This is default featured slide 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

সোমবার, ২১ মার্চ, ২০১৬

ভারতের পানি আগ্রাসন: নির্যাতিত বাংলাদেশ


কাগজে কলমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে এর সম্পর্ক আসলে তা পুরোপুরি মীন করেনা। এদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়”। এ মূলনীতির ভিত্তিতে সকলের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহাবস্থানে বাংলাদেশ আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে ভারত কখনই সেরকম আন্তরিক সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুসুলভ মনোভাব দেখায়নি। বরং এদেশের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একের পর এক আগ্রাসন নীতি চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে যুদ্ধাস্ত্র ও খুলনার পাটকলগুলোর যন্ত্রাংশ লুণ্ঠন থেকে শুরু করে তিন বিঘা করিডোর, বেরুবাড়ি, দক্ষিণ তালপট্টি দখল, ফারাক্কাবাঁধ নির্মাণ, সীমান্ত সন্ত্রাস, চোরাচালান, নির্বিচারে নিরীহ নাগরিক ও কৃষকদের পাখির মত গুলি করে হত্যা, পুশ ইন, সীমান্ত রেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভেতরের নদীর চর ও কৃষি জমি দখল করা, ফসল কেটে নিয়ে যাওয়া, আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে নৌ ও সমুদ্র সীমালঙ্ঘন, মাদক পাচার, স্বর্ণ চোরাচালান দেশের ভেতরে গুপ্তচর নিয়োগ ইত্যাদি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে একের পর এক বাংলাদেশকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলছে।

ফারাক্কা বাঁধ :
নদীমাতৃক বাংলাদেশে ছোটবড় সব মিলিয়ে ২০০টিরও বেশি নদ-নদী রয়েছে। এছাড়াও, ছড়া, নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় ইত্যাদি রয়েছে অসংখ্য। এসব নদীর মধ্যে ৫৭টি হল আন্তর্জাতিক নদী যার মধ্যে ৫৪টির উৎস তিব্বত (চীন), নেপাল, ভুটান ও ভারত থেকে। বাকি ৩টি এসেছে মিয়ানমার থেকে । বাংলাদেশের অবস্থান ভাটি অঞ্চলে হওয়ায় উজানে যে কোন ধরনের পানি নিয়ন্ত্রণের প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশই ভোগ করবে। কিন্তু সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির অজুহাতে ভারত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রাজমহল ও ভগবানগোলার মাঝে ফারাক্কা নামক স্থানে এক মরণবাঁধ নির্মাণ করে। এই বাঁধের অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পশ্চিম সীমানা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার (১১ মাইল) উজানে গঙ্গা নদীর ওপর। ১৯৬১ সালে এর মূল নির্মাণ কাজ হাতে নেয়া হয় যা ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়। ১৯৭৫ সালে ২১ এপ্রিল থেকে ২১ মে এই ৪১ দিনের জন্য অস্থায়ী ও পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধটির সকল ফিডার ক্যানেল চালু করে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকে এটা ভারত আজ পর্যন্ত বন্ধ করেনি। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে কিছুটা সফলতা থাকলেও ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির সফলতা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ এর গ্যারান্টি ক্লজ বা অঙ্গিকার অনুচ্ছেদ না থাকায় বাস্তবে ফলাফল প্রায় শূন্য। এই শত্রুভাবাপন্ন মনোভাবের কারণে আমাদের মত একটি ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিনির্ভর দেশ আজ বিপন্ন। বিপন্ন এদেশের নদী, মাটি, কৃষি, বনজ সম্পদ, বন্যপ্রাণী, পাখি, মৎস্য ও পরিবেশ। এই জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংসের প্রধান কারণ ফারাক্কা বাঁধ। এই বাঁধের প্রভাবে দেশের মানচিত্র থেকে প্রায় ২০টি নদী মুছে গেছে এবং প্রায় ১০০টি নদীর মরণদশা (পত্রপত্রিকার তথ্য অনুযায়ী)। আর বাকিগুলোর বুকে চর জেগে ইতোমধ্যে জনবসতি শুরু হয়েছে এবং একই নদী একাধিক ক্ষুদ্র ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। স্রোত না থাকায় এদেশের নদীগুলোর তলদেশে পলি জমে এর উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও নদীসংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতি বছর অত্যধিক নদীভাঙনের কারণে শত শত কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। এর ওপর আবার ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প!


ভারতের আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প :
ভারত আগামী ৫০ বছরের ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং এর সকল অববাহিকার নদ-নদীর পানি বাঁধ, জলাধার ও সংযোগ খালের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে দক্ষিণের কাবেরী নদী পর্যন্ত টেনে নেবে এবং রাজস্থানের থর মরুভূমিসহ ঐ সকল রাজ্যের খরাপীড়িত অঞ্চলে পানি সরবরাহের জন্য যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এটাই River Linking Project বা আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই “রিভার লিংকিং প্রজেক্ট” এ ব্যয় হবে প্রায় ২শ’ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই আন্ত:নদী সংযোগের ক্ষেত্রে দু’বার সমীক্ষার কাজ সম্পন্ন করেছে।
এই প্রকল্পের আওতায় ৩৮টি ছোট-বড় নদীর পানিপ্রবাহকে ৩০টি আন্ত:সংযোগ খালের মাধ্যমে ফারাক্কা বাঁধের ভেতর দিয়ে যুক্ত করা হবে এবং এধরনের সংযোগ ঘটিয়ে ৭৪টি জলাধারে পানি সংরক্ষণ করে পানিপ্রবাহ ভারতের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের খরাপ্রবণ রাজ্যগুলোতে বণ্টন করে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হবে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার পানি প্রবাহ পশ্চিমবঙ্গের উড়িষ্যা হয়ে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ ও কর্ণাটক দিয়ে তামিলনাড়ু পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। গঙ্গার পানি পৌঁছবে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান এবং গুজরাটে। উভয় দিকের প্রবাহ প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার ঘুরিয়ে আবার একত্রে আনা হবে। তাছাড়া ৯টি বড় এবং ২৪টি ছোট ড্যামের সমন্বয়ে ৪টির মাস্টারপ্লান তৈরি করতে নেপাল ও ভূটানের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ২৮/০৬/০৬ তারিখে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সুবর্ণরেখা-মহানন্দা (৩৭৩ কিলোমিটার), গঙ্গা-দামোদর-সুবর্ণরেখা (৩৯৩ কিলোমিটার), ফারাক্কা-সুন্দরবন (৬০৩ কিলোমিটার) এবং যোগীগোপা-তিস্তা-ফারাক্কা (৪৪০ কিলোমিটার) পর্যন্ত সংযোগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ৩০/০৬/০৬)। এই আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের সাথে বাংলাদেশের জন্য আর একটি ভয়াবহ ও বিপজ্জনক মরণফাঁদ টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প। এই প্রকল্প এলাকা সিলেট শহর থেকে ২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল) এবং সিলেটের জকিগঞ্জের অমলসাদ সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটার (৬১ মাইল) উজানে মণিপুর রাজ্যের বরাক উপত্যকার চারাচাঁদপুর টুইভাইয়ের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এই টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পে ১৬ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর মিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি জলাধার ও বাঁধ নির্মাণের কাজ বর্তমানে এগিয়ে চলছে। বিকল্পপথে পানিপ্রবাহের জন্য বৃহদাকার দু’টি স্লুইসগেট এবং দুটি সুড়ঙ্গ জলপ্রবাহের পথ তৈরি করে সেখানে ১৫শ’ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হবে ৫,১৬৩ কোটি টাকা। এক তথ্য মতে, এই বাঁধটি হবে ১২৫ মিটার উঁচু এবং ৩৯০ মিটার দীর্ঘ। এতে মোট ১৫.৯ হাজার মিলিয়ন ঘনমিটার পানি মজুদ করে রাখার ব্যবস্থা থাকবে। পানি মজুদ করে ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ, নৌচলাচল সুবিধা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। টিপাইমুখে বাঁধ দেয়ার ফলে বর্ষা মৌসুমে সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দেবে এবং এর ফলে সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ এলাকার প্রায় ২ লক্ষ একর জমির ফসল ধ্বংস হয়ে যাবার আশঙ্কা থাকবে। এর সাথে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মনু প্রকল্পের কার্যকারিতা আস্তে আস্তে অচল হয়ে পড়বে। এই বাঁধ শুষ্ক মৌসুমে মেঘনার মূল স্রোতধারা সুরমা ও কুশিয়ারাসহ সংশ্লিষ্ট সকল নদীর পানিপ্রবাহ ভীষণভাবে হ্রাস করবে। ভারত কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন উল্লিখিত আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে পুরো সিলেট অঞ্চল (সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলা), ময়মনসিংহ অঞ্চলের পূর্ব, কুমিল্লা অঞ্চলের উত্তর এবং ঢাকার পূর্বাঞ্চল বিরাণ ভূমিতে পরিণত হবে। পরিবেশগত বিরূপ প্রভাবে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে, উচ্চাভিলাসী আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে গঙ্গা ও পুরো ব্রহ্মপুত্র, সংকোশ এবং তিস্তাকে সংযোগ করে বিশাল পানিপ্রবাহ থেকে ১৭৩ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি সরিয়ে নিতে সক্ষম হবে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রাপ্ত উক্ত পরিমাণ পানি দিয়ে ভারতের ৩৪ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সেচ দিয়ে কৃষিকাজ করা সম্ভব হবে এবং আরো ৮ লক্ষ হেক্টর জমিতে ভূ-গর্ভস্থ পানি পাওয়া সম্ভব হবে। তবে, ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, এই প্রকল্পের ফলে হিমালয় হতে নি:সৃত নদীসমূহের ৩৫ ভাগ পানি বাষ্পাকারে আকাশে উড়ে যাবে। ফলে রাশিয়ার একদা উচ্চাভিলাষী প্রকল্প যেমন- বুমেরাং-এ পরিণত হয়েছিল, ভারতও সেরকম ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে বলে উক্ত বিশেষজ্ঞগণ অভিমত পোষণ করেছেন।


ফারাক্কা বাঁধ ও আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের ক্ষতিকর প্রভাবঃ
ফারাক্কা বাঁধের ফলে বাংলাদেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে, এই আন্ত:নদী প্রকল্পের বাস্তবায়নে তাতে শুধু আরেকটা মাত্রা সংযোজনই করবে না বরং অর্থনীতি, রাজনীতি ও পরিবেশের বিপর্যয়ে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পে খোদ পশ্চিমবঙ্গ সরকারও তাদের অংশের পরিণতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রবল আপত্তি জানিয়েছে। 

(১) বিস্তৃত অঞ্চল মরুকরণ : গঙ্গানদীতে ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার ফলে ইতোমধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব মধ্যাঞ্চলের সকল নদ-নদীর পানি আসে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও মেঘনা থেকে। এসব নদী এবং এর উপনদীগুলোর উৎপত্তি প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, তিববত (চীন) ও ভুটানে অবস্থিত হিমালয়ের হিমবাহ থেকে। এগুলো আন্তর্জাতিক নদী। এই নদীগুলোর পানি কোন দেশের একক সম্পদ নয় বরং এসব নদীর পানিপ্রবাহ সকল দেশের ঐক্যমতের ভিত্তিতে সুষম বণ্টনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু ভারত সরকার আন্তর্জাতিক কোন আইনের তোয়াক্কা না করে বরং পেশিশক্তির জোরে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধের মত উচ্চাবিলাসী প্রকল্প চালু করে পুরো বাংলাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে আজ পানির জন্য হাহাকার অবস্থা বিরাজ করাচ্ছে। এছাড়া দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এখন মরুকরণের মত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। নদীমাতৃক এই দেশটির বেঁচে থাকার অন্যতম উৎস পানি। এই পানিকে ভারত ফারাক্কা বাঁধের পর দ্বিতীয় উচ্চাভিলাসী প্রকল্প হিসেবে আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প (River Link Project) হাতে নিয়েছে। 

বাংলাদেশের মোট পানিপ্রবাহের ৬৫ থেকে ৬৭ শতাংশ আসে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রের শুকনো মৌসুমে গড় পানিপ্রবাহ ১,২৩,০০০ কিউসেক। এর ভেতর ঐ ক্যানালে নিয়ে যাওয়া হবে ১,০০,০০০ কিউসেক এবং গঙ্গা নদীর শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ ৮০ হাজার কিউসেক (কম বেশি হতে পারে) এর মধ্যে ৪৪ হাজার কিউসেক প্রত্যাহার করে ঐসব ক্যানালে প্রবাহিত করা হবে। ফারাক্কা বাঁধের পর দ্বিতীয় বার এই আন্ত:নদী সংযোগ মেগাপ্রকল্প ছাড়াও মেঘনা, সুরমা ও কুশিয়ারার মূল উৎস বরাক নদীর উজানে ভারতের মণিপুর রাজ্যের টিপাঁই গ্রামের চারাচাঁদপুর টুইভায়ের সঙ্গমে টিপাইমুখ নামক স্থানে বরাক নদীতে কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু (Hydro Electric Power Plant) করার কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। সে লক্ষ্যে ২০০৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঁধ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সিলেট জেলার জকিগঞ্জ সীমান্ত থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উজানে নাগা-মণিপুর রাজ্যে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এই সব মেগাপ্রকল্প ছাড়া আরও ২২টি নদী শাখা-প্রশাখা থেকে প্রবাহিত পথে বাঁধ দিয়ে নানারকম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। এগুলোর মধ্যে তিস্তা, মহানন্দা, করতোয়া, গুমতি, খোয়াই, মনু, কোদালিয়া, ইসালিছড়া, ফুলছড়ি, আধার মানিকছড়া, ছাগলনাইয়া ছড়া, মহামায়া ছড়া, গইরাছড়া, গজারিয়া ছড়া, কাচুয়া ছড়া, মাবেস নদী ছড়া, মাতাই ছড়া, উজিরপুর ছড়া, চন্দান ছড়া, রাজেশপুর তেতনা ছড়া, কমলা ছড়া ও ভৈরব সঙ্গলী নদী উল্লেখযোগ্য। এ সকল নদীর পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করায় ইতোমধ্যে পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সারা বাংলাদেশে ভীষণভাবে প্রভাব পড়েছে। এই সব মরণ ফাঁদ প্রকল্পের ফলে পুরো বাংলাদেশের ভবিষ্যত পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

ভূমিরূপের স্বাভাবিক স্তরের বিপরীতে এ ধরনের কৃত্রিম খাল বাংলাদেশের নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বিঘ্নিত করছে এবং করবে। এছাড়াও এ ধরনের কর্মসূচী পুরো দেশের জল নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত করবে। এই আন্ত:নদী সংযোগ থেকে ভারত যদি এই বিশাল পানিপ্রবাহ একসাথে প্রত্যাহার করে নেয় তাহলে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ভীষণভাবে ব্যাহত হবে এবং শিল্প উৎপাদন, সেচ, শক্তি, বনায়ন, মৎস্যসম্পদ প্রভৃতির ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তাতে সারা বাংলাদেশের নদী অববাহিকা অঞ্চলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে।

পানির দেশের মানুষ পানির জন্য এ রকম হাহাকার! মাছের দেশের মানুষ মাছের জন্য হাহাকার! কোন সচেতন মানুষ এসকল দৃশ্য নিজের চোখে না দেখলে বুঝতেও পারবে না যে, এদেশের নদ-নদী ও পরিবেশ আজ কতটা অসহায়! এই অবস্থার পরেও যদি ভারত আবার আন্ত:নদী সংযোগ কিংবা টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তাহলে পুরো দেশ পোরশা, সাপাহার কিংবা নাচোলের মত অবস্থায় পরিণত হবে। এই নদীনির্ভর ছোট্ট ভূ-খন্ডটির বিশাল জনগোষ্ঠী ও পরিবেশ আজ এবং আগামীতে বিপন্ন। এই দেশটি মরুভূমিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। ফারাক্কা এবং অন্যান্য বাঁধের প্রভাবে দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়ে মরতে শুরু করেছে এবং কিছু নদীর চিহ্ন ইতোমধ্যেই মুছে গেছে। বাকিগুলোও মরণপথের যাত্রী। 

২। লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সুন্দরবন বিনাশ : 
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে পৃথিবীর একমাত্র বৃহত্তর প্রাকৃতিক এই ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনটি দিন দিন বিনাশ হচ্ছে। উজানে ভারত গঙ্গার ওপর ফারাক্কা বাঁধ ও অন্যান্য নদীতে বাঁধের কারণে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই অমূল্য সম্পদ আজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বনটি বেঁচে থাকার জন্য যে পরিমাণ স্বাদু পানির প্রয়োজন তা পাচ্ছে না। উজান থেকে পানিপ্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় সাগর থেকে জোয়ারের সময় মাত্রাতিরিক্ত লোনাপানি বিভিন্ন নদী, খাল ও ছড়া দিয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করে। এই লোনাপানি বনের ভেতর প্রবেশের কারণে সুন্দরবনের পানি ও মাটির লবণাক্ততা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষের পাকা ফল মাটিতে পড়ে বীজ থেকে অঙ্কুর এবং অঙ্কুর থেকে চারাবৃক্ষ জন্মাতে পারছে না। কেননা ছোট ছোট চারাগাছের বেঁচে থাকার জন্য যে পরিমাণ স্বাদু পানির প্রয়োজন, তা না পাওয়াতে অর্থাৎ প্রয়োজনীয় পানির অভাবে বৃক্ষশূন্য অঞ্চলে বাষ্পীয়ভবন বেশি হওয়ায় পানির স্তর (Ground level water) অনেক নিচে নেমে যায়। অন্য দিকে এই বৈরী পরিবেশের কারণে বনে পাখিকুলের সংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে। ফলে যে সব পাখি ফল খেয়ে বীজ অন্যত্র নিয়ে ফেলে, সেখানেই স্বাভাবিকভাবে বৃক্ষ জন্মে। আর সেই বীজ বৃক্ষ থেকেই বিশাল বৃক্ষের জন্ম নেয়।

প্রয়োজনীয় পানির অভাবে সুন্দরবনের সুন্দরী বৃক্ষরাজি আজ বিপন্ন। ইতোমধ্যে অধ্যুধিক লোনাপানি বনে প্রবেশের কারণে সুন্দরী আগা মরা রোগের (টপ ডাইং) বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এই রোগ। ১৯৮০ এর দশকের গোড়ার দিকে সর্বপ্রথম সাতক্ষীরা জেলার বৃক্ষ বিনাশকারী এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক হানাহানি, মানুষের ভেতর দেশপ্রেমের অভাব ও জন-সচেতনার কারণে দেশের অমূল্য সম্পদ সুন্দরবন আজ ক্রমশ ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, সুন্দরবনের প্রায় ৪০ ভাগ সুন্দরী গাছ আগা মরা রোগে আক্রান্ত। ১৯৭০ দশকের চেয়ে বর্তমানে সুন্দরবনে গাছ, মাছ, পশু এবং পাখিকুলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লোনা ও স্বাদুপানির মিশ্রণের অনুপাত সঠিক না থাকা অর্থাৎ সুন্দরবনের মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে দেখা দিয়েছে লোনাপানির আধিক্য। ফলে গাছের ডগায় এবং শেকড়ে পোকার আক্রমণ বেড়েছে। বনের ভেতরে নদী ও খালে পলি পড়ে নাব্যতা হ্রাস হেতু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মৃত্তিকার বিশেষ উপাদানের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে মিঠাপানি প্রবাহ হ্রাস পেয়ে লবণাক্ততা বৃদ্ধিই সুন্দরবন বিনাশের প্রধান কারণ বলে সর্বজনমহলে স্বীকৃত।

সুন্দরবনের মাটি ও পানিতে মৃদু লবণাক্ততা উদ্ভিদের জন্য সহায়ক। কিন্তু অতিরিক্ত লবণের কারণে সুন্দরবন ও এর আশপাশের বৃক্ষশোভিত সকল বেষ্টনী বিপন্ন হতে চলেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটিতে ১ হাজার থেকে ২ হাজার মাইক্রোমস ও পানিতে ৩ হাজার মিলিমস পর্যন্ত লবণের পরিমাণ সহনীয়। সুন্দরবনের আশেপাশে ইছামতি, পশুর, রায়মঙ্গল, মালঞ্চ প্রভৃতি নদীতে বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে লবণ ছিল ১৯ হাজার মিলিমস। এর পরিমাণ বেড়ে বর্তমানে ৬০ হাজার মিলিমসে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ১৯৮৬ সালে সুন্দরবনের মাটিতে লবণ ছিল ৩২ হাজার মাইক্রোমস, যা বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার মাইক্রোমস এ দাঁড়িয়েছে। জোয়ারের সময় লোনাপানি সাগর থেকে সুন্দরবনের নদ-নদীতে প্রবেশ করে। নদীতে স্বাদু পানির স্বাভাবিক প্রবাহ থাকলে সেই প্রবাহ সাগরের লোনাপানিকে ঠেলে পুনরায় সাগরে নিয়ে যায়। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বাংলাদেশের নদীগুলোতে শুকনো মৌসুমে পানি শূন্যতা দেখা দিয়েছে, যার অনিবার্য পরিণতি লবণাক্ততা। এই লোনায় আক্রান্ত সুন্দরবনের সবুজ বন ও গাছপালা দিন দিন বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সাগরের লোনাপানির আঘাতে বেশ কয়েক প্রজাতির ধান ও মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। এমনকি লোনা পানির আধিক্যের কারণে বনের বিভিন্ন এলাকা “ব্লাস্ট ও টপ ডাইং” রোগে আক্রান্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ গাছ মারা গেছে এবং যাচ্ছে।

একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ এবং অন্যান্য বাঁধ দেয়ার কারণে দেশের বৃহত্তম বন সুন্দরবন বিনাশের পথে। কারণ ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে এরকম কোন সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। শত শত বছর ধরে সুন্দরবন প্রাকৃতিকভাবে তার আপন সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য এবং এর জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করে চলছিল। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর কারণে বনটি এখন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছে। বনটি বিনাশের সাথে সাথে ধ্বংস হচ্ছে দেশের জীববৈচিত্র্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এর সাথে সংশ্লিষ্ট লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার পথ। ফলে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর। এরপর যদি ভারতের আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয় তাহলে কী হবে আমাদের দেশের অবস্থা! কী হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিণতি! তাই সময় থাকতে আমাদের শাসকগোষ্ঠী বা সরকার এবং সর্বস্তরের মানুষকে দলমত নির্বিশেষে সচেতন হতে হবে, রক্ষা করতে হবে দেশকে।

১৯৭৪ সালে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ৩৮০ মাইক্রোমস। বর্তমানে তা তিনগুণ থেকে চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যা একাধারে মানবসম্পদ ও পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক। সমুদ্র থেকে যে লবণাক্ত পানি জোয়ারের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবেশ করে তা অপসারণ করতে নদীর স্বাভাবিক মিঠাপানির প্রবাহ প্রয়োজন। তাতে লবণ পানি আবার সমুদ্রে গিয়ে পড়তে পারে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে দেশের নদ-নদীতে পানিশূন্যতা দেখা দেয়, ফলে লবণাক্ততা বাড়তে থাকে। সে কারণে সাগর উপকূলীয় অঞ্চলে অনেক গাছের পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট অনুযায়ী খুলনা অঞ্চলের প্রধান কয়েকটি নদীতে গত কয়েক বছর ধরে লবণাক্ততা বৃদ্ধির হার ৫০ শতাংশেরও বেশি। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার বেশির ভাগ নদ-নদীতেই এখন স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ লবণাক্ততা বিরাজ করছে। খুলনা জেলার রূপসা, শিবসা, কাজীবাছা ও পশুর নদীতে ২০০২ সালের মার্চ মাসের তুলনায় ২০০৩ সালের মার্চে লবণাক্ততা গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রূপসা নদীতে গত এক বছরে লবণাক্ততা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ, শিবসায় ৫৬ শতাংশ, কাজীবাছায় ২৫ শতাংশ এবং পশুর নদীতে এ হার ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

৩। কৃষিক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে : বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে এদেশের অর্থনীতি। এদেশের প্রায় ৮৫ ভাগ লোক কৃষিজীবী। দেশটিতে রয়েছে বিস্তীর্ণ সমভূমি আর ঊর্বর নদীপলল সমৃদ্ধ মৃত্তিকা। বৃষ্টিবহুল উষ্ণ আর্দ্র জলবায়ু এদেশকে উৎকৃষ্ট কৃষিভূমিতে পরিণত করেছে। এদেশের মোট ভূমির প্রায় ৭৫ শতাংশ জমি কৃষিযোগ্য এবং চাষাবাদের জন্য নদীনালার পানির ওপর নির্ভরশীল। এ সব জমিতে আউশ, আমন, ইরি ও বোরোসহ বিভিন্ন প্রজাতির ধান উৎপন্ন হয়। এক সময় এদেশের মাটিকে বলা হত ‘সোনার চেয়েও খাঁটি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, আজ এদেশের মানুষ শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে চাষাবাদ করতে পারছে না। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় গভীর অগভীর কোন নলকূপে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির স্তর ভয়াবহভাবে নিচে নেমে গেছে। পানির জন্য সর্বত্র হাহাকার। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, গঙ্গা নদীর ওপর ভারত ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে গঙ্গার পানির সিংহভাগ প্রত্যাহার করে ভারতের খরাপীড়িত অঞ্চলে কৃষিকাজ চালাচ্ছে আর আমাদের দেশের কৃষকরা কৃষি জমিতে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছে না। ফলে দেশের অনেক জায়গায় পুড়ে যাচ্ছে ফসল এবং ফসলী জমি। পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে মাঠ-ঘাট। আষাঢ়-শ্রাবণ এই দু’মাস বর্ষাকাল। অথচ এই বর্ষাকালেও দেশে পর্যাপ্ত পানি নেই। যেখানে দেশের প্রায় ৭০% সেচকার্যে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল সেখানে পানির অভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা কৃষিজমিতে প্রয়োজনীয় সেচকার্য চালাতে পারছে না। তারপর পানিপ্রবাহের স্বল্পতার কারণে সমুদ্র থেকে জোয়ারের সাথে প্রচুর লবণ পানি প্রবেশ করে জমির ঊর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস করছে। বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশে হাজার হাজার নলকূপে আরও বেশি পাইপ বসিয়ে গভীর নলকূপের সাহায্যে পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্বাভাবিক স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে গেছে। গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের কারণে ইতোমধ্যেই দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচ প্রকল্প তথা গঙ্গা- কপোতাক্ষ প্রকল্প (G.K. Project) এলাকায় পাম্পিং ক্যাপাসিটির প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ার কারণে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। বৃষ্টির আশায় কৃষকরা বিলম্বে চাষাবাদ শুরু করে, ফলে ফলন কমে যাচ্ছে। কৃষকেরা শাক-সবজি চাষের জন্য বৃষ্টি অথবা হাজামজা পুকুরের পানির ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু তা-ও ঠিকমত পাচ্ছে না। বৈরী পরিবেশের কারণে নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য থাকা এবং অনাবৃষ্টির কারণে অনেক সময় কষ্টার্জিত ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে চাষী বা সবজি উৎপাদনকারী ভীষণভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

বাংলাদেশের উজানে প্রধান নদীসমূহে ভারত কর্তৃক বাঁধ নির্মাণ এবং দেশের বিভিন্ন নদীতে ক্রস বাঁধ তৈরিতে পানি প্রবাহ হ্রাস, পলি ভরাট এবং জলজ পরিবেশ দূষণের ফলে ৫৬টি নদীতে ইলিশের বিচরণক্ষেত্রে শতভাগ ধ্বংস ও কয়েকটি নদীর ওপরের অংশ ৯০ শতাংশ বিচরণক্ষেত্র বিলীন হয়েছে। এর প্রধান কারণ অবাধে জাটকা নিধন ও মিঠা পানির চারণভূমি হ্রাস।

৪। নদ-নদীর বিলুপ্তি : বাংলাদেশে এক সময় নদ-নদী ছড়ানো ছিল জালের মত। এ জন্য এদেশকে বলা হত নদীমাতৃক দেশ। উনিশশ’ সত্তরের দশকের গোড়ার দিকেও ছোটবড় সব মিলিয়ে প্রায় একহাজার থেকে পনেরশ’ নদী ছিল। কিন্তু ঐ সকল নদীর সংখ্যা হ্রাস পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৪০ থেকে ২৫০ এ। কোন কোন তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে নদীর সংখ্যা ২৩০টি। এগুলোর মধ্যে প্রধান নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা ও কর্ণফুলী। প্রধান নদী পাঁচটির মধ্যে পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র এর উৎপত্তি মূল হিমালয়ে এবং এগুলো ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ব্রহ্মপুত্রের বর্তমানে প্রধান প্রবাহ নব-ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা (Young Brahmaputra) যা দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে গোয়ালন্দের উত্তরে পদ্মার সাথে মিলিত হয়েছে। অতঃপর দক্ষিণ-পূর্বে ১০৪ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরের কয়েক কিলোমিটার উজানে মেঘনায় মিলিত হয়ে এটি দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। ভারত কর্তৃক ফারাক্কাসহ অন্যান্য নদীর উৎস-মুখে বাঁধ নির্মাণের ফলে ইতোমধ্যেই দেশের নদীগুলোর করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। 

সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ঘেরা এই গঙ্গা (পদ্মা) এখন মৃত্যুমুখে। গঙ্গা-পদ্মার ক্ষীণদশার জন্য দায়ী ফারাক্কা বাঁধ। আর এর ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে তো বাঁধাগ্রস্ত করছেই সেই সাথে ঘটছে সামাজিক বিপর্যয়। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ জমি গঙ্গাবিধৌত। শুধু বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মাছ ধরা ও চাষাবাদসহ জীবন জীবিকা নির্ভর এই নদীর ওপর। অথচ নাব্যতা হারিয়ে পদ্মার বুকে প্রতি বছর চরের সংখ্যা ও এর উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এসব চরে দিন দিন জনবসতি বেড়েই চলেছে। মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাদারিপুর ও শরিয়তপুরের পদ্মার চরে এ সংখ্যা বেশি। মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার উত্তরে পদ্মায় একাধিক চরের সৃষ্টি হয়েছে। শুধু পদ্মা নয় পুরনো ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, (নব-ব্রহ্মপুত্র) এবং মেঘনা নদীরও একই অবস্থা। ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় দেশের অন্য সকল নদীর চেয়ে বেশি চর সৃষ্টি হয়েছে। এসকল চরে এখন বিশাল জনগোষ্ঠীর বসবাস। এখানে অন্তত ১০টি চরে (২০০৭ এর তথ্য) কমপক্ষে দু’হাজার পরিবারের বসবাস। এদের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলছে। এরকম শুধু ব্রহ্মপুত্র আর যমুনায়ই সীমবদ্ধ নয়, সারা দেশের প্রায় সকল বৃহৎ নদীগুলোর একই করুণ দশা। আর শাখা-প্রশাখাগুলো বছরে প্রায় ৮-৯ মাসই পানিশূন্য বা মৃতাবস্থায় থাকে অতএব অতি সহজেই বোঝা যাচ্ছে দেশের প্রধান নদীগুলোর করুণ পরিণতি। তাহলে এদের শাখা-প্রশাখার অবস্থা কী হতে পারে!

গত তিন দশকে ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের ২৩০টি নদীর মধ্যে অনন্ত ৮০টি নদী, উপনদী ও শাখানদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে হ্রাসের কারণে বৃহৎ নদীসমূহ মৃত নালায় পরিণত হচ্ছে। যেখানে ১৯৭১ সালে দেশে মোট নাব্য নদীপথ ছিল ২৪ হাজার ১শ’ ৪০ কিলোমিটার। বর্তমানে সেখানে শুকনো মৌসুমে এর পরিধি এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৮শ’ কিলোমিটার। এ পরিধি দিন দিন আরও কমছে। চুক্তি অনুযায়ী পানি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। দু’হাজার কিলোমিটার জুড়ে চর, প্রমত্তা পদ্মা এখন মৃতপ্রায় স্রোতহীন নদী। পাকশি নর্থবেঙ্গল পেপার মিলের পাম্প স্টেশনের নিচে চর জেগে ওঠায় পদ্মা এখন একটি খালে পরিণত হয়েছে। জেগে ওঠা এসব চরে কৃষকেরা আখ, বাদাম ও ধান চাষ করছে। 

সুজলা-সুফলা এই দেশে শীতের শুরু থেকে সমগ্র শুকনো মৌসুম জুড়ে নদীতে পানি থাকে না। পানির অভাবে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইতোমধ্যে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নদীসমূহের নাব্যতা সংকটের কারণে দেশের নৌপথ প্রতিবছর সংকুচিত হচ্ছে। আবহাওয়ার স্বাভাবিকতার পরিবর্তন বাড়ছে। পলি জমে নদীর তলদেশের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া এবং নদীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় বর্ষাকালে উত্তরের পাহাড়ি ও বৃষ্টির পানি সীমিত আয়তনের নদীসমূহ বহন করতে পারছে না। ফলে বন্যার পানি নদী ছেড়ে উপকূলের গ্রাম-গঞ্জে ঢুকে পড়ায় প্রতি বছর বন্যায় দেশের শত শত কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট করে এবং বানভাসী মানুষেরা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। নদীর সংখ্যা হ্রাস এবং নাব্যতা সংকটের কারণে নদীর অস্বাভাবিক এ আচরণ। এর ফলে প্রতিনিয়ত নদী ভাঙন বেড়ে চলছে ফলে মানুষ হয়ে পড়ছে সহায় সম্বলহীন এবং শহরমুখী।

পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রধান নদীপ্রবাহ তিনটি-পদ্মা (গঙ্গা), ব্রহ্মপুত্র-যমুনা (নব-ব্রহ্মপুত্র) এবং মেঘনা এই তিনটি প্রবাহের সাথে যুক্ত দেশের বড় ও মাঝারি আয়তনের ২৩০টি নদ-নদী। উজান থেকে আসা ঐ তিনটি প্রধান নদীর প্রবাহ কৃত্রিম কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এর সাথে সংযুক্ত অন্য নদ-নদীগুলোর অবস্থাই বদলে গেছে। আর এর সাথে সংযুক্ত হচ্ছে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বিস্ফোরণ। দেশের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে একটি আদি ব্রহ্মপুত্র এখন মৃতপ্রায়। শুকনো মৌসুমে এর অধিকাংশ এলাকায় পানি থাকে না। এই আদি ব্রহ্মপুত্রের পানি এক সময় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার একর জমির সেচের উৎস ছিল। কিন্তু এখন পানির অভাবে সেই সমস্ত সেচ প্রকল্পগুলো বন্ধ। সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেছে নৌপথের ব্যবসা বাণিজ্য, উপরন্তু ব্রহ্মপুত্রের চরে এখন রবিশস্যের চাষ হচ্ছে।
প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহ না থাকায় উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘতম প্রমত্তা নদী তিস্তা ধীরে ধীরে শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। যেখানে তিস্তা ব্যারেজকে সচল রাখার জন্য দরকার কমপক্ষে ৫ হাজার কিউসেক পানি সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৫০ কিউসেক। ফলে উত্তরাঞ্চলের সেচভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তিস্তার বিরূপ প্রভাব পড়েছে ঐ অঞ্চলের তিস্তার পুরনো ধারা আত্রাই, করতোয়া ও পুনর্ভবার ওপর। তিস্তার দু’টো শাখা নদী বাঙ্গালী ও ঘাঘট শুকিয়ে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে।

এক সময়ের পদ্মার প্রধান শাখানদী প্রমত্তা গড়াই এখন শুকনো মৌসুমে থাকে প্রায় পানি শূন্য। কেবল বর্ষা মৌসুমে কিছুটা প্রবাহমান হয়। রাজবাড়ি জেলার ওপর থেকে বয়ে যাওয়া সেরাজপুর হাওড় ও চন্দনা এখন মৃত নদী। ফরিদপুরের কুমার নদী দিয়ে কয়েক দশক আগেও বড় বড় স্টিমার চলাচল করত। কিন্তু সেদিনের সে কুমার এখন কঙ্কাল নদী। বৃহত্তর কুষ্টিয়া এবং যশোর অঞ্চলের প্রায় সকল নদীর মাতানদী ছিল মাথাভাঙ্গা। এখন শুকনো তো দূরের কথা, বর্ষা মৌসুমেও এককালের প্রমত্তা মাথাভাঙ্গা থাকে নীরব, নিথর ও প্রাণহীন।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গড়াই-মধুমতির নিম্ন প্রবাহ বলেশ্বর। এই বলেশ্বর নদীর নামডাক ছিল বিখ্যাত আর অন্য সব নদীর চেয়ে আলাদা। পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলা বিভক্তকারী এই নদীতে প্রচুর ইলিশ ও হাঙ্গর পাওয়া যেত। আর এর স্রোত ছিল তীব্র। কিন্তু ২০০৫ এবং ২০০৬ সালে কয়েকবার বরিশাল হয়ে খুলনা ভ্রমণকালে দেখা গেল যে, বলেশ্বর ছিল একেবারে নীরব ও নিস্তব্ধ। বর্ষা মৌসুমে কিছুটা সচল থাকলেও শুকনো মৌসুমে একে দেখলে সকলে ভাববে এটি একটি স্রোতহীন মৃতপ্রায় নদী। সাগরের তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি অবস্থান বিধায় নাজিরপুর থেকে জিয়ানগর উপজেলা পর্যন্ত ছোট ছোট নৌযান চলাচল করতে পারে। কিন্তু এই নদীর অবস্থা দিন দিন আশংকাজনক। পদ্মার আর একটি বৃহত্তর শাখানদী আড়িয়াল খাঁ। এই আড়িয়াল খাঁকে প্রমত্তা পদ্মার এক সময় প্রধান প্রবাহ নির্গমন পথ হিসেবে গণ্য করা হত। সেই আড়িয়াল খাঁ-র উৎসমুখ সদরপুর থেকে মাদারিপুর পর্যন্ত অবস্থা অত্যন্ত করুণ। শিবচরের যেখানে আড়িয়াল খাঁ সেতু নির্মিত হয়েছে সেখানে সেতুর ওপরে দাঁড়ালে এর করুণ দৃশ্য সহজেই দেখা যায়। নদীটি বর্ষা মৌসুমে সচল থাকলেও শুকনো মৌসুমে মৃতপ্রায়। দু’তীরের চরে চাষ হচ্ছে চীনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন, পাট, গাম, আখ ও শাক-সবজি। সারিবদ্ধভাবে সাদা কাশফুল শোভা পাচ্ছে, এরই কিছু ভাটিতে বিভিন্ন উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত প্রমত্তা পদ্মার শাখা কীর্তিনাশাসহ কয়েকটি নদীর অবস্থাও অত্যন্ত আশংকাজনক। সেখানে সংস্কারের কোন লক্ষণ নেই এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপজ্জনক।

যশোর ও খুলনা অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ, হরিহর, নবগঙ্গা, চিত্রা, ব্যাঙ, ইছামতি, ভৈরবসহ প্রায় সকল নদী শুকনো ঋতুতে মৃতপ্রায় দশা। এছাড়াও কালনী, ডাকুয়া, বেতনা, বেগবতী, মুক্তেশ্বরী, হাঁসকুড়া, বাগমারা, চিলা, শোলামারি (সৈলমারী), ভদ্রা, ঘুমনা, টেকা, হানু, শ্রী, সোনাই ও কালিন্দী নদীর অবস্থাও একই রকম।
কুমিল্লার দুঃখ নামে পরিচিত ছিল গোমতী নদী। এখন শুকনো মৌসুমে সেটি শুকিয়ে থাকে কিন্তু বর্ষা মৌসুমে কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। তবে স্রোত আর আগের মত নেই। অপরদিকে তিতাস নদীসহ এর সকল শাখানদীর অবস্থা আরও করুণ। পুবের টিলাপাহাড় থেকে নেমে আসা চোয়ানো পানিতে বর্ষা মৌসুমে সচল থাকলেও শুকনো মৌসুমে নদীটি মৃতপ্রায়। কিশোরগঞ্জের নরসুন্দর যৌবন হারিয়ে কঙ্কাল। ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, গাজিপুর, মানিকগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, লৌহজং, বানার, ইছামতি, বুড়িগঙ্গা, বংশী, বালু, কালিগঙ্গা ও তুরাগ নদী প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে এবং উত্তর দিকের মরে যাওয়া অংশে এখন চাষাবাদ চলছে। এ সকল নদীর অবস্থা দিন দিন ক্ষীণ ধারায় পরিণত হচ্ছে।

সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পঞ্চগড়, নীলফামারী, রংপুর, বগুড়া এবং সিরাজগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ছিল প্রমত্তা করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী। সেগুলো এখন প্রায় মৃত। পাবনার ইছামতি এবং মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের ইছামতি ছাড়াও পাবনার বড়াল এবং এর সমস্ত শাখা নদীগুলো এখন মৃত নদী।

এই সব নদী-নালা দেশের পরিবেশের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদী-নালার সাথে দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর গভীর সম্পর্ক। সুতরাং নদ-নদী হুমকির সম্মুখীন হলে দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন হতে বাধ্য। ফলে ভারতের নদী প্রকল্পের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশ চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠবে। বাড়বে তাপমাত্রা, মানুষের জীবনযাপন হবে কষ্টসাধ্য, বিপন্ন হবে Ecological Balance বা প্রতিবেশ ভারসাম্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী অনাবৃষ্টি এবং বায়ুমন্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলে অত্যাধিক বরফগলা ইত্যাদির অস্বাভাবিকতার কারণে পানিই হবে বর্তমান শতাব্দীর প্রধান সমস্যা। প্রসঙ্গে ২০০৬ সালের ২৩ অকটোবর ‘‘দৈনিক ইত্তেফাক’’ এর প্রধান সম্পাদকীয় ছিল পানি সংকেটে আগামী বিশ্ব। এতে বলা হয়েছে ২০৭০ থেকে ২০৮০ সালে মধ্যে পানিসংকট ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দেখা দিবে। দরিদ্র দেশগুলোর খাদ্যোৎপাদনে অর্জিত বিশাল সাফল্য ম্লান হয়ে যাবে পানীয় ও জলের সংকটের মুখে। কেবল খাদ্য দুর্ভিক্ষ নয়, বরং দরিদ্র বিশ্বের বহু দেশকে তখন মুকাবিলা করতে হবে পানীয় জলের দুর্ভিক্ষের। ২০৫৬ সালে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় অর্ধশত বছর পর পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৯শ’ কোটিতে। এক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হতে জানা যায়, ভূ-মন্ডলে বর্তমানে পানির সংস্থান আছে ১ হাজার ৩ শ’ লক্ষ কোটি ঘনমিটার। এর মধ্যে পানযোগ্য পানির পরিমাণ মাত্র ২.৫ ভাগ। এর মধ্যে হিমবাহ আকারে আটকে আছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। বাকি ৯৭.৫ ভাগ পানিই পানের অযোগ্য। জাতিসংঘের এক সমীক্ষায় আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলা হয়েছে ২০২৫ সালের মধ্যে চরম পানীয়জলের সংকটে পড়ে গরীব দেশের কোটি কোটি লোকের মৃত্যু হতে পারে। সমীক্ষায় আরো বলা হয়, বিশ্বের ১২০ কোটি মানুষ পানির অভাবে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়বে এবং ১ কোটি ৫০ লক্ষ শিশু অনিবার্যভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। বিশেষজ্ঞদের আরও আশঙ্কা বর্তমানে বিশ্বে যেভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে তাতে কেবলমাত্র বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ জেলা অর্থাৎ ১২ থেকে ১৫ শতাংশ প্লাবিত এবং প্রায় ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) মানুষ উদ্বাস্ত্ত হয়ে পড়তে পারে। তাদের ধারণা, তাপমাত্রা যদি বর্তমানের চেয়ে ১ থেকে ২ ডিগ্রী বাড়ে তাহলে বাংলাদেশের শীতকালীন ফসল বিশেষ করে গম ও আলুসহ বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজি উৎপাদন হ্রাস পাবে। এছাড়া দেশের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভূমির ক্ষয় বৃদ্ধি পাবে।

৫। জীববৈচিত্র্য (Bio-Diversity) ধ্বংস : বাংলাদেশের নদ-নদীর স্বার্থের সাথে শুধু মানুষই নয় বরং প্রতিবেশী হিসেবে জড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রজাতির পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও পোকা মাকড়ের জীবনধারা। এদেশের নদ-নদীসমূহ মরে গেলে দেশের দুর্লভ প্রাণী ও কীটপতঙ্গসমূহ আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মানবসৃষ্ট পরিবেশ পরিপন্থী পদক্ষেপের কারণে পরিবেশ রক্ষাকারী অনেক প্রজাতির অস্তিত্ব অবলুপ্ত হতে চলেছে। অনেক প্রজাতি ইতোমধ্যে এদেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। প্রকৃতির নৈসর্গিক ভুখন্ড থেকে বৈচিত্র্যময় প্রাণী ও উদ্ভিদ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। ক্রমাগতভাবে পরিবেশ হয়ে উঠছে ভারসাম্যহীন। এদেশের অবস্থান উত্তরে হিমালয় পর্বত, সমতল ও দক্ষিণে সাগরের কারণে অসংখ্যা নদী শিরা-উপশিরার মত বয়ে চলেছে। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষা অতি জরুরী। কারণ ক্রান্তীয় এ ভূখন্ড অত্যন্ত ঊর্বর। দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু পাহাড় ছাড়া এদেশের বাকি অঞ্চল নবীন পললে গড়া সমতলভূমি। প্রাণী ও উদ্ভিদের যথাযথ বিকাশের জন্য এখানকার আবাহওয়া অত্যন্ত অনুকূল। বিশাল বৈচিত্র্য ধারণ করার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখানকার জীববৈচিত্র্য দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। 

এদেশের সর্বত্র জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ। এখানে ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৬৩০ প্রজাতির বেশি পাখি, ১২৫ প্রজাতির সরীসৃপ ইত্যাদি বাস করে। স্বাদু পানিতে বসবাস করে ২৬০ প্রজাতির মাছ আর ৪৭৫ প্রজাতির আছে সামুদ্রিক মাছ। এদেশে উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা ৩২৭ এবং ৬৬ প্রজাতির মাছ আর ৪৭৫ প্রজাতির আছে সামুদ্রিক মাছ। এছাড়াও প্রতিবছর শীতের শুরুতে উত্তর সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে অসংখ্য প্রজাতির পাখি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক ও সিলেটের হাকালুকি হাওড়সহ দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে আশ্রয় নেয়, কিন্তু শীতের শেষে স্বাভাবিকভাবে নিরাপদে দেশে ফিরে যেতে পারে না। অসাধু শিকারিদের হাত থেকে এরা নির্বিচারে নিধনের শিকার হয়। ফলে ঐ সব অতিথি পাখির আগমন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। প্রয়োজনীয় খাদ্য, বৈরী আবহাওয়া, নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস এবং সর্বোপরি মানুষের নিষ্ঠুর আচরণের ফলে ১৬ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ ও বন্য পশুপাশির বিলুপ্তি ঘটেছে। 

প্রতিবেশী দেশ ভারত বাহুবলে গঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে এবং নতুন করে শুরু করেছে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প। এর ফলে আমাদের দেশের স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস এবং জীববৈচিত্র্য আরও বিপন্ন হবে। তাই ভারতের আন্ত:নদী প্রকল্পের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বিষয়টি বিশ্ববাসীকে জানানোর জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করতে হবে। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে, আধুনিক গণমাধ্যম ও ই-মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে, সরকারের পাশাপাশি প্রবাসীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে এবং দেশের ভেতরের বিশাল জনগোষ্ঠিকে সংশ্লিষ্ট করে জনমত গঠন করতে হবে, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন জোরদার করতে হবে। এদেশকে রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে আমাদের জীবনকে রক্ষা করতে হবে। সেই সাথে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের মূল দায়িত্ব। এজন্য সকলকে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশ-বান্ধব নীতি প্রণয়নে, পরিবেশ বিষয় নিবিড় অনুসন্ধানের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যের আন্তঃসম্পর্ক বা আন্তঃনির্ভরশীলতা আবিষ্কার জরুরি। বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সকলকে আর বেশি সচেতন হওয়া উচিত।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন ও বৃক্ষ যেমন অপরিহার্য, তেমনি বনের স্বাভাবিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন বনচর পশুপাখীর। বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কমপক্ষে ১৮৫টি আইন রয়েছে। এছাড়াও পরিবেশের সাথে সম্পর্কযুক্ত ২২টি আন্তর্জাতিক চুক্তি বাংলাদেশ অনুমোদন করেছে। উপরন্তু বাংলাদেশ আরও ২৬টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দেশে এখন ১৪টি অভয়ারণ্য ও ন্যাশনাল পার্ক রয়েছে। কিন্তু কোন বিধিবিধান ও আইনের তোয়াক্কা না করে দেশের সংরক্ষিত এলাকাতেও পশুপাখির জন্য নির্ধারিত অভয়ারণ্যে চলছে বন উজাড় ও পশুপাখি নিধনের ঘটনা। 

অতএব দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ ফারাক্কা বাঁধসহ অন্যান্য বাঁধ ও দেশের নদ-নদী, খাল-বিলের নাব্যতা হ্রাস এবং ভূমি দস্যুদের দখল, গাছপালা কেটে লাগামহীনভাবে বনভূমি ধ্বংস, এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উঁচু ভূমি কিংবা প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ পাহাড় কেটে নিচুভূমি ভরাট করে আবাসভূমি তৈরি এবং অপরিকল্পিত ভাবে নগর ও শিল্পায়ন ইত্যাদি।

৬। দেশের প্রায় সকল নদীবন্দরসমূহের সৃষ্ট অচলাবস্থা : ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদীসমূহের পানিপ্রবাহ ভীষণভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে নদীগুলোর নাব্যতার অভাবে ঢাকা, খুলনা, নারায়গঞ্জ, ভৈরববাজার, চাঁদপুর, বাঘাবাড়ি, চিলমারী, গোয়ালন্দ, বরিশাল, ঝালকাঠি, হুলারহাট, কাউখালী, স্বরূপকাঠী (নেছারাবাদ), ভান্ডারিয়াসহ বিভিন্ন নদীবন্দরে জাহাজ বা বড় নৌ-যান আগের ন্যায় ভিড়তে পারে না। নদীমাতৃক এদেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্যদ্রব্য আনা-নেয়ার জন্য সকল নৌ-বন্দরমুখী কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ছে ফলে এই নদীনির্ভর দেশটি অর্থনৈতিকভাবে নানামুখী ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

ইতোমধ্যে ফারাক্কার ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ও চিলমারী নৌবন্দরে বছরের প্রায় সময়ই তেলের ট্যাংকারসহ পণ্যবাহী বিভিন্ন জাহাজ নোঙর করতে পারছে না। বৃটিশ আমলের শেষদিকেও ধানসিঁড়ি নদীর সাথে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার চিরপাড়া নদী দিয়ে বিশাল আকারের লঞ্চ-স্টীমার ঢাকা বরিশাল ও খুলনা হয়ে কোলকাতাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচল করত। ১৯৮০ দশকের গোড়ার দিকে চর পড়ে চিরপাড়া চ্যানেলটির মুখ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে বর্তমানে উক্ত নৌযানসমূহ রুট পরিবর্তন করে সুন্দরবন হয়ে খুলনা যেতে হচ্ছে। অতএব, সারাদেশের নৌ-বন্দরসমূহের অচলাবস্থার জন্য দায়ী ভারতের ফারাক্কাসহ অন্য সকল বাঁধ। তাই আজ আমাদের উচিত হবে দেশের মাটি, মানুষ ও পরিবেশকে রক্ষার জন্য সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

৭। নদীভাঙন, অকালবন্যা ও উদ্বাস্তু সমস্যা : নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নদীনালার ওপর নির্ভরশীল। অতএব নদীর অস্তিত্ব বিপন্ন হলে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পেশার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। ভারত কর্তৃক ফারাক্কাসহ অসংখ্য বাঁধ নির্মাণ পরবর্তী বাংলাদেশের নদ-নদীর বিপন্নদশার কারণে লক্ষ লক্ষ জেলে পেশার মানুষ বেকার হয়ে যাচ্ছে। নদীসমূহের নাব্যতা হ্রাসের কারণে সাগরের লোনাপানি উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবেশের ফলে বনভূমি তথা সুন্দরবনের সুন্দরীবৃক্ষসহ সকল বৃক্ষ বিনাশ ও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে এর সাথে নির্ভরশীল বাওয়ালী, কাঠুরে, জেলে ও মধু আহরণকারী (মৌয়ালী) লোকজনও দিনদিন কর্মহীন হয়ে পড়ছে।

পানি সংকটের কারণে নদীসমূহের নাব্যতা হ্রাস পেয়ে তলদেশের উচ্চতা বেড়ে দেশের প্রধান প্রধান নদীসমূহের মাঝে চর সৃষ্টি হয়। অতঃপর এই সকল চর বা দ্বীপে জনবসতি শুরু হয়, সেখানে ক্রমান্বয়ে লোকজন ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট তৈরি এবং কৃষিকাজ করতে শুরু করে। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে ভারত পাহাড় পর্বতের অতিরিক্ত পানি ধারণে অক্ষম হয়ে পড়ায় ফারাক্কাসহ যখন সকল বাঁধ খুলে দেয় তখন প্রয়োজনের অধিক পানি বাংলাদেশ ভাটির অঞ্চল বলে এদেশের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। ফলে জনবসতি, রাস্তাঘাট ও ব্যাপক শস্যহানি ঘটে এবং মারাত্মক নদীভাঙনের সৃষ্টি হয়। গত কয়েক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। 

সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, বাংলাদেশের ভূ-ভাগ ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে নতুন নতুন চর সৃষ্টি হচ্ছে। এসব চরের আয়তন দেশের দক্ষিণ দিক বরাবর বেড়েই চলছে। আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অগভীর উপকূল অঞ্চলে চলমান ব-দ্বীপ গঠন প্রক্রিয়ায় আরও কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি লাভ করবে। অন্যদিকে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, শরিয়তপুর, সিলেট, পাবনা, নেত্রকোণা, খুলনা, রংপুর, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, রাজবাড়ি, মাদারীপুর, শেরপুর, বরগুনা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশালসহ অনেক বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় প্রতিবছর। ফলে এসব ভাঙনকবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা সহায়-সম্বল হারিয়ে শহর কিংবা রেললাইনের পাশে আশ্রয় নেয়। তারা উদ্বাস্ত্ত হয়ে মানবেতর অবস্থায় জীবন কাটায়। কাজের সন্ধানে শরহগুলোতে ভিড় জমানোর ফলে তাদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে।

আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারের আইনগত ভিত্তিঃ
আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী একটি নদী যদি দুই বা ততোধিক রাষ্ট্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তবে ঐ নদীর পানি সম্পদের ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে এমনভাবে আন্তর্জাতিক নদীকে ব্যবহার করবে তা যেন অপরাপর রাষ্ট্রসমূহের সহজাত অধিকার ও স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়। যে দেশের ওপর দিয়ে নদী প্রবাহিত, নদীর সে অংশের পানি সে দেশের পক্ষে ইচ্ছেমত ব্যবহারের একচেটিয়া অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত নয়। এ সম্পর্কে প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ওপেনহেইম বলেন ‘‘কোন রাষ্ট্রকে নিজ ভূখন্ডের প্রাকৃতিক অবস্থা এমন করে পরিবর্তন করতে দেয়া যাবে না যার ফলে প্রতিবেশি কোন রাষ্ট্রের ভূখন্ডের প্রকৃত অবস্থায় কোন অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে।’’ আন্তর্জাতিক নদীর ব্যবহার সংক্রান্ত অনুরূপ মতামত ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক আইন ইনস্টিটিউটও।

পৃথিবীতে প্রায় ২১৪টি আন্তর্জাতিক নদী রয়েছে। এই নদীসমূহ একাধিক স্বাধীন দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। এসব নদীর মধ্যে আমাজান, জায়ার, জাম্বেসী, দানিয়ুব, নাইজার, নীল, রাইন, মেকং, লেকচাঁদ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখাযোগ্য। যে কোন আন্তর্জাতিক নদীর ওপর তীরবর্তী রাষ্ট্রের অধিকার সমঅংশীদারিত্বের নীতির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক নদী সম্পদের তীরবর্তী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সুষম বণ্টনের নীতি আজ স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক নদীর ব্যবহার সম্পর্কে ১৮১৫ সালে ভিয়েনা সম্মেলনে এবং ১৯২১ সালে আন্তর্জাতিক দানিয়ুব নদী কমিশন কর্তৃক প্রণীত আইনে এই নীতির উল্লেখ রয়েছে।
১৯৬৬ সালে আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি সম্মেলনে গৃহীত নীতিমালার ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি রাষ্ট্র তার সীমানায় আন্তর্জাতিক পানি সম্পদের ব্যবহার অধিকার ভোগ করবে যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। পানি সম্পদের সুষম বণ্টনের নীতি ১৯৭২ সালে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত মানব পরিবেশ সংক্রান্ত জাতিসংঘের কনফারেন্স ঘোষণাপত্রের ৫১ অনুচ্ছেদে স্থান লাভ করে।

১৯২১ সালে সুদান ও মিশরের মধ্যে নীলনদ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, সুদান নীলনদে এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করবেনা যাতে মিশরের স্বার্থ ক্ষুন্ন হতে পারে।

১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু উপত্যকা চুক্তিতেও এমন ঘোষণা উল্লেখ ছিল যে, তীরবর্তী একটি রাষ্ট্র এমন কোন ব্যবস্থা নেবে না যাতে অপর তীরবর্তী রাষ্ট্রের নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বিঘ্নিত করতে পারে।

যে নদী একবার একাধিক দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, তার ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। সেখানে নিজ দেশের আইন দ্বারা কখনোই তা নির্ধারিত হয় না। কিংবা নিজ দেশ এককভাবে সেই পানি ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী দেশকে পানির ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। কিন্তু প্রতিবেশি দেশ ভারত আন্তর্জাতিক স্বীকৃত কোন আইন মানছে না। শক্তির জোরে একের পর এক বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৫৪টি নদীর প্রায় সকল প্রবাহ পথে বাঁদ দিয়ে বাধার সৃষ্টি করে এর বিশাল পানিপ্রবাহ কৃত্রিম খালের সাহায্যে উঁচু অঞ্চলে প্রবাহিত করে কৃষিক্ষেত্রসহ ইচ্ছেমতো সকল ক্ষেত্রে পানি ব্যবহার করছে। আর এই প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৭৫ সাল থেকে। প্রথম ১৯৭৫ সালে ৪১ দিনের (২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে) অজুহাতে বাংলাদেশ সরকারকে আই ওয়াশ (Eye Wash) বা প্রতারণার ফাঁদে ফেলে বহু বিতর্কিত ফারাক্কা বাঁধটি চালু করে। ওয়াদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও বাঁধটি আর বন্ধ করেনি এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সকল আন্তর্জাতিক নদীসহ ভারতের ওপর দিয়ে বয়ে আসা সকল নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সকল প্রবাহপথ বন্ধ করে দিয়েছে। এদের মধ্যে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ, ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর বাঁধ, মুহুরী নদীতে বেলুনিয়া বাঁধ, পিয়াই নদীর ওপর পিয়াই বাঁধ, খোয়াই নদীর ওপর শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ। এই সকল নদীতে বাঁধ, গ্রোয়েন নির্মাণ কিংবা স্লুইচ গেট নির্মাণসহ আরও অসংখ্য ছড়ানদীতে বাঁধ বা স্লুইচগেট নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহপথে বাধার সৃষ্টি করছে। এই বেআইনী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বার বার প্রতিবাদ জানালেও তাতে তারা কোন কর্ণপাত করছে না। ফলে ফারাক্কাসহ ঐ সকল বিপদজনক বাঁধের প্রভাবে সারা বাংলাদেশ ক্রমশ মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নদীমাতৃক সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা এ অপরূপ বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পানির অভাবে আজ দিন দিন বিরাণ ভূমিতে পরিণত হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিশাল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দরিদ্র এই দেশটির উন্নয়নের সকল ক্ষেত্র। গুরুত্বপুর্ণ এই সেক্টরের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার দেশের অর্থনৈতিক খাত। পানির সাথে সংশ্লিষ্ট দেশের শিল্পকারখানা, নৌ-পরিবহন, নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ, বনজসম্পদ, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ বিপর্যয়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ মৃত্তিকার জলীয়তা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে দেশ এক মারাত্মক সংকটের দিকে এগুচ্ছে। প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহের অভাবে প্রায় সকল নদীর নাব্যতা ভীষণভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে প্রতিবছর অকাল বন্যা ও প্রকট নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীরা। তার শহর, সড়ক, মহাসড়ক ও রেললাইনের পাশে আশ্রয় নিচ্ছে এবং ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

ফারাক্কা বাঁধের পর তিস্তা বাঁধ, টিপাই বাঁধ প্রকল্প এবং আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প ইত্যাদির প্রতিক্রিয়ায় দেশ নিশ্চিত মরুময়তার দিকে এগুচ্ছে। নদীসমূহে প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহের অভাব দেশের নদ-নদী, হাওড়-বাওড়, বিল-ঝিল, পুকুর-ডোবাসহ সকল ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। মৎস্যক্ষেত্র প্রয়োজনীয় বিচরণভূমির অভাবে মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে বর্ষা মৌসুমেও নদীতে মাছ নেই, হাওড় বাওড় মাছশূন্য। এর ফলে প্রতিবছর মাছের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

প্রয়োজনীয় পানিপ্রবাহ না থাকায় দেশের উপকূলীয় নদীসমূহে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে লবণাক্ততার পরিমাণ। লবণাক্ততার কারণে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খুলনা অঞ্চল।
ফারাক্কা বাঁধ ও আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প ভারতের একটি সূদুর প্রসারী চক্রান্ত। বাংলাদেশ নামের এ ভূ-ভাগকে চিরতরে মরুভূমির দিকে ঠেলে দেয়ার প্রয়াস তাদের। 

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য যা করা দরকার। 
১. দেশের ভেতরে এবং বাইরে এ বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে হবে।
২. শুষ্ক মৌসুমে ভারত ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ন্যায্য পানির হিস্যা দিচ্ছে কি না সে বিষয়ে দু’দেশের চুক্তির প্রতি খেয়াল বা নজরদারী রাখতে হবে।
৩. দু’দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এ বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। কারণ শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের কথা বলে যদি সেখানে চাহিদা অনুযায়ী কম পানি দেয়া হয় সেক্ষেত্রে তা গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।
৪. অববাহিকা ভিত্তিক নদী উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে হবে।
৫. দেশকে বাঁচাতে হলে নদী বাঁচাতে হবে। প্রতিবেশি দেশ ভারতের সাথে গঠনমূলক ও সৃজনশীল আলোচনায় ফারাক্কাসহ সকল সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে হবে।
৬. প্রয়োজন হলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগী সংস্থা এর অন্য সদস্য দেশসমূহের সাহায্য নিতে হবে। আমাদের নদীর নাব্যতা বাড়াতে প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বৃহত নদী ও হাওড় বরেন্দ্র এলাকার নদী সমূহে পরিকল্পিতভাবে জলাধার তৈরি করতে হবে যাতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যায় এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষি ও সেচ কাজে প্রয়োজন মত ব্যবহার করা যায়।
৭. ভারতের আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।
৮. বিষয়টি বিশ্ববাসীকে জানানোর জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপন করতে হবে।
৯. কুটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। আধুনিক গণমাধ্যম ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারের পাশাপাশি প্রবাসীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র :
১.ফারাক্কা বাঁধ ও আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প : বাংলাদেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবঃ আখতার হামিদ খান
২. বি.এম.এ.টি আব্বাস : ১৯৮০ : ফারাক্কা ব্যারেজ ও বাংলাদেশ, ঢাকা।
৩. আবদুল জলিল; ১৯৮২ : সুন্দরবনের ইতিহাস, ঢাকা।
৪. বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি: ২০০৭, ঢাকা।
৫. সচিত্র বাংলাদেশ বিশেষ সংখ্যা (১৯৯৫) ঢাকা।
৬. মোকাররম হোসেন; ১৯৯৫ : বাংলাদেশের নদী, ঢাকা।
ঢাকা।

বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০১৬

১১ মার্চ ছাত্রশিবিরের শহীদ দিবস

১১ মার্চ ইসলামী ছাত্রশিবিরের শহীদ দিবস। ১৯৮২ সালের এই দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর শহীদ সাব্বির হামিদ, আইয়ুব ও জাব্বারের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ছাত্রশিবিরের যাত্রা শুরুর পর এই দিনে বাংলাদেশে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ হওয়ার গেীরব অর্জন করেন শহীদ সাব্বির আহমদ। শহীদ আবদুল হামিদ, আইয়ুব আলী, আবদুল জাব্বারের পথ ধরে দুইশত ছাব্বিশ জন শহীদের নজরানা পেশ করেছে এই সংগঠন।

সব ধরনের জুলুম ও নিপীড়ন থেকে মানুষের মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করে চলছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। শত বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে যারা নিরলস নিত্যদিন কাজ করে চলছে, যারা এগিয়ে চলছে আন্দোলন-সংগ্রামে, অত্যাচার-নির্যাতন, জেল-জুলুম ও জীবনদান যাদের নিত্যসঙ্গী, অপরিসীম ত্যাগ আর কুরবানির বিনিময়ে যারা কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে নিত্যদিন, তাদেরই সংগঠন ছাত্রশিবির। 

কী ঘটেছিল এই দিনে?
১১ মার্চ, ১৯৮২। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। আগের দিন ১০ মার্চ, বুধবার। সেদিন থেকেই মূলত শিবিরের এই কর্মসূচিকে বানচালের একটি হীন ষড়যন্ত্র শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে উদীয়মান শক্তি হিসেবে শিবিরকে সহ্য করতে পারল না বাতিলপন্থীরা। ১১ তারিখের অনুষ্ঠানের প্রচারের কাজে ব্যস্ত শিবিরকর্মীদের ওপর হঠাৎ করে চড়াও হলো ছাত্র ইউনিয়নের একদল দুষ্কৃতকারী। শিবিরকর্মীদের হাত থেকে প্রচারপত্র কেড়ে নিলো। প্রচারকার্য বন্ধ করার জন্য বল প্রয়োগ করতে লাগলো। কিন্তু ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে পরিস্থিতির মোকাবেলা করলেন শিবিরকর্মীরা। এতে আহতও হলেন কয়েকজন। 

১১ মার্চ সকাল থেকেই নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য জোর প্রস্তুতি চলছিল। সকাল ৮টা থেকেই প্রশাসনিক ভবনের পশ্চিম চত্বরে শিবিরের নবীনবরণের ডাকে সাড়া দেয় হাজার তরুণ-যুবকের দল। ছাত্রজনতার ঢল নামে নীল প্যান্ডেলের সম্মুখপানে। ৯টায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের প্রাণকাড়া সুমধুর বাণী দিয়ে নবীনবরণ শুরু হতে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানস্থলের অদূরে শহীদ মিনারে শিবিরের কর্মসূচির সাথে একই সময়ে একটি সাংঘর্ষিক কর্মসূচির আয়োজন করেছিল দুষ্কৃতকারীরা। তারা লাঠি, রামদা, বল্লম, হকিস্টিক ও রড নিয়ে জমায়েত হয়েছিলো। কেবল শিবিরের প্রোগ্রাম বানচালের জন্যই এ কর্মসূচি। পূর্বপরিকল্পিতভাবে তথাকথিত ছাত্র পরিষদের ব্যানারে এ সমাবেশের আয়োজন করেছিল ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ (ফ-চু), ছাত্রলীগ (মু-হা) বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যরা। ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে তারা ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বারবার গোলযোগ বাধাতে চেষ্টা করে। প্রতিবারই শিবিরকর্মীরা তাদের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। এরমধ্যে বাইরে থেকে তারা কয়েকটি বাস বোঝাই করে পাঁচ-ছয়শত সশস্ত্র সন্ত্রাসী এনে শিবিরকর্মীদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তাদের হাতে ছিল রামদা, ভোজালি, ছোরা, বল্লম, হকিস্টিক ও লোহার রড। হিংস্র হায়েনার মত তারা শিবিরকর্মীদের ওপর অতর্কিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছাত্র ইউনিয়নের হেলাল, ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি শিশির, ছাত্রলীগের ছানা, রানা, আজাদ, সাকুর, ফজলে হোসেন বাদশা, করীম শিকদার কাদের সরকার জাসদের হতভাগা ফিরোজ প্রমুখ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ক্যাডারদের নেতৃত্বে অসহায় নিরস্ত্র শিবিরের নেতা কর্মীদের ওপর জঘন্যতম হামলা চালায়! নবীন বরণ হয়ে যায় পন্ড। অস্ত্রবাজ খুনী, নেশাখোরদের হকিস্টিক, রামদা, কিরিচ চাইনিজ কুড়ালের জঘন্য আক্রমণের শিকারে পরিণত হয়। মাজলুম শিবির নেতা কর্মীরা ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় হয়ে যায় দিশেহারা।

জঘন্যতম বর্বরতা ক্রমেই খুনের নেশা বাধভাঙ্গা জোয়ারের মত তীব্রতর হচ্ছে। মজলুমের ওপর জালিমের অব্যাহত হামলায় শিবির নেতা-কর্মীরা চিৎকার আর আর্তনাদ করছে। বীভৎস দৃশ্য, করুণ-বেদানবিধূর প্রতিচ্ছবি, তবু ভিসি ও প্রক্টর মনিরুজ্জামান রক্তমাখা আহত নিরস্ত্র অসহায় শিবিরের বুকফাঁটা আর্তনাদ মর্মস্পর্শী করুণ দৃশ্যাবলী ফ্যাল ফ্যাল করে অবলোকন করছে। শত জনতার বিবেক ফেটে চৌচির হলেও তাদের বিবেকে পড়েনি কোন বেদনার রেখাপাত। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। সেদিন পুলিশ ভিসির অনুমতির অপেক্ষায় ছিল। শিক্ষক, ছাত্র কারও অনুরোধেও পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে দেয়নি। ফলে রক্তের লাল বর্ণে মতিহারের সবুজ চত্বর হয় রঞ্জিত! সে যেন রক্তের হোলিখেলা!

নিরূপায়, অসহায়, নিরস্ত্র শিবির নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাস থেকে মেইনগেট দিয়ে বের হয়ে চলে আসছে। আঘাতে আক্রমণে ৭০/৮০ জন মারাত্মক আহত, ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় দৌড়াতে আর পারছে না! মুখে শুধু আল্লাহ বাঁচাও শব্দ ছাড়া কোন আওয়াজ নেই। শহীদ সাব্বির, হামিদ, আইয়ুব ও জব্বার শহরের দায়িত্বশীল হলেও নবীনবরণ অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে তারা ছিলেন সদা তৎপর। বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের আন্দোলন একই সূত্রে গাঁথা তাই শহর থেকেই শিবির নির্মূল করার জঘন্য নীলনকশা তৈরি করেছিল বাম নেতারা। পূর্বপরিকল্পিতভাবেই হামলা পরিচালনা করেছিল তারা। আবারো তাদের চতুর্মুখী হামলায় আর আক্রমণে কান্না আর কান্নার রোল! আর্তনাদ আর আকাশ ফাটা চিৎকারে বাতাসও ভারী হয়ে যাচ্ছে।

আল্লাহর রাহে শিবিরের প্রথম নজরানা
এমনি মুহূর্তে বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে শহীদ জোহার মাজারের সামনে শিবির নেতা, উপশহরের কৃতি সন্তান সাবিবরের ওপর নারকীয় হামলা চালায়। রড-কিরিচ-রামদার শত শত আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিক্যালে ভর্তি করা হলো। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আজানের পাশাপাশি করুণ সুরে ভেসে এলো সাব্বির আর নেই! জোহরের নামাজ পড়তেও পারলেন না শিবিরের সর্বপ্রথম শহীদ হিসেবে জান্নাতুল ফিরদাউসের জামায়াতে প্রভুর কাছে হাজির হয়ে গেলেন। কান্না আর বুকফাটা আহাজারি!

শত শত নেতাকর্মী আহত আর রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। শত জনতার সম্মুখে বিএনসিসির সামনে শিবিরে নেতা আব্দুল হামিদের মাথার নিচে ইট রেখে অনেক ইট আর রড দ্বারা আঘাত করলে মগজ ছিটকে বের হয়ে যায়। পশু জবেহ করার পরে যেমন ছটফট করে তেমনি আবুদল হামিদের মগজ গলিত অবস্থা ছটফট করতে করতে লাফ দিয়ে রক্তধারা দেওয়ালে রেখে যান। রাজশাহী কলেজ থেকে আরবি অনার্স পরীক্ষা দেয়া আর হলো না। শহীদ আবদুল হামিদের রক্তমাখা বেদনার প্রতিচ্ছবি প্রতিক্ষণ প্রাণে দোলা দেয়। মনে পড়লেই হৃদয়ে জাগে শিহরণ! কিন্তু পাষাণ নিষ্ঠুরদের হাতও কাঁপেনি। যদিও কেঁপেছিল খোদায়ী আরশ। শহীদ সাব্বিরের শোকে মূহ্যমান আবাল বৃদ্ধবনিতা এক শহীদের বেদনায় শোকাহত জনতার প্রাণে মাত্র ৮/১০ ঘণ্টার মধ্যেই শহীদ আবদুল হামিদের শাহাদাত চতুর্দিকে বাতাসের মত ছড়িয়ে পড়লো। আবারো কান্না, আহাজারি আর চিৎকার।

১১ মার্চের বেদনার আধার ভেদ করে ১২ মার্চের সোনালি সূর্য উদিত হলো। মাত্র ৩৫ ঘণ্টার ব্যবধানে আহত চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ মার্চ প্রভুর ধ্যানে পাড়ি দিলেন শহীদ আইয়ূব। উদ্ভিদ পরীক্ষায় অনার্স না হলেও শাহাদাতের মর্যাদায় হলেন উদ্ভাসিত। শহীদ সাব্বির, হামিদ যেমন শহর শাখার জোন সভাপতি ছিলেন তেমনি শহীদ আউয়ুবও ছিলেন শহর শাখার অফিস সম্পাদক। তাঁর হাসিমাখা চাহনি, অপূর্ব ওয়াল রাইটিং আর মায়াবী চেহারা বেদনার প্রতিচ্ছবি আজও ডাকে বারে বার। তিনিও চলে গেলেন ওপারে সুন্দর ভুবনে। প্রতিদিন সূর্য ফেরে শুধু ওরা ফেরে না...? দীর্ঘদিন আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকলেন রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র আবদুল জাববার। কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি যান। প্রায় গান গেয়ে সান্ত্বনা খুঁজতেন এভাবে আমাকে শহীদ করে সেই মিছিলে শামিল করে নিও. ‘আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়।' তার প্রাণের আকুতি ৯ মাস পর ২৮শে ডিসেম্বর প্রভুর দরবারে কবুল হলো। তিনিও শাহাদাতের পিয়ালা পান করলেন। শহীদ সাবিবর, হামিদ, আইয়ুবের মত শহীদ জাববারের শাহাদাতেও পারলো না কেউ অশ্রু নিবারণ করতে। শহীদ আর অগণিত আহত, ক্ষত-বিক্ষত রক্তমাখা প্রতিচ্ছবি সত্যিই বেদনাবিধুর!

সেদিনের শহীদদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ সাব্বির আহমেদ 
সব ধরনের জুলুম ও নিপীড়ন থেকে মানুষের মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করে চলছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। শত বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে যারা নিরলস নিত্যদিন কাজ করে চলছে, যারা এগিয়ে চলছে আন্দোলন-সংগ্রামে, অত্যাচার-নির্যাতন, জেল-জুলুম ও জীবনদান যাদের নিত্যসঙ্গী, অপরিসীম ত্যাগ আর কুরবানির বিনিময়ে যারা কাক্সিক্ষত সফলতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে নিত্যদিন; তাদেরই একজন শহীদ সাব্বির আহমদ।

ব্যক্তিগত পরিচয়
মো: সাব্বির আহমদ। সোনালী ব্যাংকের সাবেক নাইট গার্ড মো: জামিল খানের ছয় সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন শহীদ সাব্বির আহমদ। রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার অন্তর্গত উপশহরে আবাসিক এলাকায় তাদের বাড়িটি ছিল এ/২২ নম্বর। পুরাতন ধরনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিমছাম বাড়িতে বসবাসরত পরিবারে সাব্বির ছিলেন তখন ১৮ বছরের পরিশ্রমী আর প্রাণবন্ত তরুণ।

শিক্ষাজীবন
পরিবারের দারিদ্র্যের মধ্যেও যেহেতু তিনি নিজের লক্ষ্যে পৌঁছবার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, সুতরাং অর্থকড়ির যোগান দিতে কলমের কালি তৈরির প্রকল্পসহ প্রসাধনী দ্রব্যের ব্যবসা করতেন। নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই বহন করতেন শহীদ। দৈনিক সর্বোচ্চ দু’তিন ঘণ্টা সময় পেতেন পড়াশোনার জন্য। তারপরও কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৯৭৯ সালে।

সাংগঠনিক জীবন
আল্লাহর ঘোষণা, “জান্নাতের বিনিময়ে আল্লাহ মুমিনদের জান ও মালকে খরিদ করে নিয়েছেন।” (সূরা তাওবা : ১১১) এই ঘোষণা নত মস্তকে মেনে নিয়ে আল্লাহর পথে নিজের জান ও সম্পদকে বিকিয়ে দেয়ার চূড়ান্ত শপথ নেয়ার জন্য ছাত্রশিবিরের পতাকাতলে আসেন সাব্বির আহমদ। ইসলামী ছাত্র-আন্দোলনে যোগ দেয়ার সাথে সাথে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন আদর্শবান ছাত্র হিসেবে, এবং দাওয়াতি কাজে নিজেকে সক্রিয় করেন। নিজের মেধা, মননশীলতা, সচ্চরিত্র অবলম্বন করে প্রাণপ্রিয় সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দৃঢ়সঙ্কল্প নিয়ে এগিয়ে যান তিনি। পর্যায়ক্রমে সংগঠনের কর্মী, সাথী অতঃপর সদস্যপ্রার্থীর স্তরে উন্নীত করেন নিজেকে। মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তাঁকে সদস্য হিসাবে চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ করতে দেয়নি। উপশহর এলাকার দায়িত্বশীল থাকার সময় এলাকার শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবার মাঝে অত্যন্ত মিষ্টভাষী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন তিনি।

জানাজা ও দাফন 
শহীদের গর্বিত পিতা মো: জামিল খান নিজেই পুত্রের জানাজা নামাজের ইমামতি করেন। হাত ওঠান আল্লাহর দরবারে। শহীদ পুত্রের কবুলিয়াতের এবং আহত কর্মীদের সুস্থতার জন্য দোয়া করলেন দুই চোখের পানি ছেড়ে। পরে নগরীর টিকাপাড়া গোরস্থানে চিরদিনের জন্য তাঁকে দাফন করা হয়।

পিতার অনুভূতি
অশ্রুসিক্ত পিতা মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, এমন ছেলের পিতা হওয়ার গৌরবে আমি তোমার দরবারে শোকর আদায় করছি। আমার ছেলের শাহাদাত কবুল করে নাও।” 

অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়
কৈশোরে আল্লাহর রাসূল (সা) যেমন সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক ক্লাব গঠন করে সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন, সেই রাসূলের (সা) আদর্শের অনুসারী শহীদ সাব্বিরও উপশহরের সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলার স্বার্থে সুপ্রতিষ্ঠিত ‘অনুসন্ধান’ ক্লাবের সদস্য হয়ে সমাজসেবায় ভূমিকা রাখেন। সদা চঞ্চল ও পরিপাটি কিশোর শহীদ শুধু আদর্শবান ছাত্র নয়, একজন খেলোয়াড় ও সংগঠক হিসাবেও অনেক পুরস্কার অর্জন করেন। সমাজের কারো সাথে কোনো বিষয় নিয়ে সামান্যতম কোনো কথা কাটাকাটি করেননি তিনি। তবে সত্য প্রতিষ্ঠার সৈনিক হিসেবে ন্যায়ের উচ্চারণে অত্যন্ত দৃঢ় ছিলেন। শহীদ সাব্বির অন্যের উপকার করার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন, অন্যের সেবা করে আনন্দ পেতেন তিনি। আড়ম্বরহীন জীবনযাপন করতেই পছন্দ করতেন শহীদ।

শহীদ সাব্বির নিজের যা কিছু ছিলো অর্থকড়ি-সহায় সম্পত্তি; সবকিছু কাজে লাগিয়ে দ্বীনের দাওয়াতে ব্যস্ত ছিলেন আজীবন। বায়তুলমাল থেকে খরচ করার মত খাত থাকা সত্ত্বেও শুধু বায়তুলমালের কঠোর হিসাব দিতে হবে আল্লাহর কাছে সেই অনুভূতি থেকে খরচ করেননি। নেতৃত্বের আনুগত্যে তিনি আন্তরিক ছিলেন। জীবনের শেষ দিনটিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁকে বলা হয়েছিল যে সকাল ন’টা চল্লিশের গাড়িতে ক্যাম্পাসে যেতে হবে। বাড়ির সব জরুরি কাজ শেষ করে খেতে বসে দেখলেন মা এখনো রুটি ভাজা শেষ করতে পারেননি। তাড়াহুড়ো করে চুলোর ওপর থেকে দুটো রুটি খেয়ে ক্যাম্পাসে রওনা দেন। সাব্বির জানতেন না এটাই আল্লাহর তরফ থেকে দুনিয়ার সর্বশেষ রিজিক। শহীদ সাব্বির দ্বীনের দাওয়াতি কাজসহ অন্যান্য কাজ আঞ্জাম দিয়ে যেটুকু অবসর পেতেন তা কুরআন তিলাওয়াত আর জিকির করে কাটাতেন। যারা আল্লাহর দাসত্ব কবুল করেছে তারা জিকিরের মধ্য দিয়েই তাদের সময় কাটান। 

ইসলামী আদর্শের উজ্জ্বল প্রতীক শহীদ আব্দুল হামিদ 
শহীদ আব্দুল হামিদ ইসলামী আদর্শের উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে তাঁর প্রাত্যহিক আচরণ, চালচলন, কথাবার্তায় ইসলামের সুমহান শান্তির অকপট দীপ্তিতে ভাস্বর ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই শহীদ আব্দুল হামিদ মহান প্রভুর কাছে সঁপে দিয়েছিলেন নিজেকে। ইসলামী অনুশাসনের প্রতি প্রবল ঝোঁক ও আন্তরিকতা পরিলক্ষিত হয়েছে শৈশব থেকেই। আদর্শ মুমিনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হিসাবে পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই নিয়মিত নামাজ পড়তেন। শুধু তাই নয়, বাড়ির সবাইকে এবং পাড়া-প্রতিবেশী ও সহপাঠীদের সবাইকে নামাজ পড়ার জন্য আহ্বান জানাতেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর চোখে-মুখে ছিল ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার সোনালি স্বপ্ন। সে জন্য ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন জায়গায় তিনি বক্তব্য রাখতেন। 

ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণকর্মী শহীদ আব্দুল হামিদ ইসলামের জন্য কাজ করে সবসময় মানসিক প্রশান্তি লাভ করতেন। কৈশোরেই তিনি ইসলামী জলসার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা সংগ্রহ করতেন। গ্রামের মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য গ্রামে ইবতেদায়ি মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখনও সে মাদ্রাসা আছে। মাদ্রাসার নাম সৈয়দপুর শহীদিয়া মাদ্রাসা। তাঁর স্মৃতিতে সৈয়দপুরে একটি শহীদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং শহীদ আব্দুল হামিদ স্মৃতি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে তাঁর জীবন ছিল সামগ্রিকভাবেই প্রশ্নহীন। স্বাভাবিক চাহিদা হিসেবে যখন যা জুটতো তাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন, এক্ষেত্রে কখনো বাড়াবাড়ি করেননি। তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবন পছন্দ করতেন। উন্নত ও মননশীল রুচিবোধসম্পন্ন্ ব্যক্তি হিসেবে জীবনকে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে চলাফেরা করার চেষ্টা করতেন। তিনি তাঁর কক্ষকে এবং পড়ার টেবিল সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতেন। বাড়িতে তিনি ফল-ফুলের গাছ লাগিয়ে বাড়ির সৌন্দর্য রক্ষার চেষ্টা করতেন। এ ব্যাপারে পাড়া-প্রতিবেশীকেও উদ্বুদ্ধ করতেন। আল্লাহর একান্ত বান্দা হিসেবে শহীদ আব্দুল হামিদ ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার মাধ্যমেই তাঁর চরিত্রকে উন্নত ও মাধুর্যপূর্ণ করে তুলেছিলেন। পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনি সব সময় পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিধান করতেন। জীবনে কোনো দিন দাড়ি কাটেননি। বলা যায় যে, তাগুতি সমাজের ছোঁয়া তাঁকে বিন্দুমাত্রও টলাতে পারেনি। সেজন্য এলাকার সুধীজন ও সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম হয়েছিলেন। ছোট ভাইদের প্রতি তাগিদ দেয়া ছিল তাঁর নিত্যনতুন ঘটনা। সৈয়দপুর ছিল চোর-ডাকাতের ভয়ে ভীত একটি এলাকা। আব্দুল হামিদ দুর্দান্ত সাহসিকতার সাথে চোর-ডাকাত থেকে নিজ গ্রামকে মুক্ত রাখার চেষ্টা চালান। ছোট ভাইদের ঘুমপাড়িয়ে সবার পরে তিনি ঘুমাতেন। ইসলামী আন্দোলনের জন্য তাঁর আত্মত্যাগ সমাজ, তাঁর পরিবার ও পিতা-মাতার গর্ব হিসেবে মর্যাদা পেয়েছেন। তাঁর শাহাদাতের পর তাঁর কথা যখনই তাঁর পিতার মনে পড়ত তখনই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। এর মাত্র তিন বছর ব্যবধানে সেই পিতাও পরপারে পাড়ি জমান। শহীদের মেজ ভাই একবার তাঁর আব্বাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন এবং কথা হয়েছিল। তাঁর আব্বা বলেছিলেন, ‘আমি তোমার বড় ভাইয়ের জন্যই কবরে খুব শান্তিতে আছি। শহীদের পিতা হিসেবে মহান রাব্বুল আলামিন তাঁকে সম্মানিত করেছেন, এ সুরত তাঁরই ইঙ্গিত বহন করে।’

আজও স্বপ্ন দেখেন শহীদের মা 
শহীদের মা হামিদা বেগমের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার সাথে তো আমার প্রায়ই কথা হয়।’ একদিন বাড়ির পাশের গাছের ডাল ভেঙে হামিদা বেগমের পায়ে পড়লে পা ফুলে যায়। ব্যথায় কষ্ট পেতে থাকেন। ঠিক সে সময় শহীদ আব্দুল হামিদ এসে বললেন, ‘মা, এভাবে কষ্ট করছেন কেন?’ ঘটনা জেনে তিনি পায়ে তিনটি ফুঁ দেন। পরদিন থেকে পা আগের মতো সুস্থ হয়ে যায়। এভাবেই আরেক দিন স্বপ্নে এসে তাঁর প্রিয় বাবা কতদিন আগে মারা গেছে এবং ভাইদের কে কী অবস্থায় আছে তা জানতে চান। 

ঠিক এভাবেই একদিন স্বপ্নে মাকে নানীর বাড়ি বেড়িয়ে নিয়ে আসেন। মায়ের শারীরিক খোঁজ-খবরের সাথে সাথে আত্মীয়-স্বজনদের কে বেঁচে আছে আর কে মারা গেছে তা জানতে চান। এমনিভাবে আরো একদিন স্বপ্নে আব্দুল হামিদ এলে মা তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, তুমি কোথা থেকে এসেছ? তিনি বললেন, আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। 

আরেকদিন তাঁর মা স্বপ্ন দেখলেন, বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে বেশ কয়েকজন যুবক যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে আব্দুল হামিদও রয়েছেন।

শহীদের মা হামিদা বেগম তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে আরোও বলেন, বড় ছেলে আব্দুল হামিদের কথা মনে পড়লে এখনো খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কত আদরের ছেলে ছিল সে! ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে আমি নিজের ছেলের মতো মনে করি। তাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আব্দুল হামিদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ তারা সাফল্যের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে নিতে যেন আন্তরিক প্রচেষ্টা চালায়।

শাহাদাতের পূর্বে শহীদের কথা 
গুণ্ডাবাহিনী যখন তাঁকে উপর্যুপরি আঘাত করছিল আর বলছিল, বল শালা আর শিবির করবি কি না, শিবির না করলে তোকে ছেড়ে দেব। তখন খুনিদের কথা শুনে শহীদ আব্দুল হামিদ বলেছিলেন, ‘আমি যে সত্য পেয়েছি, আমি যে আলো পেয়েছি, ইসলামের পথ পেয়েছি, তা থেকে আমি দূরে থাকতে পারবো না।’ 

সন্তানহারা পিতা-মাতার অবস্থা 
শাহাদাতের পূর্বে তাঁর পিতা-মাতা দু’জনই সুস্থভাবে, সুখে শান্তিতে জীবনযাপন করছিলেন। পুত্রশোককে ভুলতে না পেরে তিন বছর পর শহীদের শ্রদ্ধেয় পিতা জনাব নাসির উদ্দিন ইন্তেকাল করেন। আর জনমদুঃখী মাতা হামিদা বেগম সন্তানহারা ব্যথা নিয়ে এখনো দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। 

শহীদের ছোটভাই, শিক্ষক ও প্রতিবেশীর প্রতিক্রিয়া
ছোটভাই ফয়জুর রহমান বলেন, আব্দুল হামিদের উত্তরসূরিদের কাছে আশা করি তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ ত্বরান্বিত করবে। এভাবেই ঢাকাসহ সারাদেশে ইসলামের সুশীতল বাতাস বইবে। প্রতিকূল সংস্কৃতি বিরাজমান থাকায় কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ দেন। ভাইয়ের কথা মনে পড়লে ইসলামের পথে তিনি শহীদ হয়েছেন মনে করে নিজেকে সান্ত্বনা দেন।

আব্দুল হামিদের মাদ্রাসার শিক্ষক আবুল হুদা মোহাম্মদ আবদুল হাদী বলেন, সে খুব ভাল ছিল। তাঁর আচার-আচরণ, শিক্ষকদের সাথে তাঁর ব্যবহার ছিল অতুলনীয়। জুনিয়র-সিনিয়র সবার সাথে তাঁর আচরণ ছিল অনুকরণীয়। সে তো শাহাদাত বরণ করেছে।

প্রতিবেশী শফিউর রহমান বলেন, সে খুব ভালো ছেলে ছিল। আচার-আচরণ, মানুষের সাথে তাঁর ব্যবহার ছিল চমৎকার। তাঁর মেজভাই, ছোটভাই, পাড়া-প্রতিবেশীদের একটাই মাত্র প্রত্যাশা, শহীদ আব্দুল হামিদের উত্তরসূরিরা যেন তাঁর রেখে যাওয়া আন্দোলনের অসমাপ্ত কাজ সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে যথাযথ প্রচেষ্টা চালায়।


চেতনায় চির অম্লান শহীদ আইয়ুব আলী 
পদ্মাবিধৌত হযরত শাহ মখদুম (রহ)-এর পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত উত্তরবঙ্গের রাজশাহী প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক অনন্য লীলাভূমি। এই শহরে অনুকূল পরিবেশের দরুন বেশ কতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রাজশাহী সরকারি কলেজ অন্যতম। জীবনে বড় হওয়ার এক পরম স্পৃহা নিয়ে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন মেধাবী ছাত্র আইয়ুব আলী। কিন্তু বড় হয়ে আলো ফোটানোর আগেই বাতিলের হামলায় নিভে যায় তাঁর জীবনপ্রদীপ।

জন্ম ও বংশ পরিচয় 
শহীদ আইয়ুব আলী চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গার ডাউকি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ আইজুদ্দিন। আট ভাই-বোনের মধ্যে আইয়ুব আলী ছিলেন সবার বড়।

শিক্ষাজীবন
শহীদ আইয়ুব আলীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাদেমাজ্ ুস্কুলে। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। প্রাইমারি শিক্ষা শেষ করে তাঁকে আলমডাঙ্গা পাইলট হাইস্কুলে ভর্তি করা হয়। এখানে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এসএসসি পরীক্ষার সময় অসুখ থাকার দরুন দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। এসএসসি পাস করার পর তিনি আলমডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন। অতঃপর রাজশাহী কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। শাহাদাতের সময় তিনি এ কলেজেরই ছাত্র ছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে শহীদ আইয়ুব আলী
ছোট্টকাল থেকেই আইয়ুব আলী ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও অমায়িক। ছোটবেলার একটি ঘটনা, আইয়ুব আলীর বয়স তখন মাত্র আড়াই বছর। মায়ের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন নানার বাড়ি। বায়না ধরেছিলেন আখ খাবেন। উপেক্ষা করতে পারলেন না মা। দেখিয়ে দিলেন তাঁর নানার আখক্ষেত। জমির কাছেই তাঁর ছোট নানা বসা ছিলেন। আইয়ুব আলী আখ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু আখ নিতে গিয়ে যা ঘটলো তার বর্ণনা করেন তাঁর নানা : ‘ও আইয়ুবের মা, তোমার আইয়ুব আখ আনতে মাঠে গেছে। আমি ওকে আখ দিতেই সে বলল, আমি আমার নানার জমির আখ নেব। বাধ্য হয়ে ভাইয়ের জমি থেকে আখ দিলাম।’ আনুগত্যশীল আইয়ুব কেন খাবে পরের জমির আখ? মনে হয় শহীদেরা এমনই নিষ্পাপ থাকে প্রভুর তত্ত্বাবধানে। শহীদ জননী তাঁর শাহাদাতের পর স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সেই শাসনের পর থেকে আইযুব কেন, তাঁর কোনো ভাই-ই আজ পর্যন্ত পরের জিনিস না বলে স্পর্শ করা শেখেনি।’ 

সংগঠনে আগমন
ছোটবেলা থেকেই আইয়ুব আলী ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। আলমডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের পতাকাতলে আসেন। সংগঠনে যোগ দেয়ার পর থেকেই তিনি নিয়মিত কুরআন-হাদিস অধ্যয়ন করতেন। ছাত্রদের ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত দিতেন। পরিবার ইসলামী আন্দোলনের অনুকূলে না থাকলেও শহীদ আইয়ুব আলী ইসলামী আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রত্যেকটি কাজ তিনি একাগ্রচিত্তে পালন করার চেষ্টা করতেন। শাহাদাতকালে তিনি সংগঠনের সাথী ছিলেন।

শাহাদাতের ইচ্ছা পোষণ
শহীদ আইয়ুব আলী ইসলামী আন্দোলনের কাজে নিজেকে যখন সম্পৃক্ত করেছেন তখনও তাঁর পরিবার নামাজ-কালাম ঠিকমত পড়তেন না। একদিন পাশের বাড়ির মকবুল হোসেন মুন্সী তাঁর পিতাকে এসে বলল, ‘আইয়ুব যে পথে নেমেছে তাতে ওকে ঠেকিয়ে না রাখতে পারলে তো মুশকিল! কারণ চারদিকে বিরোধিতা।’ এরই প্রেক্ষিতে আইয়ুবের পিতা ছেলেকে ডেকে বললেন, ‘তুমি তো এপথে নেমেছ। কিন্তু কবে যে তোমাকে মেরে ফেলে!’ তখন আইয়ুব বললেন, ‘আল্লাহর পথে এসে মরাও ভালো। আপনি লেখাপড়া শেখাতে পারেন কিন্তু মৃত্যু তো ঠেকাতে পারেন না।’ 

অন্য একদিন শহীদ আইয়ুব আলী তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, ‘মানুষের মত মানুষ হয়ে আমাদের দুনিয়া থেকে যাওয়া উচিত।’ তাঁর কথা শুনে পিতা বললেন, ‘আমরা তো মানুষই, আবার কী রকম মানুষ হতে বলছো?’ পিতার কথা শুনে তিনি বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মারা গেলে সবাই কাঁদে আর সে হাসে।’

শাহাদাতের পর শহীদের মাতা-পিতার প্রতিক্রিয়া 
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে শহীদ আইয়ুবের অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে ফেলেন তাঁর পিতা। শোকাহত পিতার কণ্ঠে চিৎকার উঠলো- কী অপরাধ ছিল আমার ছেলের? আমি ওর মাকে গিয়ে কী বলব? ওর মা তো এ খবর শুনে বাঁচবে না!

প্রধান শিক্ষকের দৃষ্টিতে আইয়ুব
তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো: মোজাম্মেল হক বলেন, আইয়ুব ছিল খুবই মেধাবী ও বিনম্র ছাত্র। সে সকলের সাথে ভালো ব্যবহার করত। আমার সকল ছাত্রকে যদি একটি গোলাপের বাগানের সাথে তুলনা করা হয়, তবে সে বাগানের সেরা গোলাপ ছিল আইয়ুব আলী।

বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া 
১৩ তারিখ পত্রপত্রিকায় এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রায় সব কটি রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সংগঠন ও বুদ্ধিজীবী মহল বিবৃতি দিয়েছিল। সম্পাদকীয় লেখা হলো নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা উল্লেখ করে। পত্রিকার পাতায়, মিছিলে, প্রতিবাদ সভায় সর্বত্র হত্যাকাণ্ডের জন্য বিশেষভাবে দায়ী রাবি’র ভিসি’র অপসারণ ও যারা এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বর্বর পৈশাচিকতার পরিচয় দিয়েছে তাদের শাস্তির দাবি উঠলো, দাবি উঠলো ‘খুনিদের ফাঁসি চাই’। দায়সারা গোছের একটি শাস্তি হয়েছিলও বটে কিন্তু আদালতের সেই শাস্তি আর কার্যকর হয়নি। 

প্রতিবছর ফিরে আসে ১১ মার্চ। সেই সাথে ফিরে আসে আইয়ুব আলীর শাহাদাতের কথা। দেশের তৌহিদী জনতার মনের পর্দায় ভেসে থাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্তে রঞ্জিত মতিহার চত্বর। কাফেলার সৈনিকগণ এই শাহাদাত থেকে শিক্ষা নেয় সামনে এগিয়ে যাওয়ার, থমকে না দাঁড়ানোর। শহীদদের রক্ত রঞ্জিত পথ ধরেই এগিয়ে যাবে এ শহীদি কাফেলা। এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

শহীদ আব্দুল জব্বার
এ দুনিয়ার বুকে আল্লাহর কালিমাকে বিজয়ী করার জন্য যুগে যুগে কিছু মানুষ নিজেদের প্রাণ অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট এই দেশ বাংলাদেশেও এমন মানুষেরা ছিলেন, আছেন। শহীদি কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কিছু ত্যাগী প্রাণ সবুজ-শ্যামল এই জমিনে ইসলামের সুমহান আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের মধ্যে শহীদ আব্দুল জব্বার এক বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের চতুর্থ শহীদ।

ব্যক্তিগত পরিচয় ও শিক্ষাজীবন
তিনি নওগাঁ জেলার ধামইরহাট থানার চকময়রাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো: জমির উদ্দিন। আব্দুল জব্বারের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল ১০ জন, তার মধ্যে ভাই-বোন ছিল ৬ জন। ভাই-বোনদের মাঝে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি চকময়রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন চকময়রাম উচ্চবিদ্যালয় থেকে। এরপর নওগাঁ নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। তারপর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। শাহাদাতের সময়ে তিনি রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক মানের দিক দিয়ে তিনি একজন কর্মী ছিলেন।

১৯৮২ সালের ১১ মার্চ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এ দিনটি হতে পারতো একটি প্রাণোচ্ছল দিন। এ দিন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত ছাত্রদের সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। সংবর্ধনায় যোগদানের জন্য নবাগত ছাত্রদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। নবীন ছাত্রদের হৃদয়ের মণিকোঠায় ইসলাম ও ইসলামী আদর্শের বিজয় মেনে নেয়ার মতো পাত্র ছিল না ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী ও ছাত্র ইউনিয়নের দুর্বৃত্তরা। কিন্তু নৈতিক শক্তি ও জনসমর্থনে দুর্বল এসব সংগঠন আদর্শিকভাবে ছাত্রশিবিরের মোকাবেলা করতে সাহস পাচ্ছিল না। ওদিকে বসে থাকার মতো ধৈর্যও তাদের ছিল না। মরণকামড় বসাতে হবে ছাত্রশিবিরের ওপর। তাই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালায় ছাত্রশিবিরের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। মুহূর্তের মধ্যে হাসি আর আনন্দের পরিবর্তে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় পুরো ক্যাম্পাস। গুলি, বোমা, চাপাতি প্রভৃতি দিয়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর চললো সভ্যতার নৃশংসতম বর্বরতা। মুহূর্তেই থেমে গেল কয়েকটি তাজা প্রাণ। সেদিন দুর্বৃত্তদের আক্রমণের শিকার হয়ে অনেকে দীর্ঘদিন যাবৎ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র আব্দুল জব্বার তাঁদের একজন। ১১ মার্চ, ১৯৮২; ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রীর সন্ত্রাসীরা তাঁর বুকের পাঁজরগুলো মর্মান্তিকভাবে থেঁতলে দেয়। অনেকদিন ধরে চিকিৎসা করালেও পৃথিবীতে এমন কোনো চিকিৎসক ছিলেন না যিনি তাঁকে আগের মতো সুস্থ করে দিতে পারেন।

দেশের প্রখ্যাত সব চিকিৎসক ব্যর্থ হলেন আব্দুল জব্বারের চিকিৎসায়। আহত আব্দুল জব্বার অসহ্য ব্যথার দরুন পরবর্তীতে আর কোনো পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। শেষে মায়ের ছেলে মায়ের কোলেই প্রত্যাবর্তন করেন। আল্লাহর কাছে যাঁর জন্য উত্তম আবাসস্থলের ব্যবস্থা রয়েছে, ক্ষণিকের এই পৃথিবীর মায়া তাঁকে ধরে রাখতে পারে না। তেমনি আব্দুল জব্বারকেও ধরে রাখা যায়নি। মায়ের স্নেহ, বাবার ভালোবাসা, পরিবারের বন্ধন, জগতের মায়া সব কিছু ছিন্ন করে ২৮ ডিসেম্বর, ১৯৮২ সালে আব্দুল জব্বার পৌঁছে যান তাঁর পরম প্রভুর দরবারে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন)।

সাংগঠনিক জীবন
শহীদ আব্দুল জব্বার ছেলেবেলায় সংগঠনের সাথে পরিচিত ছিলেন না। তিনি নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে থাকাকালে আওয়ামী ছাত্রলীগের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন এবং নামাজের প্রতি খুবই যত্নশীল ছিলেন। শহীদ আব্দুল জব্বারের আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক ছিল সেটা বোঝা যেত তাঁর উঠা-বসা ও চলাফেরার মাধ্যমে। নামাজ অনেকক্ষণ ধরে পড়তেন এবং মসজিদে অবস্থান করতেন। বিভিন্ন সময়ে আলাপ-আলোচনার মধ্যে আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যেত। যদিও তিনি তখন আওয়ামী ছাত্রলীগের সমর্থক ছিলন। তিনি সব সময় সমাজের দুস্থ মানুষের কথা বলতেন এবং বেশ চিন্তাভাবনা করতেন আর বলতেন, এই সমাজ পরিবর্তনের জন্য একদল কর্মীবাহিনীর দরকার যারা করতে পারে এই সমাজের পরিবর্তন। তিনি প্রায়ই একটি প্রবাদ বলতেন, ‘পৃথিবীটা বড় কঠিন, পৃথিবীকে জানা খুব কষ্ট এবং পৃথিবীর মানুষকে চেনা খুব কঠিন।’

শহীদ আব্দুল জব্বার ১৯৮০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। প্রথমে তিনি রানীনগর হামিদ বাড়ির একটি মেসে অবস্থান করতেন। পরবর্তীতে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আব্দুল খালেকের আহবানে আমীর আলী হলের ১১৭ নম্বর কক্ষে তাঁর বন্ধুর সাথে অবস্থান করতে থাকেন। তাঁর বন্ধু আগেই সংগঠনের দাওয়াত পেয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছায়াতলে চলে আসেন। শহীদ আব্দুল জব্বার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অবস্থায়ও প্রথমদিকে ছাত্রলীগের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু তাঁর বন্ধু আব্দুল খালেক সংগঠনের সাথে জড়িত হলেও তাদের মাঝে সম্পর্কের তেমন কোনো অবনতি হয়নি। আব্দুল খালেকের রুমে থাকা অবস্থায় কোনো দিন তিনি তাঁকে শিবিরের কথা বলেননি। হলে আসার পর অন্য কর্মীদের ব্যবহারের ফলে শিবিরের পতাকাতলে আসেন আব্দুল জব্বার। তারপর তিনি বলতেন, ‘আমি অনেক আগে থেকে এ ধরনের সংগঠনের কথা চিন্তা করতাম, যারা পারবে সমাজের কুসংস্কারপূর্ণ কাঠামোর পরিবর্তন করে একটি আদর্শবাদী নতুন সমাজ গড়তে। শিবিরের ভেতর এ ধরনের গুণাবলিসম্পন্ন কর্মীবাহিনী দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।’ যে ছেলেটি এতদিন শিবিরের কথা শুনতে পারতেন না, সে-ই বলতে লাগলেনÑ এতদিন শিবির থেকে দূরে থেকে বড় ভুল করেছি। সংগঠনে আসার পর থেকে তিনি এত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে, সবার চোখে তিনি অনুপ্রেরণার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি কয়েক মাসের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতে সক্ষম হন। তিনি সবার সাথে বন্ধুসুলভ ভালোবাসা গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর মাঝে যে বৈশিষ্ট্যটি বেশি লক্ষ্য করা গিয়েছিল সেটা হচ্ছে নেতৃত্বের প্রতি চরম আনুগত্য ও পরস্পরের প্রতি উদার ও বন্ধুত্বসুলভ আচরণ। তিনি সংগঠন এবং সংগঠনের ভাইদের এত ভালোবাসতেন যে, তাঁর ব্যবহারের মাধ্যমে তা ফুটে উঠত। তবে সেটা বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। এভাবে কিছুদিন যেতে না যেতেই অকালে ঝরে পড়লেন তিনি। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ একদল উগ্র ও রক্তপিপাসু কুচক্রীর হাতে গুরুতর আহত হন। এই অবস্থায় তিনি প্রায় দশ মাস চরম যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটান। দশ মাসের মধ্যে তিনি প্রায় নয় মাস হলে ছিলেন এবং একমাস মাত্র বাড়িতে ছিলেন। বুকে গুরুতর আঘাত লাগার কারণে চলাফেরা করতে পারতেন না। প্রায় সময় বিছানায় শুয়ে থাকতেন। এ অবস্থায়ও তিনি বাড়ি যাননি, বাড়ি যাওয়ার কথা বললে বলতেন যে, ‘বাড়িতে আমার ভালো লাগে না, সংগঠনের ভাইদের দেখে শান্তি পাই।’ তাঁর এ কথায় বোঝা যায় সংগঠন এবং সংগঠনের ভাইয়েরা তাঁর কাছে কত আপন ছিল।

শহীদ আব্দুল জব্বারের আহত অবস্থার একটি স্মরণীয় ঘটনা
আহত অবস্থায় হলে থাকাকালে তাঁর বন্ধু আব্দুল খালেক তাঁর দেখাশোনা করতেন। একদিন তাঁর বন্ধু সংগঠনের কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। তিনি রুমে এসে দেখেন আব্দুল জব্বার রুমে নেই। রুমের এক বড় ভাইকে জিজ্ঞাসা করা হলো আব্দুল জব্বার কোথায়? তিনি জবাব দিলেন আব্দুল জব্বারকে কিছুক্ষণ আগে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। তাঁর বুকের ব্যথার কারণে চলাফেরা করতে পারত না, তাই সবাই উদ্বিগ্ন। বন্ধু খালেক ও আরো কয়েকজনে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন। কোথাও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তখন রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। তারা খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে মসজিদে গেলেন এবং দেখতে পেলেন অন্ধকারের ভেতর মসজিদের এককোণে দুই হাত তুলে বসে ক্রন্দন করছেন তিনি। আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছেন এই বলে, ‘হে আল্লাহ! আমি তো অপরাধ করিনি, আমি তো কারো ক্ষতি করিনি, কেন তারা আমার এ অবস্থা করলো? না, আমার অপরাধ আমি ঈমান এনেছি এবং ইসলামী সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েছি। হে আল্লাহ! তুমি এই সংগঠনকে শক্তিশালী কর। তুমি এই জমিনে তোমার দ্বীনকে বিজয়ী করে দাও এটাই আমার কামনা আর এটাই বাসনা।’ এই ঘটনা থেকে বুঝা যায় তিনি দ্বীনকে কতটা ভালোভাবে বুঝেছিলেন এবং দ্বীনের প্রতি তাঁর কতটা ভালোবাসা। 

আর একদিনের ঘটনা, শহীদ আব্দুল জব্বার বুকের ব্যথায় ছটফট করছেন, তখন তাঁকে তাঁর বন্ধু বললেন, তোর খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না? তখন তিনি উত্তর দেন, কষ্ট নারে কষ্ট না, এই তো আমার আত্মতৃপ্তি। আমার আত্মতৃপ্তি এই জন্য যে, আমি মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি। ইসলামের দুশমনরা আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। এতো আমার চাওয়া, এতো আমার পাওয়া। শাহাদাত মুুমিন জীবনের কাম্য, তাইতো আমার কামনা, আমার বাসনা ছিল। এইভাবে কঠিন যন্ত্রণার মাঝে জীবন অতিবাহিত হতে থাকে, কিন্তু কোনো দিন তাঁর মাঝে কোনো হতাশা দেখা যায়নি। শহীদ আব্দুল জব্বার ভাই সকল ইসলামী কর্মী ভাইয়ের আদর্শের প্রতীক হয়ে আছেন। 

জানাজা ও দাফন
পরিবারের আশা-ভরসার আশ্রয়স্থল আব্দুল জব্বারের বিয়োগব্যথায় চকময়রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। শাহাদাতের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রাজশাহী ও নওগাঁর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহীদের সাথীরা এবং শোকাভিভূত জনতা শহীদের বাড়িতে এসে ভিড় করে। সেখানে জানাজা নামাজ শেষে চকময়রামপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে আব্দুল জব্বারকে দাফন করা হয়।

শহীদ হওয়ার পূর্বে তাঁর স্মরণীয় বাণী
ইসলামী আন্দোলনের অগ্রপথিক শহীদ আবদুল মালেক সমাজের পরিবর্তন নিয়ে ভাবতেন। অন্যায় এবং কুসংস্কারপূর্ণ সমাজকে কিভাবে পরিবর্তন করা যায় সেই ভাবনায়-ই লিপ্ত থাকতেন। আর তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল তারুণ্যনির্ভর দল বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরই এ ঘুণে ধরা সমাজে পরিবর্তন আনতে পারবে। শহীদ আব্দুল জব্বার কবি নজরুলের “আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়.....” এই গানটি বেশি গাইতেন। বন্ধুরা তাঁকে এই গান গাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতেন, ‘আর কতদিন বাঁচবো! কখন যে ঝরে পড়ব কেউ জানে না।’ 

পারিবারিক কাজে সহযোগিতায় আব্দুল জব্বার 
শহীদ আব্দুল জব্বারের পরিবারের প্রধান পেশা ছিল কৃষি। তিনি পড়াশোনায় যেমন নিয়মিত ছিলেন, তেমনি পরিবারের সকল কাজে সাহায্য করতেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি এলে নিজ হাতে শাক-সবজির চাষ করতেন। পারিবারিক কৃষিকাজে কৃষকদের সাথে কাজ করতেন, আর প্রচুর মাছ ধরতেন।

শাহাদাতের পর শহীদের পিতার প্রতিক্রিয়া
শহীদ আব্দুল জব্বারের পিতা মো: জমির উদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ। তাই তিনি পুত্রকে হারিয়ে ধৈর্যহীন না হয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে ইসলামের পথে শহীদ হয়েছে এতে আমার কোন দুঃখ নেই। আল্লাহর কাছে দোয়া করি আল্লাহ যেন তাঁকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নেন।’ পরবর্তীতে শোকাহত বাবা পুত্রশোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তিনি প্যারালাইজড হয়ে যান। অবশেষে পুত্রশোকে তিনিও পরলোকগমন করেন।

মায়ের প্রতিক্রিয়া 
বড় ছেলের শাহাদাত বরণের সাথে সাথে শহীদ জননী সকিনা বিবি কান্না শুরু করে দেন। অনেক কষ্টে তিনি ধৈর্য ধারণ করেন। আল্লাহর কাছে তিনি দোয়া করেন তিনি যেন তাঁকে একজন শহীদ হিসেবে কবুল করে নেন।

ভাইয়ের প্রতিক্রিয়া 
শহীদ আব্দুল জব্বারের ছোটভাই জিল্লুর রহমান বলেন, সংগঠনের নেতাকর্মীরা যেন ইসলামী আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে সজাগ থাকে। এমন কোনো কাজ করা ঠিক নয় যা সংগঠনের সুনাম ক্ষুণœ করবে।

দীর্ঘ চৌদ্দ’শ বছর আগে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে হেরা গুহায় যে জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়েছিল, সেই জ্যোতিকে নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য সেইদিন থেকেই অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু ইসলামের ত্যাগী কিছু সৈনিকের কারণে সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এতে প্রাণ দিতে হয়েছে অনেককেই। শহীদ আব্দুল জব্বার তাঁদের অন্যতম। তিনি ইসলামের জন্য প্রাণ দিয়ে আমাদের অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হয়ে আছেন। আমরা তাঁর কাছ থেকে অনেক উৎসাহ পেতে পারি।

আজো কাঁদায়
৮২ সালের ১১ মার্চের নারকীয় ঘটনায় জুলুম নির্যাতন আর আহতদের হৃদয়বিদারক করুণ দৃশ্যের অবতারণায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সবার বিবেক স্তব্ধ হয়ে যায়। পত্রিকা, রেডিও, টিভি প্রচার মিডিয়াসহ সর্বমহলে এই নৃশংসঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় ধারাবাহিকভাবে! ফলে শিবিরের প্রতি বিবেকবানদের মানবিক সহানুভূতি আলৌকিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। সরকারি বেসরকারি হাজার জনতার উপচেপড়া ভিড় আর আহতদের ক্ষত-বিক্ষত দেহ গগনবিদারী আহাজারির দৃশ্যাবলী অবলোকন করে কেউ পারেনি অশ্রু নিবারণ করতে।

ছাত্রনেতা মামুনের সাতদিন পরও জ্ঞান ফেরেনি। উন্নত চিকিৎসা আর অমানবিক ঘটনার জন্য তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারও ছুটে যান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিনিও তীব্র প্রতিবাদ ও ঘৃণা প্রকাশ করেন। আর অজ্ঞান মামুনের উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা সামরিক-হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপতির মহতি উদ্যোগ এবং শিবিরের নেতা কর্মীদের ত্যাগ কুরবানি সর্বোপরি শাহাদাতের ঘটনা শিবিরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ইসলামী ছাত্রশিবির এই ১১ মার্চকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।

১৯৮২ সালের ১১ মার্চ যেই আলো নিভিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল তা আজ লাখো তরুণের পথের দিশা। শত জুলুম, নির্যাতন উত্তাল তরঙ্গমালার এক সাগর রক্ত পেরিয়ে আল্লাহর দ্বীনের বান্দারা আজ মিলিত হয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবিরে। লাখো নাবিক আর পথহারা যুবকের দল ভিড় জমাচ্ছে এই কাফেলা বিপ্লবী মিছিলে। শত শত বেদনার প্রতিচ্ছবি ইসলামী আন্দোলনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে।

তথ্যসূত্রঃ স্মৃতি অমলিন এবং ছাত্রশিবিরের ওয়েবসাইট

#11MarShahidDibosh
#11Mar  #ShahidDibosh

মঙ্গলবার, ৮ মার্চ, ২০১৬

মীর কাশেম আলীর মামলার পোস্টমর্টেম


বাংলাদেশের বিচার বিভাগ যে রাজনৈতিক মামলাগুলোর ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখছে না। আজ মীর কাশেম আলী সাহেবের আপীলের রায় দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। আসুন আমরা সেই অভিযোগের একটু পোস্টমর্টেম করি। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মোট অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে ১৪ টি। এর মধ্যে ১০ টি অভিযোগে মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনাল তাকে সাজা দেয় এবং এর মধ্যে ১১ নং ও ১২নং অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। আজ আপিল বিভাগের রায়ে ১২ নম্বর অভিযোগে তাকে বেকসুর খালাস দেয়া হয় এবং আরও ২টি থেকে তাকে অব্যাহতি ও খালাস দেওয়া হয়েছে।

আসুন দেখি কি ছিল ১১নং অভিযোগ? 
অভিযোগ ১১: ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। তাকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হলে আরো পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশসহ তার মৃতদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

১- মুক্তিযোদ্ধা জসিম কখন কোথায় মারা গেছেন তারও কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। চার্জ ফ্রেমিং অর্ডারে হত্যা ঘটনার তারিখ ও সময় উল্লেখ করা হয়নি। তা ছাড়া জসীম উদ্দিন ছাড়াও অপর পাঁচজনের নাম-পরিচয়ও পাওয়া যায়নি। 

২- রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসীমকে ১৯৭১ সালের ২৮ নভেম্বর ডালিম হোটেলে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগ আনা হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী সালেহ উদ্দিন তার ‘প্রামাণ্য দলিল মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ নামক বইয়ে উল্লেখ করেছেন জসীম কবে কোথায় শহীদ হয় তা জানা যায়নি। অথচ এটাই ছিল তাদের অকাট্য ডকুমেন্ট!! 

৩- ঘটনার সময়ে অভিযুক্ত মীর কাসেম আলী ঘটনাস্থলে ছিলেনই না। মীর কাসেম আলী ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে চট্টগ্রামে গেছেন বা ছিলেন সে মর্মে একটি ডকুমেন্টও দেখাতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। তদন্ত কর্মকর্তাও ট্রাইব্যুনালে এটা স্বীকার করে বলেছেন তাদের কাছে এ মর্মে কোনো ডকুমেন্ট নেই।
এ প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি প্রসিকিউশন টিমকে বলেন ‘আপনাদের ডকুমেন্টেই দেখা যায় ঘটনার সময় মীর কাসেম আলী ঢাকা ছিলেন’। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের জমা দেয়া ডকুমেন্টও তার সাক্ষ্য বহন করছে।

৪- জসিম উদ্দিন হত্যার বিষয়ে মীর কাসেমের বিরুদ্ধে তার বোন সাক্ষ্য দিয়েছেন যিনি স্বীকৃত পত্রিকার সম্পাদক। অথচ স্বাধীনতার পর ৪০ বছরে তার নিজের পত্রিকাতেও কখনও তিনি জসিম হত্যায় মীর কাসেমের জড়িত থাকার কথা বলেননি। অথচ তিনি এখন এত বছর পরে এসে ঘটনার রগরগে বর্ণনা দিচ্ছেন যা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। তিনি শপথ নিয়ে আদালতে মিথ্যা কথা বলেছেন। সুতরাং তার সাক্ষ্য কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাস করা যায় না।

৫- মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট শফিউল আলমের লেখা বই প্রসিকিউশন মীর কাসেমের বিরুদ্ধে ডকুমেন্ট হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু ওই বইয়ের কোথাও মীর কাসেম আলীর নাম নেই। ডালিম হোটেলের ঘটনায় তার জড়িত থাকার কথাও বইয়ের কোথাও বলা হয়নি। নিহত জসিম উদ্দিনের ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই হত্যাকান্ডে মীর কাসেম আলী জড়িত থাকলে তিনি সাক্ষ্য দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।

৬- চট্টগ্রামের দুইজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী এবং আবু তাহের খান মীর কাসেম আলীর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, মইত্যা গুণ্ডা, কিছু রাজাকার এবং বিহারি মিলে ডালিম হোটেল নিয়ন্ত্রণ করত। তারাই এখানে সংঘটিত সকল অপকর্মের জন্য দায়ী। তাছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের তিনজন সাক্ষীও জেরায় স্বীকার করেছেন তারা মইত্যা গুণ্ডার নাম শুনেছেন। 

৭- এ হত্যা ঘটনার সাথে মীর কাসেম আলী সরাসরি বা ঘুরিয়ে পেচিয়ে জড়িত এ রকম একটি রেকর্ড বা প্রমাণও রাষ্ট্রপক্ষ দেখাতে পারেনি। সম্পূর্ণ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তাকে মৃত্যুদন্ডের সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হয়েছে। এটি বিচারিক হত্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই রায় বাংলাদেশের বিপর্যস্ত ও নতজানু বিচার বিভাগের প্রমাণ হয়ে থাকবে এবং বিচারিক ইতিহাসের কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

সাক্ষীদের বক্তব্যে ভয়াবহ গরমিল: 
১- ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের ছয়জন সাক্ষী ও অ্যাডভোকেট শফিউল আলম লিখিত ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইটির ওপর নির্ভর করেছেন মীর কাসেম আলীকে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে। রাষ্ট্রপক্ষের যে ছয়জন সাক্ষী এ অভিযোগ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা কেউ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নন, বরং সবই শোনা সাক্ষী। সাক্ষীরা সবাই বলেছেন অ্যাডভোকেট শফিউল আলম ও অন্য কয়েকজনের কাছ থেকে তারা এ ঘটনার বিষয়ে শুনেছেন। কিন্তু অ্যাডভোকেট শফিউল আলম তার বইয়ে ডালিম হোটেলকেন্দ্রিক হত্যা নির্যাতনের ঘটনা বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে কোথাও মীর কাসেম আলীর নাম উল্লেখ করেননি। 

২- মীর কাসেম আলীকে তিনি কোথাও ‘খান’ বা ‘খান সাহেব’ বা ‘বাঙ্গালী খান’ হিসেবেও উল্লেখ করেননি। অথচ ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীকে ‘খান সাহেব’ হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রেও অ্যাডভোকেট শফিউল আলমের বই এবং দুইজন সাক্ষীর ওপর নির্ভর করেছেন।

৩- রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ নম্বর সাক্ষী হাসিনা খাতুন তার জবানবন্দীতে বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমার পরিবারের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তার মধ্যে আমার ফুপাতো ভাই জসীম ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র ছিলেন। সে একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। জসীম আমাদের চট্টগ্রাম শহরের ব্যাপারীপাড়ার বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করত। জসীম যখন আমাদের বাসায় আসত তখন তার সাথে অনেক সহযোদ্ধা থাকত এবং ঈদের দিনেও মনসুর নামে এক সহযোদ্ধা তার সাথে আমাদের বাসায় এসেছিল।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি খুব অস্থিরচিত্তে বিভিন্ন জায়গায় জসীমের খোঁজ করতে থাকলাম। এরই একপর্যায়ে বোস ব্রাদার্সের কাছে মতিন বিল্ডিংয়ে অবস্থিত তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে গিয়ে ন্যাপ নেতা অ্যাডভোকেট শফিউল আলম সাহেবের সাথে দেখা করি এবং যখন তাকে জসীমের নিরুদ্দেশের কথা বললাম তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই জসীমের বাড়ি কি সন্দ্বীপে?’ আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে বললাম, জসীম আমার ফুপাতো ভাই, তার বাড়ি সন্দ্বীপ। তখন অ্যাডভোকেট শফিউল আলম সাহেব বললেন, ‘তিনি ডালিম হোটেলে আটক থাকা অবস্থায় জসীমকে ওই হোটেলের একই কক্ষে যেখানে তিনিও আটক ছিলেন সেখানে নিয়ে জসীমকে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে আল-বদরের সদস্যরা নির্যাতন করে ফেলে দেয়। শফিউল আলম সাহেব আরো বলেন, তখন কক্ষটি বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং তার চোখ বন্ধ ছিল। জসীমকে ফেলে দিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর অনেক কষ্টে নিজের চোখের বাঁধন আলগা করে জসীমকে মরণাপন্ন অবস্থায় দেখতে পান এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই জসীম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এ কথা শোনার পর আমি কান্নাকাটি করছিলাম তখন শফিউল আলম সাহেব আমাকে জনৈক সাইফুদ্দিন খানের কাছে যেতে বললেন। তার কথামতো আমি সাইফুদ্দিন খানের কাছে গেলে তিনিও একই ধরনের কথা বলেন। আমি জসীমের লাশটি কোথায় আছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আপনারা তার লাশটি পাবেন না কারণ তাকে হত্যা করার পর তার মৃতদেহটি কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে’। আমি যখন সাইফুদ্দিন খানের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি এসব বিষয় কি করে জানলেন তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি যখন ডালিম হোটেলে আটক ছিলাম তখন স্বপন নামে একটি ছেলে ডালিম হোটেলে আটক বন্দীদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করত, সে আমাকে এসব তথ্য প্রদান করেছে’। শফিউল আলম সাহেবও অনুরূপ বক্তব্য আমার কাছে বলেছিলেন। ...

৪- হাসিনা খাতুনসহ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্যে ১১ নম্বর অভিযোগ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাদের নাম উঠে এসেছে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের কাউকেই হাজির করেনি। 

৫- সাক্ষী হাসিনা খাতুনের বর্ণনা মতে, জসিমের সাথে মনসুর নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তার বাসায় আসত। মনসুর এখনো জীবিত। সেই হতে পারত জসিমের হত্যা বিষয়ে সবচেয়ে ভালো সাক্ষী। কিন্তু তাকেও আনা হয়নি। হাসিনা খাতুন স্বীকার করেছেন: ‘ঈদের দিনে জসীমের সাথে মনসুর নামে যে সহযোদ্ধা আমাদের বাড়িতে এসেছিল সে আমার আত্মীয়, সে রেলওয়েতে অডিট বিভাগে কর্মরত আছেন।

৬- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অ্যাডভোকেট শফিউল আলম তার ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইয়ে ডালিম হোটেলকেন্দ্রিক কোনো নির্যাতনের ঘটনায় কোথাও মীর কাসেম আলীর নাম উল্লেখ করেননি। অথচ সাক্ষী হাসিনা খাতুন দাবি করেছেন: ‘আমি আমার জবানবন্দীতে যে শফিউল আলম সাহেবের কথা বলেছি তার লেখা ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইটির জসীম সংশ্লিষ্ট অংশ আমি পড়েছি। আমার চোখের দৃষ্টি কমে যাওয়ায় সম্পূর্ণ বইটি পড়তে পারিনি। আমার যতটুকু মনে হচ্ছে ওই অংশে আল-বদর কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম আলীর নাম উল্লেখ আছে।’ 
এটা সর্বৈব মিথ্যা কথা। এই রকম মিথ্যুক সাক্ষী কিভাবে আদালত গ্রহণ করতে পারে? 

৭- স্বাধীনতার পরপরই সাক্ষী হাসিনা খাতুন স্থানীয় ‘সাপ্তাহিক স্বীকৃতি’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি জেরায় স্বীকার করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তিনি অনেক লেখালেখি করেছেন। এমনকি কিলিং স্পট নামে তিনি লিখেছেন। অথচ তিনি স্বীকার করেছেন ডালিম হোটেল বা ফুফাতো ভাই জসীম উদ্দিন বিষয়ে কোনো লেখা লেখেননি। 
কেন? এখন এই বিষয়টা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো। এই বিষয়ে তিনি রগরগে বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন অথচ স্বাধীনতার পরে তার লিখা বহু আর্টিকেলের মধ্যে একটিতেও মীর কাশেম আলী সাহেব নিয়ে লিখেন নি। ডালিম হোটেল নিয়ে লিখেন নি। 

৮- জসীম উদ্দিনের ভাই প্রফেসর রাজিব হুমায়ূন জীবিত। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেছেন তার সাথে তিনি কথা বলেছেন। অথচ তিনি তাকে সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির করেননি। সাক্ষী হাসিনা খাতুন বলেছেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। 
মীর কাশেম আলীর আইনজীবী এডভোকেট শাহজাহান বলেন, প্রফেসর রাজিব হুমায়ূন কোর্টে সাক্ষ্য দিতে না আসার মধ্যে অনেক সত্য লুকিয়ে আছে। তার ভাই হত্যায় যদি সত্যিই মীর কাসেম আলী জড়িত থাকতেন তাহলে তিনি কোর্টে আসতেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন তিনি বৃদ্ধ। অথচ তিনি বলতে পারেননি তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসরে গেছেন কি না। কাজেই তার দাবি সত্য নয় বলে ধরে নেয়া যায়। তিনি তার জবানবন্দী রেকর্ড করতে পারতেন এবং তা গ্রহণের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারতেন। মূলত ডালিম হোটেলকেন্দ্রিক নির্যাতনের ঘটনা এবং তার ভাই হত্যার সাথে মীর কাসেম আলীকে তিনি জড়াননি বলেই তাকে আনা হয়নি মর্মে আমরা ধরে নিতে পারি। কারণ তিনিই হতে পারতেন এ অভিযোগের পক্ষে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী।

৯- অ্যাডভোকেট শফিউল আলম তার ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইয়ে উল্লেখ করেছে, তাকে ২৭ নভেম্বর আটক করে ডালিম হোটেলে নেয়া হয়। অথচ ১৬ নম্বর সাক্ষী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, তিনি ২৩ নভেম্বর অ্যাডভোকেট শফিউল আলমকে দেখেছেন ডালিম হোটেলে আটক অবস্থায় অন্যদের সাথে। জাহাঙ্গীর আলম আরো দাবি করেছেন, তিনি ২৩ অথবা ২৪ নভেম্বর সৈয়দ এমরানকে ডালিম হোটেলে দেখেছেন। অথচ সৈয়দ এমরান দাবি করেছেন তাকে ডালিম হোটেলে আনা হয় ৩০ নভেম্বর। জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন তিনি ২৪ নভেম্বর জসীমকে ডালিম হোটেলে দেখেছেন; অথচ চার্জে এবং অন্যান্য তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে জসীমকে ২৮ নভেম্বর ডালিম হোটেলে আনা হয় এবং সে দিনই তার মৃত্যু হয়। 

১০- মুক্তিযোদ্ধা গাজী সালেহ উদ্দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর। তিনি ‘প্রামাণ্য দলিল মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ শীর্ষক বই লিখেছেন। তিনি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিরও সদস্য। তিনি বইয়ের ২০১ পৃষ্ঠায় ‘সন্দ্বীপ উপজেলা, বধ্যভূমি ও শহীদদের তালিকা শিরোনামে লিখেছেন জসীমের মৃত্যুর তারিখ এবং স্থান সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

১১- ১৭ নম্বর সাক্ষী বলেছেন, ‘শফিউল আলম সাহেব আরো বলেন, তখন কক্ষটি বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং তার চোখ বন্ধ ছিল। জসীমকে ফেলে দিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর অনেক কষ্টে নিজের চোখের বাঁধন আলগা করে জসীমকে মরণাপন্ন অবস্থায় দেখতে পান এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই জসীম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।’

কাজেই জসীমকে কে রুমে ফেলে যায় এবং কে মীর কাসেম তা তখন তার পক্ষে চেনা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। দুই নম্বর সাক্ষী সানাহউল্লাহ চৌধুরী দাবি করেছেন অ্যাডভোকেট শফিউল আলম মীর কাসেম আলীকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাকে বলেছেন তিনি বাঙ্গালী খান। এটা যে মিথ্যা তার কারণ হলো অ্যাডভোকেট শফিউল আলম তার বইয়ে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি।

খান সাহেব বিতর্ক: 
এটা ষড়যন্ত্রকারীদের একটা জঘন্য প্রচেষ্টা। তারা ঐ সময়ের কিছু অপরাধীর নাম কে জামায়াত নেতাদের নাম বলে প্রচার করে অভিযুক্ত করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। যেমন আবদুল কাদের মোল্লা কে বিহারী কসাই কাদের আবার দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে রাজাকার দেলোয়ার শিকদার বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছিল। সেই রকমই একটা প্রচেষ্টা মীর কাশেম আলীকে “খান সাহেব” বলে চালিয়ে দেয়া। 

১- মীর কাসেম আলীকে রাষ্ট্রপক্ষ ‘খান’, ‘খান সাহেব, ‘বাঙ্গালী খান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়েও মীর কাসেম আলীকে ‘খান’, ‘খান সাহেব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
মীর কাসেম আলীকে খান সাহেব হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল-২ ও ১৯ নম্বর সাক্ষী এবং রাষ্ট্রপক্ষ সরবরাহকৃত ‘সেই সময় আনন্দ বেদনায়’ বইটির ওপর নির্ভর করেছেন। ২ নম্বর সাক্ষী বলেছেন, ‘একপর্যায়ে ছেলেটিকে আমাদের রুমে ফেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে যায়। তখন অ্যাডভোকেট শফিউল আলম কানে কানে আমাকে বলে যে, ইনি মীর কাসেম আলী, বাঙ্গালী খান বদর বাহিনীর কমান্ডার।’ 
অথচ শফিউল আলম তার বইয়ের কোথাও মীর কাসেম আলীকে ‘খান’ বা ‘খান সাহেব’ হিসেবে উল্লেখ করেননি। এমনকি তার পুরো বইয়ের কোথাও মীর কাসেম আলীর নামই উল্লেখ করা হয়নি। বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে ও তখন মীর কাসেম আলী একজন পরিচিত ব্যক্তি এ দেশে। 

২- শফিউল আলম বইয়ের ২৫৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘আবার হঠাৎ বুটের আওয়াজ কানে এলো। মনে হলো বেশ ক’জন ক্রমশ নিকটতর হচ্ছে। সেন্ট্রি দরজা খুলে হাঁক দিলো, ‘খান সাহেব এসেছে, সকলে উঠে দাঁড়াও।’ বাইরে থাকতে শুনেছিলাম এ ‘খান সাহেব’ ভয়াল নিষ্ঠুর শক্তিধর এক লোক।’
এডভোকেট শাহজাহান বলেন, এখানে বর্ণিত খান সাহেব এবং বুটের আওয়াজ থেকে এটা পরিষ্কার যে, এই খান সাহেব হলো কোনো পাকিস্তানি আর্মি অফিসার। কারণ ১৬ নং সাক্ষী জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, ডালিম হোটেলের দুষ্কৃতকারীরা উর্দুতে কথা বলত। “প্রথমে আমাকে ডালিম হোটেলের বারান্দায় বসিয়ে পিঠে ও ঘাড়ে ২-৩ টা লাথি মেরে এবং বলে ‘শালা বহুত মজবুত হ্যায়’.....”। 
ডালিম হোটেল নিয়ন্ত্রণ করত পাকিস্তান আর্মি ও বিহারিরা। কাজেই এখানে বর্ণিত খান সাহেব মীর কাসেম আলী নন এবং লেখক বইয়ে মীর কাসেম আলীকে খান সাহেব হিসেবে উল্লেখ করা তো দূরের কথা, বইয়ের কোথাও তার নামই উল্লেখ করেননি।

বিচারিক হত্যার উৎসবে মেতে উঠা ভারতীয় সমর্থনে গঠিত স্বৈরাচারী আওয়ামীলীগ সরকার এবং তাদের দলীয় পরিচয়ে প্রমোশন পাওয়া বিচারকরা মীর কাশেম আলী সাহেবকে মাত্র একটি অভিযোগে ফাঁসী দিয়েছে। সেই অভিযোগেরই এত দূর্দশা, বাকীগুলোর অবস্থা সচেতন মানুষ মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন।  

সব অভিযোগ সম্পর্কে জানুন
অন্যান্য জামায়াত নেতার বিচার নিয়ে প্রহসন
মীর কাশেম আলীর ওয়েবসাইট
ফেইসবুক পেইজ
টুইটার 

এই অন্যায় বিচার বিভাগীয় রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে সবাই সর্বোচ্চ সোচ্চার হোন।

#FreeMirQuasemAli #StopJudicialKilling #Bangladesh
#FreeJamaatLeaderd #SaveBangladesh

বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

জান্নাতের যাত্রী


সালমান আজ না খেয়েই বেরিয়েছে। এটাতো আর বাড়ি নয় যে মাকে বলবে ‘মা, আজ আমার একটু আগে বের হতে হবে, খেতে দাও’। এটা মেস। এখানে কাকে বলবে? বুয়া প্রায়ই দেরী করে আসে, আড়মোড়া ভেঙ্গে তার রান্না করতে করতেই ক্লাসের সময় পার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যায়। যেদিন একটু আগে বের হতে হয় সেদিনের সকালের খাওয়া বাদ। এতে অবশ্য সালমানের খুব একটা কিছু হয় না। মাঝে মাঝে গ্যাস জমে পেট ব্যাথা করে এই যা। এটা মোটামুটি তার অভ্যাসের মধ্যেই চলে আসছে।

আজকে ক্লাসের আগে তার মিছিল আছে। অপশক্তি স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে মিছিল। ইসলাম ও ইসলামী নেতৃত্ব রক্ষা করার আন্দোলনের মিছিল। তাই যথারীতি সে না খেয়েই বেরিয়েছে। বন্ধুদের সাথে নিয়ে সে মিছিলে যোগ দেয়। মিছিল শুরু হওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই পুলিশ গুলি ছুঁড়ে। পুলিশ এখন খুব আক্রমানত্মক। লাঠিচার্জ কিংবা কাঁদানো গ্যাসের কোন বালাই নেই। সরাসরি গুলি। তাও কোন ফাঁকা গুলি নয়। বুক বরাবর। মিছিলের সামনে থাকা সালমান প্রথম শিকার পুলিশের। বুকে গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়ে সে। সে একা নয়, অনেকে। তার অন্যান্য সহকর্মীরা অনেককে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারলেও সালমান সহ সাত জনকে উদ্ধার করতে পারেনি।

কিছুক্ষন পর পুলিশ তাদের থানায় তুলে নিয়ে আসে। এসেই শুরু করে অত্যাচার। চিৎকার আর আর্তনাদে পুরো থানাটা যেন জাহান্নাম হয়ে উঠে। সাতটা গুলিবিদ্ধ মানুষের উপর ভাংতে থাকে এক একটা লাঠি। একজন পুলিশ মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে গেলে অপরজন শুরু করে। এভাবে পালাক্রমে চলছেই। রক্তের নহর বইতে থাকলো থানায়। একটা পুলিশতো দ্রুত হাঁটতে গিয়ে রক্তে পিছলিয়ে পড়ে গেলো। ঘন লাল রক্তে সেও রঞ্জিত হয়ে গেলো। হো হো করে হেসে উঠলো তার সহকর্মী অন্যান্য পুলিশেরা। রাগে লাল হয়ে গেলো সে। তার সব রাগ গিয়ে পড়লো উলট পালট কুন্ডলি পাকিয়ে থাকা সাতটি রক্তাক্ত দেহের উপর। কি যেন খুঁজতে লাগলো সে। কিছুক্ষন পর পাশের রুম থেকে নিয়ে এলো একটা লোহার পাইপ। এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করলো সে। সালমানরা শুধু আল্লাহকে ডেকেই চলছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিকট শব্দ করে কবির নামে এক সহকর্মীর হাত ভেঙ্গে যায়। কবজি আর কনুইয়ের মাঝখান থেকে ঝুলতে থাকে তার রক্তাক্ত হাত। এ এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।

বুকে, পেটে গুলি খাওয়া সালমানের শুধু নিঃশ্বাসটাই বাকী আছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে এখনই আল্লাহর কাছে চলে যাবে। মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি তার মনে ভর করে। কত কিছু যে কল্পনা করছে সে। সারা জীবনের কথা মনে করার চেষ্টা করে। কিছু কিছু অন্যায়ের কথা মনে হতেই সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। পুলিশের ক্রমাগত পিটুনি তাকে স্পর্শ করে না। সে আছে তার মত করে আনন্দে। মালিকের সাথে মিলিত হবার আনন্দ। বহু আকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে সে। এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না তার। এমন সময় সে বুঝতে পারলো তাকে গাড়িতে তুলছে পুলিশেরা।

কিছুক্ষনপর মৃতপ্রায় সাতটি মানুষকে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে আসে। ডাক্তাররা দ্রুত চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করেন। সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যান্ডেজ করে প্রথমে রক্ত বন্ধের ব্যবস্থা করলেন। তারপর একের পর এক পরীক্ষা করতে থাকলেন কার অবস্থা বেশী খারাপ। কাকে সবার আগে অপারেশন করতে হবে। পরিক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেলো সালমানের কন্ডিশন সবচেয়ে খারাপ। ডাক্তার তাকে বললেন, 
- তুমি দ্রুত তোমার আত্মীয়দের খবর দাও। তোমার আত্মীয় কেউ কি এসেছেন?
- আমার কোন আত্মীয় স্বজন এই শহরে থাকে না। আর থাকলেও আমি তাদের ডেকে কষ্ট দিবো না। আমি তো আমার কোন ক্ষতি করিনি। তাছাড়া আমার কোন এক্সিডেন্টও হয়নি। 
- তোমার অভিভাবকের সাইন ছাড়াতো আমরা তোমার অপারেশন করতে পারবো না। পরে কোন সমস্যা হলে আমাদের উপর দায় পড়বে। 
- (পুলিশদের দেখিয়ে) আপনাদের উপর দায় পড়বে কেন? তারা আমাকে গুলি করেছে। তারপর আমাকে আবার কোন কারণ ছাড়া এক ঘন্টা পিটিয়েছে। দায় হলে তাদের হবে। আর আমার এখানে কোন অভিভাবক নেই। আমার অভভাবক একমাত্র আল্লাহ্‌। 
- আল্লাহ্‌ তো আর সাইন দিবেন না। এখন আমরা কি করবো? 
- (পুলিশদের দেখিয়ে) ওদেরকে বলুন সাইন করতে।

পুলিশও সাইন করতে অস্বীকৃতি জানালো। এরপর সালমান বললো আমাকে দিন আমিই সাইন করি। কিন্তু ডাক্তাররা বললো প্রথম কথা তোমার সাইন করার শক্তি নেই। আর দ্বিতীয়ত তোমার সাইন কাজে আসবে না। এরপর ডাক্তার সার্জারির প্রধান ডাক্তার প্রবীর কুমারকে জানালো। তিনি সব শুনে বললেন, আচ্ছা তাকে নিয়ে এসো। অপারেশনতো করতে হবে। 

ডাঃ প্রবীর কুমার সালমানকে দেখেই চমকে উঠলেন। আরে এতো সেই ছেলে। তিনি তাকে চিনেন। মাস ছয়েক আগের কথা, একদিন রাত দুটোয় হঠাৎ তার বাসায় কলিংবেলের শব্দ। তিনি বের হয়ে দেখলেন একটা শীর্ণকায় ছেলে। দরোজা খুলে দিলেন। সে ঘরে ঢুকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লো। ডাঃ প্রবীর তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেন এবং বুঝতে পারলেন দীর্ঘক্ষন না খেয়ে থাকার কারণে ভীষন দূর্বল হয়ে পড়ছে। অল্পক্ষন পরই তার জ্ঞান ফিরলো। সে অপরাধী ও কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে ডাক্তার প্রবীরের দিকে তাকালো। ডাক্তার তাকে উঠালেন এবং বসালেন। তার কোন কথা শোনার আগেই তাকে খেতে দিতে বললেন তার স্ত্রীকে। সে খাওয়া দাওয়া শেষ করলে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন কী বৃত্তান্ত? তুমি কি কর? এত রাতেই বা কোথা থেকে? 
সব শুনে ডাঃ প্রবীর বললেন, আমি তোমাকে আগে থেকেই জানতাম। প্রসূনের মুখে তোমার এত গল্প শুনেছি যে তোমার সব বিষয় মোটামুটি জানি। সালমান অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে
- কোন প্রসূন?
- কেন তোমার ক্লাসমেট প্রসূন। সে আমার ছেলে। ঐ তো ঐদিকের রুমে ঘুমুচ্ছে।

সালমানের মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠছে। ডাক্তার প্রবীর সাহেব তাকে রাজনীতি করতে বারণ করছিলেন। কিন্তু এগুলো কিছুই তার কানে যাচ্ছিল না। সকাল দশটা থেকে পুলিশ তার পেছনে লাগছে। তার মেস ঘেরাও করেছে। কিন্তু কৌশলে বের হয়েছে। সারা শহর নিজেও ঘুরেছে পুলিশদেরও ঘুরিয়েছে। সে যে কোথাও গিয়ে বসবে তার ব্যবস্থা নেই। রাস্তার রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাহারা বসানো। খাবার দোকানগুলোতে গোয়েন্দারা বসে আছে। তাই সে অগত্যা টিকতে না পেরে এই ডাক্তারের বাসায় নক করেছে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি তারা হিন্দু। সে একটু আগে মজা করে মুরগী দিয়ে ভাত খেয়েছে। তার ক্লাসমেট প্রসূনের নাম বলাতে সে বুঝতে পারলো সে কতটা ভুল করেছে। ওনারা কষ্ট পেতে পারেন তাই সে আঙ্কেল বমি আসছে এই কথা বলেই সে ওয়াশরুমে চলে গেলো। গলায় হাত দিয়ে সব বমি করে দিলো। 

অন্য কেউ না বুঝলেও ডাক্তার বুঝলেন এটা সালমান ইচ্ছে করেই করেছে। অমুসলিমদের জবাই করা মুরগী মুসলিমদের খাওয়া বারণ এটাও জানা রয়েছে তার। তিনি কিছুই বললেন না কিন্তু শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিল ছোট্ট এই ছেলেটির প্রতি। কতটা একনিষ্ঠ তার আদর্শের প্রতি। তারপর সে ওয়াশ রুম থেকে বের হলে তাকে এক গ্লাস দুধ দিলেন। যে ছেলে সারাদিন না খাওয়ার পর যা খেয়েছে তাও বিসর্জন দিতে পারে শুধু আদর্শের জন্য সে সাধারণ কোন ছেলে নয়। তার ছেলে প্রসূনের মুখে তার শুধু প্রশংসাই শুনেন। সারাদিন পুলিশের সাথে দৌড়াদৌড়ি, তার সংগঠনের কাজ সব করেও সে ক্লাসের ফার্স্ট। প্রসূন ও সালমান দুজনই চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এবার HSC পরিক্ষার্থী।

এক মুহুর্তে সব মনে পড়ে গেলো ডাক্তারের। তিনি দ্রুত অপারেশনের ব্যবস্থা করলেন। পরিস্থিতি খুবই নাজুক। তারপরও বলা চলে অপারেশন সাকসেসফুল। তিনটি বুলেট এক্সরে রিপোর্টে ধরা পড়ছিলো। তিনটাই তিনি বের করতে পেরেছেন। অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়েই ছেলে প্রসূনকে ফোন করেছেন এবং বলেছেন সালমানের কথা। ততক্ষণে প্রসূন ও তার বন্ধুরা সবাই জেনেছে। সালমানের বাবা-মাও রওনা হয়েছেন গ্রাম থেকে। 

অপারেশনের আটচল্লিশ ঘণ্টা পার হওয়ার পরও সালমানের জ্ঞান ফিরছে না। সবাই খুব টেনশনে। সালমানের বাবা সিজদায় পড়ে আছেন আছেন। আর মা ছোটাছুটি করছেন অপারেশন থিয়েটারের সামনের বারান্দায়। কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছেন তারা। সালমানের আন্দোলনের সঙ্গীরাও আছে দূরে দূরে। পুলিশের কারণে তারা সামনে আসতে পারছে না। তবে সালমানের মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখছে। সবার খাবার দাবার ঔষধ তারাই সরবরাহ করছে। বায়ান্ন ঘন্টা পর তার জ্ঞান ফিরেছে। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছিল। খুবই দূর্বল হয়ে পড়েছে। হঠাৎ তলপেটে সে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করছে। ডাক্তাররা আসলেন এবং এক্সরে করালেন। আরো দুটো বুলেটের অস্তিত্ব দেখা গেল সেখানে। আবার অপারেশন করতে হবে।

এক অপারেশনের ধাক্কাই সে নিতে পারেনি। এখন অন্য অপারেশন একেবারেই সম্ভব না। আবার ওদিকে বুলেটদুটো থাকার কারণে ভেতরে ইনফেকশন হয়ে গিয়েছে। অপারেশন না করলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। ডাক্তাররা রিস্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন অপারেশনই করতে হবে। সালমানের বাবা-মা কে পুরো কন্ডিশন বুঝালেন ডাঃ প্রবীর। তারাও মত দিলো। সবাই বুঝতে পারলো হয়তো সালমানকে আর পাওয়া যাবে না।

একে একে সবাই অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করলো। সালমানের বাবা, মা, ডাক্তাররা, নার্স, সহকর্মীরা সবাই। সালমান তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। জান্নাতি সে হাসি। ডাঃ প্রবীর একজন জুনিয়র ডাক্তারকে কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বললেন। আর সালমানের দিকে তাকিয়ে কন্ঠকে খুব স্বাভাবিক রেখে বললেন, বাবা সালমান, তোমার শরীরে আরো দুটো বুলেট আছে সেগুলো বের করতে হবে। তোমার অবস্থা খুব নাজুক। আমরা জানিনা ভবিষ্যতে কি হবে। তবে তুমি আশঙ্কামুক্ত নও। এখানে সবাই আছেন। তুমি যদি কাউকে কিছু বলার থাকে তবে বলতে পারো। তোমার ক্ষতির জন্য কারা দায়ী তাদের কথা তুমি বলে যাও।

সালমান তার মাকে ইশারায় ডাকলো। মা কতদিন তুমি আমাকে আদর কর নাই, দোষ আমার আমি বাড়ি যেতে পারিনি। আমাকে একটু আদর করবে? মা জড়িয়ে ধরলো শুয়ে থাকা সালমানকে । মা-ছেলের সাথে কান্না করতে লাগলো সবাই। ডাক্তার তাদের ছাড়িয়ে নিলেন। এবার সে বাবাকে ডেকে বললো আমার কিছু ঋণ আছে, শোধ করে দিবে? বাবা বললো, কি ঋণ আমাকে বল। আমি অবশ্যই শোধ করে দিব। বাবা ঋণটা তোমার কাছেই। তুমি কষ্ট করে রোজগার করে আমার জন্য পাঠাতে। আমি তোমার কোন আশাই পূরণ করতে পারিনি। আমার ঋণটা মাফ করে দাও। 

তারপর তার এক সহকর্মীকে কাছে ডেকে বললো, আমার বিছানার নিচে ৫০০ টাকা আছে এগুলো সোহাগ ভাইকে দিবে। আর কিছু ভাউচার আর বিগত মাসগুলোর হিসাব আমার টেবিলের ড্রয়ারে আছে। দয়া করে সেগুলোও সোহাগ ভাইকে দিবে। আর আমাকে মাফ করে দিও ভাই। সবাইকে বলিও যেন আমাকে মাফ করে দেয়। এবার ডাক্তারকে ইশারা করে বলে লিখুন।

আমি সালমান বলছি আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। আল্লাহ্‌ তায়ালা যদি মনে করেন আমাকে তার সান্নিধ্যে নিয়ে যাবেন তাহলে এটা আমার জন্য পরম পাওয়া। যারা আমাকে গুলি করেছে আমাকে মেরেছে তারা না বুঝে এসব করেছে। তারা যদি আমাদের বুঝতো তাহলে তারা এই জঘন্য কাজ কখনোই করতো না। এই অপরাধ আমাদের, আমরা এদেশের মানুষকে ভালোভাবে বুঝাতে পারিনি। আমাদের সীমাবদ্ধতার জন্য আজ এই অবস্থা। আমার প্রতি যারা নির্যাতন করেছে আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন।

সবার চোখে অশ্রু। সবাই কাঁদছে। পুলিশগুলো সহ। হঠাৎ ডাঃ প্রবীর এক পুলিশের কলার চেপে ধরে বলতে লাগলেন, কেমনে পারলে? কেমনে পারলে এই ফেরেশতার মত ছেলেকে গুলি করতে? বলে কাঁদতে লাগলেন। পুলিশগুলোও চোখ মুছতে লাগলো।

একে একে সবাইকে ডাক্তার প্রবীর অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে দিলেন। আরেকজন ডাক্তার সংজ্ঞাহীন করার ইঞ্জেকশন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সালমানের দিকে।
২৫/২/২০১৬

শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

হযরত আদম আঃ কে নিয়ে কিছু ভুল ধারণা


হযরত আদম আঃ কে সৃষ্টির সময়কার ইতিহাস নিয়ে নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। সেগুলো হলো 

১- খলিফা সৃষ্টির কথা জেনে ফেরেশতারা আপত্তি জানায়
২- আল্লাহ আদম আঃ কে গোপনে ইলম দান করে ফেরেশতাদের উপর আদম আঃ শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। 
৩- আদম আঃ জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হওয়ায় আদমকে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাদের হুকুম করা হলো। 
৪- বেহেশতে ইবলিশের ধোঁকায় পড়ে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার শাস্তি স্বরুপ আদম আঃ দুনিয়ায় নির্বাসিত হন। 
৫- দুনিয়ায় ৩০০ বছর তাওবা করার পর আদম আঃ নবী হন 
৬- দুনিয়ায় কারাগার থেকে পাকসাফ হয়ে গেলে আবার বেহেশতে যাওয়ার সুযোগ আসবে। 


পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুতে এই নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে


(২:৩০) আবার সেই সময়ের কথা একটু স্মরণ কর যখন তোমাদের রব ফেরেশতাদের বলেছিলেন , “আমি পৃথিবীতে একজন খলীফা- প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে চাই ৷”তারা বললো, “আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে নিযুক্ত করতে চান যে সেখানকার ব্যবস্থাপনাকে বিপর্যস্থ করবে এবং রক্তপাত করবে? আপনার প্রশংসা ও স্তুতিসহকারে তাসবীহ পাঠ এবং আপনার পবিত্রতা বর্ণনা তো আমরা করেই যাচ্ছি৷” আল্লাহ বললেন, “আমি জানি যা তোমরা জানো না ৷” 

(২:৩১) অতপর আল্লাহ আদমকে সমস্ত জিনিসের নাম শেখালেন তারপর সেগুলো পেশ করলেন ফেরেশতাদের সামনে এবং বললেন, “যদি তোমাদের ধারণা সঠিক হয় তাহলে একটু বলতো দেখি এই জিনিসগুলোর নাম? ”

(২:৩২) তারা বললোঃ “ত্রুটিমুক্ত তো একমাত্র আপনারই সত্তা, আমরা তো মাত্র ততটুকু জ্ঞান রাখি ততটুকু আপনি আমাদের দিয়েছেন ৷ ৪৩ প্রকৃতপক্ষে আপনি ছাড়া আর এমন কোন সত্তা নেই যিনি সবকিছু জানেন ও সবকিছু বোঝেন ৷” 

(২:৩৩) তখন আল্লাহ আদমকে বললেন, “তুমি ওদেরকে এই জিনিসগুলোর নাম বলে দাও ৷”যখন সে তাদেরকে সেসবের নাম জানিয়ে দিল। তখন আল্লাহ বললেনঃ “আমি না তোমাদের বলেছিলাম, আমি আকাশ ও পৃথিবীর এমন সমস্ত নিগূঢ় তত্ত্ব জানি যা তোমাদের অগোচরে রয়ে গেছে? যা কিছু তোমরা প্রকাশ করে থাকো তা আমি জানি এবং যা কিছু তোমরা গোপন করো তাও আমি জানি ৷” 

(২:৩৪) তারপর যখন ফেরেশতাদের হুকুম দিলাম, আদমের সামনে নত হও, তখন সবাই অবনত হলো, কিন্তু ইবলিস অস্বীকার করলো৷ সে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে মেতে উঠলো এবং নাফরমানদের অন্তরভুক্ত হলো ৷ 

(২:৩৫) তখন আমরা আদমকে বললাম , “তুমি ও তোমার স্ত্রী উভয়েই জান্নাতে থাকো এবং এখানে স্বাচ্ছন্দের সাথে ইচ্ছে মতো খেতে থাকো, তবে এই গাছটির কাছে যেয়ো না ৷ অন্যথায় তোমরা দু’জন যালেমদের অন্তরভুক্ত হয়ে যাবে ৷ ” 

(২:৩৬) শেষ পর্যন্ত শয়তান তাদেরকে সেই গাছটির লোভ দেখিয়ে আমার হুকুমের আনুগত্য থেকে সরিয়ে দিল এবং যে অবস্থার মধ্যে তারা ছিল তা থেকে তাদেরকে বের করে ছাড়লো ৷ আমি আদেশ করলাম, “ এখন তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও ৷ তোমরা একে অপরের শত্রু । তোমাদের একটি নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করতে ও জীবন অতিবাহিত করতে হবে৷” 

(২:৩৭) তখন আদম তার রবের কাছ থেকে কয়েকটি বাক্য শিখে নিয়ে তাওবা করলো ৷ তার রব তার এই তাওবা কবুল করে নিলেন৷ কারণ তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী৷ 

(২:৩৮) আমরা বললাম , “ তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও ৷ এরপর যখন আমার পক্ষ থেকে কোন হিদায়াত তোমাদের কাছে পৌছুবে তখন যারা আমার সেই হিদায়াতের অনুসরণ করবে তাদের জন্য থাকবে না কোন ভয় দুঃখ বেদনা৷ 

(২:৩৯) আর যারা একে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাবে এবং আমার আয়াতকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবে তারা হবে আগুনের মধ্যে প্রবেশকারী ৷ সেখানে তারা থাকবে চিরকাল ৷


এখানে ছাড়াও পবিত্র কুরআনে আরো ছয়টি সূরায় এই বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।


১- আল আরাফ ২য় রুকু 
২- আল হিজর ৩য় রুকু
৩- বনী ইসরাঈল ৭ম রুকু 
৪- আল কাহফ ৭ম রুকু 
৫- ত্বাহা ৭ম রুকু 
৬- সোয়াদ ৫ম বা শেষ রুকু 

এই বিষয়ের উপযুক্ত ব্যাখ্যা হলো, 
১- দুনিয়ায় আল্লাহ তায়ালা খলিফা পাঠাবেন বলে ঘোষনা শুনে ফেরেশতাদের মনে এই খটকা সৃষ্টি হলো যে তারা তো আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব যথাযথই পালন করছেন তাহলে আদম সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি? ফেরেশতাদের ধারণা ছিল তারা যে দায়িত্ব পালন করেছেন এতে আল্লাহ পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তাই ঐ দায়িত্বটি আরো ভালোভাবে পালন করার জন্যই হয়তো আদম আঃ কে সৃষ্টি করার প্রয়োজন মনে করেছেন। ফেরেশতাদের এই ধারণা যে সঠিক ছিল না সে কথা বুঝানোর জন্যই আল্লাহ তায়ালা ব্যবস্থা করেছেন। ফেরেশতারা তাদের আশংকার কথা জানিয়েছেন। আপত্তি করার ইখতিয়ার ফেরেশতাদের থাকেনা। 

২- আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের যে দায়িত্ব দিয়েছেন সে দায়িত্ব পালনের উপযোগী জ্ঞান তাদের দিয়েছেন। আদম আঃ কে যে দায়িত্ব আল্লাহ দিতে চাচ্ছেন সে দায়িত্বের উপযোগী জ্ঞানও তাকে দিলেন। ফেরেশতাদের কাছে আদম আঃ কে দেয়া জ্ঞান যে নেই একথা প্রমাণ করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বুঝিয়ে দিলেন আদম আঃ কে অন্যরকম দায়িত্ব পালনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। 

যেমন ডাক্তারী করার দায়িত্ব যাকে দেয়া হবে তাকে ডাক্তারী শিক্ষাই শিখানো হবে। অন্যদিকে যাকে দেশরক্ষার দায়িত্ব দেয়া হবে তাকে তার উপযোগী সমরাস্ত্রের জ্ঞানই দেয়া হবে। তাই ডাক্তার শ্রেষ্ঠ নাকি সেনা অফিসার শ্রেষ্ঠ এই প্রশ্ন অবান্তর। ঠিক তেমনি ফেরেশতার দায়িত্বের জায়গায় ফেরেশতা যোগ্য। খেলাফতের দায়িত্বের জায়গায় আদম আঃ যোগ্য। এখানে আদম আঃ এবং ফেরেশতাদের মধ্যে প্রতিযোগীতা বা তুলনার ভিত্তি নেই। 

৩- আদম আঃ জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ তাই তাকে সাজদা করার জন্য বলা হয়েছে এটা ঠিক নয়। যদি জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতেই সিজদা করার নির্দেশ দেয়া আল্লাহ সঠিক মনে করতেন তাহলে পিতাকে সিজদা করার জন্য সন্তানদের নির্দেশ দিতেন। শিক্ষককে সিজদা করার জন্য ছাত্রদের নির্দেশ দিতেন। এতে বুঝা যায় আদম আঃ কে সিজদা করার নির্দেশ ভিন্ন কারণে। মানুষকে খিলাফতের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। খিলাফতের কাজে সহযোগীতা না পেলে দুনিয়ায় কোন কাজই করতে পারবে না মানুষ। তাই খুব সম্ভবত ফেরেশতাদেরকে সিজদা করার নির্দেশ দেয়ার উদ্দেশ্য হলো মানুষের ইখতিয়ারে যাতে হস্তক্ষেপ না করা হয়। ফেরেশতারা আল্লাহর নাফরমানী করেন না এবং নাফরমানী পছন্দও করেন না তাদের সেই ইখতয়ারও নেই। মানুষ তার ইচ্ছামত কোন বস্তুর ব্যবহার করতে চাইলে সেই বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা যদি বাধা দেয় তাহলে মানুষের ইখতিয়ার থাকেনা। আল্লাহর নাফরমান বান্দাদের দুনিয়ায় চলার পথে পদে পদে বাধা দিলে আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা ও চেষ্টার ক্ষেত্রে যে স্বাধীনতা দিয়েছেন তা ব্যহত হতে বাধ্য। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা আদম আঃ কে সিজদা করার মাধ্যমে ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা হয়। 

৪- ইবলিশ নেতৃস্থানীয় জ্বিন ছিল। ফেরেশতা ছাড়াও জ্বিনদের মধ্যে শুধু ইবলিশকে সিজদা করার নির্দেশ দেয়া হলো কারণ সে আদম আঃ কে খিলাফত দেবার বিরোধী ছিল এবং তার বিপরীতে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল। মহান আল্লাহ তায়ালা তার এই গোপন হিংসা প্রকাশ করার জন্যই তাকে সিজদা করার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশ আর ফেরেশতাদের নির্দেশের উদ্দেশ্য এবং কারণ ভিন্ন। 

৫- মানুষকে খিলাফতের অযোগ্য প্রমাণ করার জন্য ইবলিশ যে কত যোগ্যতার সাথে শত্রু তা করতে সক্ষম সে কথা প্রমাণ করার জন্য আদম আঃ কে দুনিয়ায় পাঠানোর পূর্বে জান্নাতে পাঠানো হয়েছে। খিলাফতের জন্য আদম আঃ এবং ইবলিশের মধ্যে কে বেশী যোগ্য ও উপযোগী তা প্রমাণ হয়েছে যে, আদম আঃ ইচ্ছে করে আল্লাহর আদেশ অমান্য করেনি। আর ইবিলিশ জেনেশুনে অমান্য করেছে। আদম আঃ যখন বুঝতে পারলেন আদেশ অমান্য হয়েছে তখন তিনি অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেছেন আর ইবলিশ নাফরমানী করার যুক্তি প্রদর্শন করে জ্ঞানপাপী বলে পরিচয় দিয়েছে। 

৬- এই কথা স্পষ্ট হয়ে গেলো ফেরেশতারা মানুষের প্রতিযোগী বা প্রতিদন্ধি নয় বরং শুভাকাঙ্ক্ষী। আর এর বিপরীতে ইবলিশ মানুষের চরম শত্রু । 

৭- মানুষকে দুনিয়ায় খেলাফতের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দায়িত্ব পালনের পুরষ্কার স্বরুপই মানুষ জান্নাতের অধিকারী হবে। তাই দুনিয়াটা মানুষের কর্মস্থল, কারাগার নয়। শাস্তি দেবার জায়গা দুনিয়া নয় এবং শাস্তির জন্য দুনিয়ায় পাঠানোও হয়নি। 

৮- আদম আঃ দুনিয়ায় নবীর মর্যাদা নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন। নবী কখনো পাপী ও নাফরমান হন না। যে আদেশ অমান্য জান্নাতে হয়ে গিয়েছে এর তওবা সেখানেই কবুল পবিত্র অবস্থায় তিনি দুনিয়ায় নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। 

আলোচ্য আলোচনার শিক্ষাঃ 
১- দুনিয়ায় খিলাফতের দায়িত্ব পালনই মানুষের জন্য সর্বোচ্চ দায়িত্ব। 
২- ইবলিশ মানুষের প্রকাশ্য শত্রু । 
৩- মানুষ তার উপর অর্পিত দায়িত্ব ভুলে ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধার লক্ষ্যে কাজ করা এবং দুনিয়াবী উন্নতির রঙ্গিন স্বপ্নে বিভোর হওয়া মূলত ইবলিশের ওয়াসওয়াসা। 
৪- লজ্জাস্থান ঢেকে রাখা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কৃত্রিম কুশিক্ষা দ্বারাই তা বিকৃত করা হয়। 
৫- মানুষের সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো যৌন আকাঙ্ক্ষা। তাই এই পথে হামলা করাই শয়তান সহজ মনে করে। 
৬- ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা মানুষের পরিচায়ক নয় এটা শয়তানী বদভ্যাস। 
৭- ইবলিশের শত্রু তা মোকাবেলা বড়ই কঠিন। বাঁচার উপায় ইখলাস। নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর বিধিবিধান মেনে চলার চেষ্টা যারা করে তাদের ভয় নেই।

সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

প্রমোশন


১.
খাবার টেবিলে আশরাফ সাহেব। সাথে মসজিদের হুজুর-খাদেম সহ তিনজন লোক। কোতোয়ালী থানার ওসি তিনি। হুজুরদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করার কারণে এটা মনে করার দরকার নেই তিনি ধার্মিক লোক। আপাদমস্তক অসৎ তিনি। মাসে একদিন ফকির-মিসকিন-হুজুরদের খাইয়ে তিনি তার পাপ কাটান। এই পাপ কাটানোর সিস্টেমটা তার আবিষ্কার নয়। তার দাদা ও বাবাকেও সে দেখেছে এভাবে পাপ কাটাতে।

ইদানিং তিনি তার দুই ছেলেকে নিয়ে ভীষন চিন্তিত। তারা না করে পড়াশোনা, না শুনে কারো কথা। তিনিও তার বাল্যকালে বাবা-মায়ের অবাধ্য ছিলেন ঠিক কিন্তু এতটা বেয়াড়া ছিলেন না। ইদানিং তাদের বিরুদ্ধে অহরহ ইভটিজিং এর অভিযোগ আসছে। আরো উদ্বেগজনক খবর হল নেশার সাথে জড়িত হয়ে পড়ছে। পাড়ালেখার তো হদিসই নেই। বাসায় তাদের প্রাইভেট টিউটর টিকে না। এক মাস পড়িয়েই তারা চলে যায়। আশরাফ সাহেব একের পর এক টিউটর ঠিক করেন আর তার ছেলেরা কিভাবে টিউটরকে তাড়ানো যায় সেই ব্যবস্থা করে।

খেতে খেতে ওসি সাহেব মসজিদের ঈমামকে বললেন, আমাকে একটা ভালো ছেলে দিন, যে আমার এই দুই ছেলেকে নিজের ভাইয়ের মত দেখাশোনা করবে। ঈমাম সাহেব বললেন শিক্ষক তো আর কম দিলাম না। কিন্তু তাদের অত্যাচারে কে এখানে পড়াবে বলুন! ছেলেদের কথা ভালোভাবেই জানেন ঈমাম সাহেব কারণ তিনি তাদের আরবী পড়ান। তিনিও অনেক চেষ্টা করেছেন তাদেরকে লাইনে আনার জন্য। কিন্তু বিধিবাম, কিছুতেই কিছু হয়নি। ঈমাম সাহেব কিছুক্ষন ভেবে বললেন একটা নতুন ছেলেকে দেখেছি। তাকে বলে দেখি সে হয়তো পারবে। তার মধ্যে প্রচুর ধৈর্য্য দেখেছি।

পরদিন ঈমাম সাহেব ফজরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হতেই দেখা হল সাকিবের সাথে। সাকিব এই এলাকায় এসেছে বেশীদিন হয় নি। এই দুই কি তিন মাস। গ্রামের ছেলে, ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে তাই শহরে আসা। ঈমাম সাহেব অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছেন এই কয় দিনে সে এলাকার ছেলেদের মধ্যে নিজেকে ভীষন জনপ্রিয় করে তুলেছে।সাকিবকে ঈমাম সাহেব ওসি সাহেবের ছেলেদের পড়ানোর কথা বললেন। সাকিব রাজী হল।

২.
ওসি সাহেবের দুই ছেলে। সাজিদ আর সাঈদ। সাকিব তাদের সম্পর্কে আগে জেনে নিয়েছিলো। তাই সে এক সপ্তাহ কোন পড়াশোনার কথাই বলেনি। কেবল গল্পগুজব করেছে। এদিক-সেদিক ঘুরতে যায়। জগতের যে আরেকটি পিঠ আছে তা দেখানোর চেষ্টা করে। তাদের নিয়ে বস্তিতে যায়। মানুষের দূর্দশা দেখায়। হাসপাতালে যায় মানুষের কষ্ট অনুধাবন করতে শেখায়। আস্তে আস্তে তাদের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে লাগলো। সাজিদ- সাঈদ দেখলো সাকিব কোন টিউটর নয়, যেন তাদের কোন বন্ধু।

আশরাফ সাহেব খুব অবাক হলেন তার দুই ছেলের পরিবর্তন দেখে। মাসখানেকের মধ্যেই কেমন যাদুর মতন দুই ছেলেকে কন্ট্রোল করে ফেললো সাকিব। ওরা যে শুধু পড়াশোনা করে তা নয়, তারা এখন নিয়মিত নামাজ পড়ে। সাকিবকে তিনি সম্মানের চোখে দেখতে লাগলেন। এরমধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে। আশরাফ সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন রাজাকারদের ফাঁসীর বিরুদ্ধে এই দেশের টগবগে তরুণরা প্রাণ পর্যন্ত দিচ্ছে। কঠিন নির্যাতনেও ওদের দমাতে পারছেন না তারা। তারা যেন মার খাওয়ার জন্য বারবার মিছিল করছে।

সাকিব ইতিমধ্যে ওসি সাহেবের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠলো। ওসি সাহেব হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি পুলিশের চাকুরীতে জয়েন করার পর অনেকেই বলেছে পুলিশের ছেলে মানুষ হয় না। সাকিবের প্রতি তিনি অনেক কৃতজ্ঞ। তিনি প্রায়ই রাতে সাকিবকে খেয়ে যেতে বলেন। 

একদিন খেতে খেতে সাকিবকে বললেন, আচ্ছা ছেলেরা এভাবে রাজাকারদের জন্য জীবন দিচ্ছে কেন? সাকিব কিছুক্ষন তার দিকে তাকিয়ে ছিল। এরপর নাতিদীর্ঘ একটা বক্তব্য দিয়ে দিল। ওসি সাহেব অবাক হয়ে শুনছিলেন। তিনি এতদিন ভাবতেই পারতেন না স্বাধীনতা বিরোধীদেরও যুক্তি থাকতে পারে। এত অকাট্য যুক্তি! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন তোমার যুক্তির বিরুদ্ধে আমার বলার যোগ্যতা নাই। তুমি আবার এগুলার সাথে জড়িত না তো? সাকিব সেদিন কোন উত্তর দেয়নি। 

৩.
সরকার ঘোষণা দিয়েছে, শিবির দেখামাত্রই গুলি করতে হবে। যারা করতে পারবে তাদেরই কেবল প্রমোশন। আশারাফ সাহেব যেন এমন একটি ঘোষনার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। খুশিতে তার মুখ চকচক করতে লাগলো। আশরাফ সাহেব বহুদিন বহু অফিসার কে ঘুষ দিয়ে আসছেন তারপরেও প্রমোশন হচ্ছে না। তিনি প্রমাদ গুনলেন। এবার তার প্রমোশন হবেই। তিনি গুলি চালাবেন। একেবারে বুক বরাবর। প্রমোশন তাকে পেতেই হবে!
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় বেশ খুশি ওসি সাহেব। কালই তিনি ঘটনাটা ঘটাবেন। কাল শিবিরের হরতাল। মিছিলে তিনি গুলি করবেন। সকালে কাকডাকা ভোরেই মিছিল শুরু হলো। তিনি এসআই দের বললেন গুলি চালাও। তারা গুলি চালালো ফাঁকা। তারপরও মিছিল থামছেনা।

তিনি তার পাশে থাকা এস আই থেকে রাইফেল কেড়ে নিলেন। তাক করলেন মিছিলের যুবকদের বুক বরাবর। ঠা ঠা ঠা টানা দশ রাঊন্ড। তিন জন যুবক লুটিয়ে পড়লো। হাসি ফুটে উঠলো ওসি সাহেবের মুখে। লাশের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না।
থানায় এসে নতুন অভিযানের পরিকল্পনা করছেন। এক এস আই জানালো, স্যার দুজন মারা গেছে একজন জীবিত আছে তাকে চিকিৎসা দেব? গালি দিয়ে উঠলেন তিনি ...... পুত শিবিরের জন্য কিসের চিকিৎসা? বাসা থেকে বারবার ফোন দিচ্ছে। নানান ঝামেলায়  ও ব্যাস্ততায় তা ধরতে পারছেন না।

বিকেলে বাসায় গেলেন। দেখলেন তার স্ত্রী কাঁদছেন। সব শুনে বুঝতে পারলেন তিনি আজ হত্যা করেছেন সাকিবকে। বিমূঢ় হয়ে গেলেন। দৌড়ে গেলেন হাসপাতালে। দেখলেন তার দুই ছেলে ধস্তাধস্তি করছে পুলিশের সাথে। তিনি পৌঁছতেই দেখেন নিচে পড়ে আছে সাকিব। এখনো বেঁচে আছে। তার দুই ছেলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে চাচ্ছে কিন্তু অন্যান্য পুলিশ তা দিচ্ছে না।
এরপর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। অনেক চেষ্টা করলেন, কিছুতেই কিছু হল না। আশরাফ বলতে লাগলেন আমি শুধু আমার ছেলেকে কে গুলি করে হত্যা করি নি, তিলে তিলে হত্যা করেছি।

কাঙ্খিত প্রমোশন হয়েছে আশারাফ সাহেবের। সাহসী পুলিশ অফিসারের পদক যখন গ্রহন করছিলেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন পেছন থেকে দৌড়ে আসছে রক্তমাখা সাকিব। হাতে দুইটা রেজাল্ট কার্ড। বলছে দেখুন আঙ্কেল আমার দুই ভাই কত ভালো। তারা দুজনই ফার্স্ট হয়েছে।

পুনশ্চঃ আশরাফ সাহেব এখন হেমায়েতপুর। চিকিৎসার উর্ধ্বে তিনি।