৬টার দিকে বাউশগাড়ি, ডেমরা ও রূপসী গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে। প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে সেদিন ধর্ষণ করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা।

এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের চারজন সাক্ষী ছিলেন। যাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মাওলানা নিজামীকে ফাঁসী দেয়া হয়। আসুন দেখি সাক্ষীদের অবস্থা কেমন ছিল। 

১- রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মোঃ আইনুল হক একাত্তরের ১৪ মে কথিত হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় মাওলানা নিজামী উপস্থিত ছিলেন- এ ধরণের কোনো বর্ণনা দেননি। তিনি ঘটনার দিন শান্তি কমিটি গঠনের বিষয়ে মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলেননি। তদন্ত কর্মকর্তার নিকট বলেছেন এক কথা, কোর্টে এসে বলেছেন আরেক কথা। কাজেই মতিউর রহমান নিজামী সাহেব সম্পর্কে তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। 

২- রাষ্ট্রপক্ষের আরেক সাক্ষী শামসুল হক নান্নু এতো বেশি অসত্য তথ্য ট্রাইব্যুনাল এবং তার বাইরে প্রদান করেছেন তাকে বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। উপরন্তু তার বক্তব্য যে কতটা অসাড় তার প্রমাণ হলো তার নিজের বক্তব্য- ‘২৪ মার্চ পাবনা আলিয়া মাদরাসার নিকটবর্তী দোকানদার সেকেন্দার আলীর নিকট থেকে জানতে পারি যে, ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা আব্দুস সোবহান, মাওলানা ইছহাক, রফিকুন নবী ওরফে বাবলু পাবনা আলিয়া মাদরাসায় বসে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য ও সহযোগিতা করার জন্য একটি স্বাধীনতা বিরোধী সেল গঠন করে’ অর্থাৎ স্বাধীনতা ঘোষণার আগেই স্বাধীনতা বিরোধী সেল গঠনের কথা তিনি বলেছেন, এটি হাস্যকর বক্তব্য। আর দুই বছর বয়সে মাওলানা নিজামীকে বোয়াইলমারী মাদরাসায় পড়তে দেখা। 

৩- শামসুল হক নান্নু তার তার এক ভিডিও বক্তব্যে সে বর্ণনা করেছে সে বাধ্য হয়ে নিজামীর বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্য দিচ্ছে। তার ছেলেকে বিসিএস ক্যাডার বানানোর জন্য স্বাক্ষ্য দিচ্ছে। সে তার ভিডিও বক্তব্যে আরো বলেছে হত্যাকাণ্ড যা হয়েছে পাকিস্তানীরা করেছে নিজামীকে আমদা দেখি নাই, তার নামও শুনি নাই। এই ব্যাপারে আমি আর বিস্তারিত বলছি না, দয়া করে তার বক্তব্য শুনুন। 

৪- প্রসিকিউশনের সাক্ষী জামাল উদ্দিন-এর এই ঘটনা সম্পর্কে কোনো প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই। তিনি সাক্ষী মো.আইনুল হক ও শামসুল হক নান্নুর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন। এই দু’জনের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ায় তাকেও বিশ্বাস করা যায় না। 

৫- সাক্ষী জহুরুল হক এই মামলার তদন্ত সমাপ্ত হওয়ার পরে প্রসিকিউশনের সাজানো সাক্ষী হিসেবে হাজির করায় তাকে বিশ্বাস করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তদুপরি তিনি দাবি করেন ঘটনার রাতে তিনি বাউশগাড়ি শহীদ আব্দুল জব্বারের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অথচ তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক খানকে জেরা করার সময় তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন বাউশগাড়ী গ্রামে আব্দুল জব্বার নামে ঐদিন শহীদ কোনো ব্যক্তির নাম তিনি পান নাই। সাক্ষী জহুরুল হক তদন্ত কর্মকর্তার সাথে তার দেখা হওয়ার বিষয়েও মিথ্যাচার করেছেন। কারণ তার মতে ১৭ মে, ২০১৩ তারিখের আগে তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে দেখা হয় নাই, দেখা যায় তিনি মূল তদন্তের সময় ২০১০ এর ৬ নভেম্বর তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে দেখা করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা সেটা স্বীকার করেছেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি একজন মিথ্যাবাদী ও সাজানো সাক্ষী।

৬- আরেকজন প্রত্যক্ষ্যদর্শী সাক্ষী আযহার প্রামানিক যিনি ঐ দিন ঐ ঘটনায় আর্মীর গুলিতে আহত হয়েছিলেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে মাওলানা নিজামী সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। তাকে দিয়ে মিথ্যা বলাতে না পারায় শেষ পর্যন্ত তাকে কোর্টে হাজির করা হয়নি। 

৬ নং অভিযোগের পর্যালোচনাঃ 
অভিযোগ-৬: নিজামীর নির্দেশে ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর পাবনার ধুলাউড়ি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজতে যায় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসর রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। তারা গ্রামের ডা. আব্দুল আউয়াল ও তার আশেপাশের বাড়িতে হামলা চালিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৫২ জনকে হত্যা করে।

এই অভিযোগের তিনজন সাক্ষী ছিলেন। যাদের কথার উপর ভিত্তি করে আদালত মাওলানা নিজামীকে ফাঁসীর আদেশ দেয়। আসুন তাদের সাক্ষ্যের নমুনা দেখি। 

১- উক্ত চার্জের সাক্ষী মোঃ শাহজাহান আলী মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে বক্তব্য গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ তিনি বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৮ নবেম্বরের আগে মাওলানা নিজামীকে আমি দেখেছি, আনোয়ারুল হকের নির্বাচনী জনসভায়। নির্বাচনী জনসভা গৌরী গ্রামে হয়েছিল। গৌরী গ্রামটি সাথিয়া থানাধীন, আমার গ্রাম থেকে ৫ মাইল দূরে। এই জনসভা শুনতে আমি যাই নাই।’ তিনি যদি জনসভায় না-ই যান তবে সেই জনসভায় মাওলানা নিজামীকে কিভাবে দেখলেন? সতরাং তিনি জেরায় অসত্য তথ্য দিয়েছেন। 

২- তিনি স্বীকার করেছেন যে, তিনি টিভি চ্যানেলে অনেকবার সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তবে তিনি দিগন্ত টি.ভি, চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন কিনা মনে করতে পারেন নাই। দু’বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তার স্মরণশক্তি কমে গিয়েছে, কখন কি বলেন তা মনে থাকে না বলে তিনি দাবি করেন। তবে তিনি সেই সাক্ষাৎকার সমূহে ‘১৯৮৬ সালের নির্বাচনের আগে মাওলানা নিজামীকে দেখেননি’ বলে বলেছিলেন সেটা অস্বীকার করেন। ডিফেন্স সেই সাক্ষাৎকার সমূহের ভিডিও সমূহ প্রদর্শন করেছে। সেখানে দেখা যায় যে, তিনি মাওলানা নিজামীকে ১৯৭১ সালে দেখার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এই সাক্ষী শপথ করে কাঠগড়ায় এসে তার পূর্বোক্ত সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলায় তার সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ নেই। 

৩- উপরন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন তার স্মরণশক্তি কমে গেছে তিনি কখন কি বলেন তা মনে থাকে না। সুতরাং ৪৩ বছর আগের বিষয়ে এ ধরণের স্মৃতিশক্তিহীন ব্যক্তির সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি জেরার জবাবে বলছেন, তিনি পাবনা সাঁথিয়ার মিয়াপুর হাজী জসিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে এসএসসি পাশ করেছেন। অথচ তিনি তার জবানবন্দীতে বলেছেন, তিনি ১৯৭১ সালের যুদ্ধে আহত হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেলে চার বছর চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেছেন, তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের পর সর্বপ্রথম পাবনায় ১৯৭৫ সালে যান। অতএব তিনি হয় ১৯৭২ সালে পাবনার একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার ব্যাপারে মিথ্যা বলেছেন অথবা চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ৪ বছর অবস্থান শেষে ১৯৭৫ সালে সর্বপ্রথম পাবনা যাওয়ার ব্যাপারে মিথ্যা বলেছেন। সুতরাং এই স্ব-বিরোধী ও সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রদানকারী সাক্ষী বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং তার জবানবন্দী গ্রহণযোগ্য নয়। 

৪- এই সাক্ষী জেরায় স্বীকার করেছেন যে, ব্যাংক ডাকাতিতে সহযোগী তার অভিযোগে সোনালী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হন। তিনি এই চাকরিচ্যুতির আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করেননি। সুতরাং এই সাক্ষী অসৎ এবং তার সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়। 

৫- তিনি তার জবানবন্দীতে বলেছেন যে, তার সাথে যেসকল মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মধ্যে তাকে ছাড়া তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়। অথচ সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেন, শাহজাহান ছাড়াও আরও একজন বেঁচে যান তার নাম মাজেদ। সাক্ষী শাহজাহান আলী পরে স্বীকার করেন যে, মাজেদ এখনও জীবিত আছেন। এই ধরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি অসত্য তথ্য দেয়ায় তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। 

৬- উক্ত অভিযোগের আরেক সাক্ষী মোঃ খলিলুর রহমানের মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে দেয়া বক্তব্য গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ তিনি বলেছেন, ২৭ নবেম্বর দিবাগত রাতে রাত সাড়ে ৩টায় চাঁদের আলোয় তিনি মাওলানা নিজামীকে দেখেছেন। অথচ ঐদিন বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী চন্দ্র অস্ত গিয়েছিল রাত ১টা ২৩ মি. ৫৪ সেকেন্ডে। সুতরাং তার চাঁদের আলোয় মাওলানা নিজামীকে দেখার বিষয়টি অসত্য। 

৭- তার বক্তব্য অনুযায়ী তার সহযোদ্ধাদের মধ্যে ২ জন (শাহজাহান ও মাজেদ) বাদে সকলে ঐদিন নিহত হন। পরে তিনি জেরায় বলেন, উক্ত ২ জন এবং কুদ্দুস ছাড়া তার গ্রুপের বাকী সবাই নিহত হন। পরে তিনি আবার স্বীকার করেন, উক্ত তিন জন ছাড়াও তার গ্রুপের সালাম ঐদিন বেঁচে যায়। একই সাথে তার তিন ধরণের বক্তব্য প্রদান থেকেই বুঝা যায় তিনি অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন। 

৭- তিনি বলেছেন, ঘটনাস্থল ধুলাউড়ি গ্রামে তার আত্মীয় গফুর সাহেবের বাড়িতে তিনি ১৯৭১ সালে যাতায়াত করতেন। কিন্তু তিনি একই সাথে উক্ত গফুর ঐ সময় বিবাহিত নাকি অবিবাহিত ছিলেন বলতে ব্যর্থ হন। তিনি যদি ঐ সময়ে তার উক্ত আত্মীয়ের বাড়িতে সত্যই বেড়াতে যেতেন তবে তিনি অবশ্যই বলতে পারতেন উক্ত আত্মীয় ঐ সময়ে বিবাহিত না অবিবাহিত ছিলেন। সুতরাং বলা যায় ঐ সময়ে তার ঘটনাস্থলে যাতায়াতের বিষয়ে তিনি মিথ্যা বলেছেন। 

৮- তিনি দাবি করেছেন যে, মাওলানা নিজামী তার পাশের গ্রামের লোক হওয়ায় এবং তার গ্রামে মাওলানা নিজামীর বোন বিয়ে দেয়ায় তিনি ১৯৭১ সালের আগে থেকেই তিনি তাকে চিনতেন এবং তিনি শুনতে পেয়েছেন যে, নিজামী ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। তিনি দাবী করেছেন তিনি নিজামী সাহেবকে পারিবারিকভাবে চিনতেন অথচ জেরার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মাওলানা নিজামীদের কতজন ভাই-বোন বা মাওলানা নিজামী কোথায় কোথায় লেখাপড়া করেছিলেন তা বলতে ব্যর্থ হন। তিনি মাওলানা নিজামীর পিতার ব্যাপারেও কিছু বলতে ব্যর্থ হন। সুতরাং এতেই প্রমাণিত হয় যে, প্রসিকিউশনের শেখানো মতে তিনি নিজামীকে জড়িয়ে কথাগুলো বলেছেন, বাস্তবে আদৌ তিনি নিজামী সাহেবকে চিনতেন না। 

৯- তিনি স্বীকার করেছেন যে, রেজাউল করিম নামে সাঁথিয়ার একজন সাঁথিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে একটি বই লিখেছেন, উক্ত বই ডিফেন্স পক্ষ দাখিল করেছে। উক্ত বইয়ের ২৭-২৮ পৃষ্ঠায় ধুলাউড়ি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা রয়েছে কিন্তু মাওলানা নিজামী সেখানে উপস্থিত ছিলেন মর্মে কোনো বর্ণনা নেই। এখান থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, মাওলানা নিজামী সাহেব উক্ত ঘটনার সাথে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট নন। তিনি তার জবানবন্দীতে প্রদত্ত ‘ঐদিন রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে হঠাৎ করে আর্মীদের পায়ের বুটের শব্দ শুনতে পাই। তখন আমি ঐ বাড়ির ঘরের পূর্ব দক্ষিণ দিকের জানালা খুলে দেখতে পাই যে, মাওলানা নিজামী এবং কিছু দখলদার বাহিনী এবং কিছু রাজাকারসহ আমাদের ঘরের দিকে আসছে।’ বক্তব্যটি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বলেছেন বলে দাবি করেন। অথচ তদন্তকারী কর্মকর্তা তার জবানবন্দীতে অস্বীকার করেন যে, উক্ত সাক্ষী তার নিকট উক্ত কথাগুলি বলেছেন। যে ব্যক্তি মাত্র কয়েক বছর আগে প্রদত্ত জবানবন্দীর ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলতে পারে, তিনি ৪২ বছর আগের ঘটনা সম্পর্কেও মিথ্যা কথা বলতে পারেন। সুতরাং এই সাক্ষীকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না। 

১০- সাক্ষী মোঃ জামাল উদ্দিন এর বক্তব্যও এই ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়, কেননা তিনি প্রত্যক্ষদর্শী নন এবং এ ঘটনা তিনি সাক্ষী মো.শাহজাহান আলীর কাছ থেকে শুনেছেন। যেহেতু সাক্ষী মো.শাহজাহান আলীর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় সুতরাং তার কাছ থেকে শোনা সাক্ষী জামালউদ্দিনের বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। 

১১- প্রসিকিউশনের প্রদর্শিত বই এবং ডিফেন্স পক্ষ কর্তৃক প্রদর্শিত বইতে ধুলাউড়ি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা আছে, অথচ কোথাও মাওলানা নিজামীর সংশ্লিষ্টতার কথা আসেনি। অর্থাৎ প্রসিকিউশনের প্রদর্শিত দলিলেই ঘটনার সাথে মাওলানা নিজামীর সংশ্লিষ্টতার কথা আসেনি, সুতরাং মাওলানা নিজামী এই ঘটনার সাথে অপরাধী সাব্যস্থ করা জুলুমের নামান্তর। 

১৬ নং অভিযোগের পর্যালোচনাঃ
অভিযোগ-১৬: মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের ঊষালগ্নে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে আলবদর বাহিনী। দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার জন্য পরিকল্পিতভাবে আলবদর সদস্যরা ওই গণহত্যা ঘটায়। জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে ওই গণহত্যার দায় নিজামীর ওপর পড়ে।

১- তদন্তকারী কর্মকর্তার জবানবন্দীসহ অন্যান্য প্রমাণপত্র হতে দেখা যায়, তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের সময় মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়নি। পরবর্তীকালে ফরমায়েশী সাক্ষী সংগ্রহের মাধ্যমে অনেককেই এই অভিযোগের সমর্থনে সাক্ষী মান্য করা হলেও শুধুমাত্র উল্লেখিত দুজন সাক্ষী ছাড়া প্রসিকিউশন পক্ষ কোনো সাক্ষীকে আদালতে উপস্থিত করতে পারেন নাই। 

২- অপরাধের সময়কাল: চার্জ গঠনের আদেশে উক্ত অপরাধ সংঘটনের সময়কাল সুনির্দিষ্টভাবে বলা না থাকলেও বলা হয়েছে প্রধানত: অপরাধসমূহ সংঘটিত হয়েছে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ অথবা এর আশেপাশের সময়ে। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড শুরু হয় ১৫ নভেম্বর ১৯৭১ সাল থেকে। এর সমর্থনে প্রসিকিউশন একটি বই দাখিল করেছে। এই চার্জের সমর্থনে প্রসিকিউশনের দুইজন মাত্র সাক্ষী যে দু’টি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সে দু’টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ১৫ নভেম্বর এবং ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। এখন বিচার্য বিষয় হলো উক্ত সময়ে মাওলানা নিজামী ছাত্র সংঘের সভাপতি হিসেবে আলবদরের প্রধান ছিলেন কি না? 

৩- ছাত্রসংঘ প্রধান: প্রসিকিউশনের দাবী মতে মাওলানা নিজামী সাহেব ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। ডিফেন্সের প্রদর্শিত ডকুমেন্ট থেকে দেখা যায় ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ এর পরে মাওলানা নিজামী নন বরং তাসনীম আলম মানজার ছাত্র সংঘের প্রধান ছিলেন। সুতরাং ছাত্র সংঘের সভাপতি হিসেবে পদাধিকার বলে আলবদর প্রধান হিসেবে ৩০ সেপ্টেম্বরের পরে সংঘটিত অপরাধের সাথে মাওলানা নিজামীকে জড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। 

৪- আলবদর প্রধান: প্রসিকিউশনের প্রদর্শিত ডকুমেন্ট অনুযায়ী ৪ ডিসেম্বরের একটি সভায় আলবদর প্রধান হিসেবে মতিউর রহমান নিজামী নন বরং অন্য একজন উপস্থিত আছেন মর্মে দেখা যায়। সুতরাং প্রসিকিউশন ডকুমেন্টের থেকেই একথা প্রমাণিত যে মাওলানা নিজামী আলবদর প্রধান ছিলেন না। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী আলবদর একটি সশস্ত্র অক্সিলারি বাহিনী যার স্বতন্ত্র সাংগঠনিক কাঠামো, মিলিটারি ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা, বেতনভাতা ও অস্ত্রশস্ত্র ছিল। একজন বেসামরিক ব্যক্তির এরকম একটি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রসিকিউশনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মাওলানা নিজামী ১৯৭১ সালের পুরো সময়েই একজন বেসামরিক ব্যক্তি ছিলেন। সুতরাং নিজামী সাহেবের আলবদর বাহিনীর প্রধান হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এ সংক্রান্তে যুগোশ্লাভিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আপিল বিভাগেProsecutor VS Timohir Blaskic, Case No. IT-95-14-A para-114 মামলায় একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে যে, একই ব্যক্তি একই সাথে বেসামরিক নাগরিক এবং সামরিক কর্মকর্তা হতে পারেন না। 

৫- মতিউর রহমান নিজামী সাহেব আলবদরের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন মর্মে প্রসিকিউশন ৪টি বই দাখিল করেছে। উক্ত বইসমূহের আলোচনায় স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে যে, কিভাবে রেফারেন্স বিকৃত করে অথবা রেফারেন্স ছাড়াই আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসাবে মাওলানা নিজামীকে চিত্রিত করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রসিকিউশন প্রদর্শিত দুটি বইতে মাওলানা নিজামীকে আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা দাবি করা হয়েছে। উক্ত বই দুটির আলোচনায় দেখানো হয়েছে যে, একটিতে ভুল রেফারেন্সে এবং অন্যটিতে রেফারেন্স ছাড়াই এ দাবিটি করা হয়েছে এবং বই দুটির লেখকদের ১৯৭১ সালের ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই। উল্লেখিত ৬টি বইই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ১৯৮৬ সালের পরে লিখিত। সুতরাং নি:সন্দেহে বলা যায়, মাওলানা নিজামীর সাথে আলবদরের কোনো দূরতম সম্পর্ক ছিল একথা প্রমাণে প্রসিকিউশন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। 

৬- আলবদরের পরিচয়পত্র হিসেবে প্রসিকিউশন এই মামলায় ১১টি প্রদর্শন করেছে। উক্ত কার্ডগুলি প্রদর্শনকারী তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় স্বীকার করেন উক্ত পরিচয়পত্রসমূহ ইস্যু করেছেন একজন ক্যাপ্টেন। এর ইস্যুকারী এবং প্রতিস্বাক্ষরকারী উভয়েই পাকিস্তানী আর্মি অফিসার। নিজামী সাহেব যদি আলবদর প্রধান হতেন এবং এর উপর যদি তার কমান্ড এবং কন্ট্রোল থাকতো তাহলে অবশ্যই তার স্বাক্ষর থাকতো। এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, তিনি আলবদরের প্রধান ছিলেন না এবং আলবদর বাহিনী তার কমান্ড এবং কন্ট্রোলে ছিল না। 

৭- আলবদরের প্রতিষ্ঠা এবং এর কমান্ড ও কন্ট্রোল: প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল একাত্তরের ১৬ মে ময়মনসিংহ জেলার শেরপুরে এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তরুণ মেজর রিয়াদ হোসাইন মালিক এবং এর প্রথম কমান্ডারের নাম ছিল কামরান। সুতরাং প্রসিকিউশনের ডকুমেন্ট দ্বারাই প্রমাণিত যে, মাওলানা নিজামী আলবদরের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন না এবং প্রধানও ছিলেন না। ডিফেন্সপক্ষ কর্তৃক দাখিলকৃত তৎকালীন পাক বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডার জেনারেল নিয়াজি কর্তৃক লিখিত বই The Betrayal of East Pakistan। উক্ত বইয়ের ৭৮-৭৯ পৃষ্ঠায় জেনারেল নিয়াজি স্পষ্টভাবে বলেছেন, আলবদর বাহিনী ছিল রাজাকার বাহিনীর একটি শাখা যার প্রতিষ্ঠা এবং কমান্ড ও কন্ট্রোলে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ডিফেন্সপক্ষ কর্তৃক দাখিলকৃত THE VANQUISHED GENERALS AND THE LIBERATION WAR OF BANGLADESH একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক বই, যেখানে ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের বিশেষভাবে জেনারেল রাও ফরমান আলী ও জেনারেল নিয়াজির সাক্ষাৎকার লিপিবদ্ধ আছে। বইটির ১৪৯-১৫০ পৃষ্ঠায় জেনারেল রাও ফরমান আলী সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, রাজাকার আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা এবং কমান্ড ও কন্ট্রোলে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তা বিশেষভাবে জেনারেল নিয়াজি। জেনারেল নিয়াজি তার সাক্ষাৎকারে ১৬৪-১৬৫ পৃষ্ঠায় বলেছেন, অনেকে বলে রাজাকার আলবদর জামায়াতে ইসলামীর। এটা সত্য নয়। আমিই রাজাকার-আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠা করি এবং আমিই এটা নিয়ন্ত্রণ করতাম, আমি রাজনীতিবিদদের ঘৃণা করতাম এবং জামায়াতের লোকদেরকে আমার কাছে ঘেষতে দিতাম না। এখান থেকেই পরিষ্কার হয় যে, মাওলানা নিজামী নন বরং পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিশেষভাবে জেনারেল নিয়াজি ছিলেন আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা এবং নিয়ন্ত্রক। 

৮- প্রসিকিউশন ১৯৭১ সালে মাওলানা নিজামীর খবর সম্বলিত ২১টি পেপার কাটিং এবং ৬টি গোয়েন্দা রিপোর্ট প্রদর্শন করেছে। এর কোন একটিতেও বলা হয়নি যে, মাওলানা নিজামী আলবদর বাহিনীর সাথে কোনভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন অথবা তিনি আলবদরের কোনো বৈঠকে উপস্থিত হয়েছেন। অথচ এ সমস্ত পত্র-পত্রিকা ও গোয়েন্দা রিপোর্ট সমূহে আল বদরের অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। যা চুড়ান্তভাবে প্রমাণ করে যে, নিজামী সাহেব আলবদরের সাথে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। 

৯- বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড বিষয়ে ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত পর্যন্ত ৪২টি মামলা হয়েছে। যদিও তদন্তকারী কর্মকর্তা ৪২টি মামলা হওয়ার বিষয়ে তার অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তার প্রদর্শিত বই “একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়” হতে দেখা যায়, বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের বিষয়ে ৪২টি মামলা ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত দায়ের হয়েছে। তার প্রদর্শিত বই থেকে আরও দেখা যায় যে, বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডটির পরিকল্পনা হামিদুল হকের মালিকানাধীন অবজারভার পত্রিকার অফিসে হামিদুল হকের কক্ষেই সম্পন্ন হয়। এছাড়াও ভিডিও ডকুমেন্ট “রণাঙ্গনের দিনগুলি” হতে দেখা যায়, খান এ সবুরের বাড়ি থেকে মিরপুর মুক্ত হওয়ার পর বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের নীল নকশা উদ্ধার করা হয়েছিল। ঐ নীল নকশার বিবরণ বা নীল নকশাটি তদন্তকারী কর্মকর্তা সরকারের নিকট আবেদন করেও পান নাই অর্থাৎ তা আটকে রাখা হয়েছে। অন্যান্য দলিলপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের বিষয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক জহির রায়হানকে আহবায়ক করে একটি বেসরকারি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল যার অন্যতম সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার মওদূদ আহমেদ এবং ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম। ঐ কমিটির নথিপত্র জহির রায়হান সাহেবের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতীম একটি দেশের একজন সাংবাদিকের হাতে তুলে দেয়া হয়, যা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ সংগ্রহের কোনো প্রচেষ্টা করেন নাই বা ঐ কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদূদ আহমেদ ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের সাথেও যোগাযোগ করেননি। এ বিষয়ে সরকার কর্তৃক একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা আমরা বিভিন্ন দলিলপত্র হতে দেখতে পাই কিন্তু এ বিষয়ে ঐ কমিটি কি রিপোর্ট দিয়েছিল বা কি কি তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন সে বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো বক্তব্য দেন নাই। তদন্ত সংস্থা কর্তৃক সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে ১৯৭২ সালে প্রণীত স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা তদন্ত সংস্থায় প্রেরিত হলেও তিনি তা সংগ্রহ করেননি বা বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের মামলা সমূহে কি বর্ণনা ছিল তা তিনি জানারও চেষ্টা করেননি। এরপরও যে ২ জন ব্যক্তিকে এই মামলায় সাক্ষী হিসেবে আনা হয়েছে অর্থাৎ শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী এবং শহীদ ডা. আজহারের স্ত্রী সালমা হক তাদের স্বামীদের হত্যাকান্ডের বিষয়ে মামলা হওয়ার কথা স্বীকার করলেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঐ মামলার আসামী সম্পর্কে কোনো বক্তব্য দিতে চাননি তবে শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেছেন যে, ডা. আলীম চৌধুরীর মামলাটি নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে। 

১০- এই দু’টি হত্যাকান্ডের বিষয়ে তদন্তে দালাল আইনে রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছিল। ঐ রিপোর্ট দাখিলের পূর্বে নিশ্চিতভাবে এই দুই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন তারা মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে কোনো বক্তব্য প্রদান করেননি তা স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায়। সাক্ষ্য প্রমাণ বিশ্লেষণে আমরা আরও দেখতে পাই, ঐ দুই হত্যাকাণ্ড সংক্রান্তে স্বাধীনতার পরপরই দুজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাদেরকে ছেড়েও দেয়া হয়েছিল। তারা মাওলানা নিজামী সাহেবের অনুগত ব্যক্তি ছিলেন এই মর্মে কোনো প্রমাণ নাই। উপরন্তু ঐ দুই সাক্ষী যেভাবে মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দিয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ নাই। কেননা তাদের এই বক্তব্যসমূহ তারা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট দেয়া জবানবন্দীর সময় বলেননি। তদন্তকারী কর্মকর্তা এই চার্জের তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পর্কে যে বক্তব্যের অবতারণা করেছেন তা মিথ্যাচার ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। কারণ তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরে তিনি এই মামলার তদন্ত অব্যহত রাখেন অতিরিক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। এই তদন্তের ধারাবাহিকতাতেই ১৩ তম সাক্ষী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীকে সাক্ষী মান্য করেন যে বিষয়ে তিনি চীফ প্রসিকিউটর বরাবরে ২০১৩ সালের ২০ জানুয়ারির স্মারক নং- আন্ত: অপ: ট্রাই:/তদন্ত সংস্থা/৮৮ মূলে প্রেরিত চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, তিনি ৩০ অক্টোবর উক্ত সাক্ষীর জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করেন। অথচ তিনি তার জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন যে, তার সহযোগী তদন্তকারী কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম উক্ত সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করেন ২০১১ সালের ১০ মার্চ। দেখা যাচ্ছে যে, তদন্তের ধারাবাহিকতাতেই এই সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণের কথা বললেও এই তদন্তের কয়েক মাস পূর্বেই উক্ত সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়েছে যা অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব। ইতিহাস পিছন দিকে ঘুরলেই ২০১১ সালের ১০ মার্চ তারিখটি ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর হওয়া সম্ভব। কাজেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংক্রান্তে মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগটি ফরমায়েশী এবং সাক্ষ্য প্রমাণও অনুরূপভাবে গৃহিত। 

১১- সাক্ষী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী তার জেরায় যে সমস্ত বিষয়ে স্বীকার করেছেন তাতে খুব সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, তিনি আদালতে অসত্য জবানবন্দী দিয়েছেন। সাক্ষী সালমা হক তার মামাতো ভাই ইকবাল আর্সালান বর্তমানে কি করেন তা বর্ণনা করতে পারেন, তার খালার স্বামী অর্থাৎ খালু ১৯৭১ সালে কিভাবে নিহত হয়েছেন তার বর্ণনা দিতে পারেন, কিন্তু তার মামা ডা. আসজাদ কোনো সময় জামায়াতে ইসলামী থেকে এম পি নির্বাচিত হয়েছিলেন কিনা বা আদৌ কোনো সময় এম পি নির্বাচিত হয়েছিলেন কিনা তা জানেন না বলায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তিনি ট্রাইব্যুনালে ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য গোপন করে অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন। সর্বশেষ ফরমাল চার্জের অসংলগ্ন ও অসত্য বক্তব্য, সে অনুযায়ী চার্জ গঠন, সাক্ষীদের অসংখ্য অসত্য তথ্য প্রদান, মিথ্যাচার, তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তে গাফিলতি, তথ্য গোপন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তদন্ত না করা এবং জেরা ও জবানবন্দীতে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া, পক্ষাশ্রিত ঘোষিত মিথ্যাচারী ব্যক্তিদের বই পুস্তককে সাক্ষ্য হিসেবে দাখিল করা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাখিলি দলিলপত্র ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন না করা প্রমাণ করে যে, মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

আমার বক্তব্য বুঝার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে কিছু প্রামাণ্য চিত্র।
১ নং ডকুমেন্টারি 
২ নং ডকুমেন্টারি
৩ নং ডকুমেন্টারি
৪ নং ডকুমেন্টারি

এত বিশাল আলোচনার পর আমি বিচারবিভাগ নিয়ে কোন মন্তব্য করতে চাইনা। কেবল মহান বিচার দিনের জন্য অপেক্ষা। সেদিন নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা সেদিন সুবিচার করবেন।

বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১৬

আমার নেতা, আমার অহংকার


মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে ২৮ অক্টোবরের কথা। ২০০৬ সালে পল্টনের সেই ভয়াল দিনে মাওলানা নিজামী যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন পল্টনে চলছিল যুদ্ধাবস্থা। তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে শান্তভাবে তার বক্তব্য চালিয়ে গিয়েছেন। বার বার বলছিলেন শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে। নেতা কর্মীদের বার বার নির্দেশ দিচ্ছেন সবাই যাতে শান্ত থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে। সেদিন জামায়াত-শিবিরের শত শত নেতাকর্মীরা হতাহত হলেও মাওলানা নিজামীর ধৈর্য্য ধরার কঠোর নির্দেশ তারা পালন করে। একজন নেতার কঠোর দূর্যোগ মুহুর্তেও ঠায় দাঁড়িয়ে ধৈর্য্যের উপদেশ দিতে পারার হিম্মত মাওলানা নিজামীকে না দেখলে বোধহয় আমাদের দেখার সুযোগ হতো না। মাওলানা নিজামী ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে তার ছাত্ররাজনীতি শুরু করেন । ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। পরপর তিন বছর তিনি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রআন্দোলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দুইবার তিনি গোটা পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মওলানা নিজামী ছাত্রজীবন শেষ করে বৃহৎ ইসলামী আন্দোলন জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ১৯৭৮-১৯৮২ পর্যন্ত তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩-১৯৮৮ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি । ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং আমীর নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত (২০০০সাল) দায়িত্ব পালন করেন। ষাটের দশকে আইয়ুব সরকার বিরোধী আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী ৯০ এর আন্দোলন, ৯৬ তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রর্বতনের আন্দোলন সহ তিনি অন্যান্য সকল রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আপামর জনতার সাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর তিনি। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচিত হন ২০০১-২০০৩ এবং ২০০৪-২০০৬ সেশনে। তিনি ২০০৭-২০০৯ এবং ২০১০-২০১২ সেশনে পুনরায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বচিত হন ।

সুস্থ রাজনীতির চর্চাঃ
বাংলাদেশের কলুষিত রাজনৈতিক চর্চায় গুণগত পরিবর্তন আনার জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন শুরু থেকেই। ১৯৯১ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে তার দেয়া বক্তব্য তিনি রাজনীতিতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের কেমন আচরণ কেমন হওয়া উচিত এই বিষয়ে এই বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রথমে সরকারি দলকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন শিক্ষণীয় ভূমিকা নিতে হবে তাদেরকেই। জাতি এটাই কামনা করে। পরমত সহিষ্ণুতা দেখাতে হবে। বিরোধী দলের সমালোচনা সহ্য করার অনুরোধ করেন। সেই সাথে তিনি বিরোধী দলের ব্যাপারে বলেন, “জাতি বিরোধীদলের ভূমিকাকেও গঠনমূলক দেখতে চায়। আবেগ নির্ভর হয়ে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে গিয়ে যাতে পরিবেশ ক্ষুন্ন না হয় সে দিকে খেয়াল রাখা দরকার। অপজিশনের খাতিরে অপজিশন, বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা যাতে না করে”। তিনি আরো বলেন, “অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। যে জাতি অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না সত্যিকার অর্থে সে জাতি তার ভবিষ্যতকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করতে পারেনা। কিন্তু ইতিহাসের আলোচনা শিক্ষাগ্রহনের উদ্দেশ্যেই হওয়া উচিত। কোন তিক্ততা সৃষ্টির জন্য অতীতের ইতিহাসের আলোচনা হলে যদি পরিবেশ বিঘ্নিত হয় সে ধরণের আলোচনা যেন আমরা সকলেই পরিহার করি”। 

ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রচেষ্টাঃ
মাওলানা নিজামী সবসময় ইসলামপ্রিয় দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছেন। তিনি তার বিভিন্ন বক্তব্যে বলেন, “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এদেশের সকল ইসলামী দলকে আপন মনে করে, অন্তর থেকে তাদেরকে শ্রদ্ধা করে। আমি এতটুকু বলতে চাই, ভুল বুঝাবুঝির কারণে হোক বা যে কারণেই হোক জামায়াত ইসলামীর বিরুদ্ধে যারা সমালোচনা করেন তাদের বিরুদ্ধেও আমরা কোন কথা বলি না বলবো না। সমালোচনায় জড়িয়ে পড়ে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির মত পরিস্থিতিতে জামায়াত ইসলামী আজ পর্যন্ত শরিক হয়নি। ভবিষ্যতেও হবেনা। আজকের এই সময়টি ইখতিলাফ নিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ার সময় নয়। ইসলামে মতপার্থক্য ছিল, আছে এবং থাকবে। যে যেমতে বিশ্বাসী তাকে সে মতে থাকতে দিন। জোর করে একজনের মতের উপর আরেকজনের মত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেই সেখানে ফিতনা ফাসাদের জন্ম হতে পারে। জামায়াতে প্রথম থেকেই এই ব্যাপারে সজাগ আছে, সজাগ থাকবে"।
"আমরা বিশ্বাস করি, যারা কুরআন হাদীসের খেদমতে নিয়োজিত তারা যদি আমাদের বিরুদ্ধে ফতোয়াও দেন তবুও তারা যে কাজটি করছে সে কাজটি আমাদের কাজ। তারা হয়তো কোন ভুল তথ্য পেয়ে আমাদের বিরুদ্ধে নেগেটিভ কথা বলছে কিন্তু তারা যেহেতু আমাদেরই কাজ করছে তাই তাদের বুকে টেনে নেয়ার মত উদার আমাদের হতে হবে”। 

মাওলানা নিজামীর স্বভাবসুলভ বিনয়ঃ 
তিনি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কখনোই কাউকে ধমক দেয়া, বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি অসম্মান কিংবা কোন প্রকার কটুক্তি করেননি। অথচ বিরোধী দলের প্রতি কটুক্তি করা বাংলাদেশের খুবই প্রচলিত আচরণ। স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে তিনি সমালোচনার জবাব দিতেন। সংসদে কারো বক্তব্যের বিরোধীতা করার প্রয়োজন হলে অথবা প্রতিবাদ জানানোর দরকার হলে তিনি তা করতেন অত্যন্ত সম্মানের সাথে। ওলামা মাশায়েখদের এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেয়ার সময় তার বিনয় আমাদের কাছে আরো সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। তিনি ইসলামিক দলের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও বলেন “এখানে যারা আসছেন তারা সবাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক অথবা মসজিদের ইমাম এবং খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন। আমি নিজে শিক্ষক নই, কোন মসজিদের ইমাম নই খতীব নই। আমি ছাত্র এবং মুক্তাদী। সুতরাং সমস্ত ওলামায়ে কেরামকে আমি আমার ওস্তাদতুল্য মনে করি সম্মান করি। আমি আপনাদের ইমাম ও খতীব হিসেবে শ্রদ্ধা করি”। এভাবে সব দল মত পেশার মানুষকে তিনি সম্মান করতেন। কথা বলতেন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে। 

বাবরী মসজিদ প্রসঙ্গে মাওলানাঃ
১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর উপমহাদেশের অত্যন্ত প্রাচীন বাবরী মসজিদ ভেংগে দেয়া হয়। ভারতে বাবরী মসজিদ ভাংগার প্রতিবাদে সারা দুনিয়াব্যাপী মুসলমানরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মসজিদ ভাংগার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তৌহিদী জনতার পক্ষ থেকে এদেশের বৃহত্তম ইসলামী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ৫ম জাতীয় সংসদে বাবরী মসজিদের উপর আলোচনার জন্য প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রথমে সরকারী দল ও বিরোধী দল আলোচনার প্রস্তাবে রাজী হয়নি। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের চাপে অবশেষে সংসদে বাবরী মসজিদ প্রসংগ আলাচনার জন্য উপস্থাপিত হয়। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশের তৌহিদী জনতার পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে বাবরী মসজিদ প্রসংগে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। মাওলানা নিজামী মসজিদ ভাংগার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপন করে বলেন, বাবরি মসজিদ নিছক একটি মসজিদ নয়, ইসলামী আদর্শের, ইতিহাস, ঐতিহ্যের এবং সভ্যতার একটি বিরল প্রতীক এটি। তাই বাবরী মসজিদ ধ্বংস করে দেয়া সাধারণ কোন ব্যাপার নয়। এটাকে বিবেচনা করতে হবে আদর্শের উপর আঘাত, ইতিহাসের উপর আঘাত, একটি সভ্যতার উপর আঘাত, একটি ঐতিহ্যের উপরে আঘাত হিসাবে। গোটা বিশ্ব আজ এই কার্যক্রমের নিন্দা করছে। বাংলাদেশের দলমত নির্বিশেষে ১২ কোটি মানুষ এর নিন্দা করছে। সেই ১২ কোটি মানুষের এই সংসদ এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি নিন্দা প্রস্তাব নেবে এটাই জাতির প্রত্যাশা। মাওলানা নিজামী ভারতীয় মুসলমানদের নিরাপত্তা বিধান ও মুসলিম জাতিসত্ত্বা বিনাশের চক্রান্ত রুখে দাড়ানোর আহবান জানিয়ে জাতীয় সংসদে তার বক্তব্যে বলেন, “বাবরী মসজিদের ঘটনা নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সাথে আরো অনেক কিছু জড়িত আছে। আমি মনে করি, শুরু থেকে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের অনুসারী বর্ণ হিন্দুবাদের যে রাজনৈতিক লক্ষ্য দৃষ্ট হচ্ছে এ বাবরী মসজিদ ভাংগা তারই একটা প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। বাবরী মসজিদ ভাংগার তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হচ্ছে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বানচাল করা এবং সার্ককে অকার্যকর করা। কারণ সার্ক এর অস্তিত্ব ভারতের আধিপত্যবাদী, আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী চরিত্র তথা মানসিকতার পথে একটা বড় বাধা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশগুলো একত্রিত হয়ে ভারতের পাশাপাশি এক টেবিলে বসার সুযোগ আধিপত্যবাদী মানসিকতা চিরতার্থ করার পথে একটি বড় অন্তবায়। তাই ভারত সার্ককে মন থেকে চায় না”। মাওলানা নিজামী জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে ভারতের মুসলিম জাতিসত্ত্বা ধ্বংসের সর্বনাশা পরিকল্পনা, আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল ও আওয়ামী লীগের ভারতপ্রীতির সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন।

ফারাক্কা সমস্যা নিয়ে সংসদে আলোচনা: 
ফারাক্কা বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষের জন্য জীবন মরণ সমস্যা। ফারাক্কা ইস্যু নিয়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন করে আসছে। জাতীয় সংসদে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর ২০ জন এম পি একযোগে দাড়িয়ে ফারাক্কা সমস্যা নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনার জন্য স্পীকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। স্পীকার জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের দাবীর প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে ফারাক্কা ইস্যু নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করেন। মাওলানা নিজামী ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়া জাতীয় সংসদে তুলে ধরে এ সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলার দাবী জানান। তিনি জাতীয় সংসদে তার বক্তব্যে বলেন, মাননীয় স্পীকার, ফারাক্কার কারণে যে সেচ অসুবিধা হয় তাতে প্রায় ৩ লক্ষ একর জমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আদ্রতা হ্রাসের কারণে ৩০লক্ষ একর জমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, লবনাক্ততার কারণে ৬৪ লক্ষ একর জমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এই ক্ষতিপূরণ আদায় করার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার আমাদের আছে। আমেরিকা মেক্সিকোর তুলনায় অনেক বড় দেশ, একটি মহাদেশ। কিন্তু কলোরাডা নদীর পানির উপর আমেরিকার যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। সুতরাং এ ব্যাপারে ঐক্যমতে আসা দরকার। সেই সাথে বিকল্প বাধের ব্যাপারে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।

বসনিয়া পরিস্থিতিতে উদ্বেগ: 
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী জাতীয় সংসেদ বসনিয়া-হারজেগোভিনা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতীয় সংসদের স্পীকারের প্রতি নোটিশ প্রদান করেন। পার্লামেন্টের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর এই প্রথম সার্ববাহিনীর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। মোট এক ঘন্টার আলোচনার মধ্যে মাওলানা নিজামী জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে একাই আধঘন্টা আলোচনা করেন। তার এ আলোচনা জাতীয় সংসদে উপস্থিত সকল সদস্যের আবেগ ও অনুভূতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মজলুম মাবনতার পক্ষে নিজামীর আবেগময় বক্তব্য জাতীয় সংসদের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষারে লেখা থাকবে।

পুশব্যাক: 
ভারত সরকার মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশব্যাকের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জননেতা নিজামী জাতীয় সংসদে ভারত সরকারের এ ঘৃণ্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তিনি তার বক্তব্যে ভারতের পুশব্যাককে পুশইন বলে আখ্যায়িত করেন। মাওলানা নিজামীর এ পুশইন জাতীয় সংসদে সকলের সমর্থন লাভ করে। ফলে ভারতীয় চক্রান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

ফাজিল ও কামিল-এর ডিগ্রী ও মাস্টার্স এর সমমান প্রদান ভূমিকা: 
বহুদিন ধরেই এদেশে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যাবস্থা ছিল অবহেলিত। সরকারিভাবে এখান থেকে নেয়া ডিগ্রীর মান দেয়া হতো না। এর প্রভাবে এদেশে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কারণ মাদ্রাসা ছাত্রদের সার্টিফিকেটের মূল্য না থাকায় সরকারি চাকুরিসহ নানা চাকুরিতে বৈষম্যের শিকার হতে হতো। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মাওলানা নিজামী ফাজিল-কামিলকে ডিগ্রী ও মাস্টার্স-এর সমমান প্রদান আন্দোলনে ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় মন্ত্রীসভার এ সংক্রান্ত কমিটিতে তিনি অগ্রণী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০০৬ সালে এ কমিটিতে ফাজিল ও কামিলকে যথাক্রমে ডিগ্রী ও মাস্টার্সের সমমান প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, মন্ত্রীসভায় তা পাস হয় এবং জাতীয় সংসদে তা অনুমোদিত হয়।

টিপাইমুখ নিয়ে মাওলানার ভূমিকা:
সিলেটের জকিগঞ্জ হতে ১০০ কিলোমিটার উজানে ভারতের মনিপুর রাজ্যে টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণ করছে ভারত। সুরমা-কুশিয়ারা ও মেঘনা নদীর পানি আসে এই পথে। এটি ৯৩০ মি দীর্ঘ ও ৯৬৯ মি উচু একটি বাঁধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হবে আরেক ফারাক্কা বাঁধ। এ বাঁধ হলে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও নারায়ণগঞ্জ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, গ্রীস্মকালে ৯৪৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমির ন্যায় শুকনো থাকবে, বর্ষাকালে হঠাৎ পানি ছাড়লে ব্যাপক বন্যা হবে, প্রায় ৫ কোটি মানুষ ক্ষতিকর প্রভাবের স্বীকার হবে, ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়বে, খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে এবং শতাধিক নদী মরে যাবে। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। সিলেটে টিপাইমুখ অভিমুখে নৌমার্চ, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় মহাসমাবেশ করে জামায়াতে ইসলামী। পল্টনে টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে আয়োজিত সমাবেশে মাওলানা নিজামী বলেন, জামায়াতে ইসলামী কোন ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়। কোন বিশেষ দেশের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জামায়াতে ইসলামী অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ইসলামের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র হলে সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আর প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বাংলাদেশের কোন স্বার্থ বিরোধী কর্মকান্ডে রুখে দাঁড়াতে অভ্যস্ত। সাউথ এশিয়ান টাস্কফোর্স, টিকফা, ট্রানজিট বিরোধীতায় তিনি ছিলেন সরব। "টিপাইমুখ বাঁধের কারণে পারমানবিক বিস্ফোরণের মতই ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশ। টিপাইমুখে বাঁধ দিলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা নদী মরে যাবে। ফারাক্কার ক্ষতি সমূহের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের অহংকার পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। এক ফারাক্কার কারণে পদ্মা- যমুনা মরে গেছে। এখন মেঘনা যদি মরে যায় বাংলাদেশ মরুভূমি হয়ে যাবে। বাংলাদেশকে ভাতে ও পানিতে মারার ষড়যন্ত্র হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ"। তিনি সরকারকে আহবান করেন টিপাইমুখ নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠন করতে। অযথা সরকারের সমালোচনা না করে তিনি বলেছেন সরকার যদি টিপাইমুখের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তাহলে আমরা সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবো। মাওলানা নিজামীর নেতৃত্বে সকল বিভাগীয় শহরে জামায়াত টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে জনসমাবেশের আয়োজন করে এবং জনগণকে সচেতন করে। জামায়াতে ইসলামীর দেশব্যাপী প্রচারণায় এটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। এরপর আওয়ামী লীগ ছাড়া সর্বমহল থেকে এ বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উঠে। অথচ সরকার এদিকে তো কর্ণপাত করেনি বরং সরকারের তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন বলেন, আগে বাঁধ হোক, পরে দেখা যাবে।

ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার কন্ঠঃ
জঙ্গীবাদের নামে ইসলামকে কলুষিত করার জঘন্য ষড়যন্ত্র নিয়ে তিনি সারাজীবন কথা বলেছেন। এটাকে বিদেশী ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে তিনি বলেছেন বিদেশী শক্তি অনুপ্রবেশের জন্য এবং বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর জন্যই এতসব আয়োজন। জেএমবি নির্মূলে জোট সরকারের ভূমিকা উল্লেখ করে বলেন "পৃথিবীতে একমাত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশই জঙ্গী নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। আর এই সক্ষম হওয়ার পিছনে সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রেখেছেন এদেশের আলেম সমাজ। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সরকারকে সহযোগিতা করেছেন ওলামায়ে কেরাম। তারা প্রতিটি মসজিদ থেকে এই আওয়াজ তুলেছেন এই জঙ্গিবাদের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এতে যারা বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছিলেন তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েছে এবং তাদের জঘন্য ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়"। 

মাওলানা নিজামী ইসলাম বিরোধী শক্তিদের ষড়যন্ত্র নিয়ে সবসময় সতর্ক করে গেছেন। ইসলাম বিরোধীরা ইসলামের মধ্যে বিভক্তির চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক ইসলাম এবং আধ্যাত্মিক ইসলাম বলে মুসলমানদের আলাদা করার প্রয়াস চালিয়েছে। আধ্যাত্মিক ইসলামকে প্রমোট করার মাধ্যমে যারা ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে প্রচারণা চালিয়েছে। পীর-মুরিদ তাসাউফ চর্চাই মূলত ইসলাম অন্য কিছু ইসলাম বহির্ভুত। ইসলামে রাজনীতি বলে কিছু নেই। এই ধরণের অপপ্রচার থেকে বেঁচে থাকার পরামর্শ তিনি সবসময় দিয়েছেন। 

কৃষি মন্ত্রনালয়ে অবদান: 
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের শতকরা পচাশি জন লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাই মাওলানা নিজামী কৃষি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব নিয়েই কৃষকদের জন্য কাজ করার ব্যাপারে মনযোগী হন। ফসলের ন্যায্য পাওনা, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশকসহ যাবতীয় কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতার উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাদের যাবতীয় সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং এর সুষ্ঠু সমাধানকল্পে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এলক্ষ্যে তিনি মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক সফরের মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী, বিজ্ঞানী ও কৃষকদের মাঝে প্রানচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনেন। মাওলানা নিজামী কৃষি মন্ত্রনালয় দায়িত্ব পালনকালে “চাষীর বাড়ী, বাগান বাড়ী” শ্লোগানকে দেশব্যাপী জনপ্রিয় শ্লোগানে পরিনত করেন। তার একান্ত প্রচেষ্টায় দেশের প্রতিটি চাষীর বাড়িকে এক একটি বাগান বাড়ি হিসাবে গড়ে তুলে নিজেদের পুষ্টি চাহিদা পূরন বাড়তি উপার্জন এবং স্বাবলম্বিতা অর্জন সহজ হয়েছে। মাওলানা নিজামীর ব্যক্তিগত অভিপ্রায়ে দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় বৃক্ষ রোপন অভিযানে পৃথকভাবে ফলজ বৃক্ষ রোপন কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এরপর থেকে আলাদাভাবে ফলজ বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি উদযাপন করা হয়। সরকারের একজন মন্ত্রী হিসাবে তিনি নিজে বিভিন্ন জায়গায় বৃক্ষরোপন করেন এবং অন্যানের মধ্যে বৃক্ষের চারা বিতরণ করে বৃক্ষরোপনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রয়াস চালিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিজে উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন ফল চাষ প্রকল্প ঘুরে ঘুরে দেখেছেন, জনগণকে উৎসাহ যুগিয়েছেন এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। তাই ধানের ফলন বৃদ্ধি এবং সঠিক সংরক্ষনের দিকে ছিল তার সতর্ক দৃষ্টি। ধানের প্রধান দুই শক্র ইদুর এবং কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রনে তার মন্ত্রনালয়ের পদক্ষেপ সত্যিই প্রশংসা করার মত । আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা সম্মেলনে তার ছিল সরব ভূমিকা। বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে মাওলানা নিজামীর সুপরিকল্পিত নির্দেশনার ছাপ। আখ, পাট, তুলা, ভূট্টা, মধু এমনকি শীতকালীন শাকসবজি পর্যন্ত তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। উৎপাদিত কৃষি পণ্যের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টি এবং কৃষকদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে আয়োজন করা হয় কৃষি মেলার। এ ক্ষেত্রেও মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মাওলানা নিজামীর আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। তার দিক নির্দেশনায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম রাজশাহী, নওগা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলায়ও সম্প্রসারিত হয়েছে। দেশের কৃষি উন্নয়নে মাওলানা নিজামীর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো বি এ ডি সি বীজ উইং শক্তিশালী করণ, মাটিরগুনগত মান পরীক্ষাকরণ, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পর্যালোচনা, কৃষিবিদ কৃষিবিজ্ঞানীদের যথাযথ পদোন্নতি এবং ব্লক সুপারভাইজার পদবী পরিবর্তন করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পদ চালু।

শিল্প মন্ত্রনালয়ে অবদান: 
বিগত ২০০৩ সালে ২৫শে মে কৃষি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব থেকে মাওলানা নিজামীকে শিল্প মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব অর্পন করা হয়। উদ্দেশ্য ভেঙে পড়া বিপর্যস্ত রাষ্ট্রীয় শিল্পখাতকে পুনরুজ্জীবিত গতিশীল ও শৃংখলা ফিরিয়ে আনা। দায়িত্ব নিয়েই মাওলানা নিজামী দেশের শিল্পক্ষেত্রে নতুন গতিসঞ্চারের প্রয়াস পান। বাংলাদেশের শিল্পখাতের সমস্যাগুলো তিনি তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এ সমস্যা দূরীকরণকল্পে তিনি দেশব্যাপী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দ্রুত বিকাশের লক্ষে পৃথক শিল্পনীতি প্রনয়ন করেন । এ নীতি প্রনয়নকালে বেসরকারী খাতের উদ্যোক্তা ও সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের সাথে মত বিনিময় করা হয়। নতুন শিল্পনীতি ২০০৫ সালে ৩২টি শিল্পকে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর হিসাবে চিহ্নিত করে সেগুলোর মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। দেশের সামগ্রিক শিল্পখাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে সার্বিক দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য মাননীয় শিল্পমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি দিকনির্দেশনা কমিটিও গঠন করা হয়। প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর এ কমিটি বৈঠকে মিলিত হয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিরাজমান সমস্যা সমাধানকল্পে বাস্তবসম্মত কর্মপন্থা ও সুপারিশমালা প্রনয়নের কাজ করে চলেছে। ২০০১-০২ অর্থ বছরে যেখানে জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান ছিল ১৫.৭৬% ভাগ, সেখানে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাড়িয়েছিল ১৬.৫৮% ভগে। একই বছরে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৪৪% ভাগ যা ২০০৫ সালে এসে দাড়িয়েছিল ৭.৪৮% ভাগে। এ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার যোগ্য নেতৃত্বে দেশের শিল্পভিত্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে । চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মাওলানা নিজামীর দায়িত্বাধীন শিল্পমন্ত্রনালয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যা দেশের শিল্পাঙ্গনে নতুন প্রান স্পন্দন সৃষ্টি করেছিল। দেশে মিশ্রসারের চাহিদা মেটাতে চট্টগ্রামে দৈনিক ৮০০মে: টন উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন ডাই-এ্যামোনিয়াম ফসফেট ডিপিএ-১ ও ডাই-এ্যামোনিয়াম ফসফেট ডিপিএ-২ নামে দুইটি নতুন সার কারখানা স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন কর্পোরেশনের আওতায় সম্ভাবনাময় বন্ধ শিল্পসমূহ পূনরায় চালু করার ব্যাপারে মাওলানা নিজামীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো অত্যন্ত ইতিবাচক। তারই ঐকান্তিক ইচ্ছা ও প্রানান্তকর প্রয়াসে কর্ণফুলী পেপার মিলের বন্ধকৃত কস্টিক ক্লোরিন প্লান্ট, খুলনা হার্ডবোর্ড মিল এবং রংপুর সুগার মিল পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। ফলে তখন এ ২টি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানই লাভজনক অবস্থায় পরিচালিত হয়। এই লাভ ধরে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন দীর্ঘ ১০ বছরের মধ্যে ২০০৫-০৬ আখ মাড়াই মৌসুমে মাওলানা নিজামী মন্ত্রী থাকাকালে প্রথম বারের মতো ৭০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

ঢাকা মহানগরীর পরিবেশ উন্নয়নের জন্য হাজারীবাগে অবস্থিত ট্যানারি শিল্পকে সাভারে নতুন স্থাপিত চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন চলছে। এছাড়া ফার্মাসিউটিকেল ইন্ডাস্ট্রি, প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি ও অটোমোবাইল ওয়ার্কশপের জন্য পৃথক শিল্পনগরী গড়ে তোলার কার্যক্রম হাতে হয়েছে। লবন আমাদের দৈনন্দিন ভোগ্যপন্যের একটি অপরিহার্য উপদান। দেশে মোট সাড়ে ১১ লাখ মে. টন লবনের চাহিদা থাকলেও বিগত ২০০৫-০৬ উৎপাদন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার মে. টন লবন উৎপাদিত হয়েছে যা এ যাবত কালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। নি:সন্দেহে এ অর্জন মাওলানা নিজামীর সঠিক দিক নির্দেশনার ফসল। এ ছাড়াও বিগত ২০০৫-০৬ অর্থ বছরে শিল্প মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ স্টিল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন তাদের উৎপাদন লক্ষমাত্রা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। মাওলানা নিজামীর দায়িত্বাধীন শিল্পনালয়ের আরও কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো বিসিকের মাধ্যমে ১ লক্ষ ৩২ হাজার ৩৭৫ জন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বি এস টি আই এর আধুনিকায়ন, ফুড ফর্টিফিকেশন এলায়েন্স গঠন, ন্যাশনাল এক্রিডিটেশন এবো গঠন ইত্যাদি জাতীয় মেধা সম্পদের অধিকার সংরক্ষন শিল্পের ব্যাপারে আমীরে জামায়াতের বক্তব্য ছিলো অত্যন্ত সুস্পষ্ট এভাবে মন্ত্রী হিসাবে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী প্রতিটি ক্ষেত্রেই সততা দক্ষতা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন কালে তার দরদী মন ও সুন্দর আচরণ আজো স্মরণ করেন কর্মকর্তা কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট সকলে।

মাওলানা নিজামীর নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন: 
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নানামুখী ব্যস্ততার পরও মাওলানা নিজামী তার নিজ এলাকা সাথিয়া বেড়া থেকে এতটুকু বিমুখ হননি। সাথিয়া বেড়াবাসীর নন্দিত নেতা তিনি। এ এলাকার জনগণ তাকে তাদের এযাবতকালের শ্রেষ্ঠ নেতা হিসাবে গ্রহন করেছে। উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে পড়া সাথিয়া বেড়া তথা পাবনাবাসীর নিকট তিনি কর্মনিষ্ঠা, সততা আর দক্ষতার মূর্ত প্রতিক। এমন কি প্রাকৃতিক দূর্যোগকে উপেক্ষা করেও তিনি তার কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। মাওলানা নিজামী বিশ্বাস করেন যে যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা রাস্তাঘাট ও ব্রীজ কালভার্টের উন্নয়ন যে কোন এলাকার উন্নয়নের পূর্বশর্ত। তাই তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরই সাথিয়া বেড়ার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে নজর দেন। জোট সরকারের আমলে তিনি ১৮৫ কি মি সড়ক পাকা করেছেন। পৌরসভার প্রায় প্রতিটি রাস্তাই সংস্কার ও উন্নয়নের ছোয়া পেয়েছে। আজ সাথিয়া বেড়া কোন অনুন্নত এলাকার নাম নয় একটি সম্ভবনার নাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাজ হলো শালগড় ঈদগাহ মাঠ হতে কালাইচড়া আব্দুল হামিদের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা, ভবানিপুর থেকে শালগড় ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত সড়ক, বেড়া ডাকবাংলো থেকে সাথিয়া হয়ে মাধবপুর বিশ্বরোড পর্যন্ত সড়ক, দেবিপুর তেবাডয়া বাজার থেকে স্বরগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়ক, মাধবপুর বিশ্বরোড় হতে দবিরশেখের বাড়ি হয়ে আবু বকর সিদ্দিকের বাড়ি সড়ক, নওয়ানী ফয়জের বাড়ী হতে ফজলুল হকের বাড়ি, হতে ঈদগাহ মাঠ সড়ক হতে নাটিয়া বাড়ী বিশ্বরোড পর্যন্ত রাস্তা মেরামত, আফড়া তমিন সরকারের বাড়ির ব্রীজ, হাজরাতলা বটগাছ মোড় হতে ভুলবাড়িয়া ইউপি অফিস সড়ক, নাড়িয়া গদাই থেকে জোড়গাছা সড়কে ইছামতি নদীর উপর ব্রীজ নির্মান, হলুদঘর থেকে গোপালপুর সড়কে ইছামতি নদীর উপর ব্রীজ নির্মান, সোনাতলা ইছামতি নদীর উপর ব্রীজ, ভুলবাড়িয়া হতে হাট বাড়িয়া সড়কে ইছামতি নদীর উপর ব্রীজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আরো অনেক সড়ক তার প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে সংস্কার বা মেরামত করা হয়েছে। 

যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি অবকাঠামোগত আরও অনেক উন্নয়ন মাওলানা নিজামীর হাত ধরেই হয়েছে। জাতির মেরুদন্ড শিক্ষা বিস্তারে মাওলানা নিজামীর রয়েছে অনন্য অবদান। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে সাথিয়া বেড়া অঞ্চলের ১০টি মাদ্রাসার এমপিওভূক্তি বাতিল করা হয়। জোট সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরপরই তা পূর্ণবহাল করা হয়। তার প্রত্যক্ষ আনুকূল্যে এখানকার বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের সোপান খুজে পেয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো : সাথিয়া ডিগ্রী কলেজ, আল হেরা একাডেমী, ইমাম হোসেন একাডেমী, নাকালিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাকালিয়া বাতেনিয়া দাখিল মাদ্রাসা, বেড়া আলিম মাদ্রাসা, হুইখালি বাংলা উচ্চবিদ্যালয়, সাথিয়া যশোমন্ত দুলিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিষ্মুবাড়িয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, খলিশাখালি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পীরহাটিসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলোকদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরপাইরহাটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিলন্দা উচ্চ বিদ্যালয়, পাথাইলহাট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাগডেমরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাথিয়া ডিগ্রী কলেজ, বোয়াইলমারী কামিল মাদ্রাসা, সাথিয়া পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মনজুর কাদের মহিলা কলেজ, বেড়া আল হেরা একাডেমী, বেড়া ডিগ্রী কলেজ, বেড়া আলিম মাদ্রাসা, বেড়া বি বি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ইত্যাদি। আমাদের দেশের জনগোষ্ঠিকে জনসম্পদে পরিনত করতে হলে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই এ কথাটি তিনি যথাথই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা উন্নয়নই নয়, ছাত্র ছাত্রীদেরকে শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিতেও মনোনিবেশ করেন। এর মধ্যে কৃতি ছাত্রদের সংবর্ধনা, পুরস্কার প্রদান, বৃত্তি প্রদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি প্রদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

মাওলানা নিজামীর প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ও অর্থানুকূল্যে সাথিয়া বেড়া উপজেলায় বাস্তবায়িত আরো কিছু উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে, মসজিদ মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মান, উন্নয়ন ও অর্থায়ন, বিদ্যুতায়ন, বৃক্ষরোপন, স্বস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মান ও উন্নয়ন। আমরা জানি, বাংলাদেশে বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি দুষ্ট ক্ষতের ন্যায় কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগও রয়ে গেছে। এর মধ্যে বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছাসই প্রধান। সাথিয়া বেড়া বা পাবনাও এ থেকে মুক্ত নয়। বেড়াকে যমুনা নদীর ভাঙ্গন থেকে রক্ষার জন্য তার আন্তরিক প্রয়াস সবার প্রশংসা অর্জন করেছে। বেড়া পানি উন্নয়ন বোডের অধীনে যমুনার পশ্চিম তীর সংরক্ষন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সে কাজে ব্যয় নিরুপন করা হয়েছে ২৫০,০০,০০০/= টাকা। ফলে কৃষকরা আগে যেখানে বছরে একটি মাত্র মৌসুমে ফসল পেত সেখানে এখন তিনটি ফসল ফলানো সম্ভব হবে। বিগত বন্যায় অসহায় মানুষ তাকে যেভাবে কাছে পেয়েছে তাতে তিনি তাদের চোখের মনিতে পরিনত হয়েছেন। জীবনের ঝুকি অগ্রাহ্য করে তিনি নিজে ঘুরে ঘুরে দেখছেন বন্যার্তদের অবস্থা। তাদের মাঝে বিতরণ করেছেন চাল ডালসহ খাদ্রদ্রব্য, পরিধেয় বস্ত্রাদি এমন কি জীবন রক্ষাকারী ঔষধও। বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে চেষ্টা করেছেন জনগণের মনে সাহস সঞ্চার করার। শুধু এখানেই নয়, দূর্যোগ পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্থরা যাতে আবার দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে তার জন্য নগদ অর্থ, ঢেউটিন বিতরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন।

এমন একজন মানুষকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করার কারণ তিনি এদেশে ইসলামকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। সেক্যুলার ও ইসলাম বিরোধীরা তা হতে দিতে চায় না। তিনি চেয়েছেন বাংলাদেশের সত্যিকার স্বাধীনতা ও সার্ভভৌমত্বকে সমুন্নত রাখতে। দেশবিরোধী দালাল চক্র এবং ভারতীয় আধিপত্যের দোসররা তাঁর সেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব সহ্য করতে পারেনি। তাই তাকে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে তারা তাদের পথের কাঁটা সরাতে চায়। মাওলানা নিজামী এদেশের সম্পদ। এ জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এমন দূরদর্শী নেতার আজ বড়ই প্রয়োজন। যুদ্ধাপরাধের ধোঁয়া তুলে সাজানো মিথ্যা মামলায় ভীনদেশী এজেন্ডার বাস্তবায়ন হলে এদেশ হারাতে পারে এমন সোনালী মানুষ। হতে পারে অভিভাবকশূন্য। এ সত্য দেশবাসী উপলব্ধি করতে পারলেই কল্যান। আর এর ব্যতিক্রম হলেও মনে রাখা দরকার- আদর্শবাদীদের পরাজয় নেই। সুনিশ্চিত বিজয়ের পথেই তাদের যাত্রা নিরন্তর...

মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং এর পর্যালোচনা